পরিবেশ বিপর্যয়ে সৈকতে ভাঙন

আগের সংবাদ

দেশজুড়ে আলোচনায় ‘বেহেশত’

পরের সংবাদ

মিশেল ব্যাচেলেট আসছেন আজ

প্রকাশিত: আগস্ট ১৪, ২০২২ , ৮:৩৫ পূর্বাহ্ণ আপডেট: আগস্ট ১৪, ২০২২ , ৮:৩৫ পূর্বাহ্ণ

মানবাধিকার বিষয়ে অবস্থান স্পষ্ট করবে বাংলাদেশ

বাংলাদেশ সফরে আসছেন জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনার মিশেল ব্যাচেলেট। এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে গতকাল শনিবার এ তথ্য জানিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, আজ রবিবার ঢাকায় পা রাখবেন মিশেল। ১৭ আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশে অবস্থান করবেন তিনি। এ সময় তিনি একাধিক কর্মসূচিতে যোগ দেবেন। জাতিসংঘের প্রথম কোনো মানবাধিকার প্রধানের বাংলাদেশ সফর এটি।

মিশেল ব্যাচেলেটকে স্বাগত জানিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, বাংলাদেশ মানবাধিকারের ক্ষেত্রে জাতিসংঘের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। এ সফর বাংলাদেশের জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি এবং মানবাধিকার রক্ষা ও প্রচারের জন্য সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টা তুলে ধরার জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। আরো বলা হয়, মানবাধিকার পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অর্জন সম্পর্কে অবহিত আছেন মিশেল ব্যাচেলেট।

তবে সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, মিশেল ব্যাচেলেটের এই সফরে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে। কারণ দুপক্ষই এ বিষয়টিকে নিয়ে আলোচনায় জোর দেবে। প্রসঙ্গত, জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের ইউনিভার্সাল পিরিওডিক রিভিউয়ের (ইউপিআর) তৃতীয় পর্বের আওতায় বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যালোচনার ৪ বছর পূর্ণ হয়েছে। উল্লেখ্য, ইউপিআর জাতিসংঘ মানবাধিকার কাঠামোর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা, যার আওতায় বর্তমানে প্রতি ৫ বছর পরপর সদস্য রাষ্ট্রের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যালোচনা হয়। ২০১৮ সালের ১৪ মে তৃতীয় বারের মতো এ প্রক্রিয়ার আওতায় বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যালোচিত হয়, সেখানে আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সরকারের একটি প্রতিনিধিদল অংশগ্রহণ করে। ২০১৩ সালে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় পর্বের ইউপিআরের পর গৃহীত সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে বাংলাদেশ সরকার কতটুকু অগ্রগতি অর্জন করেছে, তা এ অধিবেশনে সরকারের পক্ষ থেকে তুলে ধরে বলা হয়- বর্তমান সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে বাংলাদেশ মানবাধিকারের ক্ষেত্রে চমৎকার অগ্রগতি লাভ করেছে। সরকারের উপস্থাপনার পর কাউন্সিলের বিভিন্ন সদস্য রাষ্ট্র সেই উপস্থাপনার ওপর মতামত তুলে ধরে প্রশ্ন রাখে ও সুপারিশ দেয়। যার উত্তরে সরকারের পক্ষ থেকে ওই সুপারিশগুলো তারা সমর্থন করছে, নাকি করছে না- তা জানাতে হয়েছে। বিভিন্ন রাষ্ট্রের সুপারিশ ও রাষ্ট্রের অবস্থান সংবলিত ‘ইউপিআর আউট-কাম ডকুমেন্ট’টি গৃহীত হয় ২০১৮ সালের ২০ সেপ্টেম্বর কাউন্সিলের পরবর্তী অধিবেশনে। এ প্রক্রিয়ার আওতায় দেয়া অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়নে সরকার পরবর্তী প্রতিবেদন দেয়ার আগ পর্যন্ত সময় পায়। সে হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশ সরকার তৃতীয় পর্যায়ের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের একেবারে শেষ বছরে রয়েছে। আগামী বছর জুনে তাদের বাস্তবায়নের অগ্রগতি ও বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা নিয়ে জাতীয় প্রতিবেদন দিতে হবে এবং নভেম্বরে পর্যালোচনায় অংশ নিতে হবে। তবে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার পেশ করা প্রতিবেদন এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রের আগাম উত্থাপিত প্রশ্নমালায় গুম, বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, বিরোধী দলীয় সদস্যদের গ্রেপ্তার, মতপ্রকাশের অধিকার সংকোচন, ৫৭ ধারা ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, নারী ও শিশুর নিরাপত্তাহীনতা এবং বিভিন্ন ধরনের বৈষম্যের যেসব পরিসংখ্যান ও তথ্য তুলে ধরা হয়েছে, তা একেবারেই ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে।

এমন পরিস্থিতিতে চার দিনের সফরে রবিবার ঢাকা আসছেন জাতিসংঘের মানবাধিকার-বিষয়ক হাইকমিশনার মিশেল ব্যাচেলেট। দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণেই তার এই সফর। এই সফরে ব্যাচেলেটের কাছে সেখানে দেয়া বাংলাদেশের মানবাধিকার-বিষয়ক প্রতিশ্রুতি স্পষ্ট করা হবে। তবে ব্যাচেলেটের সফর ঘিরে সরকারের ওপর অযথা চাপ সৃষ্টির উপলক্ষ হিসেবে জনগণকে বিভ্রান্ত করার কিছু দৃশ্যমান রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচেষ্টা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করছে বাংলাদেশ।

এ বিষয়ে পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ-বিন মোমেন বলেন, এ সফরে আমরাও সুযোগ পাব আমাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করার এবং আমরা কী করেছি সেটি বলার। একদিকে যেমন কী কী হয়নি সেটির অভিযোগ তিনি জানবেন, আবার অন্যদিকে আমাদের পক্ষ থেকে অনেক কিছু হয়েছে সেটিও বলার সুযোগ তৈরি হবে। দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে অনেক ধরনের অভিযোগ পাওয়া যায় উল্লেখ করে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, কিছু অভিযোগ খতিয়ে দেখার মতো, আবার অনেকগুলোর কোনো ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায় না। তিনি বলেন, অনেক সময়ে সংবাদপত্রে কোনো অভিযোগ প্রকাশ হওয়ার পরে অনুসন্ধান করে তেমন কিছু খুঁজে পাওয়া যায় না। কিন্তু এটি যেহেতু ছাপা হয়েছে সেটি অভিযোগের তালিকার মধ্যে ঢুকে যায়। অনেক এনজিও যেমন- ‘অধিকার’ এমন সব খবর দেয় যেগুলোর বাস্তবে কোনো ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায় না। ২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ নিয়ে এ ধরনের ভিত্তিহীন কিছু রিপোর্ট হয়েছিল।

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মানবাধিকার লঙ্ঘন, ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের অপব্যবহারসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে সরকারের বিরুদ্ধে। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, সাম্প্রতিক যে ইস্যুগুলো আছে যেমন- ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন- সেটি নিয়ে অনেক ভুল ধারণা ও অভিযোগ আছে। সেগুলো কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বা আইনমন্ত্রী বা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক হবে, সেখানে আমরা বোঝানোর চেষ্টা করব, কোনো আইনই শতভাগ সঠিক নয়। এর বাস্তবায়নের সময়ে অনেক ক্ষেত্রে ব্যত্যয় ঘটে। এজন্য আমরা কী ব্যবস্থা গ্রহণ করছি, সেটি বলা যাবে। সব অধিকারের বিষয়ে বাংলাদেশ শ্রদ্ধাশীল জানিয়ে তিনি বলেন, আমাদের সংবিধানে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের কথা যেমন বলা আছে, তেমনি মতপ্রকাশের এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতার কথাও বলা হয়েছে। এদিকে মানবাধিকার কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা হওয়ার পরে প্রায় প্রতিটি কার্যনির্বাহী কমিটিতে বাংলাদেশ সদস্য ছিল। ২০২৩-২৪ মেয়াদের কার্যনির্বাহী কমিটিতে নির্বাচন করছে বাংলাদেশ। এ কারণে এ সফরকে বাড়তি গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ-বিন মোমেন বলেন, আমরা মানবাধিকার কাউন্সিলের নির্বাহী সদস্য হওয়ার জন্য প্রার্থিতা দিয়েছি এবং সেজন্য আমাদের বাড়তি কিছু করার প্রয়োজন আছে।

এদিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সরকার দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে মানবাধিকার এজেন্ডার রাজনীতিকরণ কখনই জনগণের মানবাধিকারের প্রচার ও সুরক্ষায় সাহায্য করে না। বরং আন্তরিক সংলাপ এবং সহযোগিতা হলো এর মূল পথ। সুতরাং সরকারের ওপর অযথা চাপ সৃষ্টির উপলক্ষ হিসেবে জনগণকে বিভ্রান্ত করার কিছু দৃশ্যমান রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচেষ্টা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ জাতিসংঘের একটি দায়িত্বশীল এবং প্রতিক্রিয়াশীল সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে মানবাধিকারের প্রচার ও সুরক্ষার জন্য হাইকমিশনারের সঙ্গে গঠনমূলক আলোচনার জন্য উন্মুখ। বিবৃতিতে আরো উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে হাইকমিশনার অবগত রয়েছেন। বাংলাদেশ মানবাধিকারের ক্ষেত্রে জাতিসংঘের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনারের এ সফরে বাংলাদেশের জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি ও দেশীয় আইনি কাঠামো আপডেট করা, সচেতনতা তৈরি করা এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোকে সংবেদনশীল করার মাধ্যমে জনগণের মানবাধিকার রক্ষা ও প্রচারের জন্য সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টা তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ হবে। এতে আরো বলা হয়, ঢাকা দৃঢ়ভাবে আশা করে যে জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করবেন কীভাবে মানবাধিকার ঠিক রেখে বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রা অব্যাহত আছে। করোনা মহামারি সত্ত্বেও দেশে কেউ অনাহারে মারা যায়নি। ১৬৫ মিলিয়নের দেশ বাংলাদেশ গৃহহীনদের প্রায় এক মিলিয়ন বাড়ি দেয়ার সামর্থ্য রাখে। সামাজিক নিরাপত্তা সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় ১০ মিলিয়নেরও বেশি পরিবার খাদ্য এবং প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরবরাহ পাচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশ মানুষের জন্য খাদ্য, বাসস্থান ও উন্নয়নের অধিকার ইত্যাদি মৌলিক মানবাধিকারের প্রচার করছে। এছাড়াও বাংলাদেশে শপিংমল, স্কুল বা উপাসনালয়ে কেউ নিহত হচ্ছে না। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, জাতীয় প্রেক্ষাপট, বিশেষ করে মহামারি ও অন্যান্য ক্রমবর্ধমান সংকটের মধ্যে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, জনগণের শান্তি এবং নিরাপত্তা রক্ষণাবেক্ষণ, রোহিঙ্গা সংকট ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের মতো প্রতিবন্ধকতাগুলো যথাযথভাবে বিবেচনা করার ক্ষেত্রে সফরটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।

সফরে তিনি সরকারের মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক ছাড়াও জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, যুব প্রতিনিধি, সিএসও নেতা এবং শিক্ষাবিদদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন। হাইকমিশনার ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানাবেন। এছাড়া তিনি কক্সবাজার রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করবেন। এতে করে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় করার সুযোগ হবে হাইকমিশনারের। আর এটি রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে জাতিসংঘ তাদের এজেন্ডায় আরো জোরালো ভূমিকা রাখতে সহায়ক হবে।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়