তারুণ্যের এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা ‘বঙ্গবন্ধু’

আগের সংবাদ

যে জীবন অবিনশ্বর

পরের সংবাদ

বঙ্গবন্ধুর ৫ খুনি ৪৭ বছর ধরে বিদেশে!

প্রকাশিত: আগস্ট ১৪, ২০২২ , ১১:৩১ অপরাহ্ণ আপডেট: আগস্ট ১৪, ২০২২ , ১১:৩১ অপরাহ্ণ

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মস্বীকৃত পলাতক পাঁচ খুনি বিদেশে আছে। ৪৭ বছর ধরে বিভিন্ন দেশে ঘুরে বেড়াচ্ছে তারা। পররাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয় থেকে তাদের দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের রায় কার্যকরের কথা বারবার বলা হলেও দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই। প্রতি বছর আগস্ট মাস এলে এ নিয়ে কথা হলেও কোনো খুনি ফেরানোর সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। এদের মধ্যে এ এম রাশেদ চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রে ও নূর চৌধুরী কানাডায় অবস্থান করছে। বাকি তিনজন- শরিফুল হক ডালিম, মোসলেম উদ্দিন খান ও খন্দকার আব্দুর রশিদ কোথায় আছে, সে বিষয়ে সরকারের কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। বঙ্গবন্ধুর খুনি আজিজ পাশাকে ফেরত দিতে জিম্বাবুয়ের মুগাবে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের কাছে চেয়েছিল ১০ মিলিয়ন ডলার। লিবিয়া থেকে খুনিদের ফেরত আনতে যাত্রাপথে মাল্টায় প্রতিনিধিদলকে খুন করতে হোটেলে ভাড়াটে খুনি পাঠায় রশিদ। ডালিমকে ফেরত আনার জন্য কেনিয়া সরকারের কেউ কথা বলতে রাজি হয়নি। খুনি নূর কানাডায় ও রাশেদ চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রে আছে। দেশ দুটি মানবাধিকারের দোহাই দিয়ে বঙ্গবন্ধুর ঘাতককে আশ্রয় দিয়েছে। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর জেলহত্যার পরদিন ৪ নভেম্বর ব্যাংককে আশ্রয় নেয় খুনিরা। সেখান থেকে খুনিরা আশ্রয় নেয় লিবিয়ায়।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বঙ্গবন্ধুর খুনি মোসলেম উদ্দিন খান ইউরোপের কোনো দেশে পালিয়ে আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আরেক খুনি শরিফুল হক ডালিম পাকিস্তান, লিবিয়া অথবা স্পেনে এবং খন্দকার আব্দুর রশিদ পাকিস্তান অথবা আফ্রিকার কোনো একটি দেশে পালিয়ে আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

খুনিদের অবস্থান প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, আমরা দুজনের অবস্থান জানি। একজন যুক্তরাষ্ট্রে আছেন, আরেকজন কানাডায়। বাকি তিনজনের অবস্থান আমরা জানতে পারিনি। আমরা দেশবাসীকে, আমাদের সব প্রবাসীকেও বলেছি যদি তারা কেউ তাদের তথ্য দিতে পারেন; যদি সঠিক তথ্য দিতে পারেন তবে পুরস্কৃত করা হবে।

জানা গেছে, বঙ্গবন্ধুর খুনিদের মধ্যে রাশেদ চৌধুরী ব্রাজিল থেকে ১৯৯৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। ২০০৪ সালে দেশটিতে রাজনৈতিক আশ্রয় পান। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এলে রাশেদ চৌধুরীকে ফেরত দিতে যুক্তরাষ্ট্রকে অনুরোধ করা হয়। কিন্তু ফাঁসির আসামি বলে তাকে ফেরত দিতে অনীহা দেখিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র সরকার। রাশেদকে ফেরত দেয়ার জন্য ২০১৮ সালে দুবার এবং ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে চিঠি দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মোমেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেওর সঙ্গে একাধিক বৈঠকে রাশেদ চৌধুরীকে ফেরত পাঠানোর দাবি তোলেন। ২০১৯ সালে ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত এসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি অ্যালিস ওয়েলসের সঙ্গে এক বৈঠকের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশে রাশেদ চৌধুরীর বিচারের নথিপত্র চেয়েছে ওয়াশিংটন। ২০২০ সালের এপ্রিলে ঢাকায় মার্কিন রাষ্ট্রদূত আর্ল রবার্ট মিলারের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা হয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেনের। এছাড়া দুদেশের ক‚টনৈতিক পর্যায়ে আলোচনায় প্রায় নিয়মিত ইস্যু হয়ে দাঁড়ায় রাশেদ চৌধুরী।

ঢাকার ক‚টনৈতিক প্রচেষ্টার ফলে ২০২০ সালের মাঝামাঝি সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে থাকা রাশেদ চৌধুরীকে রাজনৈতিক আশ্রয়ের বিষয়টি পর্যালোচনার উদ্যোগ নেয় দেশটির বিচার বিভাগ। এর মধ্যে দেশটির ক্ষমতার পালাবদল হয়ে জো বাইডেন প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেন যুক্তরাষ্ট্র সফর শেষে দেশে ফিরে জানান, সফরে রাশেদ চৌধুরীকে দেশে ফেরানোর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সরকারের সঙ্গে আলাপ করেছেন তিনি।

নূর চৌধুরী বর্তমানে কানাডায় অবস্থান করছেন। ১৯৯৬ সালে প্রথম আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর নূরকে দেশে ফেরত পাঠানোর জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দেয়া হয়। ২০০৪ সালে একবার এবং ২০০৭ সালে একবার নূরকে দেশে ফেরত পাঠাতে চায় কানাডা। কিন্তু তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত সরকার বিষয়টি নিয়ে কোনো আগ্রহ দেখায়নি। ২০০৯ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে নূরকে ফের ফেরত চায়। এরই মধ্যে কানাডা থেকে বহিষ্কার এড়াতে নূর চৌধুরী সে দেশের অ্যাটর্নি জেনারেলের দপ্তরে প্রি-রিমুভ্যাল রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট (প্রাক-অপসারণ ঝুঁকি মূল্যায়ন) আবেদন করেন। সেখানে নূর উল্লেখ করেন, ‘কানাডা থেকে বাংলাদেশে পাঠানো হলে তাকে ফাঁসি দেয়া হবে।’ এ ধরনের আবেদন সাধারণত এক বছরের মধ্যে নিষ্পত্তি করা হয়। কিন্তু নূর চৌধুরীর ক্ষেত্রে কানাডার অ্যাটর্নি জেনারেল ১১ বছরেও সেটি নিষ্পত্তি করেনি। বাংলাদেশ সরকার ২০১৮ সালের জুলাইয়ে কানাডার ফেডারেল কোর্টে একটি মামলা দায়ের করে। মামলায় নূর চৌধুরীর অবস্থানসংক্রান্ত তথ্যের বিধিনিষেধ তুলে নেয়ার আবেদন করা হয়। পরের বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর কোর্ট বাংলাদেশের পক্ষে রায় দেয়। অর্থাৎ নূর চৌধুরীর অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য জানানোর জন্য কানাডা সরকারকে নির্দেশ দেয়। তবে এ বিষয়ে কানাডার সরকার এখনো কোনো সিদ্ধান্ত দেয়নি।

বঙ্গবন্ধুর খুনিদের মধ্যে মোসলেম উদ্দিন খান ইউরোপের কোনো একটি দেশে পালিয়ে আছে বলে ধারণা করা হয়। তবে করোনা মহামারির মধ্যে ২০২০ সালের জুন মাসে কলকাতার দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা বঙ্গবন্ধুর এ খুনি ভারতে আটক হওয়ার খবর ছাপে। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার বিষয়টি নিশ্চিত হতে পারেনি। বঙ্গবন্ধুর আরেক খুনি শরিফুল হক ডালিম পাকিস্তান, লিবিয়া বা স্পেনে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে সরকারের কাছে তার বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো তথ্য নেই। খন্দকার আব্দুর রশিদ পাকিস্তান বা আফ্রিকার কোনো একটি দেশে পালিয়ে আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সরকারের কাছে তার বিষয়েও সুস্পষ্ট কোনো তথ্য নেই।

খুনিরা যেভাবে রাষ্ট্রদূত হয়েছিল : ১৯৭৬ সালের ৮ জুন বঙ্গবন্ধু হত্যায় অভিযুক্তরা তৎকালীন সরকারের সহযোগিতায় বিভিন্ন দেশের দূতাবাসে নিয়োগ পায়। শরিফুল হক ডালিম প্রথমে বাংলাদেশের বেইজিং দূতাবাসে প্রথম সচিব পদে নিয়োগ পায়। সেখান থেকে ১৯৮২ সালে হংকংয়ের বাংলাদেশ মিশনে চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স হিসেবে নিয়োগ পায়। ১৯৮৮ সালে কেনিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় ডালিমকে। সেই সঙ্গে তানজানিয়ার অনাবাসী দূত হিসেবে দায়িত্বও পালন করে। নূর চৌধুরী ইরানে দ্বিতীয় সচিব পদে নিয়োগ পায়। এরপর তিনি আলজেরিয়া ও ব্রাজিলের বাংলাদেশ দূতাবাসে চাকরি করে। ১৯৯৪-৯৬ সালে হংকংয়ে বাংলাদেশ মিশনের কনসাল জেনারেল ছিল। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে যায়। পরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কানাডায় আশ্রয় নেয়। রাশেদ চৌধুরীকে ১৯৭৬ সালে সৌদি আরবে দ্বিতীয় সচিব পদে নিয়োগ দেয়া হয়। এরপর কেনিয়া, মালয়েশিয়া, জাপান ও ব্রাজিলের বাংলাদেশ দূতাবাসে চাকরি করে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাকে দেশে ফিরতে নির্দেশ দেয়া হয়। কিন্তু দেশে না ফিরে যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে যায়। আজিজ পাশা আর্জেন্টিনায় প্রথম সচিব হিসেবে নিয়োগ পায়। খুনি আজিজ পাশা ২০০১ সালের জুন মাসে জিম্বাবুয়েতে পলাতক অবস্থায় মারা যায়। খুনি ও খুনিদের সহযোগীদের মধ্যে আলজেরিয়ায় প্রথম সচিব হিসেবে নিয়োগ পায় মেজর এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ। মেজর বজলুল হুদা পাকিস্তানে দ্বিতীয় সচিব হিসেবে নিয়োগ পায়। কুয়েতে দ্বিতীয় সচিব পদে নিয়োগ পায় শরিফুল হোসেন। ক্যাপ্টেন কিসমত হাশেম আবুধাবিতে তৃতীয় সচিব পদে নিয়োগ পায়। কানাডায় তৃতীয় সচিব পদে নিয়োগ পায় নাজমুল হোসেন। আর আবদুল মাজেদ তৃতীয় সচিব হিসেবে নিয়োগ পায় সেনেগালে। মেজর শাহরিয়ার রশিদ নিয়োগ পায় ইন্দোনেশিয়ায় দ্বিতীয় সচিব পদে। আর মিসরে তৃতীয় সচিব হিসেবে নিয়োগ পায় এম খায়রুজ্জামান। হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্বদানকারী লেফটেন্যান্ট কর্নেল সৈয়দ ফারুক রহমান ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল খন্দকার আব্দুর রশিদ দূতাবাসের চাকরিতে যোগ দিতে রাজি হয়নি। তারা দুজন লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট মুয়াম্মার আল গাদ্দাফির আশ্রয়ে সেখানে ব্যবসাবাণিজ্য শুরু করে।
প্রসঙ্গত, ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকর করা হয় সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশীদ খান, মহিউদ্দিন আহমদ (ল্যান্সার), এ কে বজলুল হুদা ও এ কে এম মহিউদ্দিনের (আর্টিলারি)। বঙ্গবন্ধুর বাকি ছয় খুনির মধ্যে পলাতক আবদুল মাজেদের ফাঁসি কার্যকর করা হয় ২০২০ সালের ১১ এপ্রিল। গ্রেপ্তার হওয়ার আগে প্রায় ২৩ থেকে ২৪ বছর ভারতের কলকাতায় লুকিয়ে ছিল সে।

জাতির পিতাকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যার ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা এলে প্রথমবারের মতো ওই ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়। ১৯৯৮ সালে হত্যার দায়ে ১৫ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। পরে ২০০০ সালে হাইকোর্ট ১২ জনের মৃত্যদণ্ড বহাল রাখেন। ২০০৯ সালে আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় বহাল রাখলে আসামিরা রিভিউ আপিল করে। ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি রিভিউ আপিল খারিজ করা হয় এবং পরদিন ২৮ জানুয়ারি পাঁচ খুনির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়