বঙ্গবন্ধু হত্যার ষড়যন্ত্র উন্মোচনে বিশ্বমানের কমিশনের তাগিদ

আগের সংবাদ

৩টি গোপন নৈশভোজ ও ১টি জাতিকে বিলীনের চক্রান্ত

পরের সংবাদ

নান্দনিক বঙ্গবন্ধু

প্রকাশিত: আগস্ট ১৪, ২০২২ , ১১:৩২ অপরাহ্ণ আপডেট: আগস্ট ১৫, ২০২২ , ১২:৩৯ পূর্বাহ্ণ

জাতি গঠনে সর্বদাই এমন এক আমূল পরিবর্তনবাদী নেতার সন্ধান মেলে, যার সাথে সংযোগ রাখলে পুরো সমাজের সম্পর্ক স্থাপন করা যায়। তিনি হয়ে ওঠেন সমাজের চাওয়া-পাওয়ার সবচেয়ে বড় যোগসূত্র। তাঁকে কেন্দ্র করেই সমাজ-সংস্কৃতি বদলাতে থাকে আরো একীভূত হবার জন্য। তাঁকে আশ্রয় করেই সমাজ তার হৃদয়কে এক জায়গায় স্থাপন করে। এমন একটি ভাবনার সঞ্চার করেছেন রবীন্দ্রনাথ তার ‘স্বদেশী সমাজ’ প্রবন্ধে। তিনি মনে করতেন সচেষ্ট সমাজই এমন নেতৃত্ব তৈরি করতে পারে। আমাদের বড়ই সৌভাগ্য যে এমন এক মহান নেতার সন্ধান আমরা পেয়েছিলাম। অস্বীকার করার উপায় নেই যে বঙ্গবন্ধুর মধ্যে এমন সব বৈশিষ্ট্যই দেখা যায়। বঙ্গবন্ধুর রাজনীতিতে তাই নান্দনিকতা দৃশ্যমান হয় অবধারিতভাবে। বিশেষ করে দুঃখের দিনে পুরো জাতির এক হবার শক্তি বেড়ে যায় তাঁর নান্দনিক নেতৃত্বের আকর্ষণেই।

ড. আতিউর রহমান। ফাইল ছবি

দেশের হৃদয়কে এক করাই জাতি গঠনের মূল কথা

‘পোলিটক্যাল সাধনার চরম উদ্দেশ্য একমাত্র দেশের হৃদয়কে এক করা।’ (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ‘স্বদেশী সমাজ’, রবীন্দ্র রচনাবলী, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬২৯, বিশ্বভারতী গ্রন্থ বিতান, আশি^ন ১৪১৫)। মানুষের সঙ্গে মানুষের হৃদয়ের সম্পর্ক স্থাপনই একজন রাজনৈতিক নন্দিত নেতার প্রধান সাধনা হবার কথা। বিশেষ করে একটি জাতি গঠন প্রক্রিয়ায় এমন নেতৃত্বের ভূমিকা হয় অসামান্য। এমন নেতৃত্বের প্রধান লক্ষ্যই হতে হয়, ‘সমাজের নীচে হইতে উপর পর্যন্ত সকলকে একটি বৃহৎ নিঃস্বার্থ কল্যাণ বন্ধনে বাঁধা, ইহাই আমাদের সকল চেষ্টার অপেক্ষা বড় চেষ্টার বিষয়।’ (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ‘ভারতবর্ষীয় সমাজ’, ঐ, পৃষ্ঠা ৬২৫)। এই চেষ্টা শুধু বর্তমানের নয়। কেননা ‘অতীত বর্তমানের মধ্যে নিরন্তর চিত্তের সম্বন্ধ আছে- অখণ্ড কর্মপ্রবাহ চলিয়া আসিতেছে।’ (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৬২৪)। এই যে অতীত বর্তমানের চিত্ত সংযোগ- সেটিই একটি জাতি গঠনের মূল উপাদান হিসেবে কাজ করে। রবীন্দ্রনাথ ফরাসি চিন্তক রেঁনার ‘নেশন’ ভাবনা নিয়ে আলাপ করতে গিয়ে বলেছেন যে এটি একটি ‘সজীব সত্তা’, একটি ‘মানস পদার্থ’। আগেরটি অতীতের এবং পরেরটি বর্তমানের বিষয়। ‘একটি হইতেছে সর্বসাধারণের প্রাচীন স্মৃতি সম্পদ, আর- একটি পরস্পর সম্মতি, একত্রে বাস করিবার ইচ্ছা- যে অখণ্ড উত্তরাধিকার হস্তগত হইয়াছে তাহাকে উপযুক্তভাবে রক্ষা করিবার ইচ্ছা।’ (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ‘নেশন কী’, ঐ, পৃষ্ঠা ৬২১)।

সেই সূত্র ধরেই তিনি মনে করেন, ‘আমরা অনেকটা পরিমাণে আমাদের পূর্বপুরুষদের দ্বারা পূর্বেই গঠিত হইয়া আছি। অতীতের বীর্য, মহত্ত¡, কীর্তি, ইহার উপরেই ন্যাশনাল ভাবের মূল পত্তন। অতীতকালের সর্র্বসাধারণের এক গৌরব এবং বর্তমানকালে সর্বসাধারণের এক ইচ্ছা, পূর্বে একত্রে বড়ো কাজ করা এবং পুনরায় একত্রে সেইরূপ কাজ করিবার সংকল্প- ইহাই জনসম্প্রদায় গঠনের ঐকান্তিক মূল। … অতীতের গৌরবময় স্মৃতি ও সেই স্মৃতির অনুরূপ ভবিষ্যতের আদর্শ- একত্রে দুঃখ পাওয়া, আনন্দ করা, আশা করা- এইগুলিই আসল জিনিস, জাতি ও ভাষার বৈচিত্র্য সত্তে¡ও এগুলির মাহাত্ম্য বোঝা যায়; একত্রে মাসুলখানা-স্থাপন বা সীমান্ত নির্ণয়ের অপেক্ষা ইহার মূল্য অনেক বেশি। একত্রে দুঃখ পাওয়ার কথা এই জন্য বলা হইয়াছে যে, আনন্দের চেয়ে দুঃখের বন্ধন দৃঢ়তর।

অতীতে সকলে মিলিয়া ত্যাগ দুঃখ-স্বীকার এবং পুনর্বার সেই জন্য সকলে মিলিয়া প্রস্তুত থাকিবার ভাব হইতে জনসাধারণকে যে একটি একীভূত নিবিড় অভিব্যক্তি দান করে তাহাই নেশন।’ (রবীন্দ্রনাথ, ঐ, পৃষ্ঠা ৬২১)। সেই অর্থে জাতি গঠন একটি ক্রমবিকাশমান বহুমাত্রিক ধারা। এটি অনুভবের বিকাশ। সুখে-দুঃখে একত্রে বাঁচার এবং আরো ভালোভাবে বাঁচার স্বপ্ন দেখার বিষয়।

জাতি গঠনে বঙ্গবন্ধুর নান্দনিক ব্যক্তিত্বের প্রভাব

জাতি গঠনে সর্বদাই এমন এক আমূল পরিবর্তনবাদী নেতার সন্ধান মেলে যার সাথে সংযোগ রাখলে পুরো সমাজের সম্পর্ক স্থাপন করা যায়। তিনি হয়ে ওঠেন সমাজের চাওয়া-পাওয়ার সবচেয়ে বড় যোগসূত্র। তাঁকে কেন্দ্র করেই সমাজ-সংস্কৃতি বদলাতে থাকে আরও একীভূত হবার জন্য। তাঁকে আশ্রয় করেই সমাজ তার হৃদয়কে এক জায়গায় স্থাপন করে। তিনিই সেই সমাজের সকলের বাঁচবার উপায় হিসেবে সর্বতোভাবে আত্মশক্তির জাগরণের নেতৃত্ব দেন। নেতৃত্ব পেলে নিজের জীবনী শক্তি এবং সৃজনশীলতার সাহায্যে সমাজের পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির সাথে নিজেকে মিলিয়ে নিয়ে জাতি আত্মরক্ষা ও আত্মবিকাশের পথ খুঁজে নেয়। পরিবর্তনের সাথে এগিয়ে চলাই হচ্ছে একটি প্রাণবন্ত সমাজের বড় লক্ষণ। ঘরের এবং বাইরের শক্তিকে প্রকৃতিসঙ্গত করার এই ‘শক্তিস্বাতন্ত্র্য’ বিকাশে যিনি লক্ষ্যভেদী নেতৃত্ব দেন তিনিই হয়ে ওঠেন সম্মিলিত জনগণের ভরসার বাতিঘর। এভাবেই বাঙালির অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রতিনিধি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি নিজে আজীবন হাসিমুখে বাঙালি জাতির কষ্টের সারথি হয়ে ছিলেন। অন্যদেরও তা হবার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন। আজো তিনিই আমাদের ভবিতব্য। রাজনীতির এক অমর কবি। তাঁর নামেই আজো আমাদের ইতিহাসের দরজা খুলে যায়। তিনি যে বাঙালির অস্তিত্বের প্রতীক। একদিন “শত বছরের শত সংগ্রামের শেষে,/ রবীন্দ্রনাথের মতো দৃপ্ত পায়ে হেঁটে/ অতঃপর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন। … গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন তাঁর অমর কবিতাখানি;/ ‘এবারে সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম,/ এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’।/ সেই থেকে স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের।” (নির্মলেন্দু গুণ, ‘স্বাধীনতা- এ শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো?’)।

চলা, বলা, বজ্রকণ্ঠ, মেরুদণ্ড খাড়া করা দেহ, ঊর্ধ্বমুখী তর্জনী, আঞ্চলিক ও প্রমিত বাংলার চমৎকার সংশ্লেষ, অতিসাধারণ মানুষকেও অবলীলায় বুকে জড়িয়ে ধরা, নজরুল-রবীন্দ্রনাথ যাঁর চিরসঙ্গী, বাঙালির আশা, বাঙালির ভাষা যাঁর চির আরাধ্য, দেশের এবং সারা বিশে^র নিপীড়িত-নির্যাতিত মানুষের সহজাত কণ্ঠস্বর যাঁর কণ্ঠে ঠাঁই পায় অনায়াসে- সেই বহুমাত্রিক প্রতিভার নাম বঙ্গবন্ধু। তিনি একই সাথে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জাতীয় মঞ্চ এবং জাতিসংঘের বিশ্ব মঞ্চে নিপীড়িত জনগণের বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর হতে পেরেছিলেন। সারা বিশে^র দুঃখী মানুষের চিরসঙ্গী বঙ্গবন্ধু। তাই তো তিনি বিশ্ববন্ধু। তাঁর জীবনটাই এক অসামান্য রোমাঞ্চে ভরা। তাঁর ব্যক্তিত্ব সর্বদাই আকর্ষণীয়। তিনি এমন এক নেতা যিনি সহজেই বলতে পারেন সকল বাঙালির দুঃখই তাঁর দুঃখ। পৃথিবীর সকল মানুষের দুঃখ তাঁর দুঃখ। দুর্ভিক্ষের ভয়াবহ বাস্তবতায় দাঁড়িয়েও তিনি সোনার বাংলার ঐশ্বর্য সন্ধানে ব্যস্ত। মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েও তিনি বাঙালির ভবিষ্যৎ নিয়ে মোটেও শঙ্কিত ছিলেন না। বরং গভীরতর স্বপ্নে মগ্ন থাকতেন। তাঁর এই আশাবাদের ভিত্তি ছিল বাঙালির অক্ষয় ভালোবাসা, যা তাঁর রাজনীতি ও অস্তিত্বকে অর্থবহ করে তুলেছিল। তাদের আত্মত্যাগে তিনি দারুণ দুঃসময়েও উজ্জীবিত হতেন। ১৯৬৬ সালের ৭ জুন। ছয় দফার পক্ষে ধর্মঘট পালন করতে গিয়ে ছাত্র-শ্রমিক যেভাবে অকাতরে প্রাণ দিয়েছে, জেলজুলুম হাসিমুখে বরণ করেছে তা দেখে জেলে বসেও তিনি তাঁর ডায়েরিতে লিখেছেন, ‘মনে শক্তি ফিরে এল এবং আমি দিব্য চোখে দেখতে পেলাম জয় আমাদের অবধারিত। কোন শক্তি আর দমাতে পারবে না।’ (শেখ মুজিবুর রহমান, ‘কারাগারের রোজনামচা’, বাংলা একাডেমি, ২০১৮, পৃষ্ঠা ৭০)। পরের দিন আরো স্পষ্ট করে লিখেছেন, ‘যে রক্ত আজ আমার দেশের ভাইদের বুক থেকে বেরিয়ে ঢাকার পিচঢালা কাল রাস্তা লাল করল, সে রক্ত বৃথা যেতে পারে না। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য যেভাবে এ দেশের ছাত্র-জনসাধারণ জীবন দিয়েছিল তারই বিনিময়ে বাংলা আজ পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা। রক্ত বৃথা যায় না। যারা হাসতে হাসতে জীবন দিল, আহত হলো, গ্রেপ্তার হলো, নির্যাতন সহ্য করল তাদের প্রতি এবং তাদের সন্তান-সন্ততির প্রতি নীরব প্রাণের সহানুভূতি ছাড়া জেলবন্দী আমি আর কি দিতে পারি! আল্লাহর কাছে এই কারাগারে বসে তাদের আত্মার শান্তির জন্য হাত তুলে মোনাজাত করলাম। আর মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম, এদের মৃত্যু বৃথা যেতে দেন না, সংগ্রাম চালিয়ে যাবো। যা কপালে আছে তাই হবে। জনগণ ত্যাগের দাম দেয়। ত্যাগের মাধ্যমেই জনগণের দাবি আদায় করতে হবে।’ (শেখ মুজিবুর রহমান, প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৭৩-৭৪)।

জনগণের ওপর এই যে গভীর আস্থা এবং তাদের ত্যাগের লক্ষ্য পূরণে আমরণ সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার যে আকাক্সক্ষার কথা লিখেছেন বঙ্গবন্ধু, তা মোটেও কথার কথা ছিল না। সারাটা জীবন তিনি সংগ্রাম করে গেছেন গণমানুষের মুক্তির জন্য। বারে বারে তিনি তাঁর নিজের জীবনকে বাজি ধরেছেন এ দেশের মানুষের মুক্তির জন্য। এমনটি তিনি করতে পেরেছিলেন এ কারণে যে তিনি ছিলেন উঁচু মাপের এক দেশপ্রেমিক। তিনি স্বদেশকে জানতেন। ভালোবাসতেন তাকে হৃদয়ে দিয়ে। তাই নিরন্তর স্বদেশের মানুষকে ভালোবাসতেন। তারাও তাঁকে মনেপ্রাণে ভালোবাসতেন। আর এই অক্ষয় ভালোবাসার নির্যাসেই গড়ে উঠেছেন নান্দনিক বঙ্গবন্ধু। তাঁর ব্যক্তিত্বের দ্যুতিতে ছিল সৌন্দর্যের বিভা। ছিলেন তিনি সুন্দরের পূজারি। কল্যাণের বার্তাবাহক। অনুসারীদের মনে এমন করে স্বদেশপ্রেমের বীজ তিনি বপন করতে পেরেছিলেন তাঁর নান্দনিক ব্যক্তিত্ব ও আকর্ষণীয় নেতৃত্বের গুণে। তাঁর সারাজীবনের নানা ঘটনা প্রবাহের মধ্যে একাত্তরের ৭ মার্চ এক ভিন্ন মাত্রায় উদ্ভাসিত হয়ে আছে সারা বিশে^র মুক্তিকামী মানুষের মানসপটে। বঙ্গবন্ধুর পুরো রাজনৈতিক জীবনে এই ভাষণটিই মনে হয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

বঙ্গবন্ধুর পুরো রাজনৈতিক জীবনে এই ভাষণটিই মনে হয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। তাঁর চিন্তা ও গণমুখী নেতৃত্বের সর্বোচ্চ নান্দনিক বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে এই ঐতিহাসিক ভাষণটিতেই। পৃথিবীর ইতিহাসের বহু বিখ্যাত ভাষণের সন্ধান আমরা পাই। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ নানা কারণেই অনন্য। অসাধারণ শুধু একটি জাতিকে চ‚ড়ান্ত মুক্তির লক্ষ্যের দিকে ঠেলে দেয়ার জন্য নয়, এর কাব্যময়তা, এর ভাষাভঙ্গি, কণ্ঠের ওঠানামা, অঙ্গুলি হেলন, তাঁর দাঁড়ানোর ভঙ্গি, ঘাড় ফিরিয়ে জনতার দিকে ফিরে ফিরে তাকানো, তাঁর হুঙ্কারের সাথে সাথে জনতার গর্জন, সমুদ্রে ঝড় ওঠার মতো ধীরে ধীরে মুক্তির অভিমুখী একটি ভয়ংকর ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হওয়া- সবকিছু মিলিয়ে ৭ মার্চের ভাষণ একটি মহাকাব্যিক রূপ নিয়েছে। আর এভাবেই বঙ্গবন্ধু হয়েছেন রাজনীতির অমর কবি। যার তুলনা শুধু তিনিই। এই ভাষণে তিনি মুক্তিকামী বাঙালিকে যে পথের দিশা দিয়েছিলেন সেই পথেই হেঁটে তারা স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জন করেছেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতিকে ও সমাজকে তিনি তাঁর সুদূরপ্রসারী নেতৃত্বের গুণেই অতি অল্প সময়েই সম্ভাবনার পথরেখায় তুলে এনেছিলেন। আমাদেরই দুর্ভাগ্য খুব বেশি দিন তাঁর নান্দনিক নেতৃত্বের সুফল ভোগ করতে পারিনি বিশ্বাসঘাতকদের ষড়যন্ত্রের কারণে। তাঁর অবর্তমানে স্বদেশ চলছিল এক ‘অদ্ভুত উটে’র পিঠে অন্ধকারের দিকে। হঠাৎ করে বাংলাদেশের গতিময়তা থমকে দাঁড়ায়। সমাজ ও অর্থনীতিতে চলে অনৈতিক সব তাণ্ডব। দীর্ঘ সংগ্রাম ও ত্যাগের বিনিময়ে ফের বাংলাদেশ ফিরে আসে বঙ্গবন্ধুকন্যার হাত ধরে তাঁরই দেখানো সমুন্নয়ের পথে। বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকট সত্তে¡ও বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে সকল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই। সবচেয়ে আশার কথা বঙ্গবন্ধু নামটি এখন আমাদের মনস্তাত্তি¡ক জমিনে গভীরভাবে প্রোথিত হয়ে গেছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কাছে তিনি আজ সমহিমায় উদ্ভাসিত। তাই তো প্রকৃতিও তাঁর নামে কবিতা লেখে। মহাদেব সাহা যথার্থই লিখেছেন :

‘আমি আমার সমস্ত কবিত্ব শক্তি উজাড় করে
যে-কবিতা লিখেছি তার নাম শেখ মুজিব,
এই মুহূর্তে আর কোনো নতুন কবিতা লিখতে পারবো না আমি
কিন্তু এই যে প্রতিদিন বাংলার প্রকৃতিতে ফুটছে নতুন ফুল
শাপলা-পদ্ম-গোলাপ- সেই গোলাপের বুক জুড়ে
ফুটে আছে মুজিবের মুখ
এদেশের প্রতিটি পাখির গানে মুজিবের প্রিয় নাম শুনি,
মনে হয় এরা সকলেই আমার চেয়ে আরো বড়ো কবি।
শেখ মুজিবের নামে প্রতিদিন লেখে তারা নতুন কবিতা
মুজিব গোলাপ হয়ে ফোটে, লালপদ্ম হয়ে ফোটে
হৃদয়ে হৃদয়ে;
আমার না-লেখা প্রতিটি নতুন কবিতা জুড়ে
গাঁথা আছে তার নাম, তার মুখচ্ছবি
লিখি বা না-লিখি শেখ মুজিব বাংলাভাষায় প্রতিটি নতুন কবিতা।’
(শেখ মুজিব আমার নতুন কবিতা, মহাদেব সাহা)

* লেখক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক এবং সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়