চা শ্রমিকের মানবেতর জীবন

আগের সংবাদ

মন্টিনিগ্রোতে বন্দুকধারীর গুলিতে নিহত ১০

পরের সংবাদ

অবস্থান স্পষ্ট নয় বিএনপির

প্রকাশিত: আগস্ট ১৩, ২০২২ , ৮:১৫ পূর্বাহ্ণ আপডেট: আগস্ট ১৩, ২০২২ , ৮:১৫ পূর্বাহ্ণ

** যুগপৎ আন্দোলনের কৌশল নিয়ে ধোঁয়াশা ** ‘জাতীয় সরকার’ প্রশ্নে আস্থার অভাব ** তারেকের নেতৃত্ব নিয়ে সমমনা দলের আপত্তি **

কঠোর আন্দোলনের হুঙ্কার আর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার হাঁকডাকে ছোট দলের সঙ্গে বড় দলের নেতাদের সম্মিলন ঘটানোর চেষ্টায় বারবার হোঁচট খাচ্ছে বিএনপি। বৃহত্তর সর্বদলীয় ঐক্য গড়ার ঘোষণা দিলেও শেষ পর্যন্ত এর ভিত গড়তে পারেনি দলটি। এমনকি ‘শেখ হাসিনা সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচন নয়’- এই এক দফা দাবিতে যুগপৎ আন্দোলনের যে ঘোষণা ছিল, নানা জটিলতায় এর সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্রও এখনো তৈরি হয়নি। কবে হবে, সে বিষয়টিও স্পষ্ট করতে পারেননি বিএনপি বা সমমনা দলের নেতারা। উল্টো দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ক্রিয় থাকা বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট এবং জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট প্রায় বিলীন হয়ে গেছে।

দলীয় সূত্র জানায়, বিএনপির ‘বৃহত্তর ঐক্য’ গঠনের চিন্তা শেষ হয়েছে অনেক আগেই। এরপরই যুগপৎ আন্দোলনের ঘোষণা দেয় দলটি। এ লক্ষ্যে ২২টি সমমনা রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে এরই মধ্যে। তবে যুগপৎ আন্দোলনের আদলে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন আদৌ হবে কিনা তা নিয়ে সংশয় রয়েছে খোদ বিএনপিতেই। কারণ একদিকে বৃহত্তর জোট গঠনের স্বার্থে জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে বিএনপিতে এখন ‘শ্যাম রাখি না কুল রাখি অবস্থা’। অন্যদিকে ঐক্যের প্ল্যাটফর্মে বিএনপির মৌলিক অবস্থান কী হবে? ঐক্য হওয়ার পর রাজপথে কীভাবে আন্দোলন হবে, কারা নেতৃত্ব দেবেন, আন্দোলনের লক্ষ্য কী হবে! কোন পথে সাধারণ মানুষকে ঐক্যের আন্দোলনে যুক্ত করা যাবে- তা ঠিক করতে হিমশিম খাচ্ছেন ঐক্যের উদ্যোক্তারা। সবচেয়ে বড় বিপত্তি হলো- ঐক্যের প্রধান নেতা হিসেবে তারেক রহমানকে মানতে নারাজ ছোট দলের বড় নেতারা। এছাড়াও ক্ষমতাকেন্দ্রিক দেনা-পাওনার আগাম হিসাব ও জাতীয় সরকারের ফমুর্লা নিয়ে অস্পষ্টতার কারণে যুগপৎ আন্দোলনের ক্ষেত্র এখনো চূড়ান্ত রূপ পায়নি। এর মধ্যেই বিএনপিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছে বিএনপি সমমনা হিসেবে পরিচিত সাত দলের নতুন জোট ‘গণতন্ত্র মঞ্চ’।

বিএনপির নীতিনির্ধারকরা বলছেন, এই সরকারের অধীন নির্বাচন নয়- এই এক দফা দাবিতে অনড় তারা। তবে এই মুহূর্তে ঘটা করে সরকারবিরোধী বৃহত্তর রাজনৈতিক জোট গড়া তাদের লক্ষ্য নয়। তাদের মতে, একটি নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তী সরকারের অধীন গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং নির্বাচনের পর ‘রাষ্ট্র মেরামতের কর্মসূচি’র বিষয়ে ঐকমত্যে আসা দলগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক অঙ্গীকার বা চুক্তিতে যাবে বিএনপি। এর ভিত্তিতেই রাজপথে সরকারবিরোধী দলগুলোর সঙ্গে একটি বৃহত্তর ঐক্য স্থাপিত হবে। এ কারণে পুরনো দুই জোটকে নিষ্ক্রিয় রাখা হয়েছে। এছাড়া গণতন্ত্র মঞ্চের আত্মপ্রকাশকে ‘ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের সাফল্য’ হিসেবে দেখছেন তারা।

অনেক দিন ধরেই বৃহত্তর ঐক্যের লক্ষ্যে কাজ করছে বিএনপি, ঘোষণা রয়েছে যুগপৎ আন্দোলনেরও। কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো কিছুই দেখা যায়নি; কত দূর এগিয়েছে ঐক্য প্রক্রিয়া? এমন প্রশ্নের জবাবে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ভোরের কাগজকে বলেন, সমমনা দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা চলছে। সেখানে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি বিভিন্ন কৌশলগত কারণে। তবে ঐক্য হবেই। ছোট ছোট কিছু দল এক হয়েছে, আমরা তাদের স্বাগত জানাই।

ঐক্যের প্ল্যাটফর্মেই কী আন্দোলন? জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই বিষয়ে চূড়ান্ত কিছু এখনই বলা যাচ্ছে না। তাছাড়া প্ল্যাটফর্মটা বড় কথা নয়, সরকার পতনের আন্দোলনে রাজপথে সরব হওয়া বড় কথা। সেটার জন্য রাজনৈতিক দলগুলো যুগপৎ আন্দোলনের কথা ভাবছে। আন্দোলনের জন্য নির্দিষ্ট ফ্রন্ট বা ঐক্য কিংবা ফরমেটটা কী হবে- একসঙ্গে সবাই বসে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে শুরুটা সবাই যুগপৎভাবে করব বলেই আশা। ঐক্যের বেলায় নেতৃত্ব কে দেবেন- প্রশ্নের জবাবে বিএনপির এ নীতিনির্ধারক বলেন, আমাদের আন্দোলনের নেতা তারেক রহমান। আর ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে একক নেতৃত্বের সম্ভাবনা খুব কম। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল কিংবা জোট আছে। তাদের আলাদা আলাদা নেতা আছে।

জোটের ভাবনায় বড় বাধা জামায়ত : নতুন ঐক্যজোটের ভাবনায় জামায়াত ‘বাধা’ হলেও কৌশলে স্বাধীনতাবিরোধী এই দলটিকে সঙ্গে রেখেই ঐক্যের পরিকল্পনা বিএনপির। জোট গঠনে জামায়াতকে নিয়ে যাতে বিপত্তি না ঘটে, সে কারণে দলটির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সংলাপের সিদ্ধান্তও বাতিল করেছে বিএনপি। অথচ বিএনপির ২০ দলীয় জোটের অধিকাংশই এখন জামায়াতের নিয়ন্ত্রণে। ফলে জামায়াতকে বাদ দিতে গেলে আবার নতুন কোনো সমস্যা হবে কিনা তাও ভাবছে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব। তাদের আশঙ্কা, হঠাৎ করে কোনো সিদ্ধান্ত নিলে গত নির্বাচনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মতো হযবরল পরিস্থিতির তৈরি হতে পারে। বিএনপির এক সিনিয়র নেতা নাম না প্রকাশ করার শর্তে জানান, বিএনপির পক্ষ থেকে অনানুষ্ঠানিকভাবে বাম ঘরানার যাদের সঙ্গে কথা হচ্ছে- তাদের মূল আপত্তির জায়গাটা জামায়াত। দলগুলো বলছে, জামায়াত থাকলে ঐক্য প্রক্রিয়ার প্রশ্নেই ওঠে না। যুগপৎ আন্দোলন হবে, তবে তা বিএনপির ফর্মুলায় নয়।

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ভোরের কাগজকে বলেন, আমরা একটা বৃহত্তর প্ল্যাটফর্মে আন্দোলনে নামার টার্গেট নিয়ে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে চাই। সেখানে বাম-ডান, গণতান্ত্রিক, দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক সব দলকে একত্রিত করতে চাই। সেই লক্ষ্যে আমরা পরিকল্পনামাফিক কাজ করছি। এমন সম্ভাবনাও শেষ হয়ে যায়নি। তবে তাড়াহুড়া করব না; সব দলের সঙ্গে আলাদাভাবে কথা বলে ঐক্যের ফরমেট তৈরি করব। আশা করছি ভালো কিছুই হবে।

স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, সবাই জাতীয় ঐকমত্যের দিকে এগোচ্ছে। সবাই চাইছে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে নির্বাচন হতে হবে। মূল জায়গায় সবাই যখন এক হয়েছে, বাকিটাও হয়ে যাবে।

জাতীয় সরকারের ফরমেট নিয়ে অস্পষ্টতা : বিএনপির নির্দলীয় সরকারের দাবির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জাতীয় সরকার। দলটি বলছে, আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার পতনের পর একটি নিরপেক্ষ সরকারের হাতে রাষ্ট্রের ক্ষমতা যাবে। তাদের গঠিত নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের পরিচালনায় নির্বাচনের মাধ্যমে যে সংসদ গঠন হবে; সেই সংসদে যারা আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন- তাদের সবাইকে নিয়ে, মতামতের ভিত্তিতে যে সরকার গঠিত হবে- সেটাই হবে জাতীয় সরকার। তবে বিএনপির এই ফমুর্লা নিয়ে জোট নেতাদের আশঙ্কা- নির্বাচনের পর জাতীয় সরকারে বিএনপি কাকে রাখবে না রাখবে, এটা তখন তাদেরই এখতিয়ার হবে। এখানে ভরসার জায়গা কম।

এমনকি জাতীয় সরকারের ফর্মুলা নিয়ে খোদ বিএনপিতেই ধূম্রজাল সৃৃষ্টি হয়েছে। মূল আন্দোলনকে আড়াল করতে দলের ভেতরের কারো ষড়যন্ত্র কিনা- এমন সন্দেহ করেছেন বিএনপির কোনো কোনো নেতা। এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, যারা একটু ধৈর্যহারা হয়ে গেছে তারা চাচ্ছে কী? জাতীয় সরকার। জাতীয় সরকারটা কী? তার কী রূপরেখা, কী তার তাৎপর্য। এখন এই জাতীয় সরকারের রূপরেখা কারা করছে, এটা আবার সরকারের কুটচাল কিনা আমাদের ধারণা নেই।

প্রধান নেতা তারেককে মানা হবে না : বিগত নির্বাচনের আগে ঐক্যফ্রন্ট গঠন করে ড. কামাল হোসেনকে প্রধান নেতা নির্বাচন করে তার নেতৃত্বে নির্বাচনে অংশ নিয়ে দেশি-বিদেশি নানা সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে বিএনপিকে। ক্ষমতায় গেলে কে হবেন সরকারপ্রধান- ভোটের আগে তা স্পষ্ট করতে না পারা ভুল ছিল বলে মনে করছেন বিএনপির নেতারা। তাই এবার জোটবদ্ধ ভোট বা আন্দোলন যা-ই হোক না কোনো- তার প্রধান নেতা নির্বাচনের বিষয়ে বেশ সতর্ক আলোচনা শুরু হয়েছে দলটির ভেতরে। এক্ষেত্রে বিএনপি নেতারা খালেদা জিয়ার নেতৃত্বকে সামনে রাখার কথা প্রকাশ্যে বললেও ভেতরে ভেতরে তারা তারেক রহমানকেই ঠিক করেছেন। কারণ এই মুহূর্তে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়ার মতো অবস্থা বিএনপি চেয়ারপারসনের নেই। তবে পরিস্থিতি যা-ই হোক, কোনোভাবেই তারেককে প্রধান নেতা মানতে নারাজ জোট নেতারা। সংলাপ চলাকালে তারা বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুলকে স্পষ্টই বলছেন, আপনাদের লন্ডনি নেতাকে সামনে রেখে আন্দোলন হবে না’।

এই বিষয়ে জোটের অন্যতম শরিক বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বলেন, যুগপৎ আন্দোলনের তারিখ এখনো ঠিক হয়নি। কারণ একটি আন্দোলন ১-২ বছর টেনে নেয়া সম্ভব নয়। ২-৩ মাস টার্গেট ধরে বছরের শেষ দিকে সর্বাত্মক আন্দোলন হতে পারে। তিনি বলেন, কল্যাণ পার্টির আপত্তি না থাকলেও কিছু সমমনা দলের বিএনপির নেতৃত্ব প্রসঙ্গে আপত্তি রয়েছে। এছাড়া সন্দেহ হচ্ছে- বিএনপির সঙ্গে সংলাপ চলাকালীন অবস্থায় জোটের কিছু দল সরকারের সঙ্গেও আলোচনা করছে। যার ফলে যুগপৎ আন্দোলন একটি ফরমেটে দাঁড়াতে দেরি হচ্ছে।

বিএনপির ‘আত্মপর্যালোচনা’ চায় দলগুলো : বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা জানান, বিএনপির সঙ্গে বর্তমানে জোটবদ্ধ ও অতীতে জোট ছেড়ে গেছে এমন দলগুলোও নতুন করে সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে যুগপতের নামে রাজনৈতিক সম্মিলন চাইছে। সেক্ষেত্রে দলীয়ভাবে দলটির সুস্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে ‘নিশ্চয়তা’ চাইছেন তারা।

বিএনপির সঙ্গে জোটভুক্ত হতে আগ্রহী কয়েকজন নেতা বলেন, জোট সরকারের সময়ে সরকারের সমান্তরাল ‘হাওয়া ভবন সংস্কৃতি’ থেকে বিএনপিকে বেরোতে হবে। নেতারা বলেন, ‘লন্ডনের জেন্টেলম্যান রিমোট কন্ট্রোলে’ পরিচালিত কিনা, সেটা প্রশ্নবোধক। তিনি মাঠের বাস্তবতা সম্পর্কে কতটা অবহিত, সেটাও ভাবার বিষয়। বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, সরকারের পদত্যাগ, ভোটের অধিকারসহ কিছু ইস্যুতে ন্যূনতম রাজনৈতিক ঐকমত্য বিরোধী দলগুলোতে আছে। এই ঐকমত্যকে কেন্দ্র করে সমন্বিতভাবে যুগপৎ ধারায় আন্দোলন শুরু করার প্রক্রিয়াটিও সবার উপলব্ধিতে রয়েছে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামো এবং সংবিধানের গণতান্ত্রিক সংস্কার।

বিএনপির প্রতি ইঙ্গিত দিয়ে তিনি বলেন, অতীতে যেসব গণবিরোধী কাজ হয়েছে, সে বিষয়ে আত্মপর্যালোচনা থাকা দরকার। বিশ্বাসযোগ্যভাবে দেশবাসীর কাছে নিজেদের আত্মসমালোচনা উত্থাপন করার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ রূপকল্প সুনির্দিষ্টভাবে জনগণের সামনে আনতে হবে। তাহলে মানুষের মধ্যে আস্থা, ভরসা বাড়বে। কেবল হই-হই-রই-রই করে সরকারের পদত্যাগ দাবি করলেই হবে না।

ডি- এইচএ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়