তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব

আগের সংবাদ

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে খুনাখুনি বাড়ছে : প্রশাসনকে কঠোর ভূমিকায় নামতে হবে

পরের সংবাদ

গণপরিবহনে নারী নির্যাতন রুখতে হবে

মো. আতিকুর রহমান

লেখক ও সাবেক জনসংযোগ কর্মকর্তা, বিইউএফটি

প্রকাশিত: আগস্ট ১১, ২০২২ , ৫:৫৭ পূর্বাহ্ণ আপডেট: আগস্ট ১১, ২০২২ , ৫:৫৭ পূর্বাহ্ণ

সাম্প্রতিককালে অল্প কিছু দিনের ব্যবধানে রাস্তায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখে ধূলি দিয়ে পরপর বাসে ডাকাতি ও গণধর্ষণের নির্মম ঘটনা দেশের সচেতন সব মহলকে স্তম্ভিত করেছে। গত ২ আগস্ট কুষ্টিয়া থেকে ঢাকাগামী একটি নৈশকোচে সংঘটিত হয়েছে ভয়াবহ ডাকাতি ও গণধর্ষণের মতো নির্মম ঘটনা। ঐদিন রাতে কুষ্টিয়া থেকে ছেড়ে আসা নারায়ণগঞ্জগামী ঈগল এক্সপ্রেস পরিবহনের বাস টাঙ্গাইল অতিক্রম করার সময় ডাকাতি ও ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ইতোমধ্যে ১০ জনকে র‌্যাব গ্রেপ্তার করেছে, যা ইতিবাচক বলে মনে করি। এক্ষেত্রে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত হবে এমনটিই সবার প্রত্যাশা। যদিও বর্তমানে চলন্ত বাসে একের পর এক এমন ধর্ষণের ঘটনা সংশ্লিষ্টদেরসহ আমাদের এক কঠিন ও কুৎসিত বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, যা কর্মক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের নীতিনৈতিকতা, সততা ও যথাযথ দায়িত্ব পালনের বিষয়টিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। শুধু তাই নয়, যখন দেখি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কোনোভাবেই এই ধরনের জঘন্য অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না, তখন বিষয়টা খুব কষ্টদায়ক অনুভব করি। যদিও চলন্ত বাসে নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনা আজ নতুন নয়। তবে এর সঙ্গে নতুন করে ডাকাতিও যুক্ত হওয়ায় বিষয়টি আরো ভয়াবহ ও ভীতির কারণ বলে মনে করি। আবার যখন দেখি এমন ঘটনায় একটি সংঘবদ্ধ ডাকাত দল প্রকাশ্যে ৩ ঘণ্টা ধরে বাসের যাত্রীদের জিম্মি করে ডাকাতি ও নারী ধর্ষণ শেষে নির্বিঘেœ পালিয়ে যায় তখন বিষয়টি সত্যি মেনে নেয়া কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। তাই আমরা চাই দ্রুত এর প্রতিকার।
দেশে সাড়ে ৫ বছরে গণপরিবহনে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৩৫৭ জন। আর খুনের শিকার হয়েছে ২৭ জন, যা দুঃখজনক। সেভ দ্য রোড নামের একটি বেসরকারি সংস্থার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এমন তথ্যই উল্লেখ করা হয়েছে, যা ভীতিকর। সংস্থাটি জানায়, ২০১৭-২২ সালের ৭ আগস্ট পর্যন্ত গণপরিবহন ও অন্যান্য বাহন এবং বাসস্ট্যান্ড-ট্রেন স্টেশনে নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ৪৬০১টি, এর মধ্যে ধর্ষণ ৩৫৭ ও খুনের শিকার হয়েছেন ২৭ জন। বাংলাদেশের ৩১টি জাতীয় দৈনিক, বিভিন্ন সংবাদ সংস্থা ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রকাশিত-প্রচারিত তথ্যর পাশাপাশি সারাদেশে সেভ দ্য রোডের স্বেচ্ছাসেবীদের তথ্যানুসারে প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়, এদেশের বাসস্ট্যান্ডগুলো স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ না হওয়ার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একশ্রেণির নরপশু ও কুরুচিপূর্ণ মানুষ নারীদের পোশাক-আশাক-চালচলন নিয়ে যেমন বিভিন্নভাবে কটূক্তি করে, তেমনি নির্যাতন-নিপীড়ন করতেও পিছপা হয় না, যা মেনে নেয়া কঠিন। তাই সময় থাকতে এদের দ্রুত প্রতিহত করা যেমন জরুরি ঠিক তেমনি দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করাটাও অধিক জরুরি বলে মনে করি।
যদিও ইতোমধ্যে গণপরিবহনে-বাসস্ট্যান্ড-ট্রেন স্টেশনসহ বিভিন্ন পথে নির্যাতন-নিপীড়ন-ধর্ষণ-খুন বন্ধের লক্ষ্যে সেভ দ্য রোডের পক্ষ থেকে গণপরিবহন সংশ্লিষ্টদের প্রতি ৩টি সুপারিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকেও কিছু সুপারিশ করা হয়েছে। সুপারিশগুলো ১. রাষ্ট্রীয়ভাবে নারীর প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শনে সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে ‘নারীর প্রতি সম্মান’ শীর্ষক সচেতনতা তৈরি করা; সেখানে ধর্মীয় অনুশাসন, নীতি-আদর্শ-সভ্যতার আলোকে বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরা এবং তা বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচার এবং প্রথম শ্রেণি থেকে স্নাতকোত্তর শ্রেণির পাঠ্যবইতে সংযুক্ত করা। ২. মালিক-চালক-হেলপার-সুপারভাইজারসহ সংশ্লিষ্টদের অবশ্যই যাত্রীদের প্রতি আচরণ প্রশিক্ষণ এবং অসদাচরণ করলে তাদের শাস্তির আওতায় আনা। ৩. প্রতি ৫ কিলোমিটার অন্তর পুলিশ বুথ স্থাপন, সব সড়ক-মহাসড়ক-সেতুকে সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনা। ৪. দূরপাল্লার বাসগুলোতে টিকেটে যাত্রীদের মোবাইল নম্বরসহ শনাক্তকারী তথ্য লিপিবদ্ধ করা। ৫. যত্রতত্র যাত্রী ওঠানো ও নামানো থেকে বিরত থাকা। ৬. গণপরিবহনে নারীদের জন্য আসন সংরক্ষণ করা। ৭. সড়ক নিরাপত্তায় সড়কে প্রয়োজনীয় সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে জনবল নিয়োগ ও তাদের উপযুক্ত সরঞ্জামসহ প্রশিক্ষণ প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ। প্রতিকারে উল্লেখিত সুপারিশগুলো যত দ্রুত সম্ভব বাস্তবায়ন করা জরুরি বলে মনে করি।
যদিও দৃশ্যমান বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, দেশে হঠাৎ করেই গণপরিবহনে আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে নারী লাঞ্ছনা-ধর্ষণের ঘটনা। যা আমাদের সামাজিক সুস্থতা, নীতিনৈতিকতা, মানবপ্রীতি এবং নারীর নিরাপত্তার বিষয়গুলোকে বারবার প্রশ্নবিদ্ধ করে। বিশেষ করে দেখা যাচ্ছে সাধারণত শ্রমিক, দরিদ্র ও দুর্বল ঘরের মেয়েরাই এই ধরনের ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। আর এসব নির্মম ঘটনায় দীর্ঘমেয়াদে মামলা চালানোর মতো অর্থ ও সময় নির্যাতিতদের পরিবার দিতে পারে না। কেননা তাদের অধিকাংশেরই অবস্থান সামাজিকভাবে শক্তিশালী না হওয়ায় অপরাধীরা অপরাধ করে সহজেই পার পেয়ে যাচ্ছে, যা দুঃখজনক। অন্যদিকে সমাজে অর্থবিত্ত বা সামাজিকভাবে প্রভাবশালীরা বা তাদের মদদপুষ্টরাই ধর্ষণের মতো অপরাধ করে যাচ্ছে এবং অর্থের জোরে পার পেয়ে যাচ্ছে। অনেক সময় দেখা যাচ্ছে, সমাজে এসব প্রভাবশালীর বিপক্ষে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা মামলা নিতে গড়িমসি করছে, মামলা নিলেও তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে টালবাহানা করছে, যা দুঃখজনক। শুধু তাই নয়, আবার কখনো কখনো অপরাধীদের বাঁচিয়ে প্রতিবেদন দিয়ে কিংবা অপরাধী প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও তাদের না ধরার মতো ঘৃণ্য অভিযোগও তাদের বিরুদ্ধে অজস্র প্রকাশ পাচ্ছে, যা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। এ অবস্থার অবসান হওয়া জরুরি। কেননা এ ধরনের সুযোগ পাওয়ায় অপরাধীদের দ্বারা সমাজে জঘন্য অপরাধ অধিক হারে বাড়ছে, সময়মতো দ্রুত এর লাগাম টেনে না ধরলে আগামীতে তা সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নেবে, যার পরিণতি হবে আরো ভয়াবহ, যা মেনে নেয়া কঠিন। তাই যত দ্রুততর সম্ভব এর লাগাম টেনে ধরতে হবে।

মো. আতিকুর রহমান
লেখক ও সাবেক জনসংযোগ কর্মকর্তা, বিইউএফটি।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়