জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে : সরকার সাধারণ মানুষের কথা ভাবুক

আগের সংবাদ

জননী সাহসিকা- বঙ্গমাতা

পরের সংবাদ

অনন্যা নারী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব

ড. মীজানুর রহমান

অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সাবেক উপাচার্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশিত: আগস্ট ৮, ২০২২ , ১২:৪৮ পূর্বাহ্ণ আপডেট: আগস্ট ৮, ২০২২ , ১২:৪৮ পূর্বাহ্ণ

বঙ্গমাতা বেগম শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব এমন বিরল ব্যক্তিত্ব যিনি বাঙালি জাতির জন্য নিজেকে উৎসর্গ করে গেছেন। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে তিনি অনুঘটক হিসেবে ভূমিকা পালন করেছিলেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কারাবন্দি থাকার সময়ে কিংবা জাতির সংকটময় মুহূর্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। এমনকি দলের নেতা না হওয়া সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা যখন সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিলেন তখন তিনি সাহসী ও বাস্তববাদী সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর পক্ষে রাজনীতিতে স্মরণীয় সাফল্য অর্জন করা অসম্ভব হতো, যদি বেগম মুজিব তাঁর সঙ্গে না থাকতেন।
ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ষাটের দশকে বঙ্গবন্ধুর লাখ লাখ সমর্থকের ‘ভাবি’ হয়ে উঠেছিলেন। বঙ্গবন্ধুকে ৩ হাজার ৫৩ দিন কারাগারে কাটাতে হয়েছিল, এই কারণে প্রতিদিনের রাজনৈতিক কর্মধারা পরিচালনার দায়িত্ব তার কাঁধে পড়েছিল এবং তিনি একজন যোগ্য কর্মী হিসেবে সবচেয়ে সফলতার সঙ্গে সেই কাজটি করেছিলেন। তিনি কখনো মিছিল করার জন্য বাসা থেকে বের হননি বা প্রকাশ্য স্থানে নিজেকে জনতার সামনে তুলে ধরেননি। বরং তিনি তার দেশের নিপীড়িত জনতার একজন হয়ে বঙ্গবন্ধুর অনুসারীদের সঙ্গে রাজনৈতিক ইস্যু নিয়ে আলোচনা করার একটি অনানুষ্ঠানিক গোপন নেটওয়ার্ক তৈরি করে নিয়েছিলেন, এমনকি ব্যক্তিগত সমস্যা হলেও নেতাকর্মীদের সমস্যাগুলো সমাধান করে দিতেন। ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ, রাজধানীর আজিমপুর বালিকা বিদ্যালয়ে মহিলা ক্রীড়া সংস্থার অনুষ্ঠানে নিজের ব্যক্তিগত জীবনের কথা বলে নারীর অবদানকে স্বীকৃতি দিতে বলেছিলেন বঙ্গবন্ধু এভাবে- ‘আমার জীবনেও আমি দেখেছি যে, গুলির সামনে আমি এগিয়ে গেলেও কোনো দিন আমার স্ত্রী আমাকে বাধা দেয় নাই। এমনও আমি দেখেছি যে, অনেকবারে আমার জীবনের ১০/১১ বছর আমি জেল খেটেছি। জীবনে কোনো দিন মুখ খুলে আমার ওপর প্রতিবাদ করে নাই। তাহলে বোধ হয় জীবনে অনেক বাধা আমার আসত। এমন সময়ও আমি দেখেছি যে আমি যখন জেলে চলে গেছি, আমি এক আনা পয়সা দিয়ে যেতে পারি নাই আমার ছেলেমেয়ের কাছে। আমার সংগ্রামে তার দান যথেষ্ট রয়েছে। পুরুষের নাম ইতিহাসে লেখা হয়। মহিলার নাম বেশি ইতিহাসে লেখা হয় না। সে জন্য আজকে আপনাদের কাছে কিছু ব্যক্তিগত কথা বললাম। যাতে পুরুষ ভাইরা আমার, যখন কোনো রকমের সংগ্রাম করে নেতা হন বা দেশের কর্ণধার হন তাদের মনে রাখা উচিত, তাদের মহিলাদেরও যথেষ্ট দান রয়েছে এবং তাদের স্থান তাদের দিতে হবে।’ স্ত্রী হিসেবে বেগম মুজিব বঞ্চিত ছিলেন। তা নিয়ে কখনো অভিযোগ করতে কেউ শুনেনি। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন তার স্বামী দেশ ও মানুষের জন্য কাজ করছেন। বেগম মুজিবের নামে প্রচুর পৈতৃক সম্পত্তি ছিল। সম্পত্তি থেকে যা আয় আসত তার অংশটুকু নিজের হাতে আসলেও পুরোটাই স্বামীর হাতে তুলে দিতেন। রাজনীতির কারণে পারিবারিক জীবনে একটার পর একটা আঘাত এসেছে। কিন্তু বেগম মুজিব কখনো ভেঙে পড়েননি বা মুজিবকে বলেননি ‘তুমি রাজনীতি ছেড়ে দাও।’ সংসারটা বেগম মুজিব একাই চালাতেন। টাকা, শাড়ি, গহনা, বাড়ি, গাড়ি কোনো কিছুর জন্যই কখনো বঙ্গবন্ধুকে বিরক্ত করেননি। তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক সরকারের মন্ত্রিত্ব ছেড়ে যখন বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হলেন তখন মন্ত্রিত্বের সব সুযোগ-সুবিধা ছাড়তে হয়েছিল। পরিবারের এই সুবিধাবঞ্চিত হওয়ার ঘটনাটাও বেগম মুজিব হাসিমুখে মেনে নিয়েছিলেন। ১৯৭৩ সালে নির্বাচনের পর বঙ্গবন্ধুর ছেড়ে দেয়া যে কোনো একটি আসনে বেগম মুজিব অনায়াসেই এমপি হতে পারতেন। কিন্তু বেগম মুজিব এমন পদ-পদবির কথা কখনো চিন্তাই করেননি। স্বাধীনতা উত্তরকালে বঙ্গভবন বা গণভবনের বিশাল পরিসরে থাকার সুযোগ সত্ত্বেও ৩২ নং বাড়ির ছোট্ট পরিসরেই থেকে গিয়েছিলেন, নিজের পরিবারে নিরাপত্তা বিঘিœত হতে পারে এমন চিন্তাও তার মাথায় আসেনি।
‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ এবং ‘কারাগারের রোজনামচা’য় ঘুরে-ফিরে এসেছে বেগম মুজিবের কথা। শেখ মুজিবুর রহমানের লেখক হওয়ার অন্যতম অনুপ্রেরণার উৎস ছিলেন তিনি। বেগম মুজিব প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অর্জন করতে পারেননি। স্থানীয় মিশনারি স্কুলে (জিটি স্কুল) কিছু প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। তবে সত্যিকার অর্থে আলোকিত ছিলেন। দলীয় কর্মীদের পরামর্শ দেয়ার ক্ষমতা এবং তাদের আন্দোলন নিয়ন্ত্রণ করার পদ্ধতি এতটাই সঠিক ছিল যে, কারাগারের বাইরে এসেও বঙ্গবন্ধু তাঁর প্রজ্ঞামণ্ডিত সিদ্ধান্তগুলো স্বীকার করে নিতেন। তিনি স্বশিক্ষিত ছিলেন, ছিলেন অস্বাভাবিক প্রত্যুৎপন্নমতি এবং বুদ্ধিমান নারী। কখনো কখনো তিনি এমনভাবে কথা বলতেন যা সহজেই একজনকে হতাশার মধ্যে আনন্দিত করে তুলত। তিনি ধীরে ধীরে কথা বলতেন এবং খুব ধৈর্য সহকারে অন্যের কথা শুনতেন। পরিবারে সন্তানদের প্রতিও তিনি অত্যন্ত দায়িত্বশীল ছিলেন। তিনি সত্যিই অনেকের মা এবং শেষ পর্যন্ত জাতির মা হয়ে উঠেছিলেন। গরিবের প্রতি তার বিশেষ সহানুভূতি ছিল। তিনি প্রয়োজনে তাদের সহায়তা করতেন। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আগত কর্মীদের অর্থ সহায়তা করতেন। এছাড়া তিনি নানান উৎসবে দরিদ্রদের মাঝে দান এবং তাদের সন্তানদের লেখাপড়ার জন্য অর্থ প্রদান করতেন। নেতাকর্মীদের অসুখ হলে তাদের চিকিৎসার জন্য সাহায্য করতেন। কারাবন্দি নেতাকর্মীদের পরিবারের জন্য সাহায্য পাঠাতেন। বাসার একমাত্র ফ্রিজটি বিক্রি করে অসহায় কর্মীদের সাহায্য করেছেন। নিজের বাসায় বাজার না করে সন্তানদের খিচুড়ি রান্না করে আচার দিয়ে খেতে দিয়েছেন। এমন অবস্থায়ও কর্মীরা বিপদে পড়লে তাদের সাহায্য করেছেন।
১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু যখন কারাগারে সে সময় বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবকে খুব সক্রিয় দেখা গিয়েছে। তিনি রাজনৈতিক কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন এবং প্রতিটি স্তরের আন্দোলনের সময় তাদের কার্যকলাপ অনুসন্ধান করে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত করেছিলেন। বেগম মুজিবের পরামর্শে ছাত্র আন্দোলনের অনেক কমিটি গঠন করা হয়েছিল। এমনকি তিনি কীভাবে আন্দোলন পরিচালনা করবেন তা তাদের পরামর্শ দিতেন। প্রায় সব ছাত্রনেতার সঙ্গে তার ব্যক্তিগত পরিচয় ছিল। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে তিনি ছিলেন কাণ্ডারি। এভাবে তিনি কার্যত ছায়া নেতা হয়ে ওঠেন। স্বাধীনতার পর শেখ ফজিলাতুন্নেছা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল। এতদ্ব্যতীত, বিভিন্ন বিশ্বনেতা যখন বাংলাদেশ সফর করতেন তখন তাদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতেন। স্বাধীনতার পর বঙ্গমাতা যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে পুনর্নির্মাণে বঙ্গবন্ধুর পাশে থেকে দেশের কাজ করে গেছেন। তিনি পাকিস্তানি দখলদার সেনার দ্বারা নির্যাতিত নারীদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, তাদেরকে সমাজে পুনর্বাসিত করেছিলেন এবং দরিদ্র মেয়েদের বিয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন। সবসময় সব কাজে বঙ্গবন্ধুর সমর্থক ছিলেন। কখনো ভিন্ন কিছু ভাবেননি। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কোনো বিষয়ে মতবিরোধের কথা কখনো শোনা যায়নি।
কয়েকটি ঘটনা স্মরণ করলে বেগম মুজিবের অবদান আরো স্পষ্ট হবে। বেগম মুজিবের স্মৃতিশক্তি ছিল অত্যন্ত প্রখর। রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ তিনি সবই মনে রাখতে পারতেন। এ কারণে বঙ্গবন্ধু তাকে ‘সারাজীবনের জীবন্ত ডায়েরি’ বলেছেন। ১৯৪৬ সালে দাঙ্গার সময় বেগম মুজিব নিজে অসুস্থ থাকা অবস্থায়ও স্বামীকে দাঙ্গা উপদ্রুত এলাকায় যেতে বারণ করেননি। সেই সময় বেগম মুজিব স্বামীকে চিঠিতে লিখেছেন- ‘আপনি শুধু আমার স্বামী হওয়ার জন্য জন্ম নেননি, দেশের কাজ করার জন্য জন্ম নিয়েছেন। দেশের কাজই আপনার সবচাইতে বড় কাজ। আপনি নিশ্চিন্ত মনে সেই কাজে যান। আমার জন্য চিন্তা করবেন না। আল্লাহর ওপর আমার ভার ছেড়ে দিন।’
ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সময় বেগম মুজিব পুলিশ ও গোয়েন্দা চক্ষুর আড়ালে সংগঠনকে শক্তিশালী করেছেন। সংগঠনের অবস্থা অবহিত করা এবং বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে নির্দেশনা নিয়ে এসে দলের নেতাকর্মীদের কাছে তা হুবহু পৌঁছানোর অসাধারণ স্মরণশক্তির অধিকারী ছিলেন বেগম মুজিব। বেগম মুজিবের দুটি সিদ্ধান্ত বাঙালিকে মুক্তির সংগ্রামে এগিয়ে যাওয়ার পথ দেখিয়েছিল, প্রথমটি হচ্ছে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সময় বঙ্গবন্ধুকে কারাগার থেকে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে পাক সামরিক সরকার আটকে রেখেছিল। বঙ্গবন্ধুকে প্যারোলে মুক্তির বিষয়টি সামনে নিয়ে আসে, তখন বেগম মুজিব মামলার আরো ৩৩ জন আসামিকে রেখে বঙ্গবন্ধুর প্যারোলে মুক্তির ব্যাপারে রাজি না হতে বঙ্গবন্ধুকে পরামর্শ দেন। কারাবন্দিদের মুক্তির জন্য ৭ জুনের হরতালও সফল হয়েছিল বেগম মুজিবের প্রচেষ্টায়।
বেগম মুজিবের আরেকটি সিদ্ধান্তকে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম নিয়ামক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের আগে বঙ্গবন্ধু তাঁর দলের সদস্যদেরও কাছ থেকে কী বলবেন এবং কী বলবেন না সে সম্পর্কে বিভিন্ন পরামর্শ ও মতামত পেয়েছিলেন। এগুলো তাঁর মনে এক ধরনের বিভ্রান্তি ও চাপ সৃষ্টি করেছিল। তবে বেগম মুজিব তাঁকে অন্য কারো চেয়ে বেশি বুঝতেন, তাই স্বামীকে স্নেহ দিয়ে বলেছিলেন : ‘আপনার মনে যা আছে তাই বলুন। আপনার কথা হাজার হাজার মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করবে। আপনি যা বলতে চান, নিজের মন থেকে বলুন।’ যা কার্যত বিচ্ছিন্নতাবাদের অভিযোগকে এড়িয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়ার জন্য একটি জাদু হিসেবে কাজ করেছিল। এমনটি না করলে অনেকেই মনে করেন বাংলাদেশকে সাম্প্রতিককালের কাতালোনিয়ার ভাগ্য বরণ করার সম্ভাবনা ছিল।
স্বামী-সংসার ভালোভাবে আগলে রেখেও এই বাঙালি নারী শোষিত-নিপীড়িত জনসাধারণকে মুক্তির চেতনায় জাগিয়ে তোলার সংগ্রামে বঙ্গবন্ধুর পাশে থাকা সহযোদ্ধা হিসেবে বিশ্বের কাছে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন। বঙ্গমাতা তার বুদ্ধি, দূরদর্শিতা এবং রাজনীতি সম্পর্কে বাস্তবোচিত মূল্যায়ন এবং সুচিন্তিত সিদ্ধান্তের কারণে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।

ড. মীজানুর রহমান : অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সাবেক উপাচার্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়