স্মৃতি-সত্তায় প্রাণোচ্ছল শেখ কামাল

আগের সংবাদ

অদম্য বিনম্র সংস্কৃতিবান শেখ কামাল

পরের সংবাদ

শুভ জন্মদিন শেখ কামাল

এম শফিকুল করিম সাবু

নয়াদিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার সাবেক ব্যুরোপ্রধান

প্রকাশিত: আগস্ট ৫, ২০২২ , ১২:৩৩ পূর্বাহ্ণ আপডেট: আগস্ট ৫, ২০২২ , ১২:৩৩ পূর্বাহ্ণ

আমি যখন শেখ কামালের দেখা পাই, তখন সে ছিল হালকা-পাতলা গড়নের এক তরুণ। ঢাকা কলেজে সে আমার সহপাঠী ছিল। সে ছিল সাহসী, সৌজন্যবোধসম্পন্ন ও বন্ধুবৎসল; যে কারো সঙ্গে খুব সহজেই সে বন্ধুত্ব স্থাপন করতে পারত। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সে বন্ধুদের, বিশেষত সহপাঠীদের বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়াত। অতীতের দিকে তাকালে দেখতে পাই, তার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয়েছিল ঢাকা কলেজের হলরুমে, যেখানে আমরা অন্যান্য সহপাঠীর সঙ্গে বসে সেনাবাহিনীর এক সদস্যের কথা শুনছিলাম। সেনাবাহিনীর এই কর্মকর্তা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীতে এইচএসসি পাস করা যুবকদের রিক্রুট করার আশা নিয়ে ঢাকা কলেজে এসেছিলেন। বস্তুত আমরা এমন এক পরিবেশে বেড়ে উঠেছিলাম, যেখানে পশ্চিম পাকিস্তানের অভিজাত শ্রেণি, বিশেষত সামরিক জান্তা আমাদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক বিবেচনা করত। ফলে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়ার বিষয়টি আমাদের অনেকের কাছে দুরাশাই ছিল বটে। শেখ কামাল সম্পর্কে আমার তখন কোনো ধারণা ছিল না। সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা তার বক্তৃতা শেষে যখন শ্রোতাদের কাছ থেকে প্রশ্ন আহ্বান করলেন, কামাল দাঁড়িয়ে গেল এবং প্রশ্ন করল- পাকিস্তানি সেনাবাহিনীতে এত বৈষম্য কেন, কেন সেখানে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চল থেকে রিক্রুট করা হয় না। সবশেষে সে বলল- পাকিস্তানের স্বার্থান্বেষী সেনামহল সেনাবাহিনীতে বাঙালিদের রিক্রুট করবে না এবং এতক্ষণ যা হয়েছে, তা প্রহসন মাত্র। আমরা সবাই বিস্মিত হলাম এবং অডিটোরিয়ামজুড়ে বিরাজ করল পিনপতন নিস্তব্ধতা। সেনা কর্মকর্তা কামাল কর্তৃক উত্থাপিত অভিযোগ অস্বীকার করে বাবার নামসহ তার পরিচয় জানতে চাইলেন। দর্শক-শ্রোতাদের জন্য কোনো মাইক্রোফোন ছিল না, তাই কামাল তার গলা চড়িয়ে উত্তর দিল, তার বাবার নাম শেখ মুজিবুর রহমান। আমি হতবাক! বুঝতে পারলাম, একমাত্র মুজিবের ছেলের পক্ষেই এমন দুঃসাহস দেখানো সম্ভব। শেখ মুজিবের নাম শোনার পর সেনা কর্মকর্তা ঠিক কী বলেছিলেন আমার মনে নেই। সম্ভবত তিনি বলেছিলেন, কেবল শেখ মুজিবের ছেলের মুখেই এমন রাজনৈতিক প্রশ্ন মানায়। ওই সমাবেশে সভাপতিত্ব করেছিলেন ঢাকা কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ এবং প্রখ্যাত আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের শ্বশুর জালাল উদ্দিন আহমেদ।
সভা শেষ হলো এবং আমরা সবাই যার যার ক্লাসে চলে এলাম। আমি আমার সহপাঠীর সাহসে আশ্চর্যান্বিত। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীতে পূর্ব পাকিস্তানিদের যোগ দেয়ার প্রশ্নে সে একটি প্রাসঙ্গিক বিষয় তুলে ধরেছে এবং পাকিস্তানের দুই অংশের বৈষম্য নিয়ে সে প্রশ্ন তুলেছে এমন একসময়ে, যখন বাক-ব্যক্তির স্বাধীনতা ছিল রুদ্ধ। তখন থেকেই আমি কামালের সাহসের প্রশংসা করে আসছি।
তবে তার সঙ্গে আমার প্রথম কথা হয় ১৯৬৮ সালে, যখন আমি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র এবং ছাত্র সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঘনিয়ে এসেছে। সে তার কিছু সহপাঠীসহ আমাদের ক্লাসে এসে আমাকে খুঁজছিল। আমি যখন তার কাছে গেলাম, সে বলল- সাবু (আমার ডাক নাম), আসন্ন নির্বাচনে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করার জন্য আমাদের ক্লাস থেকে ছাত্রলীগের প্রার্থী হিসাবে তোমাকেই ঠিক করেছি। আমি দুই কারণে বিস্মিত হলাম।
এক. আমি অতীতে কখনো তার সঙ্গে কথা বলিনি। দুই. কলেজে কোনো নির্বাচনে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করার কথা আমি কখনো ভাবিনি। আমি যুক্তি দেখিয়ে নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করলাম, যাতে সে তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে। আমি বললাম- আমি তো হোস্টেলে থাকি না, আর আমি মেধাবী ছাত্রও নই। সেই সময়ে অনাবাসিক ছাত্রদের চেয়ে হোস্টেলে অবস্থানরত আবাসিক ছাত্ররাই বেশি ভোট পেত। আমি জানতাম, ছাত্র ইউনিয়নের প্রার্থী আমার চেয়ে ভালো প্রার্থী এবং সে হোস্টেলে থাকত। এর আগে সে আমাদের ক্লাস থেকে নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছিল। শেখ কামাল কথা শুনল না এবং একদিন সকালে কয়েকজন ছাত্রসহ আমাদের ক্লাসে এসে আমার পক্ষে একটি প্রক্ষেপণ (ঢ়ৎড়লবপঃরড়হ) সভায় বক্তব্য রাখল। তখনকার দিনে ঢাকা কলেজে এক চমৎকার গণতান্ত্রিক পরিবেশ বিরাজ করছিল। নির্বাচনের সময় ছাত্র সংগঠনগুলো শ্রেণি শিক্ষকের অনুমতি নিয়ে যার যার প্রার্থীকে পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য প্রক্ষেপণ সভার আয়োজন করতে পারত।
আমার পরিষ্কার মনে আছে, কামাল আমার সম্পর্কে উচ্চ ধারণা দিয়ে এবং ছাত্রলীগ কর্মী হিসেবে আমার অতীত বর্ণনা করে বক্তৃতা দিয়েছিল। সবশেষে নির্বাচনের দিন এলো এবং আমরা আনন্দ-উল্লাসে তাতে অংশ নিলাম। আমি নির্বাচনের ফলাফল সম্পর্কে নিশ্চিত ছিলাম না এবং ভোট গণনার সময় কলেজের বাইরে ছিলাম। পরদিন আমি যখন কলেজে গেলাম, সহপাঠীরা আমার বিজয় উপলক্ষে আমাকে অভিনন্দন জানানো শুরু করল। ঢাকা কলেজে সেবার ছাত্রলীগ পূর্ণ প্যানেলে বিজয়ী হয়েছিল। বিজয়ী দলের একজন অংশীদার হিসেবে আমি খুব আনন্দিতবোধ করেছিলাম। ছাত্রলীগের একজন নিবেদিতপ্রাণ কর্মী নজরুল ইসলাম সেবার ছাত্র সংসদের ভিপি নির্বাচিত হয়েছিল। সে পরে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছিল।
ঢাকা কলেজ থেকে বেরিয়ে আমি ১৯৬৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হই। কামাল ভর্তি হয় সমাজবিজ্ঞান বিভাগে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আমি ছাত্র রাজনীতিতে না জড়ালেও আমাদের বন্ধুত্ব অটুট থাকে। যখনই আমাদের দেখা হতো, আমরা আনন্দের সঙ্গে পরস্পরকে সম্বোধন করতাম। কামাল কখনোই তার বন্ধুদের অবহেলা করত না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিমনেশিয়ামেও আমাদের দেখা হতো। আমি সেখানে যেতাম উপস্থিতির হার অর্জনের জন্য; কিন্তু কামালকে দেখা যেত সে সহপাঠীদের সঙ্গে ফুটবল অথবা ক্রিকেট খেলছে।
স্পোর্টস ও সংগীত ছিল তার আবেগের জায়গা। একদিনের কথা মনে পড়ে। ডিপার্টমেন্টে নবাগতদের গ্রহণ করার অনুষ্ঠানে কামাল সেতার বাজিয়েছিল। ওই অনুষ্ঠানের একটি ছবি ছিল আমার কাছে; কিন্তু ২০০৪ সালে আমি যখন বাসা পরিবর্তন করি, তখন সেটা হারিয়ে যায়।
স্বাধীনতার পর কামাল যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকেছিল, তখন তার পরিচয় সামান্য পাল্টে গিয়েছিল, তখন সে জাতির পিতার বড় ছেলে। কিন্তু সহপাঠী ও বন্ধুদের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণের সামান্যতম পরিবর্তনও হয়নি। তার মেজাজেরও কোনো পরিবর্তন হয়নি, সেই যে ঢাকা কলেজের কিংবা স্বাধীনতার আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরনো কামাল, তেমনই ছিল সে। সে সর্বদাই ছিল হাসিখুশি এবং বন্ধুদের জোকস শোনাত। আমরা মাঝে মাঝে ভুলেই যেতাম যে, সে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছেলে। সে কখনো তার বাবার পরিচয় দিত না। ক্যাম্পাসের একজন সাধারণ ছাত্রের মতোই ছিল সে।
এরপর এলো ’৭৫-এর ১৫ আগস্টের সেই নিয়তি-নির্দিষ্ট রাত। আমি তখন জাতীয় নিউজ এজেন্সি বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার একজন সাব-এডিটর ও রিপোর্টার হিসেবে কাজ করি। ১৪ আগস্ট আমি আমার দুই সহকর্মী আজিজুল ইসলাম ভূঁইয়া ও মরহুম মোহাম্মদ মাসুমের সঙ্গে রাতের শিফটে কাজ করছিলাম। রাত ১টার দিকে ওরা দুজন অফিস ত্যাগ করেন। আমি থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। কিন্তু আমাদের পিয়ন খুব ভোরে আমাকে গভীর ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলে বলে- আপনার একটা জরুরি ফোন এসেছে। ফোনটা করেছিলেন মোহাম্মদ মাসুম। তিনি আমাকে সবচেয়ে খারাপ সংবাদটি দিলেন, যা শোনার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না। বললেন শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা ছাড়া বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সবাইকে তার নিজ গৃহে বিক্ষুব্ধ সেনারা হত্যা করেছে। দুই বোন বেঁচে গিয়েছেন, কারণ তারা বিদেশে ছিলেন। আমার কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। মাসুম আমাকে দ্রুতই অফিস ত্যাগ করতে বললেন এই বলে যে, সেনারা জাতীয় সংবাদ সংস্থা আক্রমণ করতে পারে। আমি তড়িঘড়ি অফিস ত্যাগ করি এবং এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের খবর জানাতে জেনারেল ম্যানেজার জাওয়াদুল করিমের কাছে ছুটে যাই। জাওয়াদুল করিম, যিনি পরবর্তীকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রেস সচিব হয়েছিলেন, আমাকে বিশ্বাস করতে পারলেন না। আমি বাসার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। আসাদ গেটে দেখতে পেলাম সাধারণ মানুষ ঘুম থেকে উঠে এদিক-সেদিক ঘোরাঘুরি করছে; কিন্তু এরই মধ্যে কী ঘটে গেছে এবং জাতি কী হারিয়েছে, সে সম্পর্কে তারা কিছুই জানে না। আজকের দিনে আমি পরম মমতায় শেখ কামালকে স্মরণ করছি, বেঁচে থাকলে যে আমার সমবয়সি হতো। শুভ জন্মদিন, কামাল! তোমার আত্মা শান্তিতে থাকুক।

এম শফিকুল করিম সাবু : নয়াদিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার সাবেক ব্যুরোপ্রধান।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়