তিস্তার পানি বিপৎসীমার উপরে, খুলে দেয়া হলো সব গেট

আগের সংবাদ

সমবেত প্রচেষ্টায় দেশ গড়তে হবে

পরের সংবাদ

স্বপ্নের বাংলাদেশ ও পদ্মা সেতু

প্রসূন তালুকদার

গল্পকার ও লেখক

প্রকাশিত: আগস্ট ২, ২০২২ , ১২:০৭ পূর্বাহ্ণ আপডেট: আগস্ট ২, ২০২২ , ১২:০৭ পূর্বাহ্ণ

বঙ্গবন্ধুর মানসপটে যে পাকিস্তান নয়, স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্র আঁকা হয়ে গিয়েছিল ১৯৪৮ এরও আগে তার প্রমাণ পাই পাকিস্তান গোয়েন্দা রিপোর্টের গোপন নথিতে। তাই বঙ্গবন্ধুকে দেখি ১৯৭২ সালেই সংবিধানে চারটি মূলনীতির একটি হিসেবে ‘সমাজতন্ত্র’কে বেছে নিতে। পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালের ২৪ জানুয়ারিতে ‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ’ তথা বাকশাল গঠন, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন একটি ‘সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার’ দিকেই যাত্রা বলে মনে করি। তারও আগে তিনি সব অবাঙালি মালিকানাধীন চালু এবং ফেলে যাওয়া বৃহৎ কলকারখানাগুলোকে অধিগ্রহণ করে রাষ্ট্রীয়করণ করেন। তার মধ্যে একটি হচ্ছে পাকিস্তান আমলের ‘ইস্ট বেঙ্গল স্টিল রি রোলিং মিলস লিমিটেড’, যা ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর নাম পাল্টে হয় ‘বাংলাদেশ স্টিল রি রোলিং মিলস লিমিটেড’; আজ যা দেশের সর্ববৃহৎ ইস্পাত উৎপাদন প্রতিষ্ঠান সংক্ষেপে ‘বিএসআরএম’ নামে পরিচিত। এই প্রতিষ্ঠানটিই সম্প্রতি আলোচিত ও বাংলাদেশের সক্ষমতার প্রতীক বলে বিবেচিত ‘পদ্মা সেতু’ নির্মাণে ব্যবহৃত প্রায় এক লক্ষাধিক টন স্টিলের ৯৫ শতাংশ স্টিল সরবরাহ করেছে।
১৯৫২ সালে গুজরাটি ব্যবসায়ী ‘এইচ আকবর আলী আফ্রিকাওয়ালা’ যখন চট্টগ্রামে ইস্পাত কারখানা চালু করেন, প্রথম থেকেই পেশাদারি মনোভাব গ্রহণ করেন। তারাই পাকিস্তান ও স্বাধীন বাংলাদেশে উন্নত বিশ্বের উদ্ভাবিত প্রযুক্তির ইস্পাত উৎপাদনের মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। ইউরোপ আমেরিকায় যেসব প্রযুক্তি উদ্ভাবন হয় তা এদেশে প্রথম তারাই নিয়ে আসেন আর অন্যরা তা অনুকরণ করেন। এভাবে গত সত্তর বছরে দেশের অবকাঠামো নির্মাণে যে এই প্রতিষ্ঠানটি ভূমিকা রাখবে বঙ্গবন্ধুর মতো দূরদর্শী নেতা হয়তো তা বুঝতে পেরেছিলেন। দেশের অন্যতম মেধাবী দুজন প্রকৌশলী, প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধে দায়িত্ব পালন করা পদ্মা সেতু প্রজেক্টের সাবেক ও বর্তমান দুই প্রধান, প্রয়াত ‘জাতীয় অধ্যাপক’ বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী ও অধ্যাপক শামীম জেড বসুনিয়ার অনুরোধে শুধু পদ্মা সেতুর জন্য বিশেষ গ্রেডের রড উৎপাদন করে ফেলে এই প্রতিষ্ঠানটি।
পদ্মা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রতিষ্ঠানটি একটি নজরকাড়া বিজ্ঞাপন প্রকাশ করেছিল জাতীয় সংবাদপত্র ও বড় বড় শহরের বিলবোর্ডে। বিজ্ঞাপনের ভাষা ছিল এ রকম- ‘পুরো বিশ্ব বলেছিল সম্ভব না/ একজন প্রধানমন্ত্রী আর ১৬ কোটি বাঙালি বলেছিলাম কেন না!’ যে প্রতিষ্ঠানকে বঙ্গবন্ধু বিশেষ বিবেচনায় ছাড় দিয়েছিলেন, তারাই যেন প্রায় পঞ্চাশ বছর পর তারই কন্যার কাছে কৃতজ্ঞতাস্বরূপ সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। অথবা বঙ্গবন্ধু হয়তো তার দার্শনিক প্রজ্ঞা দিয়ে বুঝতে পেরেছিলেন এমন ইতিহাস রচিত হবে একদিন তার স্বপ্নের বাংলাদেশে! ‘পদ্মা সেতু’ কি শুধু সেতু নাকি তারও বেশি কিছু তা নিয়ে শুধু দেশে নয়, রীতিমতো ইউরোপ আমেরিকার বড় বড় সংবাদ মাধ্যম ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বিভিন্ন মন্তব্য করছেন। মোট দেশীয় উৎপাদন বা ‘জিডিপি’ বাড়াতে কতটুকু ভূমিকা রাখবে, জীবন ও জীবিকার মান উন্নয়নে কেমন হয় তা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলতে থাকবে। ‘এইচ ডি আই’ বা মানব উন্নয়ন সূচকে দেশ কতটুকু এগিয়ে যাবে তাও আমরা অচিরেই বুঝতে পারব। তবে আমার কাছে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য মনে হয়েছে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের একটি মন্তব্য। গত ২৫ জুন উদ্বোধনের দিন তিনি বলেছেন, ‘পদ্মা সেতু বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোকে আত্মবিশ্বাসী হতে পথ দেখাবে, যারা এতদিন মনে করত বিদেশি ঋণ ও সাহায্য ছাড়া বড় কিছু করা সম্ভব নয়।’ পদ্মা সেতু প্রজেক্ট থেকে বিশ্বব্যাংকের সরে যাওয়ার পর বিরূপ মন্তব্যকারীদের বর্তমান মন্তব্য শুনলে সহজেই অনুমেয় একটি জাতির সক্ষমতা ও আত্মবিশ্বাস গড়তে রড-সিমেন্টের একটি স্থাপনা কীভাবে ‘জীবন্ত উদাহরণ’ হয়ে উঠতে পারে এক দশকের মধ্যেই। পদ্মা সেতু কেবল ইট, পাথর, কংক্রিট, ইস্পাতের কাঠামো নয়, এটি তারও বেশি কিছু।

প্রসূন তালুকদার
গল্পকার ও লেখক।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়