স্বপ্নের বাংলাদেশ ও পদ্মা সেতু

আগের সংবাদ

উদাসীনতাজনিত দুর্ঘটনায় ১১ ছাত্রের জীবন হরণ

পরের সংবাদ

সমবেত প্রচেষ্টায় দেশ গড়তে হবে

শাহ্জাহান কিবরিয়া

শিশু সাহিত্যিক ও কলাম লেখক

প্রকাশিত: আগস্ট ২, ২০২২ , ১২:০৭ পূর্বাহ্ণ আপডেট: আগস্ট ২, ২০২২ , ১২:০৭ পূর্বাহ্ণ

ঢাকা শহরে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পূর্বের তুলনায় বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। সম্প্রতি দৈনিক ভোরের কাগজ পত্রিকায় সন্ত্রাসীকাণ্ড বিষয়ে ‘রাজধানীর অন্ধকার জগৎ’ শীর্ষক ধারাবাহিক রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। তাতে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে তাকে ভয়াবহ বললে অত্যুক্তি হবে না। দেশের ভবিষ্যতের জন্য এ চিত্র অশনি সংকেত। ঢাকা শহর যেন অপরাধীদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। চাঁদাবাজি, বাড়ি দখল, প্রতারণা, নারী নির্যাতন, ছিনতাই, অবাধ মাদক ব্যবসা, খুনখারাবিসহ হেন অপকর্ম নেই যা ঘটছে না। রিপোর্টে সন্ত্রাসের জনপদ ঢাকাকে ৮টি এলাকায় চিহ্নিত করা হয়েছে। সব এলাকায় কমবেশি একই ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিস্তার ঘটেছে। এতে পেশাদার অপরাধী ছাড়াও ‘কিশোর গ্যাং’ নামক অপরাধী কিশোর দলের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে। এটা হচ্ছে সবচেয়ে আশঙ্কার কারণ। বলা হয়ে থাকে, শিশুরা হচ্ছে ‘জাতির ভবিষ্যৎ’। এই ‘কিশোর গ্যাং’-এর সদস্যরা যদি জাতির ভবিষ্যৎ হয় তাহলে দেশের ভবিষ্যৎ যে কী ধরনের হবে তা সহজেই অনুমেয়। এদের নৃশংসতা অনেক ক্ষেত্রে বড় সন্ত্রাসীদের কর্মকাণ্ডকেও ছাড়িয়ে যায়। দেশের প্রচলিত শিশু আইনে অপরাধী শিশু-কিশোরদের লঘু দণ্ড দানের কারণে তারা সহজে ছাড়া পেয়ে যায়। কারাগার থেকে বের হয়ে তারা পুনরায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা এদের দমন করতে হিমশিম খায়। রিপোর্টে বলা হয়েছে, এক শ্রেণির দুর্নীতিপরায়ণ রাজনৈতিক নেতার আশ্রয় ও প্রশ্রয়ে সন্ত্রাসীরা তাদের কর্মকাণ্ড নির্বিঘেœ চালিয়ে যায়। এতে আরো বলা হয়েছে, কিশোর গ্যাংয়ের অধিকাংশ সদস্য অভিজাত শ্রেণির সন্তান। দেশের আইনশৃঙ্খলা তথা প্রশাসনের ওপর অভিজাত শ্রেণির প্রভাব থাকায় এদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া যায় না। এরা হচ্ছে বিশেষ সুবিধাভোগী নাগরিক। তাই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড জাতীয় উন্নয়নের পথে তারা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মহাজনরা যতই বলেন, ‘আইন সবার জন্য সমান’। ওটা কাজির গরু কেতাবে থাকার মতো, বাস্তব চিত্র কিন্তু তার বিপরীত। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ৫০ বছর পার হলেও এখনো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেশ পরিচালিত হচ্ছে উপনিবেশিক আইনে। বিদেশিদের আইন ছিল এ দেশীয়দের দমিয়ে রাখার জন্য, আর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে জনগণের সার্বিক মুক্তির লক্ষ্যে। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর দেশে বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি চালু হয়েছিল তা আজো কমবেশি অব্যাহত রয়েছে। যার ফলে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার ওপর হামলার বিচার নিষ্পত্তি হতে এক যুগের বেশি সময় লেগেছে। সাগর-রুনির হত্যাকাণ্ড, প্রতিভাবান বালক ত্বকী হত্যার বিচার শেষ হতে বছরের পর বছর অতিক্রান্ত হচ্ছে। ‘বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে’। এর থেকে আশু নিষ্কৃতি পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। আসন্ন ঝড়ের আশঙ্কায় মরুভূমিতে উট বালুতে মুখ লুকিয়ে কিছু সময়ের জন্য নিজেকে রক্ষা করে। আমরাও এখন সন্ত্রাসীদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য দু-একটি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিচার করে নিজেদের রক্ষা করার চেষ্টা করছি। ‘সাইমুম’ অর্থাৎ মরুভূমির বালুর ঝড় বেশিক্ষণ থাকে না, অল্প সময়ে তা শেষ হয়ে যায়। কিন্তু আমাদের ‘সাইমুম’ বন্ধ হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এসব অব্যবস্থা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড স্থায়ীভাবে বন্ধ করার জন্য স্বাধীন দেশের উপযোগী যে আইন থাকার দরকার, তা আমাদের নেই। আমরা যুদ্ধ করেছি, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করতে পারিনি, অন্তত আমাদের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে তা পরিলক্ষিত হচ্ছে না। পরাধীনতার গøানি থেকে আমরা কবে মুক্তি পাব? আমাদের জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে এখনো মধ্যযুগীয় মানসিকতা বিরাজ করছে। তাই সর্বজন শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের তারা কান ধরে উঠবস করায়, গলায় জুতার মালা পরায়, মারধর করে। তাদের কোনো শাস্তি হয় না। কেননা রাজদণ্ড তাদের হাতে। পুঁজিবাদ ও উপনিবেশবাদী শক্তি আমাদের সমাজে শিক্ষকের অবস্থান যেখানে নির্ধারণ করে গেছে, স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে শিক্ষকদের অবস্থান আজো সেখানেই নির্ধারিত হয়ে আছে। এ কারণে কোনো সরকারি অনুষ্ঠানে শিক্ষকরা প্রথম সারিতে বসতে পারে না। সে স্থান অলঙ্কৃত করেন রাজনৈতিক নেতা ও আমলারা। সমাজে শিক্ষকদের আমরা বিত্ত না দিতে পারি সম্মান জানাতে কার্পণ্য করব কেন?
পুঁজিবাদী শাসনব্যবস্থা যতদিন এ দেশে সক্রিয় থাকবে ততদিন দেশবাসীর মুক্তি নেই। দেশে গণপ্রশাসন চালু করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হয়েছেন। তার লক্ষ্য ছিল শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। দেশের এক শ্রেণির শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবী আজো গণপ্রশাসনের বিরোধিতা করছে। চীন দেশে কিশোর অপরাধ দমনের উদ্দেশ্যে সম্প্রতি একটি নতুন আইন করা হয়েছে। এই আইনে কিশোর অপরাধীদের সঙ্গে তাদের মা-বাবা এবং অভিভাবকদের বিচারের আওতায় আনার ব্যবস্থা রয়েছে। শিশু-কিশোররা পারিবারিক পরিবেশে সুশিক্ষা না পেলে তারা বড় হয়ে সৎ চরিত্রের অধিকারী হয় না। শিশুর জন্মের সঙ্গে সঙ্গে পিতা-মাতার দায়িত্ব ও কর্তব্য শেষ হয়ে যায় না। সরকার কোনো বায়বীয় পদার্থ নয়। আমাদের সবাইকে নিয়েই সরকার। পরাধীন দেশে সরকার ও জনগণের অবস্থান আলাদা। এক দল শোষক, অপর দল শোষিত। দেশে এখন আর বিদেশি শাসক নেই, কিন্তু বিদেশি শাসন ব্যবস্থা অটুট রয়েছে। যে কারণে আমাদের সরকার ও জনগণের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টায়নি। প্রভু ভৃত্যের মতোই তাদের আচরণ। আমাদের দেশেও চীন দেশের অনুসরণে শিশু-কিশোরদের অপরাধ দমনের উদ্দেশ্যে তাদের পিতা-মাতা ও অভিভাবকদের শাস্তির আওতায় আনার জন্য নতুন আইন জরুরি হয়ে পড়েছে। প্রত্যেক স্বাধীন দেশ নিজ নিজ সমাজের চাহিদা অনুযায়ী আইন তৈরি করে থাকে। কিন্তু আমাদের শাসকগোষ্ঠীর চিন্তা-চেতনায় তা অনুপস্থিত। গড্ডলিকা প্রবাহের ন্যায় তারা তাদের প্রশাসন চালিয়ে যান। তাদের মধ্যে বৈপ্লবিক চেতনার একান্ত অভাব। সন্ত্রাসীকাণ্ড বন্ধ করতে হলে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ছোটখাটো অভিযান না চালিয়ে সরকারকে নিরপেক্ষ, নির্মোহ ও কঠোরভাবে অভিযান চালাতে হবে। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে হলে এর উৎস খুঁজে বের করে ব্যবস্থা নিতে হবে। যে চারিত্রিক দৃঢ়তা ও মনোবল নিয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা পদ্মা সেতু নির্মাণ করেছেন, সন্ত্রাস দমনেও তাকে সে দৃঢ়তা দেখাতে হবে। আমাদের ভবিষ্যৎকে বিপদমুক্ত করতে হবে।
ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে দেশবাসী যদি শিশুকাল থেকে তাদের সন্তানদের সুশিক্ষা দেন তাহলে অবশ্যই তারা বড় হয়ে সুনাগরিকের ভূমিকা পালন করবে। সুশিক্ষা পরিবারকে, জাতিকে কখনো হতাশ করে না, সুরক্ষা দেয়। গাছের জন্মলগ্ন থেকে যতœ পেলে সে গাছ মানুষকে ভালো ফল দেয়। এটাই প্রকৃতির নিয়ম। যে শিশু শৈশব থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা ও অসাম্প্রদায়িকতার শিক্ষা পায় সে কখনো সাম্প্রদায়িক হয়ে কোনো মানুষকে ঘৃণা করতে পারে না, হত্যা করতে পারে না। যে পরিবারে শিশুর সুশিক্ষা নেই তারা হয় সাম্প্রদায়িক ও সন্ত্রাসী। তাদের পারিবারিক জীবন পর্যালোচনা করলে এর সত্যতা মিলবে। সভ্যতার প্রাথমিক শর্ত ব্যক্তির অসাম্প্রদায়িক চেতনা। বিশ্বের সব ধর্মই মানুষকে অসাম্প্রদায়িক হওয়ার শিক্ষা দেয়। শয়তানের প্ররোচনায় মানুষ সাম্প্রদায়িক হয়। সে মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করে। জিয়াউর রহমান সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি বন্ধ করে সাম্প্রদায়িকতার পথ উন্মুক্ত করেছেন।
অবকাঠামোগত উন্নয়নের চেয়ে রাষ্ট্রের উচিত সামাজিক উন্নতির ওপর বেশি গুরুত্বারোপ করা। আমরা কখনো আমেরিকা বা রাশিয়ার মতো পরাশক্তি হতে পারব না, হতে চাইও না। আমরা ইচ্ছা করলে অনেক ভালো কাজ করতে পারি, ভালো সমাজ গড়তে পারি। ভালো কাজ করার অতীত অভিজ্ঞতা ও ঐতিহ্য আমাদের রয়েছে। সমবেত প্রচেষ্টায় আমরা দেশকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে পারি। ব্যক্তিগত অহমিকা আমাদের ত্যাগ করতে হবে। মাত্র ৯ মাসের যুদ্ধে বিশ্বের অন্যতম সুদক্ষ সেনাবাহিনীকে পরাস্ত করে আমরা বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছি। সব দেশি ও বিদেশি ষড়যন্ত্র এবং বিরোধিতাকে অগ্রাহ্য করে আমরা নিজস্ব অর্থে স্বপ্নের পদ্মা সেতু নির্মাণ করে বিশ্বে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছি। বাঙালির অভিধানে অসম্ভব বলে কোনো শব্দ নেই। বাঙালির তুলনা কেবল বাঙালি।

শাহ্জাহান কিবরিয়া : শিশু সাহিত্যিক ও কলাম লেখক।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়