অর্থনীতির বর্তমান সংকট কাটবে কীভাবে?

আগের সংবাদ

মোটরসাইকেল পলিসিতেই ঘাটতি

পরের সংবাদ

রিজার্ভ ও জ্বালানির ভাবনা-দুর্ভাবনা আর গুজব

আহমেদ আমিনুল ইসলাম

অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশিত: জুলাই ৩১, ২০২২ , ১২:৩৪ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জুলাই ৩১, ২০২২ , ১২:৩৬ পূর্বাহ্ণ

সম্প্রতি কানাডা প্রবাসী এক বন্ধুর সঙ্গে কথা হলো। দেশের নানা ঘটনা-দুর্ঘটনা নিয়ে যেমন কথা হলো তেমনি কথা হলো সেখানকার যাপিত জীবন নিয়েও। কথা হলো দ্রব্যমূল্য নিয়েও। বাজারের কথা জিজ্ঞেস করতেই উষ্মা, মন খারাপ ও রাগত উত্তেজনায় অনেক কথাই বলল। যার সারাংশ এ রকম- আগের একশ ডলারের জায়গায় এখন তিনশ ডলার খরচ হয়! অর্থাৎ সেখানেও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি! কয়েক মাস ধরেই এরূপ ভোগান্তি চলছে! নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতা এখনো সক্রিয়। তার কথা-বার্তা থেকে বুঝলাম আমরা যেমন সংকটের মধ্যে আছি তারাও অনেকটা অনুরূপ অবস্থার মধ্য দিয়েই যাচ্ছেন! অর্থাৎ বাংলাদেশের পরিস্থিতি বৈশ্বিক পরিস্থিতির সমান্তরালেই প্রবহমান। বাংলাদেশ বিশ্ববিচ্ছিন্ন কোনো দ্বীপ বা রাষ্ট্র নয়- তাই-ই হওয়ার কথা! বৈশ্বিক যে কোনো প্রভাবের ঢেউ এখানে আঘাত হানে। আবার বিশ্বের প্রায় সর্বত্রই বাঙালির অবস্থান ও কর্মক্ষেত্র হওয়ায় সেই ঢেউয়ের আঘাত এখানে একটু বেশিই আছড়ে পড়ে! কিন্তু উন্নত রাষ্ট্রগুলোর সংকট আমাদের দেশের মতো ততটা প্রকট নয়, ততটা ত্বরিতও নয়- কিন্তু সংকট আছে।
আমদের দেশের সরকার যখন প্রায়ই বলতে থাকে বিশ্ববাজারের কথা, আন্তর্জাতিক বাজারে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কথা তখন বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। অনেকে আবার সরকারের এসব বক্তব্যকে সন্দেহের চোখে দেখেন- সরকারের ব্যর্থতা খুঁজে পেয়ে তৃপ্ত হওয়ার চেষ্টাও করেন! বিশেষ করে বিরোধী নেতৃবৃন্দ বৈশ্বিক হালচালের খোঁজ-খবর রাখলেও সাধারণের সম্মুখে বক্তব্য-ভাষণে রাষ্ট্র পরিচালনায় তারা সরকারের ব্যর্থতা, দেশের গণতন্ত্রহীনতা ইত্যাদি নানা প্রসঙ্গ এমনভাবে উপস্থাপন করেন যে, মানুষ যেন সরকারের কোনো কথাই বিশ্বাস না করেন! একেই বলে রাজনীতি! তাই ঘুরেফিরে তারা নানাভাবে বর্তমান সরকারের পদত্যাগ চান। আবার মাঝেমধ্যে ‘জুজুর ভয়’ দেখিয়ে জনসমক্ষে বলে বেড়ান বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা হয়ে যাচ্ছে! ধরা যাক, বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা হলে এই শ্রেণির রাজনীতিবিদরা কীভাবে লাভবান হবেন? তর্কের খাতিরে ধরেই নিলাম কোনো একদিন ভোরে দেখা গেল বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা হয়ে গেছে! মহল বিশেষের স্বপ্ন-খায়েশ মোতাবেক সরকার পদত্যাগও করে ফেলেছে! তখন তারা কীভাবে রাষ্ট্রটিকে সামাল দেবে তার কোনো রূপকল্প কি তারা প্রস্তুত করেছেন? আমরা জানি তাদের সেই সক্ষমতা নেই। এরা কোনোরকম রূপকল্পের ধারই ধারে না! আসলে বাংলাদেশ কখনোই শ্রীলঙ্কা হবে না। ষড়যন্ত্র ও গুজব রটনাকারীরা এমন ভৌতিক একটা প্রচারণার মাধ্যমে জনমনে কেবলই আতঙ্ক তৈরির প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন- অন্ধকারে ঢিল ছুড়ে যাচ্ছেন একের পর এক! যদি কোনো একটি ঢিল কাজে লেগে যায়!
শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ টানা তৃতীয় মেয়াদে রাষ্ট্র পরিচালনা করছে বলে দেশে স্থিতিশীলতা যেমন বিরাজ করছে তেমনি অর্থনৈতিক অগ্রগতিও হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী করোনা প্রকোপের মধ্যেও জনকল্যাণের নানা সূচকে বাংলাদেশের উন্নতি ঈর্ষণীয়। কিন্তু বিশেষ একটি মহল ক্ষমতা থেকে, সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে দূরে আছে বলে আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় থাকাকে নেতিবাচক রঙে রাঙিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করার ব্যর্থ প্রয়াসে লিপ্ত আছে। ২০২৩ সালের নির্বাচন নিয়ে জনমনে ধোঁয়াশাও তৈরি করছেন। বিশ্বব্যাপী ঘটে যাওয়া ঘটনা-দুর্ঘটনা তারা চোখ মেলে দেখার অবকাশ পান না, দেশের জনগণকেও তা দেখতে দিতে চান না! কিন্তু ‘ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডে লুকোনো থাকে না কিছুই’- এই বাস্তব উপলব্ধিও তাদের নেই! বর্তমান বাংলাদেশ ডিজিটাল বাংলাদেশ। বাংলাদেশের সিংহভাগ মানুষ মুহূর্তেই সমগ্র বিশ্বের খবরাখবর পেয়ে যান। বিশেষ মহলটি জেগে ঘুমিয়ে আছে- ইচ্ছা করেই তারা সেসব দেখতে চায় না! করোনা অতিমারি-উত্তর পৃথিবী এখন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাবে জর্জরিত সে কথাও মহলটি বুঝতে চায় না। কিন্তু সচেতন মানুষ দুনিয়ার খবরাখবর রেখে চুপচাপ তথাকথিত নেতাদের ধারাবাহিক ভণ্ডামি উপভোগ করেন! জনগণকে বোকা ভেবে আওয়ামী লীগের পতন ঘটিয়ে মুহূর্তেই দেশে রামরাজত্ব কায়েম করবেন বলে বোঝানোর চেষ্টা করেন তারা! বিএনপি-জামায়াত চারদলীয় জোটের শাসনামল যারা দেখেছেন, যারা হাওয়া ভবনে গড়ে ওঠা বিকল্প সরকার ব্যবস্থার তাণ্ডব দেখেছেন, তারা এই মহলের কোনো প্রতিশ্রæতিকেই যে বিন্দুমাত্র বিশ্বাস করেন না তা নিশ্চিত। যারা বিএনপি-জামায়াত চারদলীয় জোটের শাসনামল দেখেছেন তাদের সিংহভাগই একবাক্যে স্বীকার করবেন শেখ হাসিনার টানা তৃতীয় মেয়াদেও তারা ভালো আছেন, দেশ ভালো আছে। দেশ ভালো আছে এটিই সবচেয়ে বড় কথা!
শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ ভালো আছে- আত্মমর্যাদা নিয়ে বিশ্বের বুকে বাংলাদেশ অস্তিত্ব নিয়ে টিকে আছে- এটাই বড় কথা। শুধু টিকে আছে বললেও ভুল হবে, সদম্ভে তার অস্তিত্ব ঘোষণা করে টিকে আছে। সম্প্রতি শিল্প খাতে রপ্তানির ক্ষেত্রে চীন এবং ভিয়েতনামকে পেছনে ফেলে এক নম্বরে উঠে এসেছে। আগামী দুই বছর বাংলাদেশ এই অবস্থান ধরে রাখবে বলে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার খবর বার্তা এসেছে! সাম্প্রতিককালে উদ্বোধন হয়েছে বাঙালির নিজস্ব টাকায় নির্মিত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় স্থাপনা স্বপ্নের পদ্মা সেতু। পদ্মা সেতুর সাফল্য আমাদের অহঙ্কার ও আত্মমর্যাদার মুকুটে যুক্ত করেছে নতুন স্বর্ণ-পালক! শিল্প খাতে রপ্তানির একটি বিশাল চালান পদ্মা সেতু ব্যবহারের মাধ্যমে মোংলা হয়ে ইউরোপ যাত্রা শুরু করেছে। এতে দূরত্ব ও সময়ের সাশ্রয় হবে। আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে পদ্মা সেতুর ভূমিকায় আমাদের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হবে। আমরা যে সমৃদ্ধ অর্থনীতি গড়ে তুলতে চাই, আমরা যে উন্নত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গড়তে চাই তারই শুভসূচনা সম্পন্ন হয়েছে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার হাত ধরেই।
শেখ হাসিনার কাছে নিরাপদ থেকে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে বাংলাদেশ খ্যাতি লাভ করেছে। বিগত ১৪ বছরে দেশে কোনো ‘হাওয়া ভবন’ তৈরি হয়নি, তৈরি হয়নি বিকল্প কোনো সরকার ব্যবস্থাও। আওয়ামী লীগই রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। জননেত্রীর প্রাজ্ঞ দিকনির্দেশনায় দেশ এগিয়ে চলছে। ১৪ বছরের বেশি সময় এ দেশের মানুষ বঙ্গবন্ধুকন্যার ওপরই ভরসা রেখেছে। জননেত্রীর রূপকল্পগুলোই যে অগ্রগতির সুচিন্তিত কৌশল তাও মানুষ গভীরভাবে বুঝতে পেরেছে। ভবিষ্যৎ রূপকল্প এবং রূপরেখা আছে বলেই মানুষ শেখ হাসিনার ওপর আস্থা স্থাপন করেছে। উল্টোদিকে শেখ হাসিনাও সাধারণ মানুষের আস্থার যথাযথ সম্মান রক্ষা করে চলেছেন- দেশকে সম্মানের সঙ্গে সামনে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন। কিন্তু ষড়যন্ত্রকারীরাও থেমে নেই! নতুন নতুন বিষয়ে ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তারের অপচেষ্টায় নতুন নতুন কৌশলে তারাও আত্মপ্রকাশ করছে! সম্প্রতি দেশের রিজার্ভ এবং জ্বালানির সঞ্চয় নিয়ে গুজব ছড়ানো শুরু করেছে- লক্ষ্য একটাই, সাধারণের মনোভূমিতে শ্রীলঙ্কার প্রতিস্থাপন! রিজার্ভ ও জ্বালানি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহল সাধারণকে স্বচ্ছ ধারণা দিলে গুজব রটনাকারীদের অপপ্রয়াস নস্যাৎ হবে।
দেশের রিজার্ভ ও জ্বালানি নিয়ে অনেকেই কমবেশি কথা বলছেন। কেউ কেউ আবার আতঙ্কও ছড়াচ্ছেন! অনেকে আবার বাংলাদেশকে শ্রীলঙ্কা মনে করে স্বপ্নের মধ্যেই লাফাতে-ঝাঁপাতেও শুরু করেছেন! কোনো দেশের তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর রিজার্ভ ও জ্বালানির সাশ্রয় থাকলেই অর্থনীতিকে স্বাভাবিক বলা যায়। বাংলাদেশে ৯ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর রিজার্ভ রয়েছে, জ্বালানি মজুতও পর্যাপ্ত। মে মাসে এশিয়ার ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) দেনা ২.২৩ বিলিয়ন পরিশোধের ফলে রিজার্ভের পরিমাণ ৪০ বিলিয়নের নিচে নামায় মূলত নানামুখী আলোচনা-সমালোচনা ও গুজবের সূত্রপাত। এসবের গোড়ায় পানি ঢালছে একটি বিশেষ মহল।
ইতিহাস পর্যালোচনায় জানা যায় ১৯৯১-৯২ অর্থবছরে বিএনপির শাসনামলে দেশের রিজার্ভ ছিল ১.৬০ বিলিয়ন। পরে ২০০৫-০৬ অর্থবছরে অর্থাৎ চারদলীয় জোট সরকারের সময় রিজার্ভ ছিল ৫ বিলিয়ন ডলার। ২০০৯-১০ এবং ২০১২-১৩ অর্থবছরে রিজার্ভ দাঁড়িয়েছিল যথাক্রমে ১০ ও ১৫ বিলিয়ন ডলার। সরকার স্থিতিশীল থাকায় রিজার্ভও বাড়তে থাকে। ২০১৬ সালে ৩০ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করে। আমরা দেখেছি করোনা-অতিমারির মধ্যে ২০২০ সালের ৩ জুন বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো রিজার্ভ ৩৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়। আবার মাত্র তিন সপ্তাহ পরেই অর্থাৎ ২৪ জুন রিজার্ভ হয় ৩৫ বিলিয়ন এবং ৩০ জুনের মধ্যে তা ৩৬ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করে। সে বছরেরই ডিসেম্বর মাসে রিজার্ভ ৪৩ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করে। ২০২১ সালের আগস্টে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি। বিভিন্ন ধরনের ঋণ পরিশোধ ও আমদানি ব্যয়ের ফলে সম্প্রতি রিজার্ভ ৪০ বিলিয়নের নিচে আসাতেই সমালোচনার সূচনা! কিন্তু অর্থনীতিবিদরা এতে শঙ্কার কোনো কারণই দেখছেন না। রিজার্ভ যখন ২৫-৩০ বিলিয়ন ছিল তখন আমরা আনন্দে ডগমগ থাকতে পারলে ৩৯ বিলিয়নেও কেন আতঙ্কিত- এমন প্রশ্ন অর্থনীতিবিদদেরই! তাদের মতে বাংলাদেশের রিজার্ভ ভালো অবস্থানেই আছে। মূলত আমদানিপণ্যের ক্রমবর্ধমান ব্যয় পরিশোধেই রিজার্ভের ওপর চাপ বেড়েছে। সাম্প্রতিককালে অনেক দেশেরই রিজার্ভ নিম্নগামী। তাই বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশ সরকারও রিজার্ভের চাপ কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে। বিদ্যুৎ সাশ্রয়, সরকারি কর্মকর্তাদের গাড়ি ক্রয় কিংবা অপ্রয়োজনীয় বিদেশ সফর বাতিল করেছে।
বর্তমান বিশ্ব এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মধ্যে আছে। এরূপ পরিস্থিতিতে সরকারকে অ-জনপ্রিয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়। বৃহত্তর স্বার্থে জনগণও অনেক কিছু মেনে নেয়। দেশকে নিরাপদ রাখতে সাধারণ মানুষ কঠিন সিদ্ধান্তও মাথা পেতে নেয়। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতাদের সততার পরিচয় দিয়ে জনগণকে ভরসা দিতে হয়। শেখ হাসিনার আদর্শ দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রতিফলিত হলেই সাধারণ মানুষ ছোটখাটো অসন্তুষ্টি সহজে মেনে নেবে। যে কোনো গুজব থেকে জাতিকে সুরক্ষা দিতে সরকারকেই তৎপর হতে হবে।

আহমেদ আমিনুল ইসলাম : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়