রিজার্ভ ও জ্বালানির ভাবনা-দুর্ভাবনা আর গুজব

আগের সংবাদ

সব দলকেই ভোটে আনার প্রস্তাব দেবে আওয়ামী লীগ

পরের সংবাদ

মোটরসাইকেল পলিসিতেই ঘাটতি

প্রকাশিত: জুলাই ৩১, ২০২২ , ৮:৩৭ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জুলাই ৩১, ২০২২ , ৮:৩৮ পূর্বাহ্ণ

* ১৭ গুণ বেশি ঝুঁকিপূর্ণ * দুর্ঘটনার ৪০ শতাংশই এই বাহনে * কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা *

বর্তমান সময়ে দেশের সড়কগুলোতে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহনের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে মোটরসাইকেল। সড়ক মহাসড়কের ৪০ শতাংশ দুর্ঘটনা সংঘটিত হচ্ছে এই বাহনটির কারণে। ঈদের ছুটিতে সড়কে নিহতদের ৩ ভাগের ১ ভাগ মানুষ মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন। অথচ সব মহলে নেতিবাচক আলোচনার পরও যন্ত্রচালিত এই দ্বিচক্রযানটি নিয়ন্ত্রণে সরকারের জোরাল কোনো পদক্ষেপ নেই। এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শও আমলে নিচ্ছে না সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো।

এদিকে বিআরটিএ বলছে, মোটরসাইকেল এখন পেশাভিত্তিক যানবাহনে পরিণত হয়েছে। এই অবস্থায় হঠাৎ করে মহাসড়কে মোটরসাইকেল চলাচল বন্ধ করে দেয়ার কোনো সিদ্ধান্ত বিআরটিএর নেই, তবে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে। আগামী সেপ্টেম্বর মাস থেকে নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়া শুরু হবে।

সড়ক ও দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করেন এমন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়কসংক্রান্ত বিভিন্ন বৈঠকে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ এবং সংগঠনের পক্ষ থেকে বিআরটিএকে নানা পরামর্শ দেয়া হয়। কিন্তু সরকারি এই প্রতিষ্ঠানটিসহ দায়িত্বশীলরা কোনো পরামর্শই কানে তুলছেন না। কর্মকর্তারা নিজেদের চিন্তাধারার বাইরে যেতে চান না। তাদের উদাহরণ দিয়ে বারবার বোঝানো হয়েছে, পৃথিবীর অনেক দেশেই মোটরসাইকেল এখন নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চীন ৪০ বছর ধরে মোটরসাইকেল বন্ধের চেষ্টা করেও পারছে না। বাংলাদেশকে এখনই মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণে জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে। ঢাকাসহ সারাদেশেই বাহনটি সহজলভ্য হওয়ায় সড়কে যানবাহনের স্বীকৃত বিন্যাস অকার্যকর হয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের সড়কে এখন মোট যানবাহনের ৭৫ শতাংশ হচ্ছে মোটরসাইকেল। সড়কে নিরাপত্তার জন্য মানসম্মত হেলমেট, এলবো ও নি গার্ড ব্যবহার করা এবং পুলিশের নজরদারী বাধ্যতামূলক করার তাগিদ বারবারই দিয়ে আসছেন বিশেষজ্ঞরা।

জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা গেছে, স্বাভাবিক সময়ে সড়ক দুর্ঘটনায় হাসপাতালে আসা রোগীর মধ্যে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত। গত রোজার ঈদে এই হাসপাতালে আসা রোগীর ৪০ শতাংশই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত। কুরবানির ঈদের আগে সরকার সড়ক মহাসড়কে মোটরসাইকেল চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করায় মোটরসাইকেল কম চলেছে। এ কারণে দুর্ঘটনা ২০ শতাংশে নেমে আসে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান বলেন, অন্যান্য উন্নত দেশের সঙ্গে আমাদের পরিকল্পনা ও পলিসিতে ঘাটতি রয়েছে। সড়ক পরিবহন আইনে বলা আছে, আনফিট যানবাহন মহাসড়কে চলতে পারবে না। কিন্তু আমাদের দেশে চলছে। নীতিনির্ধারকরা যখন একটি পলিসি তৈরি করেন, তাদের এই বিষয়ে যে ধরনের গবেষণা হওয়া দরকার, স্ট্যাডি করা দরকার তা করা হয় না। আমরা সমস্যা জটিল আকার ধারণ করার পর সমাধানের পথ খুঁজি। এখন চ্যালেজিং অবস্থায় রয়েছে। আমাদের দেশের সড়কের শৃঙ্খলা নেই, সড়ক ভালো নয়, চালকরা সাইন ও মার্কিং মানেন না, লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া ভালো নয়। তাছাড়া প্রক্রিয়াগত কিছু বিষয়ও আছে। মহাসড়কে মোটরসাইকেল যারা চালাচ্ছেন, তাদের ন্যূনতম বয়স নির্ধারণ করতে হবে।

জাপানে নিম্নতম বয়স ২৪ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশে তা ২৫ বছর করা উচিত। আরো দেশে এই নিয়ম রয়েছে। মোটরসাইকেলের ‘রেজিস্ট্রেশন প্রসেস স্লো ডাউন’ করতে হবে। মোটরসাইকেলের যন্ত্রাংশ আমদানির ওপর থেকে শুল্ক ৫ শতাংশ কমিয়ে দেয়া হয়েছে- সরকারকে এই প্রক্রিয়া থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। মোটরসাইকেলকে এত বেশি সহজলভ্য করার কোনো প্রয়োজন নেই। বিআরটিএ যে হারে রেজিস্ট্রেশন দিচ্ছে- সেই একই হারে ড্রাইভিং লাইসেন্স দেয়ার সক্ষমতা নাই। এর ফলে মোটরসাইকেলের রেজিস্ট্রেশন বেশি দেয়া হলে, লাইসেন্সবিহীন চালকের সংখ্যা বাড়বে এবং দুর্ঘটনাও বেশি ঘটবে। ভুতুরে চালকের সংখ্যা বাড়বে। এতে সড়কে দুর্ঘটনা কমবে না। যেসব চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই, সড়কে সেই চালকরাই বেশি বেপরোয়া।

ড. হাদিউজ্জামান বলেন, যে কোনো চার চাকার যানের চেয়ে মোটরসাইকেল ১৭ গুণ বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। অথচ প্রায় ৪০ লাখ মানুষ এখন সরাসরি মোটরসাইকেলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। তাই পুরোপুরি বন্ধ না করে দ্রুত নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নিতে হবে। শিক্ষানবিশ লাইসেন্স থাকা মানেই মোটরসাইকেল চালানোর লাইসেন্স নয়। এই বিষয়টি প্রতিরোধ করা গেলে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা প্রতিরোধে ‘এন্টিবায়েটিকের’ মতো কাজ হবে। সর্বোচ্চ রাজনৈতিক সদিচ্ছা নিয়ে সরকারকে পলিসি তৈরি করতে হবে।

বিআরটিএর পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) শীতাংশু শেখর বিশ্বাস জানান, মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণে বিআরটিএ উদ্যোগ নিয়েছে। ইতোমধ্যেই একটি সিদ্ধান্ত হয়েছে, কেউ মোটরসাইকেল রেজিস্ট্রেশন করার জন্য বিআরটিএতে এলে তাকে ড্রাইভিং লাইসেন্স অবশ্যই দেখতে হবে। ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া আর কোনো মোটরসাইকেল রেজিস্ট্র্রেশন করা হবে না। আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে এই প্রক্রিয়া বিআরটিএ কার্যকর করতে যাচ্ছে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এবং সেইফ রোড এন্ড ট্রান্সপোর্ট এলায়েন্সের (শ্রোতা) সভাপতি ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, সড়কে নিরাপত্তাহীনতা দেশের একটি অন্যতম মানবিক বিপর্যয়। সড়ক ব্যবস্থাপনায় রাষ্ট্রীয় উদাসীনতা রয়েছে। ইতিবাচক যোগাযোগ ব্যবস্থা ও জনপরিসেবা খাতকে সুষ্ঠুভাবে গুরুত্বের জায়গায় নিতে হবে। জনস্বার্থের বিপরীতে গোষ্ঠীস্বার্থ বিদ্যমান হওয়ায় পরিবহন সেক্টরে শৃঙ্খলা ফিরছে না। গোষ্ঠীস্বার্থ রাজনৈতিক আনুকুল্য পাচ্ছে।

সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করা সংগঠন রোড সেফটি ফাউন্ডেশন নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার সার্বিক চিত্র দিন দিন ভয়াবহ হচ্ছে। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ব্যাপকহারে বেড়েছে। অপ্রাপ্ত বয়স্ক ও মানসিকভাবে অপরিপক্ব চালকরা বেপরোয়া গতিতে মোটরসাইকেল চালানোর কারণে নিজেরা দুর্ঘটনায় পড়ছে এবং অন্যরাও পরিস্থিতির শিকার হচ্ছে। কুরবানির ঈদে মোটরসাইকেল চলাচলে নিষেধাজ্ঞার কারণে রোজার ঈদের চেয়ে দুর্ঘটনা অনেক কম হয়েছে। সরকার এখনই মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে সড়কের অবস্থা আরো ভয়াবহ হতে পারে।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, বরাবরের মতো মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার শীর্ষে রয়েছে। কুরবানির ঈদযাত্রায় ১১৩টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৩১ জন নিহত এবং ৬৮ জন আহত হয়েছেন। এই সংখ্যা মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৩৫ দশমিক ৪২ শতাংশ ও নিহতের ৩২ দশমিক ৯১ শতাংশ। মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে।

সড়ক এবং সেতুতে চলাচলের জন্য পৃথক লেনের দাবি জানিয়েছে সামাজিক সংগঠন ‘সেভ দ্য রোড’। পদ্মা সেতুসহ সব সড়ক-মহাসড়ক ও সেতুতে মোটরসাইকেলের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে তারা। দাবি বাস্তবায়ন না হলে আরো কঠোর কর্মসূচি দেয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন সেভ দ্য রোড নেতারা। সংগঠনের মহাসচিব শান্তা ফারজানা বলেন, দুর্ঘটনারোধে সড়কে সিসিটিভি, স্পিডগান স্থাপন করতে হবে। যত দ্রুত সম্ভব মোটরসাইকেলের জন্য পৃথক লেন বাস্তবায়নের পাশাপাশি দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সর্বোচ্চ গতিসীমা নির্ধারণ এবং এই নির্দেশনা না মানলে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

এসআর

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়