বাংলাদেশ-ভারত জেআরসি বৈঠক নিয়ে ধোঁয়াশা

আগের সংবাদ

চাঁদপুরে ট্রাকের ধাক্কায় তিন রিকশাযাত্রী নিহত

পরের সংবাদ

রোগীরা কেন বিদেশমুখী

প্রকাশিত: জুলাই ৩০, ২০২২ , ৮:৪০ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জুলাই ৩০, ২০২২ , ৮:৪০ পূর্বাহ্ণ

দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি আস্থার সংকট > ব্যয় বেশি > আধুনিক চিকিৎসা সুবিধার অভাব

দেশে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে অনেক উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু উন্নত বা বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবায় এখনো তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। তবে বাংলাদেশ হৃদরোগ, ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে দেশে বেশকিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। সেগুলো সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হলেও বিত্তবানদের আস্থা অর্জন করতে পারেনি। যে কারণে চিকিৎসার জন্য মানুষের বিদেশ যাওয়ার প্রণতা ক্রমেই বাড়ছে। এ সম্পর্কে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আস্থার সংকটের পাশাপাশি দেশে চিকিৎসা ব্যয়ও অনেক বেশি। রোগী এবং স্বাস্থ্য অধিকার নিয়ে যারা কাজ করেন তাদের অভিযোগ, দেশে চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক মানসিকতাই বেশি। রোগ নির্ণয় ও সঠিক চিকিৎসায়ও ঘাটতি রয়েছে। এছাড়া যারা স্বাস্থ্যসেবা দেন, তাদের বেশির ভাগেরই আচরণ আন্তরিক নয়। রোগীকে পর্যাপ্ত সময় ও মনোযোগ দেয়ার মানসিকতা অনুপস্থিত। তাই চিকিৎসা নিতে বিদেশে ছুটছে মানুষ। স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদদের মতে, এর ফলে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে চলে যাচ্ছে। কিন্তু এ পরিস্থিতি উত্তরণের জন্য কর্তৃপক্ষের কোনো নীতিমালা এবং কৌশল নির্ধারণ করা নেই।

এদিকে গত বছর ডিসেম্বর মাসে ‘বাংলাদেশ চিকিৎসা শিক্ষা অ্যাক্রডিটেশন আইন-২০২১’ খসড়া অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। এই আইন অনুযায়ী, অনুমোদন ছাড়া বিদেশে কেউ চিকিৎসা নিতে বা পড়তে যেতে পারবেন না। কিন্তু তবুও চিকিৎসার জন্য বিদেশগামী মানুষের স্রোত বন্ধ হচ্ছে না। তবে কোভিড-১৯ মহামারিতে এই প্রবণতায় ভাটা পড়েছিল। বিধিনিষেধের বেড়াজাল উঠে গেলে মানুষের মধ্যে আবারো দেখা গেছে সেই বিদেশমুখী প্রবণতা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বে স্বাস্থ্যব্যবস্থার স্বাভাবিক চিত্র হলো- প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা যখন ভালো হয়, তখন বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবার ঝুঁকি বাড়ে। গড় আয়ু বাড়লে বার্ধক্যজনিত রোগ বাড়বে। অপুষ্টিজনিত রোগ কমলে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, ক্যান্সার, স্থূলতার মতো সমস্যাগুলোর ঝুঁকি বাড়বে। আমাদের যেভাবে বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবার দিকে নজর দেয়ার দরকার ছিল, সেভাবে নজর দেয়া হয়নি। বিভিন্ন দেশ স্বাস্থ্য খাতকে অর্থনৈতিক খাত হিসেবে গড়ে তুলেছে। তারা ‘হেলথ ট্যুরিজম’ শব্দের সঙ্গে পরিচয় করিয়েছে, যা আমরা পারিনি।

এছাড়া সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিত্তবানরা নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্যও বিদেশে যাচ্ছেন, যা দেশের স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসকদের প্রতি তাদের অনাস্থারই প্রমাণ দেয়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বেশ কয়েকবারই দেশের মাটিতেই চিকিৎসা নেয়ার ইচ্ছা প্রকাশের পাশাপাশি দেশে চিকিৎসা নেয়ার জন্য সর্বস্তরের জনগণকে আহ্বানও জানিয়েছেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর সেই আহ্বানে যে অবস্থা সম্পন্নদের সাড়া নেই তা মন্ত্রী, এমপি, রাজনৈতিক নেতা, সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আচরণেই স্পষ্ট হয়। বাংলাদেশের রোগীরা জটিল হার্ট সার্জারি, ক্যান্সারের চিকিৎসা, অঙ্গ প্রতিস্থাপন, বন্ধ্যত্ব চিকিৎসা, অস্থি ও অস্থিসন্ধির অপারেশন, স্নায়ুরোগ, কিডনি রোগ এমনকি নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্যও বিদেশ যাচ্ছেন।

তথ্য বলছে, সামর্থ্য অনুযায়ী মানুষ চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন দেশে যায়। তবে বেশি যাচ্ছে ভারতে। এছাড়া সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়ায়ও যাচ্ছে। অতি ধনীদের পছন্দের তালিকায় আছে যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যের মতো উন্নত দেশও। সঠিক তথ্য না থাকলেও প্রতি বছর ১০ লাখের বেশি মানুষ দেশের বাইরে চিকিৎসাসেবা নিচ্ছেন বলে মনে করা হয়।

গত ৩০ মে জাতীয় সংসদে ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার অনেক উন্নয়ন হয়েছে। কথায় কথায় চিকিৎসার জন্য বিদেশে ছুটে যাওয়া উচিত নয়।

এদিকে এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছেন, দেশে সব রোগের সুচিকিৎসা বা সুব্যবস্থা রয়েছে। দেশে যথেষ্ট ভালো হাসপাতাল রয়েছে, উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে। উন্নত যন্ত্রপাতি রয়েছে। তবে আমাদের আস্থার অভাব আছে। করোনার মধ্যে চিকিৎসা নিতে কেউ বিদেশ যেতে পারেননি। তারা কিন্তু দেশেই চিকিৎসা নিয়েছেন।

সম্প্রতি রাজধানীতে একটি অনুষ্ঠানে শিল্প প্রতিমন্ত্রী কামাল আহমেদ মজুমদার বলেছেন, প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে অসংখ্য রোগী চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাচ্ছেন, এর ফলে আমরা বৈদেশিক মুদ্রা হারাচ্ছি। রোগীদের বিদেশ যাওয়া রোধ করতে অবশ্যই দেশের চিকিৎসকদের আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। আমাদের প্রচুরসংখ্যক চিকিৎসক তৈরি হচ্ছে, কিন্তু মানের দিকেও আমাদের খেয়াল রাখতে হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আওয়ামী লীগ তার নির্বাচনী ইশতেহারে বলেছে, বাংলাদেশ ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত প্রগতিশীল রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। সে লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবার মান বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিতেই হবে।

স্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলনের আহ্বায়ক ও বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশীদ-ই-মাহবুব মনে করেন, কিছু চিকিৎসার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের হাসপাতালগুলোতে উন্নত প্রযুক্তি এখনো আসেনি। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া সম্ভব। ৯০ শতাংশ চিকিৎসা আমাদের এখানে সম্ভব।

রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বিদেশে চিকিৎসা নেয়া প্রসঙ্গে তিনি ভোরের কাগজকে বলেন, মানুষ তার ইচ্ছেমতো যেখানে ইচ্ছা সেখানে চিকিৎসা করাতে পারে। করোনার সময় তারা কি বাইরে গেছেন? তখন তো দেশেই চিকিৎসা নিয়েছেন। কিন্তু দেশে চিকিৎসার ব্যাপারে তাদের আস্থা এবং দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতির বিষয়ে ইচ্ছা- দুটোরই ঘাটতি আছে। গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা বিদেশে চিকিৎসা নিতে গেলে জনগণের মধ্যে অনাস্থা তৈরি হবেই। এই সমস্যা সমাধানে রাষ্ট্রের নীতিগত সিদ্ধান্ত থাকতে হবে। রাষ্ট্রের এই জায়গাটাতে দুর্বলতা আছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ সফরে এসে বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন ভারতের বিশিষ্ট নিউরো সার্জন ডা. লক্ষ্মী নারায়ণ ত্রিপাঠী, গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট ডা. প্রদীপ্ত কুমার শেঠি। তারা বলেছেন, গত ১০ বছরে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে অনেক উন্নতি হয়েছে। চিকিৎসা ব্যবস্থায় ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে অনেক রোগী বিদেশে বিশেষ করে ভারত বা কলকাতায় যাচ্ছেন। তারা ‘সেকেন্ড ওপিনিয়ন’ নিতে কিংবা আরো উন্নত চিকিৎসা করাতে যাচ্ছেন।

বিদেশমুখী প্রবণতার কারণ সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ ভোরের কাগজকে বলেন, রোগ নির্ণয়ে নির্ভুল পরীক্ষা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমাদের দেশে ডায়াগনস্টিক টেস্টের মান ভালো না হওয়ায় অনেক সময় চিকিৎসক রোগ নির্ণয়ে ব্যর্থ হন। সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে ভারতে যাতায়াতের সুবিধা, থাকা-খাওয়া ও চিকিৎসা খরচ অনেকাংশে কম এবং ভিসা প্রাপ্তির সহজলভ্যতা, ভাষাগত সুবিধার কারণেও বাংলাদেশের মানুষ ভারতে বেশি যাচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।

ডি- এইচএ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়