যৌন হয়রানি বন্ধে চাই সামাজিক প্রতিরোধ

আগের সংবাদ
ড.-রাহমান-নাসির-উদ্দিন

আইসিজেতে মিয়ানমারের আপত্তি খারিজ, এতে রোহিঙ্গাদের কী লাভ?

পরের সংবাদ

শিক্ষক ও শিক্ষার ওপর নির্যাতন বন্ধ করবে কে?

অজয় দাশগুপ্ত

কলাম লেখক

প্রকাশিত: জুলাই ২৯, ২০২২ , ১২:২২ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জুলাই ২৯, ২০২২ , ১২:২২ পূর্বাহ্ণ

শান্তি আর অশান্তির মধ্যে এটাই তফাৎ। শান্তি শীতল বাতাসের মতো। ধীরে বয়। অশান্তি ছড়িয়ে পড়ে দাবানলের মতো। গত কিছুদিন বলতে গেলে কয়েক বছর ধরেই দেশে সংখ্যালঘু নামধারী হিন্দু নামধারীদের ওপর চলছে নির্যাতন। নির্যাতনের ধরন বদলে গেলেও টার্গেট গ্রুপ বদলায়নি। রসরাজ থেকে কপালের টিপ এরপর এখন এটা নেমে এসেছে শিক্ষকদের ওপর। এর আগে শিক্ষকদের অনুভূতির নামে অত্যাচার বা তাদের বিপদে ফেলে অপমান চলছিল। শ্যামল কান্তি কান ধরার অপঘটনা পুরনো না হতেই চলে এসেছিল আরো ঘটনা। হতে হতে শেষতক বিজ্ঞান পড়ানোর অপরাধে কারাগারে গেলেন হৃদয় মণ্ডল। তারপরও থামল না। গলায় জুতার মালা পরিয়ে ঘোরানো প্রিন্সিপাল স্বপন কুমার বিশ্বাসের ঘটনাটি ছড়িয়ে পড়ার ফাঁকেই ছাত্রের হাতে আহত টিচার উৎপল সরকার প্রাণ হারিয়েছেন। এই নির্মমতা একদিনে বা একক কোনো ঘটনায় তৈরি হয়নি। এর পেছনে আছে সমাজ রাজনীতি ও মানুষের নীরবতা আর আপসকামিতা। কী হয়েছিল সে দিন? খবর বলছে :
‘প্রতি বছরের মতো এবারো কলেজে মেয়েদের ক্রিকেট টুর্নামেন্টের আয়োজন করা হয়। খেলা চলাকালে দশম শ্রেণির ওই ছাত্র ক্রিকেট খেলার স্টাম্প দিয়ে অতর্কিত শিক্ষক উৎপল সরকারের ওপর হামলা চালায়। প্রথমে ওই ছাত্র শিক্ষকের মাথায় আঘাত করে এবং পরে এলোপাতাড়ি পেটাতে থাকে। এছাড়া স্টাম্পের সুচালো অংশ দিয়ে পেটের বিভিন্ন অংশে আঘাত করে। পরে শিক্ষকরা এগিয়ে গেলে ওই ছাত্র সেখান থেকে সটকে পড়ে। গুরুতর আহতাবস্থায় উৎপল সরকারকে প্রথমে আশুলিয়া নারী ও শিশু স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নেয়া হয়। আঘাত গুরুতর হওয়ায় সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সোমবার ভোরে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।’
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করে ১০ বছর ধরে আশুলিয়ার চিত্রশাইল এলাকার হাজি ইউনুছ আলী স্কুল এন্ড কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে প্রভাষক হিসেবে চাকরি করছিলেন। প্রতিষ্ঠানটির শৃঙ্খলা কমিটির সভাপতি ছিলেন তিনি। তাকে মারধরের অভিযোগ ওঠা শিক্ষার্থীর (১৬) বাড়ি আশুলিয়ায়। দশ বছর এক স্কুল এন্ড কলেজে কাজ করার পরও উৎপল ধরতে পারেননি নাড়ি। বুঝতে পারেননি সমাজের পচন কতটা গভীরে চলে গেছে। হয়তো ছাত্রটিকে তিনি শাসিয়েছিলেন, হয়তো শাস্তি দিয়েছিলেন। সে একজন মাস্টার দিতেই পারেন। সবচেয়ে বড় কথা শাস্তি বা বিচার শিক্ষাদান কিংবা পাঠের কোনো অংশ ছিল না। যেহেতু উৎপল ছিলেন শৃঙ্খলা কমিটির সভাপতি, তিনি এ কাজ করবেন এটাই স্বাভাবিক। এবং নিঃসন্দেহে উদ্দেশ্য ছিল সংশোধন করা, অন্যায় থেকে বিরত রাখা। এই শাস্তি বা বিচারের মুখোমুখি আমরা সবাই হয়েছি। স্কুল-কলেজে টিন এজ বয়সে আমাদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। সে সময় আমরা সবাই অনভিজ্ঞতা আর বুদ্ধির অপরিপক্বতায় ভুগি। আমাদের অভিভাবক তখন ঘরে যেমন মা-বাবা, বাইরে আমাদের শিক্ষক। সময়ের সিংহভাগ কাটে স্কুল-কলেজে। আর আজকাল মোবাইল ও ডিজিটাল জগতে ঘরেও মানুষ একা। যে যার মতো মুখ গুঁজে মোবাইল কিংবা অন্য কোনো মিডিয়ায়। মা-বাবা-ভাইবোন সবাই আলাদা জগতের বাসিন্দা। এমন সময়ে শিক্ষকরাই তো অভিভাবক। কিন্তু যে কোনো কারণে হোক জিতু নামের ছেলেটি তা মানেনি। তার আক্রোশ এমন আগ্রাসী ছিল যে উৎপল বাঁচতেই পারেননি। জীবন কেড়ে নেয়ার মতো এমন দানব তৈরি হচ্ছে ঘরে, এমন জন্তুর অধম আমরা লালন করছি সমাজে। এটাই ভয়ের ব্যাপার।
আজকাল কিশোর গ্যাং তরুণ গ্যাং নামে যেসব কথা শুনি তাদের নৃশংসতা আর আক্রমণের যেসব গল্প পড়ি তাতে এটা স্পষ্ট এরা নিয়ন্ত্রণহীন। কোথাও মাদক, কোথাও যৌনতা, কোথাও ধর্মের নামে উসকানি এদের মগজ ধোলাই করে রাখে। তখন এরা আর স্বাভাবিক মানুষ থাকে না। জিতু নামের ছেলেটিও ছিল না। এই অমানবিকতার উৎস খুঁজে বের করা না গেলে প্রবণতা থামানো যাবে না। আগামীতে আরো উৎপল জান হারালেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। সমাজের দিকে তাকালেই আপনি কতগুলো প্রশ্নের জবাব পেয়ে যাবেন। এই সমাজে এখন অল্প কিছু যুবক ছাড়া আর কেউ ক্রিকেট ফুটবল খেলে না। কেউ খেলাঘর কচিকাঁচার আসর কিংবা এমন কোনো সংগঠন করে না। সাহিত্য সংস্কৃতির সঙ্গে যোগাযোগ নেই কারো। আমরা এই বয়সে কবিতা লিখতাম। উপন্যাস পড়তাম। সিনেমা দেখে কান্নায় বুক ভাসাতাম। সে আনন্দ কেড়ে নিয়েছে আমাদের তথাকথিত ডিজিটাল মিডিয়া। মানুষের আবেগ আনন্দ উৎসাহ সব এখন পর্দামুখী। সে সুযোগে পর্দার দখল নিয়েছেন এমন কিছু মানুষ যারা ধর্মের ধ-ও জানেন না। এরাই এখন বক্তা। এদের ফলোয়ার চলচ্চিত্র নায়ক নায়িকাদের চেয়েও বেশি। এদের কাজ নিয়মিত মগজ ধোলাই করা। চাপা পড়ে আছে সুফিবাদ। ফকির বাউলেরা দরগাহ প্রেমিরা আজ আতঙ্কে। আমি নিশ্চিত না জিতু উগ্রবাদের খপ্পরে পড়েছিল কি-না। কিন্তু এটা নিশ্চিত পিটিয়ে মাস্টার বা শিক্ষক হত্যা করার মতো বিকৃত মানসিকতা সে কোনো না কোনোভাবে পেয়ে গিয়েছিল। আমি ভাবতেই পারি না প্রকাশ্য দিবালোকে এক ছাত্র তার শিক্ষককে স্টাম্প দিয়ে পিটিয়ে চলেছে আর বাকিরা সবাই নীরব দর্শক। এমন তো না যে ছেলেটি রিভলবার বা পিস্তল দিয়ে গুলি করে পালিয়ে গেছিল। মানুষের প্রাণ কি এত সহজে যায়? সে পরিমাণ আঘাত করার মতো সময় কেন দেয়া হয়েছিল তাকে? এটা কি আমাদের সমাজ পচনের আরেক ইঙ্গিত? যেখানে এটা পরিষ্কার আপনি বা যে কেউ আক্রান্ত হলেও কেউ এগিয়ে আসবে না। এটা মনে হয় এখন সবাই সত্য বলে জানেন। যে বিপদে পড়লে সাহায্য পাওয়া অসম্ভব।
এই সাইড লাইন দর্শক হওয়ার ব্যাপারটা আমাদের সমাজে নতুন। আগে মানুষ এমন কিছু দেখলেই ঝাঁপিয়ে পড়ত। এখন পড়ে না। কারণ সবাই জানে তার জানটি হারালে কেউ এগিয়ে আসবে না। সবাই এটাও মানে কাকে বাঁচানো ফরজ আর কাকে না বাঁচালেও অসুবিধা নেই। উৎপল চলে গেছে। রয়ে গেছে তার জননী। যিনি বলেন, ‘প্রতি রাইতেই আমার ব্যাটা ফোন কইরছে। আমগোরে খবর লিছে। এহুন শুনি ছেলে নাই…।’ কাঁদতে কাঁদতে বৃদ্ধ মা গীতা রানী বাকরুদ্ধ হয়ে যাচ্ছেন। এই আমাদের নিয়তি?
সরকার, রাজনীতি বা অন্য কোনো কিছুকে দোষারোপ করার আগে ভাবতে হবে সমাজের এই অধঃপতন কেন? কীভাবে এতটা নৃশংস আর হৃদয়হীন হয়ে গেছে আমাদের সন্তানরা। আজ মাস্টার কাল অন্য কেউ হয়তো একদিন মা-বাবাকেও এমন পিটিয়ে মারতেও দ্বিধা করবে না এসব ছাত্র। তারপরও কেউ দায় এড়াতে পারেন না। না বিচার না আইন না সমাজ। সবকিছু যে ঠিক নেই কোথাও যে সাম্প্রদায়িকতা নৃশংসতা আর দানবীয় আচরণ এক হয়ে গেছে, এটা এখন অন্ধও বুঝতে পারে। কবে ঘুরে দাঁড়াবে জাতি? না একের পর এক উৎপল দেখতে দেখতেই কালো সময় ঘিরে ধরবে সবকিছু?

অজয় দাশগুপ্ত : কলাম লেখক।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়