বিদ্যুৎ সংকটে বিপাকে কৃষক

আগের সংবাদ

তীরে এসে তরী ডুবল ইন্ডিজের, সিরিজ ভারতের

পরের সংবাদ

সংরক্ষিত বনে বাফুফেকে জমি বরাদ্দে বিক্ষুব্ধ পরিবেশবাদীরা

প্রকাশিত: জুলাই ২৫, ২০২২ , ৮:২৫ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জুলাই ২৫, ২০২২ , ৮:২৫ পূর্বাহ্ণ

দেশে বনভূমির অপ্রতুলতা ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মধ্যে পড়ার আশঙ্কার মধ্যেই নতুন বির্তকের জন্ম দিয়েছে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়। তারা বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনকে (বাফুফে) ফিফার অর্থায়নে অত্যাধুনিক টেকনিক্যাল সেন্টার নির্মাণের জন্য কক্সবাজার জেলার খুনিয়াপালংয়ে ২০ একর জমি বরাদ্দ দিয়েছে। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পরিবেশবাদীরা। এই বরাদ্দ ঠেকাতে প্রয়োজনে ফিফা পর্যন্ত যাওয়ার হুমকিও দিয়েছেন তারা।

অনেক দিন ধরেই বাফুফে ও জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ কক্সবাজারে জমির সন্ধান করছিল। খুনিয়াপালং ছাড়াও জেলার টেকনাফের সাবারাং, রামুর ক্রুসকুল ও জুয়ারিনালা নামক এলাকায়ও জমি পরিদর্শন করেছিল, কিন্তু কিছুতেই জমি মেলাতে পারছিল না। গত ডিসেম্বরের মধ্যে জমি বরাদ্দের নিশ্চয়তা চেয়েছিল ফিফা। বাফুফে দিতে পারেনি। অবশেষে নির্ধারিত সময়ের ৬ মাস পর গত জুনে বাফুফে বরাদ্দ পায় বহুল প্রতিক্ষীত সেই জমি।

কক্সবাজার জেলায় মোট বনভূমির পরিমাণ ২ লাখ ৬০ হাজার ৪৬ একর, যার মধ্যে অবৈধ দখলে গেছে ৪৫ হাজার ৯৯০ একর। ৪৩ হাজার ৫৬৮ জন অবৈধ দখলদার ও ৬৯৬টি প্রতিষ্ঠান অবৈধভাবে এই বনভূমি দখল করেছে। এছাড়া রোহিঙ্গাদের জন্য ৬ হাজার ১৬৪ একর বনভূমি উজাড় হয়ে গেছে, সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে আরো ১৪ হাজার ৩৭২ একর। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) বরাদ্দ পাওয়া ২০ একর জমির ওপর অত্যাধুনিক একটি টেকনিক্যাল সেন্টার নির্মাণ করবে। টেকনিক্যাল সেন্টারটি তৈরির জন্য ৩ থেকে সাড়ে ৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার দেবে ফিফা। ৪ জুলাই বাফুফের কাছে বরাদ্দকৃত জমি হস্তান্তর করেছে খুনিয়াপালং মৌজা বন অধিদপ্তর।

দেশের পরিবেশবাদীরা বলেছেন, সংরক্ষিত বনাঞ্চল ফিফাকে বরাদ্দ দেয়া ‘সংবিধান, আইন ও আদালতের আদেশের লঙ্ঘন’। গত বুধবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এমন মন্তব্য করেন তারা। বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটের সভাপতি মোবাশ্বের হোসেন বলেন, জীবনকে যা হুমকিতে ফেলে তা উন্নয়ন হতে পারে না। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন ফিফার বিনিয়োগ যেন পরিবেশ-প্রতিবেশগত হুমকি সৃষ্টি না করে। তিনি বলেন, প্রয়োজনে আমরা ফিফার কাছে যাব। ফিফা অবশ্যই বিষয়টি বিবেচনায় নেবে। বনের জমিতে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণকে ‘নেশা’ হিসেবে উল্লেখ করে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান প্রশ্ন তোলেন, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় কিভাবে কলমের খোঁচায় ২০ একর জমি দিয়ে দিতে পারে? বেসরকারি সংগঠন নিজেরা করির সমন্বয়কারী খুশী কবির বলেন, আমরা বিদেশে গিয়ে আন্তর্জাতিক আইনে স্বাক্ষর ও অঙ্গীকার করে আসি- পরিবেশ রক্ষায় কাজ করব। কিন্তু বাস্তবে আইনকে অলঙ্কার হিসেবে রেখে দেয়া হয়। উচ্চ আদালতের আদেশও অমান্য করা হয়। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক শরীফ জামিল বলেন, কক্সবাজারে বন ধস করে বাফুফের স্থাপনা নির্মাণ করা হলে বায়ুদূষণ আরো বাড়বে।

এ বিষয়ে বাফুফের সাধারণ সম্পাদক মো. আবু নাঈম সোহাগ ভোরের কাগজকে বলেন, আমাদের যেখানে জমি দেয়া হয়েছে তা একটি সামাজিক বনায়ন। সে এলাকায় মানুষ বসবাস করছে। সামাজিক বনায়নে মানুষ অবাধে প্রবেশ করছে, গাছ কাটছে আবার লাগাচ্ছে। আশপাশে অনেক প্রকল্প রয়েছে।
বরাদ্দকৃত ২০ একর জমিতে বাফুফে আবাসিক প্রশিক্ষণ একাডেমির অংশ হিসেবে এখানে দুটি ফুটবল মাঠ, একটি চারতলা ডরমিটরি ও একটি মেডিক্যাল সেন্টার নির্মাণ করবে।

পরিবেশবাদীদের দাবি বাফুফের ‘টেকনিক্যাল সেন্টার’ নির্মাণ হলে কাটা পড়বে বনের প্রায় ৩০ হাজার ছোট বড় গাছ। এই বন আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণের জোট আইইউসিএনের তালিকাভুক্ত মহাবিপদাপন্ন এশিয়ান হাতির আবাসভূমি। এছাড়া এ বনে হরিণ, বন্যশূকর, বানরসহ অসংখ্য প্রজাতির উদ্ভিদ ও পাখি রয়েছে। এটি নির্মাণের পুরো তহবিল দিচ্ছে ফিফা। গাছকাটা প্রসঙ্গে বাফুফের সাধারণ সম্পাদক ভোরের কাগজকে বলেন, আমরা বনভূমি নষ্ট করছি না। বরাদ্দকৃত ২০ একর জমির মধ্যে দুটি খেলার মাঠ প্রস্তুত করতে দুই একর করে ৪ একর এবং একটি চারতলা ভবন নির্মাণ করতে এক একর জমি ব্যবহার করব। অবশিষ্ট জমির গাছ নষ্ট হওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই। বন যেভাবে আছে সেভাবেই থাকবে। আমরা ফিফাকে সব কিছু অবহিত করেছি।

গত বছরে স্কটল্যান্ডের গøাসগোতে অনুষ্ঠিত কপ-২৬ এ ২০৩০ সালের মধ্যে বনউজাড়িকরণ বন্ধের অঙ্গীকার করা হয়েছে। এছাড়া বনাঞ্চল রক্ষায় সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা আছে। সংবিধানের ১৮ (ক) অনুচ্ছেদে বলা আছে, রাষ্ট্র বনাঞ্চল, জীব বৈচিত্র্যসহ সার্বিক পরিবেশ বর্তমান ও পরবর্তী প্রজন্মের জন্য রক্ষা করবে।

বিশিষ্টজনরা বাফুফের টেকনিক্যাল সেন্টার নির্মাণের জন্য চট্টগ্রামে জেলার বিভিন্ন অংশে থাকা ১০ লাখ ৮ হাজার ৭৬৮ একর অকৃষি খাসজমির কথাও উল্লেখ করেছেন। তারা কক্সবাজারের রামুতে সংরক্ষিত বন ও পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনকে (বাফুফে) দেয়া জমির বরাদ্দ বাতিলের পাশাপাশি বনবিধ্বংসী সব কার্যক্রম বন্ধের দাবি জানিয়েছেন। কারণ ‘এ বনে হাতির বিচরণ আছে। স্থাপনা হলে ওদের অসুবিধা হবে, ভবিষ্যতে এখানে কোনো বন থাকবে না। বন বিভাগের তথ্য মতে, ডি-রিজার্ভ করা, দখল-বেদখল, লিজ দেয়া, বনউজাড়িকরণ- এসব কারণে হাতির বিচরণক্ষেত্র দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসছে। ফলে হাতি-মানুষের সংঘাত বাড়ছে।

অন্যত্র জমি এবং হাতির বিচরণ সম্পর্কে বাফুফের সাধারণ সম্পাদক মো. আবু নাইম সোহাগ বলেন, ফুটবলের উন্নয়নে কাজ করার জন্য সরকার আমাদের জমি দিয়েছে। আমাদের প্রয়োজন জমি। সরকার যেখানে জমি দেবে সেখানেই আমরা টেকনিক্যাল সেন্টার নির্মাণ করব। কক্সবাজার জেলার খুনিয়াপালংয়ে ফুটবল ফেডারেশনকে যে ২০ একর জমি বরাদ্দ দেয়া হয়েছে সেখানে থেকে হাতির বিচরণ ক্ষেত্র অনেক দূরে। স্থানীয়রা জানিয়েছে বরাদ্দকৃত জমির আশপাশে হাতি কখনো আসেনি। হাতির বিচরণক্ষেত্র নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা নেই।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়