বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হোন

আগের সংবাদ

টালমাটাল বিশ্বেও শেখ হাসিনার ব্যয় সংকোচন নীতির সুফল আসবেই

পরের সংবাদ

ঋণখেলাপিদের বিশেষ সুবিধা দেয়ার আগে যাচাই-বাছাই করতে হবে

রেজাউল করিম খোকন

সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা ও কলাম লেখক

প্রকাশিত: জুলাই ২৪, ২০২২ , ১:৩৩ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জুলাই ২৪, ২০২২ , ১:৩৩ পূর্বাহ্ণ

গত ১৩-১৪ বছরের মধ্যে সবচেয়ে চাপে রয়েছে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি। রাজস্ব আয়ে ঘাটতির পাশাপাশি নতুন করে যোগ হয়েছে বিশ্ব সংকট। বিশেষ করে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, রপ্তানি এবং রেমিট্যান্স আয়ে ঘাটতির কারণে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে বড় ধরনের সমস্যা হচ্ছে। টাকার বিপরীতে মার্কিন ডলারের দাম বৃদ্ধিসহ নানা কারণে অসহনীয় হয়ে উঠছে জিনিসপত্রের দাম। মনে হচ্ছে, আগামী দিনে পরিস্থিতি আরো বেসামাল হয়ে উঠবে। করোনায় ক্ষতিতে ব্যবসায়ীদের ঘুরে দাঁড়াতে ঋণ পরিশোধে ছাড় দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। এর ফলে ব্যবসায়ীরা ঋণ শোধ না করেও ২ বছর ব্যাংকের খাতায় ছিলেন ভালো গ্রাহক। এখন ওই সুবিধা উঠে গেছে, তবে অনেক ব্যবসায়ী আগের মতোই ঋণ শোধ করছেন না। ফলে বাড়ছে খেলাপি ঋণ। খেলাপি ঋণ ঠেকাতে বড় ছাড় দিয়ে নীতিমালা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর ফলে ঋণ আদায় না বাড়লেও সাময়িকভাবে কমবে খেলাপি ঋণ। আর বিশৃঙ্খল হয়ে পড়বে ব্যাংকের তারল্য ব্যবস্থাপনা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এই নীতিমালা। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও করোনার সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় এই সিদ্ধান্ত। গণহারে এমন সুবিধা কখনোই ভালো ফল দেয় না। খেলাপি ঋণ আদায়ে শক্ত পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। নতুন নীতিমালার ফলে খেলাপি ঋণ নিয়মিত করতে এখন আড়াই থেকে সাড়ে ৬ শতাংশ অর্থ জমা দিলেই চলবে। আগে যা ছিল ১০-৩০ শতাংশ। পাশাপাশি এসব ঋণ ৫-৮ বছরে পরিশোধ করা যাবে। আগে এসব ঋণ শোধ করতে সর্বোচ্চ ২ বছর সময় দেয়া হতো। আবার নতুন করে ঋণও পাওয়া যাবে। পাশাপাশি খেলাপি ঋণে কী সুবিধা দেয়া হবে, তা নির্ধারণ করার পুরো ক্ষমতা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। এর ফলে ব্যাংক মালিকরাই ঠিক করবেন, কী সুবিধা পাবেন ঋণখেলাপিরা। আগে বিশেষ সুবিধায় ঋণ নিয়মিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন লাগত। যা স্বয়ং গভর্নর অনুমোদন করতেন। নতুন গভর্নর দায়িত্ব নিয়ে সেই ক্ষমতার পুরোটাই ব্যাংকগুলোর হাতে তুলে দিয়েছেন। নতুন নীতিমালার ফলে ব্যাংকের ঋণ আদায় আরো কঠিন হয়ে পড়বে।
ঋণ নিয়মিত করার আগে গ্রাহকের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা যাচাই ও খেলাপি হওয়ার কারণ পরীক্ষা করতে হবে। কেউ অভ্যাসগত খেলাপি হলে তার ঋণ নিয়মিত করা যাবে না। এসব গ্রাহকের ঋণ আদায়ে ব্যাংককে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। ব্যবসায়ীদের চাপে এ সিদ্ধান্ত হয়েছে, তাই ব্যবসায়ীরা এতে লাভবান হবেন। তবে ব্যাংকের জন্য বড় চাপ তৈরি করবে। ব্যাংকের তারল্য ব্যবস্থাপনা কঠিন হয়ে পড়বে। এতে নতুন ঋণ কমে যাবে, নতুন উদ্যোক্তারাও ঋণ পাবেন না। বিদেশি ব্যাংক ও ঋণদাতা সংস্থাগুলো এসব ছাড় ভালোভাবে নেয় না। এর ফলে দেশীয় ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক ব্যবসায় কোনো প্রভাব পড়ে কি-না, তা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। তবে আগে বাংলাদেশ ব্যাংকে বিশেষ সুবিধায় ঋণ পুনঃতফসিল করতে বিভিন্ন তদবির আসত। এ কারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর সেই সুবিধা দেয়ার ক্ষমতা ব্যাংকগুলোকে দিয়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের জারি করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, করোনার দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব, বহির্বিশ্বে সাম্প্রতিক যুদ্ধাবস্থা প্রলম্বিত হওয়ার কারণে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা চলছে। নতুনভাবে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা ও শ্রেণিকৃত ঋণের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার স্বার্থে ঋণ পুনঃতফসিলীকরণ সংক্রান্ত নতুন নীতিমালা জারি করা হলো।
আগে যে কোনো পরিমাণ মেয়াদি খেলাপি ঋণ নিয়মিত করতে ১০-৩০ শতাংশ এককালীন অর্থ জমা দিতে হতো। এখন আড়াই থেকে সাড়ে ৬ শতাংশ অর্থ জমা দিলেই হবে। আগে চলমান ও তলবি খেলাপি ঋণ নিয়মিত করতে ৫-১৫ শতাংশ এককালীন অর্থ জমা দিতে হতো, এখন আড়াই থেকে সাড়ে ৫ শতাংশ অর্থ জমা দিলেই চলবে। আগের নিয়মে খেলাপি মেয়াদি ঋণ নিয়মিত হলে তা পরিশোধে ৯-২৪ মাস সময় দেয়া হতো। নতুন নীতিমালায় ১০০ কোটি টাকার কম ঋণে ৬ বছর, ৫০০ কোটি টাকার কম ঋণে ৭ বছর ও ৫০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ পরিশোধে ৮ বছর পর্যন্ত সময় দেয়া যাবে। আগে চলমান ও তলবি ঋণ নিয়মিত হলে তা পরিশোধ করতে ৬-১৮ মাস সময় দেয়া হতো। এখন ৫০ কোটি টাকার কম ঋণ পরিশোধে ৫ বছর, ৩০০ কোটি টাকার কম পরিশোধে ৬ বছর ও ৩০০ কোটি টাকার বেশি ঋণে ৭ বছর পর্যন্ত সময় দেয়া যাবে। বিশেষ সুবিধা নিয়ে যেসব খেলাপি গ্রাহক নিয়মিত হয়েছেন, তারা ব্যাংক থেকে আবারো ঋণ নিতে পারবেন। এজন্য সাধারণ গ্রাহকদের বকেয়া ঋণের ৩ শতাংশ জমা দিতে হবে, তবে রপ্তানিকারকদের জন্য তা ২ শতাংশ। আগে নতুন ঋণ নিতে সাধারণ গ্রাহকদের ১৫ শতাংশ ও রপ্তানিকারকদের সাড়ে ৭ শতাংশ অর্থ জমা দিতে হতো। এদিকে যেসব মেয়াদি ঋণ নিয়মিত রয়েছে, তাও নতুন করে পুনর্গঠন করা যাবে। এতে বিদ্যমান মেয়াদের অবশিষ্টের সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত সময় বাড়ানো যাবে। আগে যা ছিল ২৫ শতাংশ। এতে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কমবে।
বর্তমানে অনেক দেশ সমস্যায় পড়ে গেছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। শ্রীলঙ্কার পরিস্থিতি আমরা দেখতে পাচ্ছি। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংক আগ বাড়িয়ে এমন সুবিধা দিয়েছে। যারা ভালো গ্রাহক হিসেবে পরিচিত, ছোট ও মাঝারি গ্রাহক- তাদের এসব সুবিধা দিলে ভালো হতো। গণহারে এমন সুবিধা কখনোই ভালো ফল দেয় না। খেলাপি ঋণ আদায়ে শক্ত পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। ঋণ নীতিমালায় এমন ছাড়কে আইএমএফ কীভাবে নেবে, এটাও দেখার বিষয়। করোনাসৃষ্ট এ বিপর্যয় থেকে ঘুরে দাঁড়াতে সরকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছিল। এসব প্যাকেজের আওতায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেয়া হয়েছে স্বল্প সুদে ঋণ। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে সরকার চলমান মহামারির শুরু থেকেই সচেষ্ট। দেশের বড়, মাঝারি ও ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য সংগত কারণে দ্রুতই আর্থিক প্যাকেজ ঘোষণা করেছিল। দুঃখজনকভাবে শর্ত ভঙ্গ করে অনেক অর্থ চলে গেছে ভিন্ন খাতে। এটা স্পষ্টতই অপব্যবহার ও অনিয়ম বৈকি। বিশেষ এক পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সচল রাখতে দেয়া হয়েছিল প্রণোদনার অর্থ। এর অপব্যবহার কোনোভাবেই কাম্য নয়। শিল্প-ব্যবসা-বাণিজ্য উজ্জীবিত রাখতে সরকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে। দেশের উদ্যোক্তাদের পরিত্রাণে দিয়েছে সাশ্রয়ী হারে ঋণ। এটা তাদের জন্য বড় ধরনের আর্থিক সহায়তা বৈকি। এতে তারা ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে সমর্থ হচ্ছেন।
প্রণোদনা থেকে প্রত্যক্ষভাবে যেহেতু উদ্যোক্তারা লাভবান হচ্ছেন, তাই নিজ গরজেই তাদের অপব্যবহারের অনৈতিক প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি। দুর্ভাগ্যক্রমে প্রণোদনা প্যাকেজের অপব্যবহার অনেকাংশে রোধ করা যাচ্ছে না। প্রণোদনার অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর নজরদারি বাড়ানোর বিকল্প নেই। যেহেতু অপব্যবহারের তথ্য মিলছে, সেহেতু ব্যাংকগুলোকে গ্রাহক চিহ্নিত করা, ঋণ অনুমোদন, বিতরণ ও ব্যবহার নিশ্চিতের ব্যাপারে আরো সতর্ক হতে হবে। গণহারে ঋণখেলাপিদের এমন বিশেষ সুবিধা দেয়ার আগে যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই করতে হবে। বাড়াতে হবে তদারকি। তালিকা ধরে কারা কোথায় অর্থ ব্যয় করছেন, সেটা খতিয়ে দেখা দরকার। দায়ীদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে শর্ত ভঙ্গ করলে বিশেষ সুবিধা প্রত্যাহারের মতো কঠোর ব্যবস্থাও নেয়া যেতে পারে।

রেজাউল করিম খোকন : সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা ও কলাম লেখক।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়