বিজিবি-বিএসএফ সম্মেলন : সীমান্তে হত্যা বন্ধে সুরাহা নেই!

আগের সংবাদ

বিরোধীরা চান টি এন সেশন, ক্ষমতাসীনরা দলনফর

পরের সংবাদ

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও চলমান বাস্তবতা

ড. মোহাম্মদ বাহাউদ্দিন

চেয়ারম্যান ও অধ্যাপক; ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশিত: জুলাই ২৩, ২০২২ , ১২:৩০ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জুলাই ২৪, ২০২২ , ৪:৩৫ অপরাহ্ণ

ইসলাম শান্তি, উদারতা, মানবতা আর অসাম্প্রদায়িকতার ধর্ম। মহান মানবতাবাদী আদর্শ ও দর্শনের ফলশ্রæতিতে অতি অল্প সময়ের ব্যবধানে সমগ্র বিশ্বব্যাপী এ ধর্ম ব্যাপক প্রচার-প্রসার লাভ করে। জাতি-ধর্ম, দেশ-কাল আর শ্বেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গ নির্বিশেষে সবার মাঝে এ মহান ধর্মের নীতি-বিধানগুলো গ্রহণযোগ্যতা পায়। ইসলাম পরিণত হয় এক সর্বজনীন-বিশ্বজনীন জীবন-পদ্ধতিতে। যেই জীবনাচারে নেই কোনো সংকীর্ণতা, সংঘাত; বরং এতে রয়েছে উদারতার বিশালত্ব আর সমুদয় সৃষ্টির প্রতি অশেষ মমত্ববোধ। ইসলাম মানেই শান্তি। তাই ইসলাম প্রবর্তনের মধ্য দিয়ে অশান্ত, বিশৃঙ্খল ও ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ মরুময় আরবের জেহালত সমাজে সৌহার্দময় পরিবেশ, স্থিতিশীলতা ও শান্তিপূর্ণ অবস্থা ফিরে আসে। ঐশী নির্দেশনার আলোকে পৃথিবী এক নতুন সভ্যতার স্পর্শ পায়। মানুষ মানুষকে মানবতা, পরমতসহিষ্ণুতা ও ঔদার্যের দৃষ্টিকোণ থেকে চিনতে শিখে, পরস্পর পরস্পরকে সম্মান করতে শিখে এবং অজ্ঞতা-মূর্খতা ও পাষণ্ডতা থেকে বেরিয়ে আসে। ইসলামের কল্যাণে বর্বর আরব সমাজ ওহির জ্ঞানে আলোকিত হয়, সব নিষ্ঠুরতা তিরোহিত হয় এবং মানবতা পূর্ণতা পায়। রাজা-প্রজার পার্থক্য, ধনী-নির্ধনের ভেদাভেদ আর সাদা-কালোর বৈষম্য দূরীভূত হয়। মানুষের কর্ম ও কৃতিত্বের মাধ্যমে তার মর্যাদা ও অবস্থান নিশ্চিত হয় এবং মানবসমাজের সব পঙ্কিলতা দূরীকরণে আদম সন্তানরা নিরন্তর প্রয়াস চালায়। কিছুসংখ্যক আল্লাহর বান্দা ত্যাগ-তিতিক্ষা, কষ্ট-যাতনা আর ইসলামের জীবনপদ্ধতি বাস্তবে রূপায়ণ করতে দিবস-যামিনী অক্লান্ত শ্রম দেন। তাদের বিরামহীন সাধনা আর অবর্ণনীয় পরিশ্রমে ইসলাম অতি অল্প সময়ের ব্যবধানে দুনিয়ার অন্যতম বৃহৎ এক জীবনাদর্শে পরিণত হয়। পৃথিবীর বুকে নিগৃহীত, বঞ্চিত ও উপেক্ষিত জনমানুষের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটে; কেননা ইসলাম তাদের সবার যৌক্তিক, মানবিক ও কাক্সিক্ষত চাহিদা পরিপূরণে এক স্বপ্নসারথির ভূমিকা পালন করে।
কিন্তু আজ আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশে আমরা কী দেখছি? শতকরা নব্বই ভাগ মুসলমানের দেশে ইসলামের অনুপম জীবনাদর্শ আমাদের সমাজ জীবনে কতটুকু আশীর্বাদ নিয়ে আসতে পারছে? শান্তির ধর্ম ইসলামের মোড়কে যেন আজ সমাজ থেকে শান্তি বিতাড়নের মহড়া চলছে। হাজার বছরের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্তের আলোকিত জনপদ হলো এই দেশ। আবহমানকাল থেকে এই জনপদে বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর মানুষরা পারস্পরিক সহমর্মিতা, হৃদ্যতা ও মমত্ববোধের সঙ্গে সহাবস্থান করে আসছে। জাতিগত, গোষ্ঠীগত বা ধর্মগত পার্থক্যের কারণে এদেশে কোনো সম্প্রদায় কখনো নিগৃহীত হয়নি; সংখ্যালঘুর তকমা মাখিয়ে কাউকে নির্যাতনের শিকারও করা হয়নি। কিন্তু বড়ই দুঃখ ও পরিতাপের বিষয়- আজকের বাস্তবতা যেন ভিন্নরূপ পরিগ্রহ করেছে। সুদীর্ঘকালের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সুমহান ঐতিহ্যকে ভূলুণ্ঠিত করে আজ এদেশে যাদের সংখ্যালঘু হিসেবে বলা হচ্ছে তাদের ওপর নির্মম-নিষ্ঠুর নিষ্পেষণ চালানো হচ্ছে। আর তা করা হচ্ছে নিতান্তই ধর্মীয় পার্থক্যের কারণে এবং যারা এসব সন্ত্রাসী কাজে সরাসরি যুক্ত হয়েছে তারা ইসলামযুক্ত ভ্রান্ত রাজনৈতিক মতাদর্শের অনুসারী অথবা যারা বিসমিল্লাহর দোহাই দিয়ে রাজনৈতিক ইসলামকে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির তরে কাজে লাগায় তারা। অথচ ইসলামে সংখ্যালঘুদের মর্যাদা ও অধিকার যথাযথভাবে স্বীকৃত এবং এতে অমুসলিমদের ওপর হামলা, নির্যাতন তো দূরের কথা, সামান্যতম সাম্প্রদায়িক অপ্রীতিকর কোনো বিষয়েরও স্থান নেই।
ইসলামের সংবিধিবদ্ধ নিয়ম-কানুন ও বিধি-বিধান সংবলিত নির্ভুল ঐশী কিতাব পবিত্র কুরআনকে ‘হুদাল্লিল আলামিন’ বা ‘হুদাল্লিন্নাস’ অর্থাৎ বিশ্ববাসীর জন্য পথনির্দেশক বা সমগ্র মানবজাতির জন্য হেদায়েতের গ্রন্থ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তাই সর্বজনীন-বিশ্বজনীন এ মহাগ্রন্থ হতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রতি গুরুত্ব ও তাৎপর্য বহন করে এমন কিছু বাণীর উল্লেখ করছি- ‘তোমাদের ধর্ম তোমাদের কাছে আর আমার ধর্ম আমার কাছে (১০৯:৬)।’ ‘আমাদের কর্ম আমাদের কাছে আর তোমাদের কর্ম তোমাদের কাছে (প্রিয়)। আমাদের ও তোমাদের মাঝে কোনো বিবাদ নেই। আল্লাহই আমাদের একত্রিত করবেন আর আমাদের সবার প্রত্যাবর্তন তাঁরই কাছে (৪২:১৫)।’ ‘তুমি একনিষ্ঠভাবে নিজেকে ধর্মের ওপর প্রতিষ্ঠিত কর (৩০:৩০)।’ ‘ধর্মে কোনো জোরজবরদস্তি নেই (২:২৫৬)।’ ‘তোমার প্রতিপালক ইচ্ছা করলে পৃথিবীতে যারা আছে তারা সবাই ইমান আনয়ন করত। তবে কি তুমি বিশ্বাসী হওয়ার জন্য মানুষের ওপর জবরদস্তি করবে? (১০:৯৯)’ ‘আর তারা আল্লাহকে ছেড়ে যাদের ডাকে তাদের তোমরা গালি দেবে না। কেননা তারাও তবে অজ্ঞানতাবশত আল্লাহকে গালি দেবে। এভাবে প্রত্যেক জাতির চোখে তাদের কার্যকলাপ শোভন করেছি। তারপর তাদের প্রতিপালকের কাছে তারা ফিরে যাবে। অতঃপর তিনি তাদের কৃতকার্য সম্বন্ধে তাদের জানিয়ে দেবেন (৬:১০৮)।’ ‘আর প্রত্যেকের (নির্দিষ্ট) একটি দিক আছে যার দিকে সে মুখ করে দাঁড়ায়। অতএব তোমরা সৎকর্ম সম্পাদনে প্রতিযোগিতা কর। তোমরা যেখানেই থাক না কেন আল্লাহ তোমাদের সবাইকে একত্রিত করবেন (২:১৪৮)।’ ‘তোমরা তোমাদের ধর্ম সম্বন্ধে বাড়াবাড়ি কর না এবং আল্লাহর সম্বন্ধে সত্য বল (৪:১৭১)।’ ‘আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য নির্ধারিত করে দিয়েছি নিয়ম-কানুন, যা তারা পালন করে। সুতরাং তারা যেন তোমার সঙ্গে এ ব্যাপারে বিতর্কে লিপ্ত না হয় (২২:৬৭)।’ ‘তোমাদের প্রত্যেকের জন্য শিরআত (আইন) ও স্পষ্ট পথ নির্ধারণ করেছি। ইচ্ছা করলে আল্লাহ তোমাদের একজাতি করতে পারতেন, কিন্তু তিনি তোমাদের যা দিয়েছেন তা দিয়ে তোমাদের পরীক্ষা করার জন্য। তাই সৎকর্মে তোমরা পারস্পরিক প্রতিযোগিতা কর (৫:৪৮)।’ ‘বলো, হে আহলে কিতাব! তোমরা তোমাদের ধর্ম সম্বন্ধে বাড়াবাড়ি কর না (৫:৭৭)।’ পবিত্র কুরআনে বিবৃত আল্লাহপাকের উল্লিখিত বাণীগুলোর ব্যাখ্যা নিষ্প্রয়োজন; বিভিন্ন ধর্ম ও ধর্মাবলম্বীদের প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা, দায়িত্বশীলতা, সহিষ্ণুতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বিষয়টিই এসব আয়াতে কারিমায় নির্দেশিত হয়েছে।
ইসলাম কি ধর্মীয় কারণেও ভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের সম্পদ আর সম্ভ্রমের ওপর আক্রমণের বা তাদের বাসস্থানে অগ্নিসংযোগ করার অনুমতি আছে? নিশ্চয়ই না, বরং ইসলামে অন্যান্য সব ধর্ম ও তার অনুসারীদের যথাযথ সম্মান, অধিকার ও মর্যাদার বিষয়টি সুনির্দিষ্ট ও স্বীকৃত হয়ে আছে। কিন্তু ইসলামের কথিত রক্ষক ও ঠিকাদার সেজে আজ নামধারী মুসলমানরা অমুসলিম নাগরিকদের জন্য এদেশে আজাব-গজবের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এরা কি ইসলামকে আল্লাহপাক ও প্রিয়নবী (সা.)-এর চাইতেও বেশি ভালোবাসে, পছন্দ করে? মহানবী (সা.)-কে তদানীন্তন অমুসলিমরা কত নির্যাতন করেছে, অত্যাচারের স্টিমরোলার চালিয়েছে, গৃহহারা করেছে, মারতে মারতে রক্তাক্ত ও বেহুঁস করে দিয়েছে, দাঁত ভেঙেছে, মাথা ফাটিয়েছে, জন্মস্থান ত্যাগে বাধ্য করেছে, হত্যার ষড়যন্ত্র করেছে, অপবাদ আরোপ করেছে; কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, দয়াল নবী কোনোদিন কাউকে গালি-বকা দেননি, বদদোয়া করেননি, প্রতিশোধ নেননি, কাউকে আঘাত করেননি, কারো বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেননি, কারো কোনো ক্ষতি সাধন করেননি।
মহান আল্লাহর বাণী, মহানবী (সা.)-এর নির্দেশনা আর ইসলামের উদারনৈতিক জীবন-ব্যবস্থায় অমুসলিমদের জীবন-মালের সার্বিক সুরক্ষা ও নিরাপত্তার সবধরনের নিশ্চয়তা বিধান করা হয়েছে। ইসলাম পরমতসহিষ্ণুতার শিক্ষা দেয় এবং পারস্পরিক সম্প্রীতির সঙ্গে সবার সহাবস্থান নিশ্চিত করে। এমনকি যে এলাকায় মুসলিম জনগণের সংখ্যা বেশি হবে সে এলাকায় অমুসলিমদের জীবন ও সম্পদের হেফাজতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেবে মুসলমানরাই; এটাই ইসলামের শিক্ষা। এক্ষেত্রে বিশ্বমানবতার পরম সুহৃদ মহানবী (সা.)-এর একটি কঠোর সতর্কবার্তা প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন- ‘মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকায় সংখ্যালঘু অমুসলিমরা হলো পবিত্র আমানত। কোনো মুসলিম যদি সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন চালায় তাহলে কিয়ামত দিবসে আমি সেই এলাকার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের বিরুদ্ধে আল্লাহর আদালতে মামলা দায়ের করব।’ মহানবী (সা.)-এর উপরোক্ত সতর্কবাণীর পরিপ্রেক্ষিতে আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারি, কোনো প্রকৃত মুসলমান সংখ্যালঘু অমুসলিম নাগরিকদের ওপর কোনো ধরনের অত্যাচার করতে পারে না। যারা মানবতাবিরোধী এসব কাজে লিপ্ত হবে তারা আর যাই হোক কখনো মুসলমান হতে পারে না; এদের ওপর মানবতার অভিশাপ, আল্লাহ ও তদীয় রাসুলের অভিশাপ; সর্বোপরি মানবাত্মা আর মানবসভ্যতার অভিশাপ। স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সব জনগণের জীবন-ইজ্জত আর সম্পদ-সম্ভ্রমের সার্বিক নিñিদ্র নিরাপত্তার ব্যবস্থা গ্রহণ সরকারের নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব। দেশের অমুসলিম নাগরিকদের ওপর বর্বরোচিত হামলা, সাম্প্রদায়িক সংঘাত, অগ্নিসংযোগ, লুটতরাজ আর ধ্বংসযজ্ঞের হোতা নরপশুদের পাকড়াও করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান সরকারের অন্যতম গুরুদায়িত্ব।

ড. মোহাম্মদ বাহাউদ্দিন : চেয়ারম্যান ও অধ্যাপক; ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়