সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখুন

আগের সংবাদ

মন্দিরে হামলা : শেষ কোথায়?

পরের সংবাদ

শেয়ারবাজার বিনিয়োগে ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে

মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম

পুঁজিবাজার বিশ্লেষক

প্রকাশিত: জুলাই ২২, ২০২২ , ১২:৩০ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জুলাই ২২, ২০২২ , ১২:৩০ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশের শেয়ারবাজার ঐতিহাসিকভাবেই ঢিমেতালে চলছে। এটি কখনো সেভাবে প্রতিষ্ঠা পায়নি। আর্থসামাজিক উন্নয়নের সব সূচকই এখানে পরাস্ত। বাংলাদেশের উন্নয়নের পঙ্খীরাজ যখন মধ্য গগণে, তখন হামেশাই শেয়ারবাজারের আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। ইদানীং এই ভাবনাগুলো মাহাবুব সাহেবের মাথায় বারবার ঘুরেফিরে আসছে। করোনার সঙ্গে যুদ্ধ, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, বিশ্ববাজারে ভোগ্যপণ্যে আগুন, সর্বোপরি এ জীবনযুদ্ধে ভালো নেই দেশের জনগণ। এর মধ্যে একটু বাড়তি উত্তাপে রয়েছে মাহাবুব সাহেবের মতো শেয়ারবাজারের ১৫ লাখ বিনিয়োগকারী। অর্থাৎ দেশের প্রায় ১ শতাংশ মানুষ আর সবার চেয়ে একটু বেশিই ক্ষতিগ্রস্ত ও চিন্তিত। খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার যে কোনো পণ্য থেকে শুরু করে এমন কোনো বিলাসীপণ্য নেই যার দাম বাড়েনি। বাড়েনি শুধু শেয়ারদর। দিন যত গড়াচ্ছে মাহাবুব সাহেবদের জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহের বোঝা তত ভারি হচ্ছে। আর হালকা হচ্ছে পোর্টফলিও। বাজেট নিয়ে বরাবরের মতো মাহাবুব সাহেব চিন্তিত। তবে এবারের এই দুশ্চিন্তার কারণ একটু ভিন্ন, সেটি হলো- বাজেটে রাজস্ব নীতি, মুদ্রানীতি, আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য, মোট জাতীয় উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি ও সর্বোপরি সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার লক্ষ্যগুলো সরাসরি শেয়ারবাজারকে প্রভাবিত করে। কিন্তু এই বিষয়গুলো বরাবরই উপেক্ষা করে, বিনিয়োগকারীদের কালো টাকা বিনিয়োগের বিষয়টি একটি মূর্তিমান আতঙ্ক হয়ে দাঁড়ায়। অথচ দেখা যায়- এই কালো টাকা বা অপ্রদর্শিত আয় খুব কমই শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ হয়। লক্ষণীয় বিষয় হলো এবারের বাজেটের আগেই শেয়ারবাজার অস্থিতিশীল। এটি ঠিক কালো টাকা বিনিয়োগ সম্পর্কিত নয়। গত ফেব্রুয়ারি থেকে অর্থাৎ রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বা শ্রীলঙ্কা নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করার আগেই শেয়ারবাজারে ঘটে চলছে লঙ্কাকাণ্ড।
এ বছরের ১৩ ফেব্রুয়ারি ডিএসইএক্স সূচক ছিল ৭ হাজার ৮৯ পয়েন্ট। ওই অবস্থান থেকে শুরু হয় সূচকের পতন। তা চলতে থাকে ২২ মে পর্যন্ত। ধারাবাহিক এই পতনে সূচক ৯৪৭ পয়েন্ট কমে দাঁড়ায় ৬ হাজার ১৪২ পয়েন্টে। ঢালাওভাবে কমেছে ভালো-মন্দ সব শেয়ারের দর। ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সব শ্রেণির বিনিয়োগকারী। বাজার মূলধন হারিয়েছে প্রায় ৬৪ হাজার কোটি টাকা। মাহাবুব সাহেব এই পতনের ‘কারণ’ অনুসন্ধানে ব্যস্ত। যেখানে চলতি অর্থবছরের বাজেটে শেয়ারবাজারে অনেক সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয়েছে, বিশেষ করে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর করপোরেট ট্যাক্স আড়াই শতাংশ কমানো হয়েছে। ফলে ওই সব কোম্পানির শেয়ারদর বেড়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু বাজারে ঘটছে ঠিক এর উল্টো। আমাদের শেয়ারবাজারে অর্থনীতির প্রচলিত সূত্রগুলো ঠিক কাজ করছে না। আমাদের শেয়ারবাজার ক্ষুদ্র বিনিয়োগনির্ভর। এরা সবসময়ই দেশি-বিদেশি বড় বিনিয়োগকারীদের অনুসরণ করেন। তাই ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের বিবেচনাহীন সিদ্ধান্ত বাজারের পতন আরো ত্বরান্বিত করে। আর প্রাতিষ্ঠানিক সুষ্ঠু বিনিয়োগ আমাদের শেয়ারবাজারে কখনোই ছিল না। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী ও ব্যক্তিশ্রেণির বড় বিনিয়োগকারী এক কথায় কারসাজিই আমাদের শেয়ারবাজারের অস্থিরতার অন্যতম কারণ। বিভিন্ন গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, গত দুই বছরে বাজারে যতসংখ্যক কোম্পানি নিয়ে কারসাজি হয়েছে, তা ২০১০ সালকেও হার মানায়। মাহাবুব সাহেব বিস্মিত হন, যখন কারসাজি চক্রের কারো কারো সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সখ্যতার খবর শুনতে পান। অথচ এই কমিশনই বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ সুরক্ষা নিশ্চিত করবেন বলে বারবার আশ্বস্ত করেন। কিন্তু এর প্রতিফলন আপাতত বাজারে দেখা যাচ্ছে না।
আইসিবির কাছে ব্যাংকগুলোর ঋণ শেয়ারবাজার এক্সপোজার লিমিটের বাইরে রাখা ও শেয়ারবাজার বিনিয়োগে ব্যাংকের ২০০ কোটি টাকা বিশেষ তহবিলের আকার বাড়িয়ে ৩০০ কোটি টাকার কথা শোনা যাচ্ছে। পাশাপাশি আগে থেকেই নিয়ন্ত্রক সংস্থার ব্যাংকগুলোর সঙ্গে চিঠি চালাচালি তো রয়েছেই। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি ফলপ্রসূ কোনো প্রভাব বাজারে পড়ছে বলে মাহাবুব সাহেবের মনে হয় না। কারণ অভিজ্ঞতা বলে- নির্দেশনা অমান্য করা এখন বাংলাদেশে অপসংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। এসব কোনো পদক্ষেপই যখন বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়েনি, তখন বাধ্য হয়ে বাজারের পতন ঠেকাতে সেই পুরনো পন্থায়- শেয়ারদরে নিচের সার্কিট ব্রেকার বেঁধে দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। এই টোটকা ওষুধ বাজারের পতন ঠেকাতে সাময়িক কাজ করলেও এটি যে দীর্ঘমেয়াদি কোনো সমাধান নয়। তা মাহাবুব সাহেবের নিকট ইতিহাস থেকে জানা। এর আগে বাজার স্থিতিশীলতায় তারল্য বাড়াতে মার্জিন লোন রেশিও বাড়িয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। যা মাহাবুব সাহেবের কাছে মনে হয়, কইয়ের তেলে কই ভাজার মতো। তবে এবারে মাহাবুব সাহেব খুব সতর্ক, তিনি ঋণের ফাঁদে পা দেবেন না। বাজারে তারল্য বাড়ানো তার কাজ নয়। তার নিজের যা মূলধন আছে, তা দিয়েই তিনি বিনিয়োগে থাকবেন। তিনি বিশ্বাস করেন, অন্যের ওপর ভরসা না করে, দায়িত্বশীল বিনিয়োগ আচরণই বাজার স্থিতিশীলতার একমাত্র পন্থা। মাহাবুব সাহেব বাজেটে মন দিলেন। আশার কথা হলো, গতবারের মতো এবারেও শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর করপোরেট ট্যাক্স আড়াই শতাংশ কমিয়েছে অর্থমন্ত্রী। তবে স্বচ্ছতা বাড়াতে, নির্দিষ্ট কিছু শর্ত আরোপ করেছে। গত দুই বছরে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর করপোরেট ট্যাক্স মোট ৫ শতাংশ কমে ২০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ফলে কোম্পানিগুলোর লভ্যাংশ বেড়ে সুফল পাবে বিনিয়োগকারীরা। মাহাবুব সাহেব ভেবে দেখলেন, নতুন বাজেটের পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন হলে শেয়ারবাজার গতিশীল হবে। সে ক্ষেত্রে সব পক্ষকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। অভিজ্ঞ মাহাবুব সাহেব এবারের বাজেটের আগে গতবারের মতো শেয়ার বিক্রি করে পোর্টফলিও খালি করেননি, বরং তার পোর্টফলিওতে ভালো কিছু মৌলভিত্তি কোম্পানির শেয়ার রয়েছে। তা সব শর্তাদি মেনে করপোরেট ট্যাক্স কমানোর সুফল পাবে। তাই তিনি একটু ফুরফুরে মেজাজে। সূচকের অবস্থান যাই হোক না কেন? তার পোর্টফলিও খুব বেশি ঝুঁকিতে থাকবে বলে তিনি মনে করেন না। শেয়ারবাজার বিনিয়োগে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিতে হবে। এখানে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে আইকিউ বা সেট স্কোরের কোনো সম্পর্ক নেই। এর অর্থ হলো ধৈর্যশীল ও শৃঙ্খলাবদ্ধ হওয়া এবং ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেকে পরিপক্ব করে গড়ে তোলা। আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। নিজের বিনিয়োগ দায়িত্ব নিজের নিতে হবে। মনে রাখতে হবে- শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে ব্রেনের চেয়েও চরিত্রের বৈশিষ্ট্যের গুরুত্ব অনেক বেশি। শেয়ারবাজারে ভিড়ের মধ্যে স্রোতে গা না ভাসিয়ে পরের আবেগকে নিজের বিচার বুদ্ধির ওপর স্থান দেয়া যাবে না। অভিজ্ঞ মাহাবুব সাহেব লক্ষ করলেন আমাদের দেশে বিনিয়োগকারীদের সমস্যা হলো এরা ইতিহাস তথা ভুল থেকে শিক্ষা নেয় না, নিজেদের অলক্ষ্যে একই ভুল বারবার করেন। মোহকে সঙ্গী করে আলেয়ার পেছনে ছোটেন। এ যেন রবীন্দ্রনাথের পোস্টমাস্টার গল্পের শেষাংশ- ‘হায় বুদ্ধিহীন মানব হৃদয়। ভ্রান্তি কিছুতেই ঘোচে না, যুক্তিশাস্ত্রের বিধান বহুবিলম্বে মাথায় প্রবেশ করে, প্রবল প্রমাণকেও অবিশ্বাস করিয়া মিথ্যা আশাকে দুই বাহুপাশে বাঁধিয়া বুকের ভিতরে প্রাণপণে জড়াইয়া ধরা যায়, অবশেষে একদিন সমস্ত নাড়ি কাটিয়া হৃদয়ের রক্ত শুষিয়া সে পলায়ন করে, তখন চেতনা হয় এবং দ্বিতীয় ভ্রান্তিপাশে পড়িবার জন্য চিত্ত ব্যাকুল হইয়া ওঠে।’

মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম : পুঁজিবাজার বিশ্লেষক।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়