ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে ১০ উইকেটে হেরে হোয়াইটওয়াশ বাংলাদেশ

আগের সংবাদ

ব্যাংক লেনদেনে ডলারের দর ১০০ ছুঁইছুঁই

পরের সংবাদ

বিধ্বস্ত সুনামগঞ্জ শহরে ভূতুড়ে নিস্তব্ধতা

প্রকাশিত: জুন ২৮, ২০২২ , ৮:০৮ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জুন ২৮, ২০২২ , ৮:৩৮ পূর্বাহ্ণ

আদালতের নিয়মিত বিচারকাজ বন্ধ > অফিসপাড়া নিথর > বন্ধ হাসন রাজা মিউজিয়াম > পথে পথে ক্ষতচিহ্ন

‘দেখার হাওর’-এর বুক চিরে বয়ে চলা সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কের হাসন রাজা তোরণ পার হয়েই হাতের বাঁয়ে ইকবালনগর এলাকা। সুনামগঞ্জ শহর থেকে ৫ কিলোমিটার আগে হলেও একে শহরের অংশ হিসেবেই ধরা হয়। গতকাল সোমবার সরজমিন গিয়ে ইকবালনগরের অধিকাংশ ঘরবাড়িকে দুমড়ানো-মোচড়ানো অবস্থায় দেখা গেছে। গত ১৬ ও ১৭ জুন বিধ্বংসী বন্যা এমন ধ্বংসলীলা চালানোর পর অধিবাসীরা রাস্তার উল্টোদিকে একটি নির্মাণাধীন বহুতল ভবনে আশ্রয় নিয়েছিলেন। কবে ঘরে ফিরতে পারবেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন সবাই।

মিলন নামের একজন বাসিন্দা বলেন, এই ইকবালনগরে বানের পানি এসেই তিনজনকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল। দুদিন পরে তাদের লাশ পাওয়া গেছে পার্শ্ববর্তী ভিরাজপুর থেকে। এবারের সর্বনাশা বন্যা মানুষকে শুধু ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করেনি, কয়েকজনের প্রাণও খেয়েছে। তারপরও রক্ষা নেই। মানুষ নতুন করে আতঙ্কিত হয়ে পড়ছে, আবার বৃষ্টি বাড়বে। আর বৃষ্টি বাড়লে বন্যাও বাড়বে।

সুনামগঞ্জ শহরে ঢোকার ১৫ কিলোমিটার আগে শান্তিগঞ্জ উপজেলা। যেখানে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নানের বাড়ি। আজ মঙ্গলবার দুপুরের ফ্লাইটে তিনি সিলেটে আসবেন, সেখান থেকে শান্তিগঞ্জ যাবেন। তারপর দুদিন এলাকায় থেকে তিনি বন্যার ক্ষতচিহ্ন দেখবেন। এর আগে গতকাল এই সড়ক ধরে সুনামগঞ্জে যাওয়ার পথে দেখা গেল রাস্তার পাশে ত্রিপল টানিয়ে থাকছেন মানুষজন। বানের পানিতে ভিজে পচে যাওয়া ধান উঁচু এই সড়কজুড়ে রোদে শুকাচ্ছেন অনেকে। পচা ধানের গন্ধে এলাকায় থাকাই দুষ্কর হয়ে পড়েছে। জয়কলস ইউনিয়নের আস্তমা এলাকার বাসিন্দা নুরুজ্জামান বলেন, ১০০ মণ ধান ছিল। সব ধানই ভিজে পচে গেছে। তবু পচা ধান শুকিয়ে রাখছি, যদি কোনোভাবে কাজে লাগানো যায়।

সড়কজুড়ে ধানের এই পচা গন্ধ নাকে নিয়ে সুনামগঞ্জ শহরে ঢুকে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে গিয়ে দেখা গেল, সেখানকার দেয়ালগুলোয় এখনো বন্যার পানির দাগ লেগে আছে। কাজকর্ম খুব একটা নেই। কয়েকজন ঠিকাদার এসেছিলেন বিলের কাগজে সই করিয়ে নিতে। তারাও অনেকক্ষণ বসে রইলেন। অধিদপ্তরের প্রকৌশলী মাহবুব আলম বন্যার তাণ্ডবের কথা জানাতে গিয়ে বলেন, গত ১৬ ও ১৭ জুন আমরা পানিতে অবরুদ্ধ হয়েছিলাম। ১৬ জুন বিকালে অফিস থেকে বেরোনোর সময় ছিল কয়েক ইঞ্চি পানি। রাত ১০টার মধ্যে গলাসমান পানি হয়ে যায়। সেই পানি কমলেও এখনো জেলা সদর ঠিক হয়নি। অনেকটা স্থবির হয়ে আছে। জেলাসদরের সঙ্গে এখনো ছাতক, দোয়ারাবাজার, তাহিরপুর, জগন্নাথপুর, শাল্লা, বিশ্বম্ভরপুর, দিরাইয়ের যোগাযোগ শুরু হয়নি। এমন দুর্যোগ আগে কখনো দেখেননি জানিয়ে তিনি বলেন, বন্যার কারণে শহরের সবকিছু বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। দোকানপাটসহ সব প্রতিষ্ঠান তছনছ হয়ে গেছে। উঁচু এক জায়গায় খিঁচুড়ি রান্না হয়েছিল। সেই খিঁচুড়ি খেয়ে আমরা দুদিন কাটিয়েছি।

ওই অফিসের কর্মচারী রানু বেগম জানান, তার বাড়ি শহরের মল্লিকপুরে। পানির কারণে তারা এক সপ্তাহ অফিসের কনফারেন্স রুমে থেকেছেন। গত শনিবার তিনি বাড়ি ফিরলেও হাঁটুপানি ভেঙে ঘরে ঢুকতে হয়েছে।

শহরের হাসননগরের বাসিন্দা মো. আবু বক্কর ছিদ্দিক নিজের ঘরে ৩ ফুট পানি ছিল জানিয়ে বলেন, এক সপ্তাহ বিদ্যুৎ ছিল না। মোবাইলে নেটওয়ার্ক ছিল না। সব মিলিয়ে এক ভয়ঙ্কর অবস্থা ছিল। নিজের চোখে না দেখলে বিপর্যয়ের চিত্রগুলো কেউ বিশ্বাস করবে না বলেও জানান তিনি।

সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের একদিকে জেলা দায়রা জজ আদালত, অন্যদিকে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত। এক কোণে রেকর্ড রুম। কার্যালয়ের সামনের ফুলবাগানটিকে দেখে মনে হলো নানা জাতের ফুলের গাছগুলোকে কেউ যেন বাঁকা করে রেখে গেছে। পানি নেমে যাওয়ায় মাটি স্যাঁতসেঁতে হয়ে রয়েছে। দোতলায় উঠে জানা গেল, ত্রাণ বিলি করতে জেলা প্রশাসক ধর্মপাশা উপজেলায় গিয়েছেন।

পরে মোবাইল ফোনে জেলা প্রশাসকের সিএ শাহিনুর রহমানের সঙ্গে কথা হলে তিনি তারা বনানী পাড়ার বাসার বিবরণ দিয়ে বলেন, সেদিন আমাদের একতলার বাসার পুরোটাই পানিতে ডুবেছিল। দোতলায় আরেকজনের ঘরে উঠে জীবন বাঁচিয়েছি। ঘরের সব নষ্ট হয়ে গেছে। নতুন করে এখন এগুলো কিনতে হচ্ছে। বিপর্যয়ের পর বিপর্যয় কাটানো শাহীনুর বলেন, বিকাল থেকে পানি এলো, রাত থেকে বিদ্যুৎ গেল, এরপরে মোবাইলের নেটওয়ার্ক। একপর্যায়ে ট্যাংকের পানিও ফুরিয়ে এলো। বাধ্য হয়ে বন্যার পানিই আমরা ব্যবহার করলাম। সেই থেকে শহরটি এখনো স্থবির হয়ে আছে।

জেলা প্রশাসকের অফিস থেকে বেরিয়ে জেলা জজ আদালতে গিয়ে দেখা গেল, সবই সুনসান। কিছু মানুষ এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করলেও কোনো কাজ নেই। প্রাকৃতিক এই দুর্যোগে আদালতের কাজও প্রায় বন্ধ। এ সময় দোতলা থেকে এডভোকেট আব্দুল জলিলকে নিচে নেমে আসতে দেখা গেল। তিনি বলেন, কেউ হয়তো হাজতে আছেন, তার জামিন শুনানি প্রয়োজন- এই দুর্যোগে সেটা হচ্ছে। কেউ হয়তো নতুন মামলা করবেন- এই দুর্যোগে সেটাও হচ্ছে। এর বাইরে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বিচারকাজ বন্ধ আছে বলে জানান তিনি। নিজের বাড়িতেও পানি উঠেছিল জানিয়ে তিনি বলেন, যেখানে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, সেখানে মানুষ আদালতে আসবে কী করে?

আদালত বারান্দায় পান দোকান নিয়ে বসে আছেন শহরের তেঘরিয়ার বাসিন্দা সাইদুল ইসলাম। পান দোকানের পাশাপাশি তিনি আদালত এলাকায় তিনটি খাবারের ক্যান্টিনও চালাতেন। কিন্তু বানের পানি সব ভাসিয়ে নেয়ার পর সেই ক্যান্টিন এখনো চালু করতে পারেননি। কারণ নতুন করে পণ্য তুলে বেচাকেনা করার মতো টাকাপয়সা তার হাতে নেই।

আদালত চত্বর থেকে বের হতেই দেখা গেল, মুহুরি রঞ্জিত তালুকদার অনেকটা জোরে জোরে কারো সঙ্গে ফোনে কথা বলছেন। সেই ফোনে তিনি বলছেন, রেকর্ড রুমে এখনো পানি জমে আছে। তোমার কাগজ তুলতে পারিনি। কাছে গিয়ে পরিচয় দেয়ার পর তিনি বলেন, নতুন করে আর কী বলব, সবইতো শুনতে পেলেন। পাশে থাকা আরেকজন বলেন, ভয়ঙ্কর বন্যায় শহরের যে ক্ষতি হয়েছে, তা অফিসের ডেস্কে বসে তালিকা করা যাবে না। একটি ওয়েবসাইটে অটোমেশন করে সরাসরি নাগরিকদের কাছ থেকে ক্ষতির বিবরণ আনতে হবে। এতে হয়তো কিছু মানুষ ভুয়া তথ্য দেবে, তবু ক্ষতির পুরোপুরি একটি চিত্র পাওয়া যাবে বলে মনে করেন তিনি।

শুধু অফিসপাড়াই নয়, গতকাল দিনভর সুনামগঞ্জ জেলা শহরের নানা অলিগলি ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ বাড়ির নিত্যব্যবহার্য জিনিসপত্র পানিতে ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে। পানি নামার পর বন্যার্তরা ঘরে ফিরে সেই নষ্ট হওয়া জিনিসগুলো রাস্তার মোড়ে মোড়ে স্তূপ করে রেখে দিয়েছেন। পৌরসভার পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের বাড়িতে পানি ওঠায় তারাও কাজে আসছেন না। সব মিলিয়ে বন্যার পানিতে স্থবির হওয়া শহর যেন আরো অকার্যকর হয়ে আছে।

শহরের নতুনপাড়ার রাস্তায় ঢুকে দেখা গেল, পানিতে ভিজে যাওয়া তোশক, বালিশসহ আরো কিছু আসবাবপত্র ফেলে রাখা হয়েছে। এসব রাস্তায় কেন ফেলে রাখা হয়েছে জানতে চাইলে সেখানকার বাসিন্দা সোহেল আহমেদ বলেন, এই রাস্তা ধরে যত সামনে যাবেন, ততই এসব দেখবেন। পুরো শহরের যত বাড়ি আছে, তার বেশির ভাগ বাড়ির নিত্যব্যবহার্য জিনিস পানিতে ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে। সব কিছু আবার নতুন করে কিনতে হবে। নতুন পাড়ার রাস্তা পেরিয়ে শহীদ আবুল হোসেন সড়কে এসে প্রবীন্দ্র দাশকে পাওয়া গেল। গামছা পরিহিত প্রবীন্দ্র বলেন, পানি এসে ঘরের সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। এমনকি লুঙ্গিটাও নিয়ে গেছে। টাকা না থাকায় নতুন করে কিনতে পারছি না। এখন গামছা পরেই থাকছি। একটু দূরেই সিরাজুল ইসলাম নিজের ভিজে যাওয়া তোশক রোদে শুকাচ্ছেন। তিনি বলেন, রোদে শুকিয়ে দেখি ব্যবহার করা যায় কিনা।

সেই রাস্তা পেরিয়ে দেখা গেল, হাজী মকবুল পুরকায়স্থ উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে এখনো পানি জমে আছে। ভবনের দ্বিতীয় তলার আশ্রয় কেন্দ্রে এখনো রয়ে গেছে কয়েকটি পরিবার। ত্রাণ হিসেবে তারা চিড়া-মুড়ি পেয়েছে বলে জানায়। সেখান থেকে সামনে আগালেই জেলা স্টেডিয়াম। সেটিও জলমগ্ন। পানি জমে আছে সুনামগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজ ক্যাম্পাসেও। কলেজ পেরিয়ে বাঁধনপাড়ায় এক বাড়িতে ঢুকে দেখা গেল, সুরম্য অট্টালিকার নিচতলায় বানের পানি ঢুকে সবকিছু ধ্বংস করে দিয়েছে। ঘরের খাটগুলোও আর ব্যবহার উপযোগী নেই।

বাঁধনপাড়া থেকে বেরিয়ে জামাইপাড়া হয়ে তেঘরিয়া হাসন রাজা মিউজিয়ামে গিয়ে দেখা গেল, সেটি বন্ধ আছে। কারণ জানতে চাইলে সেলিনা বেগম নামে এক কর্মী জানান, বানের পানি দেওয়ান হাসন রাজা মিউজিয়ামে ঢুকে বিভিন্ন দুষ্প্রাপ্য জিনিস নষ্ট করে ফেলেছে। এর মধ্যে রয়েছে- খড়ম, জুতা, লাঠিসহ নানা কিছু। সেলিনা বেগমের কথার রেশ ধরে মিউজিয়ামের সদর দরজার সামনে গিয়ে দেখা গেল, নানা ধরনের ছবির ফ্রেম ফেলে রাখা হয়েছে। ফ্রেমের ভেতরে থাকা ছবিগুলো নষ্ট করে দিয়েছে পানি। পাশেই একটি ভেজা ছবি পড়ে ছিল। হাতে তুলে দেখা গেল, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুলের সঙ্গে মরমী কবি দেওয়ান হাসন রাজার অমূল্য স্মৃতিটাও নষ্ট করে দিয়েছে বন্যার পানি।

মিউজিয়াম ঘুরে সিলেটের দিকে যাত্রা করতেই সামনে পড়ল সুনামগঞ্জ জেলা পুলিশ লাইন্স। প্রতিষ্ঠানটির মূল ফটকের সামনে জনাশতেক মানুষের ভিড় দেখে এগিয়ে যেতেই তারা ঘিরে ধরলেন। তাদের সবারই কথা, এক মুঠো ত্রাণ চাই। না খেয়ে আছেন। ভিড়ের এক ফাঁকে সন্তান কোলে পারুল বালা এবং বৃদ্ধ শামসুন্নাহার এসে বললেন, ‘গত কয়েকদিন ধরিয়া চিড়া-মুড়ি খাইয়া আছি। আমরারে একটু ভাত দেইন।’ কিন্তু এই সময়ে ভাত কোথা থেকে দেব? তবু তাদের আশ্বস্ত করে সিলেটের পথে পা বাড়াই আমরা দুই সংবাদকর্মী।

ডি- এইচএ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়