দেশে মাদকের আগ্রাসন : অভিযানের পাশাপাশি প্রয়োজন সামাজিক আন্দোলন

আগের সংবাদ

সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা : আর্থিক নিরাপত্তার শক্ত ভিত্তি

পরের সংবাদ

মাদকমুক্ত হোক যুবসমাজ

অধ্যাপক ড. অরূপরতন চৌধুরী

কলাম লেখক, চিকিৎসক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা; প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, মানস

প্রকাশিত: জুন ২৭, ২০২২ , ১২:৪৭ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জুন ২৭, ২০২২ , ১২:৪৭ পূর্বাহ্ণ

গতকাল পালিত হয়েছে বিশ্ব মাদকমুক্ত দিবস। জাতিসংঘের উদ্যোগে ১৯৮৯ সাল থেকে ২৬ জুনকে আন্তর্জাতিকভাবে মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচার রোধ দিবস হিসেবে পালন করা হয়। এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল ‘স্বাস্থ্য এবং মানবিক সংকটে মাদকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা।’ বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৭৫ লাখ মাদকাসক্ত রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। দেশে এত বিপুলসংখ্যক রোগীর জন্য নেই প্রয়োজনীয় হাসপাতাল বা নিরাময়কেন্দ্র। এদের চিকিৎসার জন্য দেশের ৪৪ জেলায় অনুমোদনপ্রাপ্ত মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্র আছে মোটে ৩৫১টি। এর মধ্যে শতাধিক ঢাকায়। অনুমোদনপ্রাপ্ত কেন্দ্রগুলোর মোট শয্যাসংখ্যা মাত্র ৪ হাজার ৭২৮টি। দেশের আরো একটি ভয়ংকর চিত্র হচ্ছে যে, ইয়াবা গ্রহণকারী ৮৫ শতাংশই তরুণ যুবসমাজ। যার ফলে এসব মাদকাসক্ত নানা ধরনের জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে; তার মধ্যে কিডনি, লিভার ছাড়াও মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কাজকর্ম নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। একটি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ইয়াবা সেবনকারীরা অল্প সময়ের মধ্যেই মানসিক বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন এবং যৌনশক্তি হারিয়ে ফেলেছেন চিরতরে। সূত্র জানায়, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন মাদক নিরাময়কেন্দ্রে প্রায় ১৫ হাজার মাদকাসক্ত রয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ৯ হাজার ইয়াবাসেবী। একটানা মাত্র দুই-আড়াই বছর ইয়াবা সেবনের ফলেই তারা মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। তাদের নার্ভগুলো সম্পূর্ণ বিকল হয়ে পড়েছে। ইতোমধ্যেই দেশে ইয়াবা আসক্তির সংখ্যা ৩০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে বলে ধারণা করছে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। বিভিন্ন সূত্র বলছে- দেশের তরুণ প্রজন্মের এক-চতুর্থাংশই কোনো না কোনো ধরনের নেশায় আসক্ত। বস্তি কিংবা রাজপথে দেখা যায় ছিন্নমূল শিশু-কিশোররা জুতা তৈরির গাম দিয়ে নিয়মিত নেশা করে।
বাংলাদেশ মাদক উৎপাদনকারী দেশ না হয়েও ভৌগোলিক কারণে মাদকের বড় ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এশিয়ার গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল, গোল্ডেন ক্রিসেন্ট ও গোল্ডেন ওয়েজ নামে পরিচিত মাদক চোরাচালানের তিনটি প্রধান অঞ্চলের কেন্দ্রে বাংলাদেশের অবস্থান। তাই আন্তর্জাতিক মাদক কারবারিরাও বাংলাদেশকে ট্রানজিট হিসেবে সহজে ব্যবহার করতে পারছে। পরিসংখ্যানে জানা যায় দেশে গত তিন বছরে নারী ও শিশু মাদকাসক্ত বেড়েছে তিন গুণ। অপরিকল্পিত গর্ভপাতসহ বিভিন্ন কারণে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছেন নারীরা। উচ্চবিত্ত পরিবারের নারীদের মধ্যে এ নিয়ে চিকিৎসা নেয়ার প্রবণতা বাড়লেও, মধ্য ও নিম্নবিত্তের মধ্যে তা বাড়েনি। সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপে এখনো অধিকাংশ মাদকাসক্ত নারী চিকিৎসার বাইরে। মাদকাসক্তদের মধ্যে ৫ শতাংশ নারী। তাদের বয়স ১৫-৩৫ বছরের মধ্যে। নারী মাদকাসক্তদের ৪৩ শতাংশই ইয়াবাসেবী।
একটি অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রতি ১৭ জনে একজন তরুণ মাদকাসক্ত। জাতিসংঘের মাদক নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ইউএনও-ডিসির তথ্যমতে, বাংলাদেশে মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের প্রতি দশজনে একজন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসে। এই সত্য ধরে নিলে ৭৫ লাখে রোগীর সংখ্যা দাঁড়ায় ৭ লাখ ৫০ হাজার। কিন্তু চারটি সরকারি নিরাময়কেন্দ্র এবং ২০৯টি বেসরকারি নিরাময়কেন্দ্র মিলে চিকিৎসার সুবিধা আছে পাঁচ হাজারের মতো। বাকি মাদকাসক্ত ব্যক্তিরা থাকছে চিকিৎসাসেবার বাইরে।
বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে মাদকের বিরুদ্ধে গত দুই বছরেরও বেশি সময় থেকে অভিযান পরিচালনা করছে। প্রধানমন্ত্রী মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছেন। এখন থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি চাকরিতে প্রবেশের আগে প্রার্থীদের ডোপ টেস্ট বা মাদক পরীক্ষা করা হবে। যাদের পজিটিভ হবে তারা অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। ইতোমধ্যে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৮ কার্যকর হয়েছে। এই আইনে মাদক ব্যবসায়ীদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
মাদকসক্তি একটি রোগ। মাদকাসক্তদের ঘৃণা বা অবহেলা না করে ভালোবাসা দিয়ে মাদকের কুফল সম্পর্কে নৈতিকভাবে সচেতন করে তুলতে হবে। নিরাময়কেন্দ্রে নিয়ে গিয়ে সম্পূর্ণ চিকিৎসা দিতে হবে। সে সুস্থ হয়ে আবার পরিবারে ফিরে আসবে। তাই পিতা-মাতার প্রতি অনুরোধ আপনার সন্তানকে সময় দিন, অসৎ সঙ্গ থেকে দূরে রাখুন, ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা দিন। মাদকাসক্ত হলে তাকে লুকিয়ে রাখবেন না, ঘৃণা করবেন না বরং তাকে ভালোবাসা দিয়ে বুঝিয়ে সুপথে ফিরিয়ে আনুন। প্রয়োজনে মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্রে নিয়ে যান, তাকে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা দিন। মাদকাসক্তরা সমাজের এই পরিস্থিতির শিকার। তাদের পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসার ব্যবস্থা করলে তারা সমাজের বোঝা না হয়ে বরং সুস্থ হয়ে পরিবারে ফিরে আসবে। তারাই সমাজকে সঠিক পথে পরিচালিত করবে।

অধ্যাপক ড. অরূপরতন চৌধুরী : কলাম লেখক, চিকিৎসক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা; প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, মানস।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়