স্পর্ধায় মাথা তুলেছে পদ্মা সেতু ব্রাভো বাংলাদেশ

আগের সংবাদ

পদ্মা সেতু উদ্বোধন : নতুন অধ্যায়ে বাংলাদেশ

পরের সংবাদ

স্বপ্নের পদ্মা সেতু : নতুন এক বাংলাদেশের অভ্যুদয়

আহমেদ আমিনুল ইসলাম

অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশিত: জুন ২৬, ২০২২ , ১:২৩ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জুন ২৬, ২০২২ , ১:২৩ পূর্বাহ্ণ

আজ থেকে নতুন এক বাংলাদেশের অভ্যুদয়। আজ থেকে নতুন এক বাংলাদেশে প্রবেশ করেছি আমরা। গতকাল ২৫ জুন উদ্বোধন হয়ে গেছে দেশবাসীর স্বপ্নের পদ্মা সেতু। প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা জাতির বহু আকাক্সিক্ষত পদ্মা সেতুর উদ্বোধন করেছেন। তার নেতৃত্বেই শেষ পর্যন্ত জাতির স্বপ্ন জয় সম্ভব হলো। আর এই স্বপ্ন জয়ের মধ্য দিয়ে ২৫ জুন বাংলাদেশের ইতিহাসে আরেকটি অনন্য উল্লেখযোগ্য দিন হিসেবে ঠাঁই করে নিল। নানা আলোচনা, সমালোচনা, নানা জনের নানা রকমের ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ আর উপহাসকে উপেক্ষা করে স্বপ্নের পদ্মা সেতু এখন বাস্তবতা- পদ্মার দুই তীরের জনপদ ও জনগণকে এক সুতায় গেঁথে নিয়ে এই সেতু বাঙালির অহংকারের প্রতীকে পরিণত, বাঙালির সাহস ও সক্ষমতার প্রতীকে পরিণত এক উজ্জ্বল বাস্তবতা। একটি বিরোধী পক্ষের নানা বলয়ের ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ আর উপহাসই শুধু নয়- গভীর ষড়যন্ত্র মোকাবিলার মধ্য দিয়ে ১৭ কোটি মানুষের স্বপ্ন ও আকাক্সক্ষার বাস্তবায়ন সম্ভব হলো।
আজ মানুষ সেতুর ওপর দিয়ে এপার থেকে ওপারে যাচ্ছে- ওপার থেকে এপারে আসছে! কিন্তু আমরা পদ্মা সেতুকে কেবল নদী পারাপারের সেতুমাত্র মনে করি না- আমরা মনে করি পদ্মা সেতু জননেত্রী শেখ হাসিনার স্বপ্ন ২০৪১ সালের মধ্যে ‘উন্নত ও সমৃদ্ধ’ রাষ্ট্রে পৌঁছানোরও সেতু! এই সেতু নির্মাণের সাফল্য ও সক্ষমতা আমাদের মনে যে উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছে তা একদিকে যেমন আমাদের স্বপ্নের বাস্তবায়ন অন্যদিকে তেমনি আবার নব নব স্বপ্ন এবং প্রেরণারও উৎস!
দেশে স্থিতিশীল অবস্থা বিরাজ করলে, সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বাধাগ্রস্ত না হলে দেশ যে এগিয়ে যায়- এগিয়ে যেতে পারে পদ্মা সেতুর সাফল্য তারই প্রমাণ। এক সময় দেশ-বিদেশের অনেকেই সন্দেহ করেছিলেন- বিভিন্নজন বিভিন্নভাবে পদ্মা সেতু প্রকল্পের নেতিবাচক এবং তির্যক সমালোচনাও কম করেননি! এমনকি উন্নয়ন অংশীদার অনেক দেশও আকারে-ইঙ্গিতে জননেত্রীকে এত বড় প্রকল্পের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে বলেছিলেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকন্যা তার নৈতিক সাহস, দৃঢ় মনোবল, রাজনৈতিক দূরদৃষ্টি ও মানুষের কল্যাণচিন্তা থেকে চুল পরিমাণ বিচ্যুত হননি। তার দৃঢ় নেতৃত্বেই পদ্মা সেতুর সফল ও বাস্তব পরিণতি। আজ প্রমত্ত নদীটির ওপর পদ্মা সেতুর সাফল্যে সেসব উন্নয়ন অংশীদার রাষ্ট্রগুলো নিজেদের ভ্রান্ত ধারণা নিজেরাই ভাঙার প্রয়াস খুঁজছেন। তাদের অভিব্যক্তিতে এখন বাংলাদেশের প্রতি সমীহের অন্ত নেই, সমীহের অন্ত নেই দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেত্রী শেখ হাসিনার সাহসিকতা এবং অদম্য নেতৃত্বের প্রতিও!
পদ্মা সেতু উদ্বোধনের প্রাক্কালে চীনা রাষ্ট্রদূত লি জিমিং ও সাংবাদিকদের মতবিনিময় প্রসঙ্গ উল্লেখ করা যেতে পারে। বিগত ১৮ জুন সাংবাদিকদের কোনো দেশের নামোল্লেখ না করে তিনি বলেছেন, ‘বিদেশি কিছু উন্নয়ন অংশীদার বিশ্বাসই করতে পারেনি যে, বাংলাদেশ সরকার নিজস্ব অর্থায়নে এ ধরনের একটি বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারবে। তা সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী সব সন্দেহ, চাপ ও অভিযোগের মুখে নিজেকে ইস্পাত কঠিন দৃঢ় রেখে বাংলাদেশের শতভাগ অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিলেন।’ তিনি আরো বলেন, ‘এরূপ সিদ্ধান্তের জন্য সরকারপ্রধানের পক্ষ থেকে দরকার ছিল অসীম সাহস ও দৃঢ় রাজনৈতিক দায়িত্ববোধ। এই সম্পর্কে ভাবতে গেলেই তিনটি শব্দ আমার মনে ভেসে ওঠে তা হলো- সাহস, সংকল্প ও সমৃদ্ধি।’ চীনা দূত লি জিমিংয়ের অনুরূপ উপলব্ধি আমরা সব সময়ই অনুভব করি। আমরা জানি জননেত্রীর সততা, ন্যায়নিষ্ঠা, দায়িত্ববোধ, কর্তব্যজ্ঞান এবং সর্বোপরি নৈতিক সাহস কতটা দৃঢ়! আর বিশ্বব্যাংকের অপমানের সমুচিত জবাব দিতে তিনি কতটা কৌশলী! সততা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন বলেই নিজস্ব তহবিলে তার পক্ষে এমন বড় একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের সংকল্প গ্রহণ সম্ভব হয়েছিল। তার সেই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের পরিণত ও পরিপক্ব ফল ভোগ শুরু করেছি আমরা- এ দেশের ১৭ কোটি মানুষ! চীনা দূত আরো বলেছেন, ‘বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি স্বপ্ন থেকে সেতুটি আজ বাস্তবে রূপ নিয়েছে। এখন থেকে কেউ সন্দেহ করতে পারবে না যে বাংলাদেশ পারে না।’ চীনা দূত তার বক্তব্যে এ প্রকল্পে তার দেশের একটি প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ত হওয়ায় তিনি গর্ববোধ করেন বলেও সাংবাদিকদের অবহিত করেন। এছাড়া তিনি বলেছেন, ‘পদ্মা সেতু কেবল দুই খণ্ড ভূমিকেই সংযুক্ত করবে না। বরং এটি আমাদের জনগণের হৃদয়কে সংযুক্ত করে অভিন্ন সমৃদ্ধি ও ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাবে। আমি বিশ্বাস করি, যাতায়াতের জন্য সেতুটি খুলে দেয়ার পর এটি থেকে বাংলাদেশের জনগণ উপকৃত হবে। এটি দক্ষিণ এশিয়ার যোগাযোগের ক্ষেত্রে অবদান রাখবে এবং চীন ও বাংলাদেশের ভ্রাতৃত্বের চিরবন্ধন হিসেবে কাজ করবে।’ তার এ পর্যবেক্ষণ নিশ্চয়ই আমাদের অনুপ্রাণিত করবে।
একই দিনে অর্থাৎ ১৮ জুন ঢাকার রুশ দূতাবাস এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রচার করে। সেখানে পদ্মা সেতুকে ‘প্রকৃত গেম চেঞ্জার’ হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়, ‘পদ্মা সেতু আঞ্চলিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ, সংযোগ, কর্মসংস্থান, পর্যটন ও অন্যান্য অনেক ক্ষেত্রে বহুমুখী সুযোগ সৃষ্টি করবে।’ একই বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়, ‘পদ্মা সেতু নির্মাণ একটি মাইলফলক অর্জন এবং এটি বাংলাদেশ সরকার ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শিতার কারণে সম্ভব হয়েছে।’ রুশ দূতাবাসের সেই সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলা হয়েছে, ‘নিসন্দেহে এটি জাতীয় জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে অনেকাংশে অবদান রাখবে এবং বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ব্যাপক উন্নয়নে সুবিধা সৃষ্টি করবে।’ এছাড়া বিজ্ঞপ্তিটিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের লালিত সোনার বাংলার স্বপ্ন আমাদের চোখের সামনে বাস্তবায়িত হচ্ছে।’ আমরা আমাদের স্বপ্ন ও বাস্তবতা সম্পর্কে সচেতন বটে- তবু পদ্মা সেতুর অপার সম্ভাবনা নিয়ে বিভিন্ন রাষ্ট্রের এমন ইতিবাচক মন্তব্য আমাদের উৎসাহিত করে।
আবার জাপানি রাষ্ট্রদূত ইতো নাওকো পদ্মা সেতুর সাফল্য সম্পর্কে সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘আমি নিশ্চিত যে, এটি (পদ্মা সেতু) অত্যন্ত ফলপ্রসূ ও সফল হবে। সুতরাং দ্বিতীয় পদ্মা সেতু হবে একটি বাস্তবতা। জাপান সরকার ও জাইকা সরকারের নির্মাণ প্রচেষ্টায় অংশগ্রহণের সম্ভাবনা বিবেচনার অবস্থানে থাকবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশে মানসম্মত অবকাঠামো নির্মাণ কাজে অংশগ্রহণের সম্ভাবনা থাকলে টোকিও ভালো প্রযুক্তি দিতে প্রস্তুত রয়েছে। জাপান এ পর্যন্ত বাংলাদেশে ছোট ও বড় ১৩৪টি সেতু নির্মাণে সহযোগিতা করেছে।’ আমরা ভালো করেই বুঝতে পারি যে, স্বপ্নের পদ্মা সেতুর সাফল্যই দ্বিতীয় পদ্মা সেতু এখন সময়ের দাবি। এ বিষয়ে জাপানের আগ্রহও আমাদের ভালো লাগে। পদ্মা সেতু সফলভাবে নির্মাণ সম্পন্ন করায় জাপানি রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের সরকার ও জনগণকে জাপান সরকারের পক্ষ থেকে অভিনন্দন জানাতে গিয়ে বলেন, ‘এই পদ্মা সেতু হচ্ছে বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রায় একটি চমৎকার মাইলফলক। আর এটি বাংলাদেশের নিজস্ব উদ্যোগ ও অর্থায়নে নির্মাণ শেষ হয়েছে।’ ইতো নাওকো পদ্মা সেতুকে বাংলাদেশের স্বপ্ন ও গর্ব হিসেবে স্বীকার করেন। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার জন্য বাংলাদেশ যে কী করতে পারে এটি তার বড় প্রমাণ বলেও স্বীকার করেন। পদ্মা সেতু বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির আকাক্সক্ষাকেও পূরণ করবে বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন। বাংলাদেশের চলমান উন্নয়ন কর্যক্রমের অব্যাহত অগ্রগতি প্রসঙ্গে বলেছেন যে, এ মাসে পদ্মা সেতু এবং বছরের শেষের দিকে মেট্রোরেলসহ মানসম্মত স্থাপনাগুলো উদ্বোধনের জন্য ২০২২ সাল বাংলাদেশের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। রাষ্ট্রদূত তার বক্তব্যে আরো বলেছেন, ‘এটি সন্তোষজনক বিষয় যে, জাপান একটি সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় এই (পদ্মা সেতু) প্রকল্পের অংশ হতে পেরেছিল। এটা দুর্ভাগ্যজনক যে, জাইকা পদ্মা সেতুতে অর্থায়নে অংশীদার হতে পারেনি যদিও এতে জাপান সরকারের আগ্রহ ছিল।’ জাপানি দূত নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের সাহসী সিদ্ধান্তের জন্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভূয়সী প্রশংসা করেন। পদ্মা সেতুর সাফল্যদৃষ্টে বাংলাদেশের সক্ষমতারও প্রশংসা করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘রূপকল্প-২০৪১ এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশের উন্নয়নের যাত্রায় জাপান পাশে থাকবে।’ জাপানের এ অভিব্যক্তিও আমাদের আনন্দিত করে।
স্বপ্নের পদ্মা সেতুর সফল বাস্তবায়নে বিশ্বের অনেক দেশের দৃষ্টি এখন বাংলাদেশের দিকে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সৌদি আরব বাংলাদেশের প্রশংসায় পঞ্চমুখ, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মুগ্ধ। পদ্মা সেতু নির্মাণের সাফল্য অনেকটা যেন বিশ্বজয়েরই সাফল্য! নানামুখী কঠিনতম চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা ও প্রতিহত করে গতকাল উদ্বোধন হয়ে গেছে বিশ্ব সেরা প্রকৌশল ও প্রযুক্তির সমন্বয়ে নির্মিত বাঙালির স্বপ্নের পদ্মা সেতু।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আজ থেকে পদ্মা সেতুর ইতিবাচক প্রভাব শুরু হবে। আজ থেকেই নতুন এক বাংলাদেশের সূচনা। এই বাংলাদেশ শুধু অর্থনীতি নয় মানসিকতার দিক দিয়েও আমাদের শক্তিশালী এক মেরুদণ্ড অনুভব করতে শেখাবে। নতুন বাংলাদেশ ‘সোনার বাংলা’ বিনির্মাণে আমাদের প্রত্যয়ী করবে। আমরা যে কঠিন কাজও দক্ষতার সঙ্গে করতে পারি তা আজ বৈশ্বিক বাস্তবতা। এই বাস্তবতার রূপকার জননেত্রী শেখ হাসিনাকে সশ্রদ্ধ অভিনন্দন। জননেত্রী শেখ হাসিনার যুগোপযোগী ও সাহসী সিদ্ধান্ত গ্রহণের দূরদৃষ্টিসম্পন্ন প্রজ্ঞার কারণেই বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশ আজ অনন্য মর্যাদায় অভিষিক্ত হচ্ছে- অভিষিক্ত হচ্ছে অমিত গৌরবে!

আহমেদ আমিনুল ইসলাম : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়