আত্মমর্যাদার পদ্মা সেতু অগ্রগমনের দৃঢ় প্রত্যয়

আগের সংবাদ

পদ্মা বহুমুখী সেতু : আত্মমর্যাদা ও অর্থনীতির ভিত রচনার স্মারক

পরের সংবাদ

জাতীয় আত্মশক্তি ও বাঙালির জয়যাত্রার প্রতীক

হারুন হাবীব

মুক্তিযোদ্ধা, কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক

প্রকাশিত: জুন ২৫, ২০২২ , ১২:১০ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জুন ২৫, ২০২২ , ১২:১০ পূর্বাহ্ণ

পদ্মা সেতু সম্পর্কে মতামত দিতে গিয়ে কিছুদিন আগে লিখেছিলাম, প্রমত্তা পদ্মার এপার-ওপার যুক্ত করে দেশের অর্থায়নে সুবৃহৎ এই প্রকল্পের বাস্তবায়ন আমাদের জাতীয় আত্মশক্তি ও বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জয়যাত্রার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হবে। আজ ২৫ জুন ২০২২, মহাসমারোহে উদ্বোধন ঘটছে দেশের সর্ববৃহৎ, বহুলালোচিত এবং দীর্ঘতম এই সেতুর। একই সুরে আজো বলতে চাই যে, এই সেতু শুধু বাংলাদেশের গৌরবের ধন নয়, একই সঙ্গে বিস্তৃত ষড়যন্ত্র ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে সাহসে সামনে এগোবার কৃতিত্ব উদাহরণ। অতএব জাতীয় ইতিহাসের এই মহোৎসব ঘিরে কিছু কথা বলা সঙ্গত বিবেচনা করি।
দেশের সড়ক ও রেল যোগাযোগের বড় পরিবর্তন ঘটে বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতুর উদ্বোধনে, ১৯৯৮ সালের জুন মাসে। একজন সংবাদ পেশাজীবী হিসেবে টাঙ্গাইলের ভূয়াপুরে, সেদিনের অনুষ্ঠানে থাকার সুযোগ হয় আমার। প্রমত্তা যমুনার ওপর দিয়ে তৈরি প্রায় ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়ক ও রেল সেতুটি দেশের উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে ঢাকার যোগাযোগের বিপ্লব ঘটিয়েছে, উত্তরাঞ্চলের অবহেলিত অংশের জন্য আশীর্বাদ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে এবং উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক চিত্র বদল করছে। উপস্থিত অভ্যাগতরা সেদিন অবাক চোখে তাকিয়েছিলেন যমুনার ওপর তৈরি চোখ ধাঁধানো সুবিশাল স্থাপনার দিকে। এর ঠিক দুই যুগ পর সুবিশাল পদ্মার ওপর আরো বড় এবং আরো বিপুল অর্থ ও শ্রমসাধ্য আরেকটি রেল ও সড়ক সেতুর উদ্বোধন ঘটছে আজ, যা রাষ্ট্রীয় জীবনের আরেক বড় আশীর্বাদ। কারণ এই সেতু দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ২১টি জেলার সঙ্গে ঢাকার যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করবে স্বল্পতম সময়ে। বদলে দেবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ভাগ্য।
এই ক্ষুদ্র নিবন্ধে আমি পদ্মা সেতুর অসামান্য বা অত্যাধুনিক প্রযুক্তি দক্ষতা কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃত্তির সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে আলোচনায় যাব না। নদীর গভীরতা, নদী শাসন ও খরস্রোত বিবেচনায় এ ধরনের প্রযুক্তির ব্যবহার বিশ্বের আর কোথাও আগে হয়নি। হয়তো তাই। কিন্তু এসব বিবরণ দেয়া আমার কাজ নয়। এগুলো করবেন বিশেষজ্ঞ মহল। আমি কেবল এই সেতু কেন বাঙালির আত্মশক্তি ও জাতীয় জয়যাত্রার প্রতীক- কেন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আরেক পুনরুত্থান- তা নিয়ে কিঞ্চিৎ আলোকপাত করব।
প্রথমত, এই প্রথমবার এমন একটি সুবিশাল স্থাপনা দেশের নিজের অর্থে, অর্থাৎ ৩০১৯৩.৩৯ কোটি টাকা খরচ করে সেতু বানাবার সাফল্য দেখিয়েছে বাংলাদেশ। যে বাংলাদেশকে ‘তলাহীন ঝুড়ি’ বলে পশ্চিমা দুনিয়া তিরস্কার করেছে, যে বাংলাদেশকে যুগের পর যুগ বিদেশি ঋণ ও অনুদানের ওপর চলতে হয়েছে, সেই বাংলাদেশ ৩০ হাজার কোটি টাকার জোগান দিয়ে পদ্মা সেতু বানিয়েছে! বিষয়টা অনেকের কাছে অবিশ্বাস্য ঠেকলেও কাজটি করতে পেরেছে বাংলাদেশ এবং এই অসম্ভবকে জয় করা গেছে বলে জাতীয়ভাবে আত্মশ্লাঘার সুযোগ আছে।
দ্বিতীয়ত, প্রায় ৭ কিলোমিটার দীর্ঘ সেতু, এপার থেকে ওপারে দেখা যায় না। নিচে বহমান উত্তাল পদ্মা- এমনই ভয়ংকর যে, আমাজনের পর এটিই বিশ্বের দ্বিতীয় ক্ষরস্রোতা এবং গভীরতম নদী! কিন্তু শেখ হাসিনা ও তার সরকার সেতুটি বানাতে চায়। কারণ সেতুটি করা গেলে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ উপকৃত হবে, জাতীয় প্রবৃত্তির উন্নয়ন ঘটবে। অতএব মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক শক্তির সরকার ২০০৯ সালে আঁটঘাঁট বেঁধে মাঠে নামল। প্রাথমিক প্রস্তুতি সম্পন্ন হলো। কিন্তু বিশ্বব্যাংক বা মূল ঋণদাতা সংস্থার সহযোগিতা ছাড়া এমন একটি বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন একেবারেই সম্ভব নয়। এগিয়ে এলো বিশ্বব্যাংক, সঙ্গে এলো জাইকা, ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক। সবাই ভাবল এবার স্বপ্নের পদ্মা সেতু হবে।
কিন্তু গোল বাঁধল ঠিকাদার নিয়োগে। টাকা যেহেতু বিশ্বব্যাংকের, সেহেতু তার খবরদারি মেনেই ঠিকাদার দিতে হবে! কিন্তু সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা তা মানলেন না। অতএব প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ তুলল বিশ্বব্যাক। বিশ্বব্যাংকের দেশীয় সমর্থরা সোরগোল বাঁধাল। এক সময় প্রকল্প থেকে সরেও গেল বিশ্বব্যাংক। কেটে পড়ল অন্যান্য দাতা সংস্থাও। সরকারের জন্য চরম সংকট। না করা যাচ্ছে সরকারের মুখ রক্ষা, না পারছে বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ মানতে। থমকে গেল সরকার, বৈশ্বিক চাপ কমাতে যোগাযোগ মন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হলো, একজন শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তাকে জেলে যেতে হলো। কিন্তু শেখ হাসিনা দমলেন না। তিনি চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলেন। তিনি এক সাহসী সিদ্ধান্ত নিলেন। ২০১২ সালের ৯ জুলাই মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিলেন প্রধানমন্ত্রী। নানা মহলের ব্যঙ্গবিদ্রুপ উপেক্ষা করে ঘোষণা দিলেন, পদ্মা সেতু হবে এবং দেশের টাকাতেই হবে।
তৃতীয়ত, এমন একটি ঘোষণার পর থেকে প্রধানমন্ত্রী ও তার সরকার যে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করল তা ছিল সুবিশাল। দেশ ও বিদেশের বেশকিছু মহল থেকে শেখ হাসিনার ঘোষণাকে ‘অতিমাত্রায় আত্মপ্রত্যয়ী’ এবং ‘অবিমৃষ্যকারী’ সিদ্ধান্ত বলে গালমন্দ করা হলেও পদ্মা সেতুর কাজ থেমে থাকল না। শুধু তাই নয়, আগের নকশায় রেলপথ যুক্ত ছিল না কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ইচ্ছাতে রেলপথ যুক্ত করা হলো। জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া শুরু করা হলো। উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব সংশোধন করা হলো। সেতুর দৈর্ঘ্য বাড়ানো হলো।
অর্থাৎ বিশ্বব্যাংকের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে শেখ হাসিনা এক বড় যুদ্ধে নামলেন। সে যুদ্ধ কতটা বিপদ সংকুল, কতটা কষ্টকর ছিল তা কেবল সরকারপ্রধান এবং তার উপদেষ্টাগণ জানেন। যা হোক, নানা প্রতিবন্ধকতার পর পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হলো ২০১৪ সালে। ২০২২ সালের জুন মাসে নিজের অস্তিত্ব প্রকাশ করল বাংলাদেশের বৃহত্তম সেতু। এই স্থাপনার নির্মাণে জাতির আত্মপ্রত্যয় ও আত্মবিশ্বাসের জয় হয়েছে। প্রতিবন্ধকতার সব পাহাড় ডিঙিয়ে স্বপ্নের পদ্মা সেতু আজ দাঁড়িয়ে আছে। বাংলাদেশ স্বপ্ন ছুঁয়েছে।
পদ্মা সেতু সে কারণেই জাতীয় আত্মশক্তি ও বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জয়যাত্রার প্রতীক এবং অন্যায্য প্রতিবন্ধকতার বিরুদ্ধে সাহসে রুখে দাঁড়াবার প্রতীক হয়ে উঠেছে। শত বাধাবিপত্তি ডিঙিয়ে এই সেতুর নির্মাণ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সাহসী চেতনার পুনরুত্থান ঘটিয়েছে। এই অসাধ্য কাজটি সম্পাদন করার জন্য আমি বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার সরকার এবং সংশ্লিষ্ট সব মহলকে এই সফলতার জন্য অভিনন্দিত করছি।

হারুন হাবীব : মুক্তিযোদ্ধা, কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়