ইউক্রেনসহ তিন দেশের প্রার্থিতা অনুমোদনের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত ইইউয়ের

আগের সংবাদ

নিউজ ফ্ল্যাশ

পরের সংবাদ

পদ্মাকাহন: আমাদের স্বপ্ন সেতু

প্রকাশিত: জুন ২৪, ২০২২ , ১০:৪৪ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জুন ২৪, ২০২২ , ১০:৪৪ পূর্বাহ্ণ

‘গোল্ডেন গেইট ব্রিজ, সানফ্রানসিসকো। স্কুলের নিচের ক্লাসে বইয়ে এক ইংরেজি কবিতা পড়েছিলাম এ ব্রিজটিকে নিয়ে লেখা। বইয়ের এক পাতা, মাঝ বরাবর অর্ধেকে ব্রিজটির দম্ভপূর্ণ ছবি, ডান পাশে কবিতাটি ছাপা। স্কুল বয়সী এক শিশুর মনে আঁকিবুঁকি জিজ্ঞাসা- কোথায় আমেরিকা? কোথায় সানফ্রানসিসকো? কেমন সেটা?

৭৬ সালে ঢাকা এসেছি পরচিতি এক বড় ভাই বিমানে চাকুরি করতো। তখন বিমানবন্দর তেজগাঁও। একদিন তার কাছে যাই বিমানবন্দর দেখবো, সেইসঙ্গে বিমানে উঠা নামা। বড় ভাই ট্রানজিটে নিয়ে গেলেন, স্ন্যাকস করবে। খেতে খেতে পরচিয় এক আমেরিকান ট্রানজিট যাত্রীর সঙ্গে । আমাকে জিজ্ঞেস করলো কখনো আমেরিকা গিয়েছো? আমি বললাম না। তিনি বললেন আসবে এক সময়। আমি বললাম যাবো সানফ্রানসিসকো। তিনি বললেন কেন? আমি বললাম গোল্ডেন গেইট ব্রিজ দেখবো।

আইফেল টাওয়ার কি ফ্রান্সকে পরিচিতি দেয় নাকি ফ্রান্সকে আইফেল টাওয়ার? স্ট্যাচু অব লিবার্টি, টুইন টাওয়ার, পেট্রোনাস টাওয়ার এগুলো মডার্ণ মার্ভেল, তাদের দেশকে পরচিতি দেয়, তার শৌর্যবীর্য উৎকর্ষতার মহিমা ঊর্ধ্বে তুলে ধরে। প্রমত্তা পদ্মার বুকে দানবাকৃতি সেতু হবে, পদ্মা দুপারের মানুষকে একাকার করবে, দেশকে বিভাজিত ব-দ্বীপের বিভক্তি থেকে পরিত্রাণ দিবে, সম্ভব? ভেবেছে কি কেউ?

আশির দশকে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আমি দক্ষিণের জেলা গোপালগঞ্জ থেকে ঢাকায় আসতাম তখন যাওয়া আসার সবচেয়ে ভালো সময় ছিলো বর্ষাকাল। আমরা সকাল ১১ টার দিকে সহপাঠী সিমিয়র জুনিয়র মিলে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ২০/২৫ জনের একটি দল হৈ হৈ করে লঞ্চে উঠতাম। সন্ধ্যা র্পযন্ত তুমুল আড্ডা, লঞ্চের আপার ক্লাস, সামনে পেছনে। কেউ কেউ তাস নিয়ে বসে যেতো। তারপর রাত নেমে আসলে নদীর ঠান্ডা বাতাস খেতে খেতে ঘুম এসে যেতো। লঞ্চে রান্না খুব সুস্বাদু ছিলো, নাকি বাড়ন্ত বয়সের দুর্নিবার ক্ষুধা, যে কারণেই হোক খাবার খুব মজা ছিলো।

খেয়েই ঘুম। সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রথমে জিজ্ঞাসা করতাম মুন্সিগঞ্জের কাঠপট্টির কাছাকাছি পৌঁছলাম কিনা। কাঠপট্টির কাছাকাছি পৌঁছলেই সেখান থেকে সদরঘাট ৩০/৪০ মিনিটের দূরত্ব। আর সদরঘাট মানেই তখন ঢাকা। প্রায় এক দিনের যাত্রা, তাও বলছি তখনকার সময় ঢাকা যাওয়ার সবচেয়ে ভালো যোগাযোগ ছিলো বর্ষাকাল।

শীতকালে বিশ্ববিদ্যালয় ছুটিতে বাড়ি গেলে ঢাকা আসা যাওয়ার ছিল ভিন্ন এক সংগ্রাম এ অন্য এক অভিযাত্রা। আমার মফস্বল শহর। শহরের সবাইকে চিনি। সব রিক্সাওয়ালা পরিচিত। বিকালে কাউকে বলে রাখতাম ঢাকা যাবো। রিক্সাওয়ালা ভোর রাতে এসে ডেকে তুলতো। রেডি হয়ে রিক্সায় করে ৮/১০ কিলো মিটার দূরে হরিদাসপুর লঞ্চ ঘাটে যেতাম। তারপর ভোর ছয়টায় ছোট এক তলা লঞ্চে করে ৫/৬ ঘন্টায় পৌঁছাতাম টেকেরহাট। রোড সাইডে চায়ের দোকানে অপেক্ষ। তখন মাওয়ায় কোন ফেরিঘাট ছিলনা। ১২টা ৩০ মিনিটের দিকে বরিশাল-ফরিদপুর রুটে চলাচলকারী বিআরটিসি বাসে করে ফরিদপুর গোয়ালচামট বাস স্ট্যান্ড। তারপর আবার লোকাল বাস অথবা বেবি টেক্সি করে দৌলতদিয়া ফেরিঘাট। বললাম যতো সহজে সেটা তত সহজ ছিলোনা। পথে টেকেরহাট ফেরি, দিকনগর ফেরি, দৌলতদিয়া ঘাটের আগেও গোয়ালন্দ ফেরি। দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে পৌঁছাতে পৌঁছাতে পড়ন্ত বিকালে। সেখানে পৌঁছে আগে ঘাটের সেইসব বিখ্যাত হোটেলে লাঞ্চ। তারপর লাঞ্চ করে পদ্মা পার হয়ে আরিচা ঘাটে আসতে আসতে সন্ধ্যা। তারপর মুড়ির টিন বাসে করে গাবতলী। সেখান থেকে রিক্সায় মিরপুর রোড ধরে যখন আমার প্রিয় জহুরুল হক হলে পৌঁছেছি তখন রাত ৮ টা কিংবা ৯ টা । সমস্ত শরীর, ট্রাভেল ব্যাগ ধুলোয় ধুসরিত। পুরু শরীরে ধুলোবালির আস্তরণ। মাওয়া ঘাটের বয়স খুব বেশী নয়। স্বপ্ন সেতু চালু হচ্ছে। ঘাপটি হয়তো বন্ধ হয়ে যাবে। এখানে পারাপারের অপক্ষোয় এ্যাম্বুলেন্সে মৃত্যু হবেনা কারো আর।

সহজ করে বলি। এই কয়দিন আগেও মিডিয়াতে মেলা হই চই। ঢাকায় সবজির দাম বেড়েছে। বেগুন কেজি ৬০ টাকা। সেইদিন সকালে দক্ষিণে কৃষক বেগুন বেচেছেন কেজি ১৭ টাকা। ২৫শে জুনের পর তাকে অত্যন্ত ১৭ টাকায় আর বেগুন বেচতে হবেনা যখন ঢাকায় সেটির দর ৬০ টাকা। যোগাযোগ মানে চলাচল। আর চলাচল মানেই আর্থিক সমৃদ্ধি। পুরো দক্ষিণাঞ্চল জুড়ে শিল্পায়ন হবে, নগরায়নের গতি বৃদ্ধি পাবে, ব্যবসা বাড়বে, নতুন করে র্কমসংস্থান হবে কোটি মানুষের। মেগা প্রকল্পগুলো দক্ষিণাঞ্চলের চেহারা পাল্টে দেবে।

বঙ্গবন্ধু স্টিমারে করে বাড়ি যেতেন। সড়ক যোগাযোগ সে সময় তেমন ছিলোনা বললেই চলে। সেইজন্য আমার এলাকার মানুষ মামলা মোকাদ্দমা, জমি জমার রেকর্ড সংক্রান্ত দেন দরবারের বিষয় ছাড়া তাদের সে সময়কার জেলা শহর ফরিদপুর মুখো হতো না। খুলনা নৌ পথ সহজ ছিলো। শিক্ষা, ব্যবসা, চাকুরী এজন্য সবাই খুলনা পছন্দ করতো। এজন্য খুলনা শহরে আমাদের এলাকার মানুষের চোখে পড়ার মতো উপস্থিতি এখনো রয়েছে।

পদ্মা সতেু চালু হলে বর্ষায় দিগন্ত ছোয়া অপর পারের উদ্দেশ্যে ‘বদর’ ‘বদর’ বলে ব্যাপারীর নৌকা এখন আর পাড়ি খুব একটা দেবে না। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়রে অমর সৃষ্টি কুবের, কপিলা চরিত্রগুলো আমাদের অগ্রযাত্রার আবাহনে বিস্মৃত ও ধোয়াঁশা হয়ে ইতিহাসের আরো গভীরে প্রোথিত হবে। কিন্তু সেইসাথে সংগ্রামী কুবেরদের বঞ্চনা, শোক ও লাঞ্চনাও জাদুঘরমুখী হবে।

মিষ্টি পাগল বাঙালি। আমাদের দেশে জন্ম হলে মিষ্টি, পরীক্ষায় পাশ করলে মিষ্টি, বিয়ে হলে মিষ্টি, মৃত্যু হলে মিলাদের মিষ্টি, পরীক্ষায় ফেল করলেও মিষ্টি আছে- দোয়া অনুষ্ঠানের মিষ্টি, যাতে ভবিষ্যতে পাশ করা যায়। ভালো খবরে মিষ্টি, বাজী ধরে মিষ্টি, উৎসব, পালা পার্বনেও মিষ্টি।

আগামীকাল স্বপ্ন সেতুর যাত্রা শুরু। সারাদেশে উৎসবের আমেজ। ঈর্ষা এক মারাত্মক মানবীয় দুরাচার। এক শ্রেণীর বাঙালির মধ্যে সেটা অনেক প্রকট। তাই উৎসবের মিষ্টি মেজাজ দেখে ক্ষিপ্ত ও ঈর্ষা তাড়িত হয়ে তেতোর ফেরীওয়ালারা নোটিশ দিয়েই হাজির হয়েছেনে। আপনার তেতো আপনিই গেলেন। আমাদের শোনার দেখার সময় নাই। এ পর্যন্ত এ সেতু নিয়ে আমাদের দেশীয় কুশীলবরা তাদের আঞ্চলিক ও আর্ন্তজাতিক সাঙ্গ-পাঙ্গোদের নিয়ে যতো ভানুমতির খেল দেখানোর চেষ্টা করেছেন তাতে করে দুর্দমনীয় বাঙালির, এ দেশের মানুষের কিছু আসে যায় না।

আমি নিশ্চিত এগুলো নিয়ে ভবিষ্যতে মানুষের তেমন আগ্রহ না থাকলেও পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম খরস্রোতা নদীতে একটি উদীয়মান জাতির সাহসী নেতৃত্ব কিভাবে লক্ষ্যতে স্থির থেকে এই অনন্য ইঞ্জিনিয়ারিং মার্ভেল বিনির্মাণে রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিয়েছেন, প্রকৌশলীরা পলি বাহিত চঞ্চলা অস্থির প্রমত্তা পদ্মার বুকে এক সুবিশাল সেতু নির্মাণ করেছেন এবং তার নির্মাণ প্রয়াসের বাঁকে কতো বিস্ময়, চমক ও চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করেছে এবং প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী ও নির্মাণ কর্মীরা কিভাবে সেগুলো সমাধান করেছেন সেগুলো গবেষণার খোরাক হবে।

বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্য দুই দার্শনিক নীতিকে চিহ্নিত করেছেন। ‘‘ক্ষুধা ও দারিদ্র মুক্ত দেশ ও আত্মর্মযাদাশীল জাতি গঠনের স্বপ্ন”।জাতির পিতা এ দেশে মাত্র সাড়ে তিন বছরের জন্য রাষ্ট্র পরিচালনায় ছিলেন। এ ক্ষুদ্র সময়ে তিনি তাঁর লক্ষ্য অর্জনের শুভযাত্রা শুরু করেছিলেন। দেশের সাম্প্রতিকতম অর্থনেতিক অগ্রায়নের কারণে ক্ষুধা পরাজিতের পথে।

আর্ন্তজাতিক মঞ্চে যুক্তরাষ্ট্র এই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরেই গ্লোবাল পাওয়ার হিসেবে আবির্ভূত হয়। তার প্রায় একশো বছরের মতো সময়ের আগে সানফ্রানসিসকো পোতাশ্রয়ের মূলে গোল্ডেন গেইট ব্রীজ নির্মিত হয়। সেটি ছিলো তাদের এক অর্জিত শৌর্যবীর্যের প্রতীক। ২৫শে জুন বৈশ্বিক মঞ্চে ‘‘আমার টাকায় আমার সেতু/ বাংলাদেশের পদ্মা সেতু” শুভ উদ্ভোধনের মাধ্যমে আত্মর্মযাদাশীল জাতি হিসেবে আমাদের নবযাত্রা শুরু হচ্ছে – মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনি থাকছেন সেই নবযাত্রার হুইসেল ব্লোয়ার।

লেখক : ড. বেনজীর আহমেদ বিপিএম (বার), ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ, বাংলাদেশ।

এসএইচ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়