ই-গেটে এনালগ ভিসা চেকিংয়ে মিলছে না পূর্ণাঙ্গ সুবিধা

আগের সংবাদ

আবারও কি মা হচ্ছেন আনুশকা শর্মা!

পরের সংবাদ

নামেই বেড়েছে সামাজিক সুরক্ষা বাজেট

প্রকাশিত: জুন ১৬, ২০২২ , ৯:১৪ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জুন ১৬, ২০২২ , ৯:১৪ পূর্বাহ্ণ

সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সহায়তায় সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির একজন সুবিধাভোগী বরিশালের উজিরপুর উপজেলার মিনা বেগম। বয়স্ক ভাতার আওতায় ২০১৬-১৭ অর্থবছরে মিনা বেগমের মাসিক ভাতা ১৮০ টাকা থেকে বেড়ে ৫০০ টাকা হয়েছে। এর মধ্যে তার বয়স বেড়েছে, জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে। কিন্তু সাত বছরেও বাড়েনি ভাতার পরিমাণ। মিনা বেগম জানান, স্বামীর মৃত্যুর পর কষ্টে দিনাতিপাত করছেন তিনি। এর মধ্যে পড়ে গিয়ে হাত ও পা ভেঙে অনেকটা অচল হয়ে আছেন তিনি। ছেলে-মেয়ে বিয়ে করে যার যার সংসার নিয়ে ব্যস্ত। পঙ্গুত্বের পাশাপাশি এখন শরীরে নানা রোগ বাসা বেঁধেছে। এজন্য প্রতি মাসে ওষুধ কিনতেই সরকারি ভাতার পুরো ৫০০ টাকা ব্যয় হয়।

২০০৯ সালে দিনবদলের সনদ বাস্তবায়নের মাধ্যমে দারিদ্র্যের হার কমানোর লক্ষ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করে আওয়ামী লীগ সরকার। এর অংশ হিসেবে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় বিভিন্ন ধরনের সুবিধা দেয়ার কর্মসূচি হাতে নেয় বর্তমান সরকার। গত ১৪ বছরে আওয়ামী লীগ সরকারের দেয়া সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা জনগণের হৃদয়ে দাগ কেটেছে। তবে প্রতি বছর কাগজে-কলমে সামাজিক সুরক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়লেও প্রকৃতপক্ষে বরাদ্দ কমে যায়। এবারের বাজেটেও তা ঘটেছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী খাতে ১ লাখ ১৩ হাজার ৫৭৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা বাজেটের ১৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ ও জিডিপির ২ দশমিক ৫৫ শতাংশ। ২০২১-২২ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ১ লাখ ৭ হাজার ৬১৪ কোটি টাকা। এ হিসাবে বরাদ্দ বেড়েছে ৫ হাজার ৯৬২ কোটি টাকা। কিন্তু এর মধ্যে শুধু পেনশনের বরাদ্দ বেড়েছে ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। বাস্তবে এ খাতে বরাদ্দ কমেছে ৩ হাজার কোটি টাকা। এক কথায় সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর জন্য প্রস্তাবিত সামগ্রিক বরাদ্দ ২ শতাংশ বেড়েছে, সে তুলনায় পেনশনভোগীদের জন্য বরাদ্দ বেড়েছে ২১ দশমিক ৪৮ শতাংশ।

উন্নয়ন সমন্বয়ের সভাপতি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান বলেন, ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হলেও চলতি বাজেটের তুলনায় তা ২ শতাংশ কম। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এ খাতে বরাদ্দ আরো বাড়ানো দরকার।

তিনি বলেন, দ্রব্যমূল্যের চাপে থাকা মানুষের সামাজিক সুরক্ষার চাহিদার প্রেক্ষাপটে এ বরাদ্দ অবাক করেছে। বিশেষ করে খোলাবাজারের (ওএমএস) বরাদ্দ ২২৩ কোটি টাকা কমে যাওয়া ও হতদরিদ্রদের জন্য কর্মসৃজন কর্মসূচির বরাদ্দ ৯৫ কোটি টাকা কমে যাওয়া সময়ের প্রেক্ষাপটে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। অতিদরিদ্রদের জন্য ১০ টাকা কেজির চাল ১৫ টাকার প্রস্তাব করাও সঠিক হয়নি।

দেশে সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী খাতের আওতায় ১২৩টি কর্মসূচি রয়েছে। এগুলো বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করছে ২৪টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ।

দেখা গেছে, ৭ বছর ধরে ৫৭ লাখ বয়স্ক এবং বিধবা বর্তমানে প্রতি মাসে ৫০০ টাকা ভাতা পাচ্ছেন। তাদের ভাতার পরিমাণও বাড়ছে না। প্রস্তাবিত বাজেটে প্রতিবন্ধীদের ভাতা ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮৫০ টাকা করা হলেও অন্য কোনো ভাতা বাড়ানো হয়নি। একই সঙ্গে ৩ লাখ ৬৫ হাজার নতুন প্রতিবন্ধীকে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচির আওতায় ২ দশমিক শূণ্য ৯ লাখ উপকারভোগী যুক্ত করা হয়েছে। বাজেটের সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ ২ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে ২ দশমিক ৩ শতাংশে নেমেছে। এ বরাদ্দ কমার বিষয়টা কল্যাণমূলক অবস্থান থেকে সরকারের সরে আসার শামিল বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রান্তিক ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির খাদ্যের ৫০ শতাংশই চাল। ব্যয়ের বড় অংশই খাদ্যে যায়। মূল্যস্ফীতি দেখা দিলে মানুষ খাদ্যে কাটছাঁট করবে। ফলে পুষ্টিকর খাবার কমে যাবে। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলো বর্তমান পরিস্থিতির চাহিদার আলোকে হয়নি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

অর্থ বিভাগ বলছে, ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেটের ৩ লাখ ৮৮ হাজার ৫২৭ কোটি টাকাই ব্যয় হবে দারিদ্র্য বিমোচনে। এ হিসাবে দারিদ্র্য বিমোচনে ব্যয় হচ্ছে ঘোষিত বাজেটের ৫৭ শতাংশ। সরকারের ৬২টি মন্ত্রণালয় বিভাগ ও সংস্থার মধ্যে সেতু বিভাগের ৯ হাজার ২৯৭ কোটি টাকা বরাদ্দের মধ্যে সর্বোচ্চ ৯৬ দশমিক ৯৩ শতাংশ দারিদ্র্য বিমোচনে ব্যয় দেখানো হচ্ছে। সেতু, টানেল, ফ্লাইওভার, এক্সপ্রেসওয়ে, সাবওয়ের মতো অবকাঠামো নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে সমন্বিত পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করে আর্থসামাজিক উন্নয়নে কাজ করে থাকে সেতু বিভাগ। এ বিভাগের ৯ হাজার ২৯৭ কোটি টাকা বরাদ্দের ৮ হাজার ৯৯৫.৪২ কোটি টাকাই ব্যয় হবে ৯টি প্রকল্প বাস্তবায়নে।

মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামো অনুসারে, রেল মন্ত্রণালয়ের জন্য প্রস্তাবিত ১৮ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা বরাদ্দের ৮৭ দশমিক শূণ্য ৩ শতাংশই সরাসরি দারিদ্র্য বিমোচনে ভূমিকা রাখবে। সব মিলে মন্ত্রণালয়টির জন্য প্রস্তাবিত বরাদ্দের ১৭ হাজার ৬৫ কোটি টাকাই দেখানো হচ্ছে দারিদ্র্য বিমোচনে। অথচ রেলের টিকেটে দরিদ্রদের জন্য আলাদা কোনো কোটা নেই। অনলাইনে আন্তঃনগর ট্রেনের অর্ধেক টিকেট বিক্রি হওয়ায় দরিদ্রদের টিকেট পাওয়ার সুযোগও কমেছে।

উন্নয়ন প্রকল্পে নজরদারি ও বাস্তবায়নের মান পরিবীক্ষণে নিয়োজিত বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) এ ব্যয়ের প্রায় ৩১ শতাংশ দারিদ্র্য বিমোচনে দেখিয়েছে। বিসিক, বিটাকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে ব্যাপক কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা শিল্প মন্ত্রণালয়ের ব্যয়ের অর্ধেক ধরা হচ্ছে দারিদ্র্য বিমোচনে।

অন্যদিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দের ৭২ দশমিক ২৪ শতাংশ দারিদ্র্য বিমোচনে ব্যয় হবে। আবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্যয়ের ৪০ শতাংশই দারিদ্র্য বিমোচনে যাচ্ছে। তবে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) বরাদ্দে দারিদ্র্য বিমোচনে অবদান দেখানো হচ্ছে মাত্র ১ দশমিক ৮৫ শতাংশ।

এ বিষয়ে সিপিডির সম্মানীয় ফেলো প্রফেসর ড. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, যে কোনো খাতে সরকারের ব্যয় বাড়লে অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধির মাধ্যমে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ে। এ হিসাবে সরকারি ব্যয়ের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে দারিদ্র্য বিমোচন হচ্ছে।

তিনি বলেন, সরকারি বরাদ্দের যে অংশটা সরাসরি দরিদ্রদের হাতে যাবে; ঠিক ততটুকুই দারিদ্র্য বিমোচনে অবদান রাখবে। সেটা সামাজিক নিরাপত্তার মাধ্যমে পণ্য সহায়তা বা নগদ হস্তান্তরের মাধ্যমে হতে পারে।

তিনি আরো বলেন, বাজেটের কতটা দারিদ্র্য বিমোচনে ভূমিকা রাখছে, তার একটা সঠিক হিসাব দরকার। গড়পড়তা প্রতিবেদন তৈরি না করে প্রকৃত হিসাব বের করতে পারলে ভবিষ্যতে সরকারের দারিদ্র্য বিমোচন নীতিমালা আরো সুদৃঢ় হবে।

সানেমের গবেষণা পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক ড. সায়মা হক বিদিশা বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাস্তবতায় যেখানে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো দরকার ছিল, সেখানে এবারের প্রস্তাবিত বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে প্রকৃত বরাদ্দ কমেছে। এটি সরকারের ঘোষিত নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সরকারের অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, সামাজিক নিরাপত্তা খাতে জিডিপির ২ শতাংশ বরাদ্দ দেয়া হবে। কিন্তু এ বছর পেনশন, বৃত্তি ও সুদ বাদে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে প্রকৃত বরাদ্দ এক শতাংশের মতো। এমনকি গত বছরের চেয়েও এবার বরাদ্দ কমানো হয়েছে।

তিনি বলেন, এখনকার বাস্তবতায় প্রয়োজন ছিল মাথাপিছু সামাজিক ভাতার বরাদ্দ বাড়ানো। একইসঙ্গে ওএমএসে বরাদ্দ বাড়ানো হোক। কিন্তু বাস্তবে এবার উল্টো ওএমএসে বরাদ্দ কমানো হয়েছে। তার পরামর্শ, সামাজিক নিরাপত্তা খাতের ওএমএসে বরাদ্দ যেন কোনোভাবেই কমানো না হয়; কারণ এটা অত্যন্ত জরুরি।

রি-এমএস/ইভূ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়