ভোক্তার সুফল কোন পথে

আগের সংবাদ

রাত ৮টায় দোকান বন্ধের সিদ্ধান্ত কতটা বাস্তবসম্মত

পরের সংবাদ

মালখানার অভাবে নষ্ট হচ্ছে মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামত

প্রকাশিত: জুন ১৩, ২০২২ , ৮:২৫ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জুন ১৩, ২০২২ , ৮:২৫ পূর্বাহ্ণ

** আলামত সংরক্ষণ আইনে পরিবর্তন আসছে : আইনমন্ত্রী ** কাজটা সোজা, উদ্যোগ নেয়া কঠিন : ড. শাহদীন মালিক ** আলামত সংরক্ষণ আদালতের দায়িত্ব : পুলিশ **

দেশের থানা ও আদালতের কোথাও পর্যাপ্ত মালখানা বা মামলার আলামত সুরক্ষিত রাখার পর্যাপ্ত জায়গা নেই। খোলা আকাশের নিচে অযত্ন অবহেলায় নষ্ট হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ সব মামলার আলামত। বিশেষ করে আলামত হিসেবে জব্দ করা গাড়ির শুধু বডি পড়ে থাকলেও ইঞ্জিনসহ সব যন্ত্রপাতি খোয়া যাচ্ছে বা চুরি হয়ে যাচ্ছে পুলিশ হেফাজত থেকেই। দীর্ঘ সময়েও মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় নিলাম ডেকে বিক্রি করা যাচ্ছে না জব্দ করা আলামত। অনেক যানবাহনের ভেতর গজিয়ে গেছে গাছ, উঠেছে আগাছা। রোদ-বৃষ্টির মধ্যে ধুলা-বালি পড়ে অযত্ন-অবহেলায় জং ধরে অকেজো হয়ে পড়েছে কয়েক শ যানবাহন। অথচ এসব আলামতের বাজারমূল্য কোটি কোটি টাকা, আবার মামলা বিবেচনায় আলামত হিসেবে এসবের গুরুত্ব অপরিসীম।

জানা গেছে, দেশে মোট থানা ৬৬৪টি। এর মধ্যে পুলিশের ৮টি রেঞ্জে ৫২৭টি, ৮টি মেট্রোপলিটনে ১১০টি, একটি হাইওয়ে থানা, দুটি নৌ-থানা, ২৪টি রেলওয়ে থানা আছে। এসব থানা নিজস্ব জমি ও স্থাপনার পাশাপাশি অনেক থানার কার্যক্রম চলছে ভাড়া করা বাড়িতে। থানাগুলোতে যে পরিমাণ জমি ও স্থাপনা রয়েছে তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল হওয়ায় মালখানা বা আলমত সংগ্রহে রাখার জায়গা একেবারেই অপর্যাপ্ত।

এ প্রসঙ্গে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়কমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, মামলার আলামত সংরক্ষণের জন্য আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আইন পরিবর্তনের কাজ চলছে। তিনি বলেন, এখন ডিজিটাল যুগ, আলামত হিসেবে কিছু জিনিস ভিডিও করে বা স্ট্রিল ছবি তুলে বা অন্যকোনোভাবে নমুনা রেখে বাকিগুলোর পরবর্তী কার্যক্রম সম্পন্ন করা যাবে। সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেন, ১০০ বছর আগে যখন আইন করা হয়েছিল তখন চুরি-ডাকাতি কম হতো, তখন বড় ধরনের আলামতের কথা চিন্তা করা হয়নি। এখন এর বিকল্প চিন্তা করা কঠিন কাজ নয়- উল্লেখ করে তিনি বলেন, জব্দকৃত আলামতের মধ্যে যানবাহনের ক্ষেত্রে সেগুলোর ভিডিও, স্টিল ছবি তুলে বা বিকল্প পদ্ধতি বের করলে বাস-ট্রাক আটকে রাখার দরকার থাকবে না। উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, খুনের মামলায় ভিকটিমের লাশ আলামত হিসেবে রাখা হয় না। মামলা প্রমাণে ময়নাতদন্ত রিপোর্ট কাজ করে। তাহলে বাস-ট্রাক কেন আটকে রাখা হয় বছরের পর বছর। এজন্য আইনে কিছু পরিবর্তন আনতে হবে জানিয়ে তিনি বলেন, কাজটা সোজা; কঠিন হচ্ছে উদ্যোগ নেয়া। প্রয়োজনীয় উদ্যোগের অভাবে ‘আলামত সমস্যা’ সমাধান হচ্ছে না বলে জানান তিনি।

পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি হাবিবুর রহমান বলেছেন, আলামত মূল্যবান জিনিস এবং ন্যায় বিচরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সারাদেশের কোথাও আলামত সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেই। আলামত কোর্টের সম্পদ- জানিয়ে তিনি বলেন, থানা এবং কোর্ট কোথাও আলামত সংরক্ষণের জায়গা নেই। আদালতের নির্দেশে পুলিশ কোনোভাবে এগুলো ম্যানেজ করার চেষ্টা করে আসছে। তিনি বলেন, চার্জশিটের সঙ্গে আলামত আদালতে চলে যাবে- এমন বিধান থাকলেও কার্যক্ষেত্রে তা হচ্ছে না। অপরাধের সঙ্গে গাড়ির যোগসূত্র থাকায় সব থানাতেই আলমত হিসেবে গাড়ির সংখ্যা বেশি। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও এই সমস্যা সমাধানের পথ খুঁজছেন জানিয়ে তিনি বলেন, এমনিতে অন্য ছোট আকৃতির আলামত পুলিশ সঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে পারে।

নরসিংদীর পুলিশ সুপার আশরাফুল আজিম বলেন, সব মামলার জব্দ তালিকা সঙ্গে সঙ্গে কোর্টে পাঠানো হয়। এরপর কোর্টের আদেশ বা সিদ্ধান্তে সবকিছু হয়। এক্ষেত্রে পুলিশের কোনো দায় থাকে না। তিনি বলেন, পর্যাপ্ত জায়গা না থাকার পরও আদালতের সম্পত্তি (আলামত) পুলিশ সংরক্ষণের জন্য সাধ্যমতো চেষ্টা করে। বছরের পর বছর পড়ে থাকায় আলামত নষ্ট হচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোর্টের আদেশ না পাওয়ায় আলামতের কোনো সুরাহা হয় না। জব্দ করার পর বা মামলার চার্জশিট দেয়ার সময় আদালতে আলামত উপস্থাপনের ব্যাপারে ফৌজদারি কার্যবিধিতে স্পষ্ট করে বলা আছে বলেও জানান তিনি। লালমনিরহাটের পুলিশ সুপার আবিদা সুলতানা বলেছেন, মামলার তদন্ত শেষে চার্জশিট হওয়ার পর সব আলামত আদালতের হেফাজতে যাওয়ার কথা। কিন্তু আদালতের আলামত সংরক্ষণের পর্যাপ্ত স্থান না থাকায় সেগুলো থানা বা পুলিশ লাইনে রাখা হয়। এজন্য নির্দিষ্ট বা সুরক্ষিত কোনো ব্যবস্থা না থাকায় সব আলামত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, জেলা প্রশাসককে আলামত সরিয়ে নিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে একাধিকবার বলা হলেও কোনো ব্যবস্থা হয়নি।

ঢাকা মহানগর ও বিভিন্ন জেলায় অবস্থিত বেশ কয়েকটি থানা ঘুরে আলামত ফেলে রাখার অভিন্ন চিত্র চোখে পড়েছে। সড়ক দুর্ঘটনা, চোরাই পণ্য, মাদকদ্রব্য বহনসহ বিভিন্ন অভিযোগে পুলিশ জব্দ করে মোটরসাইকেল, ট্রাক, বাস, প্রাইভেট কার, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, মাইক্রোবাস প্রভৃতি। জব্দ করার পর মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এসব যানবাহন অযত্নে পড়ে থাকে থানা চত্বরে। একপর্যায়ে এগুলো ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। মূলত ৩টি কারণে থানায় জব্দ যানবাহন নষ্ট হচ্ছে- গাড়ি ছাড়িয়ে নিতে মালিকের না আসা, আদালতের নির্দেশনা ছাড়া এসব যানবাহন নিলামে বিক্রি করতে না পারা এবং থানা কর্তৃপক্ষও জব্দ যানবাহন সম্পর্কে আদালতকে কিছু অবগত না করা। মালিক না আসায় যানবাহনগুলো বছরের পর বছর থানা চত্বরে পড়ে থাকলেও আইনি জটিলতায় বিক্রিও করা যায় না। মামলার আলামত হিসেবে এগুলো রাখতে হচ্ছে। অযতেœ খোলা জায়গায় পড়ে থাকা এসব যানবাহনের বেশির ভাগ চেনারও উপায় নেই। ডাম্পিং ও থানা চত্বরে কতসংখ্যক যানবাহন রয়েছে তারও সঠিক তথ্য নেই কর্তৃপক্ষের কাছে। তবে থানাভেদে কমবেশি ৩০ থেকে ৪০টা রয়েছে। এসব যানবাহনের দাম কয়েক’শ কোটি টাকা হবে বলে ধারণা কর্তৃপক্ষের। আদালতের নির্দেশনা না পাওয়ায় এসব যানবাহন নিলামে বিক্রিও করা যাচ্ছে না।

ডিএমপির রমনা, শাহবাগ, রামপুরা, ভাটারা, হাতিরঝিল, খিলগাঁও, যাত্রাবাড়ী ও খিলক্ষেত থানা ঘুরে দেখা গেছে, জব্দ করা এসব গাড়ি থানা চত্বরের বেশির ভাগ অংশ দখল করে রেখেছে। এ কারণে চলাচলের জায়গাও সংকুচিত। জব্দ করা এসব গাড়ি রাখার কোনো ছাউনি না থাকায় খোলা আকাশের নিচে সেগুলো নষ্ট হচ্ছে। ঢাকার পাশে ঢাকা জেলার সাভার, আশুলিয়া, ধামরাই, গাজীপুর জেলার শ্রীপুর থানার চিত্রও অভিন্ন।

একাধিক জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পুলিশের সাধারণ নিবন্ধন কর্মকর্তা (জিআরও) জানান, মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘ সূত্রিতার কারণে নিলাম হয় না। যুগ যুগ আলামত পড়ে থাকার নজিরও রয়েছে। তবে, আদালত চাইলে পড়ে থাকা গাড়িগুলো দ্রুত নিলামের ব্যবস্থা করতে পারেন। কিন্তু সেটা করা হচ্ছে না। থানা কর্তৃপক্ষ চাইলেও কিছু করার থাকে না। মামলার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত আমরা কিছু করতে পারি না। কারণ আলামত হিসেবে যানবাহনগুলো জব্দ করা হয়েছে। গাড়িগুলো নিলামে তোলা হলে বিক্রির টাকা সরকারি কোষাগারে জমা হবে। অনেক যানবাহন ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে মাটিতে দেবে যাচ্ছে। কিছু যানবাহনের যন্ত্রাংশ খুলে পড়ছে, চুরিও হয়ে যাচ্ছে। কোনো দুর্ঘটনায় পর মালিক যদি গাড়ি ফিরে পেতে চান তবে আদালতে আবেদন করেন। আবেদনের পর আদালত থানা পুলিশকে মালিকানার তথ্য যাচাই করে প্রতিবেদন দিতে বলেন। পুলিশ প্রতিবেদন দিলে জব্দ করা গাড়ি মালিককে ফেরত দেয়া যায় কিনা, সেই নির্দেশনা দেয়া হয়। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মালিক আদালতে আবেদন করেন না। আবার কোনো থানা এলাকায় জব্দ করা গাড়ি রাখার জায়গা না থাকলে থানা কর্তৃপক্ষ আদালতকে অবহিত করলে সেগুলো নিলামে বিক্রি কিংবা ধ্বংস করার নির্দেশনা দিতে পারেন। দেখা যাচ্ছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে থানা কর্তৃপক্ষ সেটি করছে না।

২০০৬ সাল পর্যন্ত জব্দ করা যানবাহনের ডাম্পিং স্টেশন ছিল শাহবাগ থানার আঙিনা। পরে সেটি বাতিল করা হয়। সম্প্রতি ওই থানার পেছনে গিয়ে দেখা গেছে, কয়েক হাজার গাড়ি পড়ে আছে। জায়গার অভাবে একটির ওপর রাখা হয়েছে আরেকটি প্রাইভেট কার। কোনটি কত বছর আগের তাও জানা নেই কর্তৃপক্ষের। থানা পুলিশ বলছে, কাগজপত্র না থাকলে কিংবা আদালতে মামলা থাকলে নিষ্পত্তির জটিলতায় বেশির ভাগ মালিক যোগাযোগ করেন না। ফলে আদালতের নির্দেশনা না আসায় মালিককে ফেরত দেয়া যায় না।

গাজীপুরের শ্রীপুর থানার অফিসার ইনচার্জ ইমাম হোসেন বলেছেন, জায়গা না থাকায় সব আলামত খোলা আকাশের নিচে রাখতে হয়। আদালতকে জানানো হলে মামলা নিষ্পত্তি হলে নিলাম করার কথা বলা হয়। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ এ এফ এম সায়েদ জানান, আলামত খোলা আকাশের নিচে রাখা হয়। আদালতে অনেক মামলা নিষ্পত্তি সাপেক্ষে গাড়ি মালিককে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে। আইনি প্রক্রিয়া মেনে আলামত কমানোর জন্য ঢাকা রেঞ্জ অফিস থেকেও তাগাদা দেয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি। ঢাকার শাহবাগ থানার অফিসার ইনচার্জ মওদুদ হাওলাদার বলেছেন, আদালতের নির্দেশ না পাওয়ায় আলামতের মালামালের কোনো সুরাহা করা যাচ্ছে না। রামপুরা থানায় এক যুগ আগের গাড়িও পড়ে আছে। এতদিনে যেগুলো একপ্রকার মূল্যহীন হয়ে পড়েছে। রামপুরা থানার অফিসার ইনচার্জ রফিকুল ইসলাম বলেছেন, জব্দ করা যানবাহনের বেশির ভাগের বৈধ কাগজপত্র নেই অথবা চোরাই। মামলার আলামত হিসেবে যানবাহনগুলো বছরের পর বছর থানা চত্বরে পড়ে থাকছে। এতে থানা চত্বর সংকুচিত হয়ে পড়ছে। যাত্রাবাড়ী থানার অফিসার ইনচার্জ মাজহারুল ইসলাম বলেছেন, দীর্ঘদিন পড়ে থেকে নষ্ট হলেও আমাদের কিছু করার নেই। গাড়িগুলো বিভিন্ন মামলার আলামত। আদালত নির্দেশনা না দিলে আমাদের কিছু করার নেই।

ডি- এইচএ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়