বাজার নিয়ন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার গুরুত্ব দিন

আগের সংবাদ

যে কারণে হঠাৎ উত্তাল রাজনীতি

পরের সংবাদ

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন কি সংশোধন হচ্ছে

প্রকাশিত: জুন ১, ২০২২ , ৭:৫০ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জুন ১, ২০২২ , ৭:৫০ পূর্বাহ্ণ

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন কী সংশোধন হচ্ছে ? গতকাল মঙ্গলবার আইন, বিচার ও সংসদবিষয়কমন্ত্রী আনিসুল হকের বক্তব্যে এ ইঙ্গিত দেয়ার পরে নতুন করে এ প্রশ্ন সামনে চলে এসেছে। শত বিরোধিতা সত্ত্বেও নানান যুক্তি তুলে ধরে ২০১৮ সালের ৮ অক্টোবর কণ্ঠভোটে এ বিলটি পাস হয় জাতীয় সংসদে। বিশেষ করে গণমাধ্যমকর্মীরা এ আইনটির বিরোধিতা করে নানা কর্মসূচি পালন করেন। তারপরও এ আইনটি বাতিল অথবা নিবর্তনমূলক কয়েকটি ধারা বাতিলের দাবিতে সোচ্চার থাকে গণমাধ্যমকর্মীসহ তাদের বিভিন্ন সংগঠন, রাজনৈতিক দলসহ দেশি-বিদেশি মহল।

সম্পাদক পরিষদ, সাংবাদিক ইউনিয়ন, রিপোর্টার্স ইউনিটিসহ বিভিন্ন সংগঠন প্রতিবাদে বিবৃতি প্রদান, সমাবেশ, মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সাংবাদিক ও মানবাধিকার সংগঠন আইনটির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে বাতিলের দাবি জানিয়ে বিবৃতি দেয়। বিরোধী কয়েকটি রাজনৈতিক দলও এর বিরোধিতা করে। ক্ষমতায় গেলে এই আইন বাতিল করার ঘোষণা দেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গত ২২ মে জাতীয় প্রেস ক্লাবে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে গণমাধ্যম সংক্রান্ত এক মতবিনিময় সভায় সভাপতির বক্তব্যে বিএনপি মহাসচিব বলেন, আমাদের পরিষ্কার ঘোষণা, সরকার গঠন করলে মুক্ত গণমাধ্যমের অন্তরায় ‘ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টসহ সব ধরনের নিবর্তনমূলক আইন ও অধ্যাদেশ বাতিল করব। গণমাধ্যমে প্রকাশিত যে কোনো বিষয় সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বা সংস্থা প্রেস কাউন্সিলে ফয়সালা না করে কোনোভাবেই যেন আদালতে মামলা দায়ের করতে না পারেন সেটা নিশ্চিত করা হবে। এ আইন পাসের সময় সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয় তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে সংঘটিত অপরাধ দমন করতেই এ আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। এটি সাংবাদিক বা সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হবে না। যদিও সরকারের এ কথা ঠিক থাকেনি। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এবং সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ করতেই আইনটি দেদার প্রয়োগ করা হয়েছে, এখনো হচ্ছে। যদিও আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এ কথা মানতে নারাজ। তিনি বলেন, ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের মামলা কমে যাচ্ছে। মামলা করলে দ্রুত গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না। এখন সরাসরি মামলা নেয়া হয় না। এখন মামলা একটা নির্দিষ্ট সেলে পাঠিয়ে দেয়া হয়। এটা গ্রাউন্ড লেভেল পর্যন্ত যাচ্ছে। তাতে মিস ইউজ (অপপ্রয়োগ) এবং অ্যাবিউজ (অপব্যবহার) বন্ধ হয়ে যাবে।

মন্ত্রী জানান, ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ জাতিসংঘের রেসিডেন্স কো-অর্ডিনেটরের মাধ্যমে জেনেভায় জাতিসংঘের হাইকমিশন ফর হিউম্যান রাইটসের অফিসের সঙ্গে এ নিয়ে বৈঠক করেছে। আমরা দুপক্ষই সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমাদের দিক থেকে একটি কমিটি করে দেয়া হবে, তাদের দিক থেকে একটা কমিটি থাকবে। সারা বিশ্বের যে বেস্ট প্র্যাকটিস সেগুলো দেখব। দেখার পর কোনটা বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে প্রযোজ্য হয়, সেটা গ্রহণ করব। আমরা লেজিসলেটিভ সচিবের নেতৃত্বে একটা কমিটি করে দিয়েছি। তারা একটা বৈঠকও করেছেন। শিগগির আরেকটি মিটিং হবে।

গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে গণমাধ্যম কেন্দ্রে গণমাধ্যমকর্মী আইন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও ডাটা সুরক্ষা আইন নিয়ে বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েট রিপোর্টার্স ফোরাম (বিএসআরএফ) আয়োজিত ‘বিএসআরএফ সংলাপ’ অনুষ্ঠানে মন্ত্রী ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন সাইবার ক্রাইম মোকাবিলার জন্য করা হয়েছে জানিয়ে বলেন, আমরা সবাইকে আশ্বস্ত করতে চাই, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার এমন কোনো আইন করবে না, যে আইন স্বাধীন সাংবাদিকতা কিংবা স্বাধীন সংবাদ পরিবেশনের দায়িত্বকে খর্ব করে। তিনি বলেন, আমরা জনগণকে সেবা করতে এসেছি। এর মাধ্যমে যদি কোনো ত্রæটি বিচ্যুতি হয়, সেটা যদি জনগণ বলতে চায় আমরা সেটা শুনব। প্রতিকারের প্রয়োজন হলে সেটা করব।

সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও রাজনৈতিক নেতাদের অবমাননায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে এ পর্যন্ত হাজারেরও বেশি মামলা হয়েছে। বেশির ভাগ মামলা করেছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। জানুয়ারি-২০২০ থেকে ফেব্রুয়ারি-২০২২ পর্যন্ত ২৬ মাসে ৮৯০টি মামলা হয়। প্রথম ১৫ মাসে গড়ে ৬০ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। পরবর্তী ৯ মাসে গড়ে ১৪৭ জনের বিরুদ্ধে।

এসব মামলার মধ্যে বেশির ভাগই হয়েছে আইনটির ২৫ ও ২৯ ধারায়। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ১ হাজার ১৩৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। চলতি বছরের প্রথম দুই (জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি) মাসে ১৬৫ মামলায় ৩৩৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এসব মামলার বিবাদী হলেন- সাংবাদিক, শিক্ষক, এনজিও ও অধিকারকর্মী, রাজনীতিবিদ, ছাত্র, সরকারি ও বেসরকারি কর্মচারী, ব্যবসায়ী, আইনজীবী, ধর্মীয় নেতাসহ অন্য পেশাজীবীরা। সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে বিরোধী দলের নেতাকর্মী ও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে। ‘অন্তহীন দুঃস্বপ্ন- বাংলাদেশের ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট ২০১৮’ শীর্ষক এই গবেষণায় নেতৃত্ব দেন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির ডিস্টিঙ্গুইশড প্রফেসর ও সিজিএসের উপদেষ্টা ড. আলী রীয়াজ।

এ আইনে দায়ের হওয়া মামলায় কারাবন্দি লেখক মুশতাক আহমেদের মৃত্যুর পর দেশে-বিদেশে আইনটি নিয়ে তুমুল বিতর্ক এবং সমালোচনা হয়। কারাগারে মারা যাওয়া মুশতাক আহমেদের সঙ্গে একই মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে প্রায় ৫ মাস কারাবন্দি ছিলেন কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোর, মো. দিদারুল ইসলাম। তিনি রাষ্ট্রচিন্তা নামের একটি সংগঠনের সদস্য। জামিনে মুক্ত হয়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা তো আমাদের জীবন দিয়ে জানি। প্রত্যেকটা শব্দ উচ্চারণ করার আগে ১০ বার চিন্তা করি। এই শব্দটাতে আমি কী ধরা খাব কিনা! আমার পরিবার, বন্ধু-বান্ধব তারাতো আমার নিরাপত্তা নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন। জামিনে মুক্ত হলেও এখনো নানাভাবে প্রশাসনের নজরদারির মধ্যে আছেন বলেই জানান তিনি।

আইনটি পাস হওয়ার আগে-পরে এর কিছু ধারার অপপ্রয়োগ নিয়ে আশঙ্কার কথা জানান মানবাধিকার সংগঠন, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। আইনটির ৯টি ধারা বাকস্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও গণমাধ্যমের জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করে এসব ধারা সংশোধনের দাবি করে আসছে সম্পাদক পরিষদসহ বিভিন্ন সংগঠন। আইনটি বাতিল কিংবা সংশোধন করতে দেশি-বিদেশি চাপ অব্যাহত রয়েছে। ঘরে-বাইরে নানামুখী চাপের মুখে সরকার পরিস্থিতি অনুধাবন করে আইনটি সংশোধনের চিন্তা-ভাবনা করছে, যা গতকাল আইনমন্ত্রীর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়। প্রায় ৪ বছর আগে পাস হওয়া এ আইন সংশোধনের ইঙ্গিত পেয়ে গণমাধ্যমসহ সংশ্লিষ্টরা ইতোমধ্যেই স্বস্তি প্রকাশ করেছেন।

ডি- এইচএ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়