প্রাথমিক শিক্ষায় এডহক নয়, স্থায়ী নীতিকৌশলই আবশ্যক

আগের সংবাদ

রপ্তানি আয়কে একদিনের মধ্যে টাকায় রূপান্তরের নির্দেশ

পরের সংবাদ

থানায় থানায় দায় ঠেলাঠেলি

প্রকাশিত: মে ৩১, ২০২২ , ৮:০১ পূর্বাহ্ণ আপডেট: মে ৩১, ২০২২ , ৮:০১ পূর্বাহ্ণ

সীমানা জটিলতার অজুহাতে আরেক থানা দেখিয়ে দেয় পুলিশ, প্রতিকার পান না ভুক্তভোগীরা, চাপা পড়ছে অনেক অপরাধ

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ৫০ থানার মধ্যে অনেক থানার সীমানা নিয়ে ঠেলাঠেলির কারণে বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন প্রতিকার প্রার্থীরা। অনেক ক্ষেত্রে দায় এড়ানোর চেষ্টা করছে পুলিশ; আর সুযোগ নিচ্ছে অপরাধীরা। ছিনতাই ও ক্লুলেস খুনসহ নানা অপরাধ আমলে নিতে চায় না সংশ্লিষ্ট থানা। কোনো ঘটনা আলোচিত হলে পদস্থ কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপে হয় সুরাহা। আবার পুলিশের আগ্রহ না থাকায় অনেক ঘটনাই আড়ালে থাকছে। রাজধানীতে এমন অনেক ওয়ার্ড রয়েছে- যা পাশাপাশি দুই থানার অন্তর্গত। এসব স্পটে মাদক সেবন ও বখাটেরা আড্ডা দেয়। তারাই মূলত এলাকাভিত্তিক নানা অপরাধে জড়িত। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঠেলাঠেলির সুযোগ নিচ্ছে ছিচকে অপরাধীরাও।

জাতীয় নিরাপত্তা সেলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া এ প্রসঙ্গে ভোরের কাগজকে বলেন, সীমানা ঠিক করে সচিব কমিটি। নির্দিষ্ট সীমানার বাইরে গিয়ে অন্য থানার পক্ষে কোনো ঘটনায় মামলা বা তদন্ত করা সম্ভব নয়।

ঢাকা মহানগর পুলিশের মুখপাত্র, উপকমিশনার মো. ফারুক হোসেন বলেন, আইনের বিধান হচ্ছে কোনো একটি ঘটনার যেখানে শুরু বা শেষ হয় দুই স্থান পৃথক থানায় হলে ভুক্তভোগী এর যে কোনো একটি থানায় মামলা করতে পারেন। তবে অনেক সময় ঠেলাঠেলির প্রবণতা দেয়া যায়- এমন অভিযোগ সত্য। সেক্ষেত্রে ভিকটিম দ্রুত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে সুফল মিলবে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর মালিবাগ মোড় রমনা, হাতিরঝিল, রামপুরা, শাজাহানপুর এই চার থানার পাশাপাশি ঢাকা রেলওয়ে থানার সীমান্তবর্তী মালিবাগ মোড়ে কোনো ঘটনা ঘটলে সেটি কোন থানার অন্তর্গত- এনিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পুলিশের অনেক সময় চলে যায়। এর মধ্যে ভুক্তভোগীকে অনেক কাঠখড় পোহাতে হয়। খিলগাঁও তালতলা মার্কেট খিলগাঁও থানার পাশের সড়কের অর্ধেক অংশ থেকেই রামপুরা থানা। একপাশে রামপুরা, অন্যপাশে খিলগাঁও থানা হওয়ায় টহল এবং অভিযোগ রেকর্ড নিয়ে হরহামেশাই ঘটছে হয়রানির ঘটনা। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২ নম্বর ওয়ার্ডের একাংশ খিলগাঁও থানা; আরেক অংশ রামপুরা থানার মধ্যে পড়েছে। খিলগাঁও থানার ১০ গজের মধ্যে রামপুরা থানার এলাকা শুরু হয়েছে। রামপুরা থানার মেরাদিয়া এলাকার এক গলি পরই ডেমরা থানা এলাকা। মতিঝিল-পল্টন-শাজাহাপুর ও রামপুরা থানার মধ্যে সীমানা জটিলতায় সৃষ্ট বিরোধের খবর থানা পুলিশের মুখে মুখে। সেখানেও চুরি-ছিনতাই-ডাকাতি বা অপরাধের কোনো ঘটনা সংঘটিত হলে বিপত্তি ঘটে প্রায়ই।

পোস্তাগোলা ব্রিজের আগে ডানপাশে শ্যামপুর মডেল থানা এলাকা। কিন্তু সীমান্তঘেঁষা রাস্তার বিপরীত পাশই কদমতলী থানার অন্তÍর্গত। মিরপুর থানা এলাকায় দারুস সালাম, শাহআলী থানা হয়েছে। দিয়াবাড়ি দারুস সালাম থানায়, নবাবের বাগ শাহআলী থানায় আবার কাঁচামালের আড়ত পড়েছে দারুস সালাম থানা ও শাহ আলী থানা মিলিয়ে। ৩০০ ফিটের অন্তর্গত সড়কের সীমানা নিয়ে ঢাকার খিলক্ষেত ও নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ থানার মধ্যে রশি টানাটানি রয়েছে। কলাবাগান-শেরেবাংলা নগর- তেজগাঁও ও ধানমন্ডি থানার সীমানা নিয়ে জটিলতা আছে।

স্কয়ার হাসপাতালের একপাশ কলাবাগান আরেকপাশ শেরেবাংলাা নগর থানায় পড়েছে। সোনারগাঁ হোটেল থেকে রাসেল স্কয়ার পর্যন্ত অনেকগুলো নোম্যান্সল্যান্ড রয়েছে। গ্রিন রোডের সীমানা নিয়ে অভিযোগের কমতি নেই। কোতোয়ালি ও সূত্রাপুর থানার সীমানা জটিলতার কারণে ছিনতাই, ইভটিজিংসহ অনেক অপরাধ সংঘটিত হলেও ভুক্তভোগীরা প্রতিকার পাচ্ছেন না। উত্তরা পূর্ব-উত্তরা পশ্চিম-তুরাগ-উত্তর খান-দক্ষিণ খান থানাতেও সীমানা নিয়ে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ আছে। হাশেম খান রোডের সীমানা নিয়ে হাজারিবাগ ও মোহাম্মদপুর থানার মধ্যে দায় এড়ানোর অভিযোগ পুরনো। এই সড়কের উত্তর অংশ মোহাম্মদপুর এবং দক্ষিণ অংশ হাজারীবাগ থানার অন্তর্গত। জাহাঙ্গীরগেট ক্যান্টনমেন্ট ও বনানী থানার কাছাকাছি হলেও ওই এলাকা পড়েছে কাফরুল থানায়। মিরপুর সনি সিনেমা হলের মোড় তিন থানার মোহনা হিসেবে পরিচিত। এই স্পটে ছিনতাইয়ের ঘটনা বেফশ ঘটে। অভিযোগ নিয়ে মিরপুর-দারুস সালাম ও শাহ আলী থানা পুলিশ ঠেলাঠেলি করে। এতে ভুক্তভোগীরা চরমভাবে হয়রানির শিকার হন।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কোতোয়ালি থানা ও সূত্রাপুর থানার মাঝে বাহাদুর শাহ পার্ক। সদরঘাটে যেতে বা আসতে গেলে গুরুত্বপূর্ণ স্থানও এটি। লোকে লোকারণ্য থাকলেও এ পার্কে প্রায়ই ঘটছে ছিনতাই। পার্কের পাশে পুলিশ বক্স থাকলেও থোরাই কেয়ার করছে ছিনতাইকারীরা। এর আগে পার্কটিতে আকাশ বাহিনী নামে কিশোর গ্যাংয়ের ছিনতাই নিয়ে খবর প্রকাশের পর দুইজনকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেয় পুলিশ। তবুও কমছে না ছিনতাই।

কোতোয়ালি থানা পুলিশ সূত্র মতে, পার্কের ছিনতাইকারীরা সদরঘাট থেকে আসে। তবে ছিনতাই বন্ধ না হওয়ার কারণ হিসেবে ভুক্তভোগীরা বলছেন, কোনো তদন্ত করা হয় না, নেই কোনো পুলিশি অভিযান। অভিযোগ করতে গেলে পুলিশ বলছে, ‘এটা আমাদের থানা এলাকার নয়’। এমনই একজন ভুক্তভোগী জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের এক ছাত্রী (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক)। তিনি ভোরের কাগজকে বলেন, ১৫ মে সন্ধ্যার দিকে বাহাদুর শাহ পার্ক এলাকা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের যাচ্ছিলেন। এ সময় কিশোর বয়সের একজন তার হাত থেকে পার্টস (ব্যাগ) ছিনতাই করে নিয়ে যায়। তার পেছনে চিৎকার করে দৌড়ালেও পাশে থাকা কোতোয়ালি থানার পুলিশ বক্সের সদস্যরা এগিয়ে আসেনি। পরে অভিযোগ করতে গেলে বলা হয়, এটা আমাদের থানা এলাকার নয়। পরে সূত্রাপুর থানার পুলিশের কাছ গেলে তারা জানতে চায়, ‘রাস্তার এ পার, নাকি ও পার’। তখন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে বললে কোতোয়ালি থানায় যেতে বলে। কোতোয়ালি থানার পুলিশ বক্সে সাধারণ অভিযোগ করা হলেও এখনো কোনো সুফল পাননি সেই শিক্ষার্থী। এমন কয়েকজন ভুক্তভোগী জবি শিক্ষার্থী একই অভিযোগ করেন। এমনই আরেক ঘটনা ঘটে ঢাকা জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের সামনের রাস্তায়। এক নারী সন্ধ্যার পর রিকশায় করে এক শিশুকে জোর করে নিয়ে যাওয়ার সময় স্থানীয় লোকজনের কাছে ধরা পড়েন। এ সময় আইনজীবী পরিচয়ে এক ব্যক্তি সূত্রাপুর থানায় ফোন দিলে পুলিশ সদস্যরা বলেন, ‘রাস্তার এ পার, নাকি ও পার?’। পরে পুলিশ সদস্যরা জানান, এটা তাদের এলাকার ভিতর নয়।

এ বিষয়ে বাহাদুর শাহ পার্কের পাশে কোতোয়ালি থানার পুলিশ বক্সের ইনচার্জ উপপরিদর্শক নাহিদুল ইসলাম বলেন, আমাদের এখানে দুই থানা একই ডিভিশনে হওয়ায় মামলা না নেয়ার সমস্যা তুলনামূলক কম। আমরা সমন্বয় করে কাজ করি। তবে ভুক্তভোগীরা জায়গা সঠিক করে বললে আমাদের জন্য ভালো হয়।

এদিকে সীমানার অজুহাতে দায়িত্ব আরেক থানার ওপর চাপিয়ে দেয়া শুধু কোতোয়ালি-সূত্রাপুর থানার মধ্যেই নয়; ওয়ারী ও বংশাল থানার মধ্যেও এমন অহরহ ঘটনা রয়েছে। এর মধ্যে নবাবপুর রোড ও রোডের শেষ মাথায় সুন্দরবন স্কয়ারের পাশে প্রতিদিন হচ্ছে ছিনতাই, পকেট মার ও চাঁদাবাজি। কিন্তু মামলা করতে গেলে এক থানা আরেক থানা দেখিয়ে দেয়। এমনকি ঘটনা পুলিশের সামনে ঘটলেও ‘ঝামেলা’ মনে এগিয়ে আসে না তারা। গুলিস্তান ফোয়ারা মোড়ের স্থানটি অমীমাংসিত। সেখানে অহরহ ঘটে ছিনতাই ও পকেটমারের ঘটনা। জায়গাটি মতিঝিল, ওয়ারী, পল্টন ও শাহবাগ থানার মধ্যবর্তী স্থান। অপরাধীচক্রের বেশি আনাগোনা গুলিস্তানের ওই এলাকাজুড়ে হলেও মামলা করতে গেলে বিপত্তিতে পড়তে হয়। পুলিশ বক্স থাকলেও ঝামেলা এড়াতে এগিয়ে আসেন না বলে ওই এলাকার ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন।

ডি- এইচএ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়