আমদানিজনিত মূল্যস্ফীতি ও ডলারের চাপে দেশের অর্থনীতি

আগের সংবাদ

চালের বাজার অস্থির : ভাঙুন অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট

পরের সংবাদ

আসছে নির্বাচন : বিকল্প নেতৃত্বের প্রয়োজন আছে কী?

আহমেদ আমিনুল ইসলাম

অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশিত: মে ২৯, ২০২২ , ৬:২১ পূর্বাহ্ণ আপডেট: মে ২৯, ২০২২ , ৬:২১ পূর্বাহ্ণ

সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২৩ সালের শেষ দিকেই জাতীয় নির্বাচনের সম্ভাবনা। নির্বাচন নিয়ে, পরবর্তী প্রধানমন্ত্রিত্ব নিয়ে অনেকেই নানা প্রসঙ্গে শেখ হাসিনার বিকল্প চিন্তা করার অবকাশ তৈরি করেছেন। আমরা মনে করি, তার বিকল্প খোঁজার সময় এখনো আসেনি, এখনই এর আদৌ কেন প্রয়োজনও আছে বলে মনে করি না। তবে নির্বাচন নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে, চিন্তা করতে হবে, নির্বাচনকে অনুষ্ঠিত হতে দিতে হবে। এখন এটাই ভাবনার কথা। আসন্ন নির্বাচনের এই সম্ভাবনা নিয়ে আবার আশঙ্কাও আছে বিস্তর। কেননা বিএনপি মাঠে-ময়দানে এবং বিশেষ করে গণমাধ্যমের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখায় ‘বর্তমান সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচন নয়’ বলে বাতাস দিয়ে বেড়াচ্ছে এবং তাতে আমাদের মনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের সম্ভাবনার চেয়ে আশঙ্কাই বেশি তৈরি হচ্ছে! কারণ আমরা নির্বাচন কেন্দ্রিক বিএনপি এবং তাদের সহযোগী দলগুলোর কর্মকাণ্ড দেখেছি। সে এক ভয়ানক ও ভয়াবহ স্মৃতি! জ্বালাও-পোড়াওয়ের এমন মহোৎসব (!) নিকট অতীতে আমরা দেখিনি। যেমনটি দেখিনি পেট্রলবোমার এত ব্যাপক সংখ্যক আবিষ্কার, উৎপাদনসহ মানুষ এবং বিভিন্ন রকমের যানবাহনের ওপর তার প্রয়োগও! অগ্নিদগ্ধ এবং ঝলসে যাওয়া মানুষের মুখগুলো এখনো আমাদের স্মৃতিসত্তাকে বিমর্ষ করে তোলে। রাজনীতির নামে এমন অমানবিক ও দানবীয় সন্ত্রাস দেখে বিশ্ববাসীও হতভম্ভ হয়েছিল তখন। গণতান্ত্রিক পথে না হেঁটে ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপে সমগ্র জাতিকে তারা অতিষ্ঠ করে তুলেছিল। সেই আশঙ্কা থেকেই ২০২৩ সালের আসন্ন নির্বাচন নিয়ে আমাদের মনের ভেতর শঙ্কা যেমন জেগে ওঠে তেমনি ভয়ংকর অভিজ্ঞতার পুনরুজ্জীবনের ভয়ে শিহরিতও বোধ করি। ভয়ে শিহরিত হওয়ার কারণ এজন্য আরো বেশি যে, সে সময়ের তুলনায় বর্তমান সময় অবধি আওয়ামী লীগের শাসনকাল আরো দীর্ঘ হয়েছে। বিলম্বিত হয়েছে সেসব দলের ক্ষমতার মসনদ লাভের স্বপ্ন। স্বপ্ন বিলম্বিত হলেও, আওয়ামী লীগের ক্ষমতাকাল লম্বা হলেও বিএনপি-জামায়াতের ক্ষমতার প্রতি আগ্রহ ক্রমশ বেড়েই চলেছে। এই দীর্ঘ সময়ের ফাঁকে বিরোধী সব পক্ষের জিঘাংসা, রিরংসা, ক্ষোভ, লোভ, সবই প্রচুর পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। বৃদ্ধি পেয়েছে ষড়যন্ত্রের নব নব কৌশলও। তাই বাম-ডান অগ্র-পশ্চাৎ কোনো আদর্শের তোয়াক্কা না করে সবাই যেন শেখ হাসিনাকে হটানোর জন্য রণসজ্জায় সজ্জিত! অর্থাৎ আওয়ামী লীগকে বধ করার অভিপ্রায়ে শত্রæপক্ষ ‘গোকূলে বেড়েই চলেছে’! তারা শুধু সংখ্যায়ই বেড়ে চলেছে তা বলা যাবে না- নানাভাবে হয়তো বা তারা শক্তিও সঞ্চয় করেছে- তা সে দেশ থেকে হোক কিংবা বিদেশ থেকে! যদি তাই না হবে তবে সম্প্রতি বিএনপির কোনো কোনো নেতা তাদের বক্তৃতায় সরকারকে ‘সময় নির্দিষ্ট’ করে হুঁশিয়ারি ও হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন কীভাবে তাই আমাদের জিজ্ঞাস্য।
রাষ্ট্র ক্ষমতায় আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিন হয়ে গেছে। এ কথা গোপন নয়- মিথ্যাও নয়। আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা আছে বলেই, সাধারণের জন্য কাজ করে চলেছে বলেই তাদের আসন এখনো শক্ত অবস্থান থেকে বিচ্যুত হয়নি। বরং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের প্রতি সাধারণের আস্থা আছে বলেই আওয়ামী লীগ তথা জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার এখনো অবিচল ও অটল রয়েছে। সাফল্যের সঙ্গেই বর্তমান মেয়াদ তারা শেষ করতে যাচ্ছে। মনে রাখা জরুরি, এই সরকারের কোনো স্তরে যদি কোনো ব্যর্থতা থেকেই থাকে তবে একমাত্র পদ্মা সেতু উদ্বোধনের মাধ্যমেই সব ব্যর্থতা পদ্মার প্রবল স্রোতে ভেসে যাবে! শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এ দেশের মানুষই শুধু নয় তামাম দুনিয়ার মানুষ এক ঐতিহাসিক সাফল্য প্রত্যক্ষ করার অভিজ্ঞতায় নিজেদেরই সমৃদ্ধ করতে যাচ্ছে। পরপর টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার ফলে আওয়ামীবিরোধী মনোভাব জনমনে কিছুটা হলেও তীব্রতা পেয়েছে। যদিও সাংগঠনিকভাবে এই মনোভাব কোনো সামাজিক বা রাজনৈতিক ভিত্তি অর্জন করতে পারেনি। মানুষের মনে সামাজিক অনেক বিষয়েই এক ধরনের হতাশা সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু এই হতাশাও সংঘবদ্ধ কোনো রূপ লাভ করতে পারেনি। যদিও আমরা দেখতে পাচ্ছি বিএনপিসহ উঠতি কিছু সংগঠন কিংবা ব্যক্তি সরকারকে আর ‘এক মুহূর্তও’ রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকতে দিতে ইচ্ছুক নয়! ভাবখানা এমন যে, তারা একটি ফুঁ দিলেই নড়বড়ে সরকার চোখের পলকেই নিঃশেষ হয়ে যাবে! দয়া করে তারা তাদের মুখখানি খুলে কেবল সেই শক্তিমান ফুঁটুকু এখনই দিচ্ছেন না! আওয়ামী লীগের প্রতি তাদের এই দরদ দেখে আমজনতার মুখে হাসি আসে বৈকি! শেখ হাসিনাকে মায়ের মতন দেখেন (!) বলেই তাদের কেউ কেউ ভয়ংকর ও দানবীয় ফুঁ দেয়া থেকে বিরত রয়েছেন বলে আমাদের ভাবতে হবে! দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকায় ‘পান থেকে চুন’ খসলেই সরকারের দোষ মহিরুহ সমান হয়ে ওঠে। অর্থাৎ ছোটখাটো কোনো ভুলভ্রান্তি বা সাধারণের মনের মতো কোনো সিদ্ধান্ত না হলেই সরকারের নেতিবাচক সমালোচনায় অনেকে মুখর হয়ে ওঠে।
সাম্প্রতিককালে দ্রব্যমল্যূ বৃদ্ধি সরকারের বিপক্ষে জনমত তৈরি হওয়ার একটি পটভূমি তৈরি করেছে। কিন্তু আমরা বিশ্ব বাজারের দিকে তাকিয়ে দেখি না। তাকিয়ে দেখি না বৈশ্বিক নানা সংকটের দিকেও। নানা রাজনৈতিক উত্থান-পতনে বিশ্ব ব্যবস্থাপনা যখন টালমাটাল অবস্থা তার প্রভাবে অপরাপর দেশের মতো বাংলাদেশের বাজার পরিস্থিতিও অনেকটাই অস্থির। এ বাস্তবতা আমদের মানতে হবে। আবার সরকারকেও উপলব্ধি করতে হবে বৈশ্বিক সংকট থাকলেও আমাদের যাপিত জীবন হঠাৎ যেন পর্যুদস্ত না হয়ে পড়ে। দেশের সাধারণ মানুষের আয় ব্যবস্থার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বাজার নিয়ন্ত্রণে সাধ্যমতো চেষ্টাটুকু করতে হবে। এ চেষ্টাটুকু সাধারণ মানুষ দেখতে পারলেই গভীর সান্ত¡না অনুভব করে। বাজার সংকটের কথা বুঝাতে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলকে আরো যতœশীল হতে হবে। তাহলেই মানুষ বিশ্ব ব্যবস্থার সঙ্গে বাংলাদেশের তুলনাকে মেনে নিতে দ্বিধা করবে না। তা না হলে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি নিয়ে বিরোধী দলের লাগামহীন উসকানিমূলক বক্তব্যকেই সত্য ধরে নিয়ে রাজপথে তাদের সংখ্যা বাড়িয়ে তুলতে কার্পণ্যমাত্র করবে না। বাজার নিয়েও ষড়যন্ত্রের কোনো শেষ নেই। অদৃশ্য সিন্ডিকেটের কথা সবাই বললেও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কিংবা তৎসংশ্লিষ্ট কোনো সংস্থা সেই সিন্ডিকেটের অস্তিত্ব এখনো আবিষ্কারে ব্যর্থ হয়েছে।
বাজার পরিস্থিতি এবং দীর্ঘদিন একটানা ক্ষমতা বর্তমান আওয়ামী লীগের সামনে দুটি শক্তিশালী চ্যালেঞ্জ। কিন্তু যথাযথ প্রচারণার মাধ্যমে সরকার সাধারণকে অবশ্যই বোঝাতে সক্ষমতা অর্জন করতে পারতেন যে তারা বিশ্ব বাজার সম্পর্কে সতর্ক আছেন এবং যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণে তৎপরও আছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অল্পদিন আগে এক ভাষণে বলেছেন, রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধসহ অন্যান্য বৈশ্বিক প্রভাবে আমাদের সামনে কঠিন দিন আসছে। তাই তিনি সবাইকে সচেতন থাকতেও অনুরোধ করেছেন। বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি এবং দেশের ভেতরকার উন্নয়নের গতিশীলতা সম্পর্কে দলীয়ভাবে প্রচারণার মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে সচেতন করে তুলতে হবে। তাহলেই তারা বুঝতে পারবেন, শত অভাব-অনটনেও বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সঠিক পথেই আছে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ। এরূপ বিষয়ে সাধারণ মানুষকে বুঝানো সম্ভব হলে তারাই রাষ্ট্র ক্ষমতা থেকে আওয়ামী লীগকে সরানোর ষড়যন্ত্র কঠোরভাবেই মোকাবিলা করবেন। কেননা এ দেশের মানুষ কিছুটা হলেও বুঝতে সক্ষম যে, বাংলাদেশ প্রকৃতপক্ষে কার হাতে নিরাপদ।
যারা সরকারের দীর্ঘস্থায়িত্ব দেখে মন খারাপ করছেন তাদের একটি বিষয় উপলব্ধি করা প্রয়োজন যে, টানা দীর্ঘ মেয়াদে একই সরকার ক্ষমতায় আছে বলে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বেগবানরূপে অব্যাহত আছে। দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য গৃহীত বড় বড় সব প্রকল্পও ধারাবাহিকভাবে সচল ও সক্রিয় রয়েছে। কোভিড-১৯ মহামারির সময়ও দেখেছি সেসব উন্নয়ন প্রকল্প কাজ গুটিয়ে বসে থাকেনি। আর এর ফলেই আমাদের জিডিপি গত বছরের তুলনায় আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। এই জিডিপির আরো সন্তোষজনক এক অবস্থান তৈরি হবে আসছে ২৫ জুনের পর থেকে। সে দিন পদ্মা সেতুর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হতে যাচ্ছ। এই সেতুর উদ্বোধন শুধু বাংলাদেশের অর্থনীতিকে গতিশীল করবে তা নয়- আঞ্চলিক অর্থনীতির গতিপ্রবাহকেও নবতর চাঞ্চল্যে জাগিয়ে তুলবে। সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের আমূল পরিবর্তন ঘটতে যাচ্ছে পদ্মা সেতুর উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে। জননেত্রী শেখ হাসিনার প্রাজ্ঞ ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতৃত্বের কারণে আজ বাংলাদেশের এই সাফল্য। পদ্মার স্রোতে ভেসে যাক ব্যর্থতার আবর্জনার স্তূপ!
যদি বাংলাদেশ সঠিক পথে সামনের দিকে এগোয়, যদি বাংলাদেশ অর্থনৈতিক বিপর্যয় এবং করোনা মহামারির মতো দুর্যোগ কাটিয়ে পদ্মা সেতুর মতো বড় বড় প্রকল্পের সফল বাস্তবায়নে সক্ষমতা প্রদর্শনে বিশ্বের সমীহ অর্জন করতে পারে তবে রাষ্ট্র ক্ষমতায় নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থানের কার্যকারিতা খুব একটা আছে বলে আমরা মনে করি না। তাছাড়া আওয়ামী লীগ ছাড়া রাষ্ট্রকে আমরা কার হাতে সমর্পণ করব! আমরা বড়জোর আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে শেখ হাসিনার বিকল্প কোনো নেতৃত্ব তৈরির প্রকল্প নিতে পারি। আমরা জানি জননেত্রী শেখ হাসিনার বিকল্প সম্ভব নয়। তবু নেত্রী মাঝেমধ্যে অবসরের ইঙ্গিত দিয়ে আমাদের ক্ষণিকের জন্য হলেও স্তব্ধ করে দেন। তখন বুঝি, তারও অবসরের প্রয়োজন- বিশ্রামেরও প্রয়োজন। কিন্তু এমন একজন তো দরকার যিনি তার অবসরে রাষ্ট্র এবং দলকে যথাযথ নেতৃত্ব দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেন। আমাদের এমন নেতৃত্ব দরকার যিনি জননেত্রীর ভিশন ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উন্নত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত করার প্রত্যয়ে হবেন দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ।

আহমেদ আমিনুল ইসলাম : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়