কৃষি খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ হোক বাজেটে

আগের সংবাদ

আসছে নির্বাচন : বিকল্প নেতৃত্বের প্রয়োজন আছে কী?

পরের সংবাদ

আমদানিজনিত মূল্যস্ফীতি ও ডলারের চাপে দেশের অর্থনীতি

মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম

পুঁজিবাজার বিশ্লেষক

প্রকাশিত: মে ২৯, ২০২২ , ৬:২১ পূর্বাহ্ণ আপডেট: মে ২৯, ২০২২ , ৬:২১ পূর্বাহ্ণ

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বিশ্ব অর্থনীতিতে দেখা দেবে মন্দা। পশ্চিমা বিশ্বে চলছে এখন রেকর্ড মূল্যস্ফীতির যুগ। সেই সঙ্গে চীনে এখনো বিভিন্ন অঞ্চলে আছে লকডাউন। এসব কিছুই অনেকে ঝড়ের পূর্বাভাস মনে করছেন। সারাবিশ্ব ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি নিয়ে শঙ্কিত, বিশেষ করে খাদ্য মূল্যস্ফীতি সারা বিশ্বের মানুষের চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতির কারণে দেশে দেশে নাগরিক অসন্তোষ তৈরি হতে পারে- এমনই শঙ্কা প্রকাশ করছে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো। তৈরি হতে পারে রাজনৈতিক অস্থিরতা। গরিব দেশগুলোর দুর্দশার অন্ত থাকবে না। ধনী দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মূল্যস্ফীতির হার ৩০-৪০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। আমেরিকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভসহ বিশ্বের বড় অর্থনীতির সব দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মরিয়া- এ ক্ষেত্রে একটাই করণীয়, নীতি সুদহার বৃদ্ধি করা। ইতোমধ্যে সব বড় দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি সুদহার বৃদ্ধি করেছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে তা কতটুকু কার্যকর হবে এটি অনুমান করা সহজ নয়। বিশ্বায়নের এই যুগে প্রতিটি দেশই একে অপরের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত। তাই বাংলাদেশের অর্থনীতিও হুমকির মুখে। অর্থনীতিতে দেখা দিয়েছে বেশকিছু চ্যালেঞ্জ। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, মহামারিকালীন বেড়ে যাওয়া দারিদ্র্য নিরসন করে আয়বৈষম্য কমানো ও কর্মসংস্থান বাড়ানোই হলো অর্থনৈতিক উন্নয়ন ধরে রাখার পূর্বশর্ত। একটি দেশের অর্থনীতির ব্যবস্থাপনা কতটা সুসংহত; এটি বোঝার জন্য মূল্যস্ফীতি হার, মুদ্রার বিনিময় হার এবং ঋণের সুদের হার- এই তিনটি সূচক খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনীতি স্থিতিশীলতায় সূচকগুলোর মধ্যে সমন্বয় থাকা জরুরি। অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নষ্ট হলে বিনিয়োগ কমে যায়। ফলে কর্মসংস্থানেও দেখা দেয় স্থবিরতা। করোনার আগে সর্বশেষ অর্থবছর ছিল ২০১৮-১৯। বর্তমানে সফলভাবে করোনা মোকাবিলা করে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর কথা বলা হলেও অর্থনীতির সূচকগুলো আগের অবস্থান থেকে এখনো অনেক দূরে। দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি প্রায় দেড় দশকের মধ্যে সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় রয়েছে। বাজারে প্রতিটি পণ্যের দাম যেন লাগামছাড়া এক ঘোড়া। একটি পণ্যও খুঁজে পাওয়া যাবে না- যার দাম স্থিতিশীল। এর মধ্যে আমদানি করা পণ্যের দাম বেড়েছে লাফিয়ে লাফিয়ে। ভুট্টা ও সয়াবিন থেকে শুরু করে ডাল, আটা, ময়দা, মাছ, মাংস, ডিম, গুঁড়া দুধ, চিনি, মসলা পণ্য, এমনকি লবণের দাম বাড়ছে। আর ভোজ্যতেলের দামের তেলেসমাতি তো সবারই জানা। ব্যবসায়ীরা তেল গুদামে মজুত রেখে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে। ফলে ভোজ্যতেলের মূল্যবৃদ্ধির যে মিছিল, তা আরো বেগবান হচ্ছে। সম্প্রতি ভারত গম রপ্তানি বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে। তাই পাইকারি বাজারে গত সোমবার গমের দাম এক লাফে গড়ে প্রায় সাড়ে ৮ শতাংশ বেড়েছে। তা কেজি হিসেবে তিন থেকে সাড়ে চার টাকা। শুধু আমাদের পাইকারি বাজারে নয়, দাম বেড়েছে বৈশ্বিক বাজারেও। যুক্তরাষ্ট্রে গমের দাম বেড়েছে প্রায় ৫ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে দেশে মূল্যস্ফীতির হার ৬ দশমিক ২২ শতাংশ। এটি বাস্তবতার সঙ্গে কতটা সঙ্গতিপূর্ণ, তা নিয়ে নতুন করে ভাবনার কিছু নেই। এ জন্য পরিসংখ্যান বা সংখ্যাতত্ত্ব নিয়ে অনেকে মহাবিরক্ত। তাই তারা মিথ্যার প্রকারভেদ এভাবে করেন- মিথ্যা, ডাহা মিথ্যা ও সংখ্যাতত্ত্ব। সংখ্যাতত্ত্ব ডাহা মিথ্যার চেয়ে অনেক বিপজ্জনক। এবারের মূল্যস্ফীতির মূল কারণ হলো, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। এ কারণে জ¦ালানি তেলের দাম বাড়তি। অন্যদিকে মহামারির শুরু থেকেই বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘিœত। ফলে দেখা যাচ্ছে, এই মূল্যস্ফীতি বাজারে অতিরিক্ত মুদ্রার জন্য নয়। তবে বাংলাদেশে যে মূল্যস্ফীতি তা অনেকাংশে আমদানিজনিত মূল্যস্ফীতি। এর পাশাপাশি মহামারিকালীন অর্থনীতি চাঙা রাখতে প্রণোদনা হিসেবে কম সুদে ব্যবসায়ীদের যে অর্থ দিয়েছিল সরকার, ওই অর্থের বড় অংশ এখনো ব্যবসায়ীদের কাছে রয়েছে। তা যথাযথ উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার হয়েছে কিনা, সেটি নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। তা বাজারে কিছুটা অর্থ সরবরাহ বাড়িয়েছে। এটিও মূল্যস্ফীতির অন্যতম কারণ বলে অনেকে মনে করেন। আবার গত কয়েক মাসে মুদ্রা হিসেবে মার্কিন ডলারের বিনিময় মূল্য অনেকটাই বেড়েছে। বিশ্বজুড়েই ডলারের দাম চড়া। এক বছরে ডলারের দর বেড়েছে ১৬ শতাংশ। গত ২০ বছরের মধ্যে বিশ্বে ডলারের দর এখন সবচেয়ে বেশি। ফলে বিপদে আছে বাংলাদেশের মতো ছোট অর্থনীতির দেশগুলো। আমদানিনির্ভর বাংলাদেশ শুরু থেকেই ডলারের দর কৃত্রিমভাবে ৮০ টাকার মধ্যে ধরে রাখার চেষ্টা করেছে। কিন্তু এবার আর সেই নীতিতে অটল থাকতে পারেনি বাংলাদেশ ব্যাংক। চলতি বছর এখন পর্যন্ত পাঁচবার টাকার মান কমানো হয়েছে। শুরুতে ২০ পয়সা করে অবমূল্যায়ন করা হলেও ১৬ মে এক লাফে ৮০ পয়সা বাড়ানো হয়েছে ডলারের দাম। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত ৮৭ টাকা ৫০ পয়সায় ডলার কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। ব্যাংকগুলো ৯৫ টাকার আশপাশে ডলার বিক্রি করছে। আর খোলাবাজারের কথা তো বলাই বাহুল্য; গত ১৭ মে খোলাবাজারে ডলারের মূল্য ছিল ১০২ টাকা, তা-ও আবার দুষ্প্রাপ্য। ডলার নিয়ে কারসাজির কথা শোনা যাচ্ছে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংককে কঠোর হতে হবে। ডলারের দর বেড়ে যাওয়ার ফলে হু হু করে বেড়েছে আমদানি ব্যয়। গত অর্থবছরের তুলনায় চলতি অর্থবছরের ৯ মাসে আমদানি ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৪৬ শতাংশ। এভাবে চলতে থাকলে ২০২১-২২ অর্থবছর শেষে আমদানির পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ৮৫ বিলিয়ন ডলার। এর বিপরীতে থেমে নেই রপ্তানি আয়ও। অর্থবছরের দুই মাস বাকি থাকতে লক্ষ্যমাত্রার (৪৩ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলার) কাছাকাছি পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে অর্থবছর শেষে প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হবে। দুর্ভাবনার বিষয় হলো- প্রবাসী আয় কিন্তু নিম্নমুখী। গত অর্থবছরের তুলনায় একই সময়ে প্রবাসী আয় কমেছে প্রায় ১৬ শতাংশ। এপ্রিল পর্যন্ত দেশে প্রবাসী আয় এসেছে ১৭ বিলিয়ন ডলার। আশা করা যায়, অর্থবছর শেষে এটি ২০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। ওই হিসাবে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি থেকে যাবে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলার। তা আমাদের রিজার্ভের পরিমাণকে ভয়াবহভাবে কমিয়ে ৩০ বিলিয়ন ডলারের নিচে নামিয়ে আনবে। এটি অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত। রিজার্ভ এখন ৪২ বিলিয়ন ডলার। তা দিয়ে মাত্র সাড়ে পাঁচ মাসের আমদানি ব্যয় নির্বাহ করা সম্ভব। আগে ছিল তা ৮ মাসেরও বেশি। আমদানির এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা অব্যাহত থাকলে দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হবে। সরকারের এখানে নজরদারি বাড়াতে হবে। অপ্রয়োজনীয় বিলাসী পণ্য আমদানি বন্ধ করে খতিয়ে দেখতে হবে আমদানির আড়ালে টাকা পাচার হচ্ছে কিনা। বিশ্ববাজারে পণ্যের মূল্য বাড়লে দেশের বাজারেও মূল্য বাড়বে- এটাই স্বাভাবিক। তবে ভরা মৌসুমে চালের দাম বাড়ছে- এটা ভালো লক্ষণ নয়। পাইকারি বাজারে চালের দাম কেজিপ্রতি ২ থেকে ৫ টাকা বেড়েছে। এভাবে প্রধান খাদ্যপণ্য- চাল, ডাল, আটা, ময়দা, ভোজ্যতেল, পেঁয়াজ, রসুনের দাম বাড়লে শুধু যে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্তরা চাপে পড়ে- তা নয়। সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে মধ্যবিত্তসহ সর্বস্তরের মানুষ। নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে তদারকি জোরদার করতে হবে। কেউ অসাধু পন্থায় পণ্যের দাম বাড়ালে কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে। অন্যদিকে সাম্প্রতিক সময়ে সরকার ফের গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়াতে চাচ্ছে। এই সময়ে যা মূল্যস্ফীতিকে আরো উসকে দেবে। এই ধরনের আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত মোটেও বাস্তবসম্মত নয়। আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, বৈশ্বিক ঝুঁকি ও কৌশলগত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ভেরিস্ক ম্যাপলক্রফট ১৩২টি দেশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে আগামী ৬ মাসের নাগরিক অস্থিরতার সূচক (সিভিল আনরেস্ট ইনডেক্স) প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিতে সব দেশেই চাপ বাড়ছে। আর যে ১০টি দেশের কথা আলাদাভাবে নজরে রাখার কথা বলা হয়েছে, এর মধ্যে দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশও রয়েছে। তাই আমাদের সাবধান হতে হবে। খাদ্যপণ্য উৎপাদনে নিজেদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। এ অবস্থায় আসন্ন অর্থবছরের বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, মানুষের আয় ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করে বৈষম্য নিরসনে জোর দিতে হবে। কৃষি খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে হবে। সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি শক্তিশালী করতে হবে। আমদানি করা খাদ্যপণ্যের ওপর থেকে শুল্ক প্রত্যাহার করে পণ্যমূল্য সবার ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে হবে।

মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম : পুঁজিবাজার বিশ্লেষক।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়