আন্দোলনকে গণঅভ্যুত্থানে রূপ দিতে চায় বিএনপি

আগের সংবাদ

জলবায়ু অভিযোজনে আর্থিক অনুমোদন বাড়ানোর তাগিদ মেয়র আতিকের

পরের সংবাদ

তৈরি হচ্ছে পি কে হালদারের ঘনিষ্ঠদের তালিকা

প্রকাশিত: মে ১৯, ২০২২ , ৮:৫৬ পূর্বাহ্ণ আপডেট: মে ১৯, ২০২২ , ৮:৫৬ পূর্বাহ্ণ

ডিভাইসে সাজানো নাম, ফোন নম্বর ও টাকার অঙ্ক

হাজার কোটি টাকা পাচারের নায়ক পি কে হালদারের ঘনিষ্ঠ প্রভাবশালীদের নামের খসড়া তালিকা করছে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। পি কে হালদারের বিভিন্ন আস্তানা থেকে উদ্ধার হওয়া ডায়েরি এবং ডিভাইস ছাড়াও ফোন কল ও বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যম মারফত করা বিভিন্ন জনের কাছে করা কলের তালিকা এখন ইডির হাতে। ইডির কর্মকর্তারা দিন-রাত ধরে সেই তালিকা একসঙ্গে তৈরি করছেন। তালিকায় দুই বাংলার পি কে ঘনিষ্ঠদের নাম আছে। তবে বাংলাদেশের প্রভাবশালীদের সংখ্যা বেশি।

সূত্রমতে, পি কে হালদারের মোবাইল এবং অন্যান্য ইলেক্ট্রনিক্স ডিভাইস ও ডায়েরিতে পাওয়া নামের সঙ্গে ফোন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম মারফত কলের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা পর্ব শেষে একটা তালিকার খসড়া করেছে। তালিকায় থাকা বাংলাদেশের প্রভাবশালীদের নাম শুনে প্রথমত হতবাক হন তদন্তকারী কর্মকর্তারা। এমনকি পি কে হালদারের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া ডিভাইসে অ্যালবাম করে সাজানো ছিল নাম ও ফোন নাম্বারের তালিকা, ব্যবসার খতিয়ান, টাকার অঙ্ক ও নানা ধরনের ছবি। তদন্তকারী কর্মকর্তারা গ্রাম থেকে উঠে আসা পি কে হালদারের অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার দেখেও অবাক হয়েছেন।

ইডির কর্মকর্তারা তার কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া একাধিক দেশের পাসপোর্ট সম্পর্কে জানার সময় প্রশ্ন করেন, সেসব দেশের নাগরিকত্ব ও পাসপোর্ট তৈরির কাজে কারা সহযোগিতা করেছিল? কেনই বা একাধিক দেশের পাসপোর্ট করেছেন তিনি? কাদের টাকা পাচারের কাজ করত? কাদের টাকা ভারতে আবাসন থেকে আমদানি-রপ্তানি ব্যবসায় বিনিয়োগ করত? এসব প্রশ্নের প্রাথমিক জবাব পেয়েছে ইডি।

ইডি কর্মকর্তারা নামের তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে কয়েকটি সেগমেন্ট করেছেন। যত ক্ষেত্র আছে, তাদের একটা আর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করা উচ্চ পদের ব্যক্তিদের নামের তালিকা আলাদা করেছেন। তালিকায় ব্যক্তিদের নামের পাশে পি কে হালদারের সঙ্গে ব্যবসা ও যোগাযোগের কারণও লেখা হচ্ছে। এমনকি ভারতে পি কে হালদারের

পরিচিত বন্ধু এবং বিজনেস পার্টনারদের তালিকা করে এরই মধ্যে তল্লাশিতে নেমেছে ইডি। খোঁজ নেয়া হচ্ছে তাদের সঙ্গে বাংলাদেশের আর কোন প্রভাবশালীদের সম্পর্ক আছে?

ইডির কর্মকর্তারা পি কে হালদার সম্পর্কে তথ্য নানাভাবে সংগ্রহ করেছেন। আত্মীয়, ব্যবসায়িক পার্টনার নয়, দূরের মানুষদের পেছনে টাকা বিনিয়োগ করে তিনি যেভাবে একাধিক কোম্পানি তৈরি করেছেন, তা ভাবাচ্ছে তদন্তকারী কর্মকর্তাদের। পি কে হালদারের ফোন ও ডিভাইস থেকে মিলেছে তাদের সম্পর্কে নানা তথ্য। যাদের বিরাট অংশ হলেন মহিলা। যে কোনো তদন্তকারী সংস্থাকে ঘোল খাওয়াতে পারে তার এই বিনিয়োগ বিন্যাসের লেয়ার। পশ্চিমবঙ্গে আবাসন থেকে আমদানি-রপ্তানি খাতে তার বিরাট বিনিয়োগের বহর দেখে তালিকা তৈরি হচ্ছে। এরপর সেই তালিকা ধরে শুরু হবে তল্লাশি অভিযান।

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, হাজার হাজার কোটি রুপি আত্মসাতের অভিযোগে এরই মধ্যেই ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা ইডির হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন প্রশান্ত কুমার হালদার (পি কে হালদার)। বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট ও দুর্নীতি দমন কমিশনের তরফে পাঠানো তথ্যের ভিত্তিতে পি কে হালদারসহ তার সহযোগীদের গ্রেপ্তার করেন ইডির কর্মকর্তারা। গত ১৪ মে পি কে হালদারকে গ্রেপ্তারের পর পাঁচ দিন কেটে গেছে। এরই মধ্যেই তদন্তকারী কর্মকর্তাদের কাছে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এসেছে। অভিযুক্তদের কাছ থেকে বাজেয়াপ্ত করা ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছেন ইডির আইনজীবী। এমনকি উদ্ধার করা হয়েছে ১৫০ কোটির বেশি ভারতীয় রুপি।

পি কে হালদারের এই বিশাল সাম্রাজ্য বিস্তারের পেছনে আর কোন কোন সহযোগী বা রাঘববোয়ালের হাত রয়েছে ইডি তারও একটা ইঙ্গিত পেয়েছে। আর সেই সূত্রে ধরেই চলছে নতুন করে তল্লাশি অভিযান। কখনো পি কে হালদারকে একা বসিয়ে আবার কখনো দুজন বা সবাইকে একত্রে বসিয়ে ক্রসচেক করে নিতে চাইছেন তদন্তকারী কর্মকর্তারা।

তিন দিনের রিমান্ড শেষে মঙ্গলবারই পি কে হালদার, তার ভাই প্রাণেশ হালদার, স্বপন মৈত্র ওরফে স্বপন মিস্ত্রি, উত্তম মৈত্র ওরফে উত্তম মিস্ত্রি, ইমাম হোসেন ওরফে ইমন হালদার ও আমানা সুলতানা ওরফে শর্মি হালদারকে কলকাতার স্পেশাল (সিবিআই) আদালত-১ এ তোলা হলে আদালত পাঁচ পুরুষ অভিযুক্তকে ১০ দিনের রিমান্ডের নির্দেশ দেন। অন্যদিকে অভিযুক্ত এক নারীকে ১০ দিনের জেল হেফাজত পাঠানো হয়। তদন্তে গতি আনতে পাঁচজনকে আরো জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন- এই আবেদন জানিয়ে তাদের নতুন করে রিমান্ডে নিয়েছে ইডি। তাদের রাখা হয়েছে সল্টলেকের সিজিও কমপ্লেক্সে ইডির আঞ্চলিক কার্যালয়ে। নতুন নতুন তথ্যের সন্ধানে সবাইকেই জেরার পর জেরা করছেন তদন্তকারী কর্মকর্তারা। তবে তাদের মূল লক্ষ্য পি কে হালদার।

এমনকি তদন্তের স্বার্থে গণমাধ্যমকর্মীদের এড়াতে অভিযুক্তদের সিজিও কমপ্লেক্স থেকে বিধাননগর মহকুমার হাসপাতালে নিয়ে মেডিকেল চেকআপের বদলে ৪৮ ঘণ্টা অন্তর একজন মেডিকেল অফিসার সিজিও কমপ্লেক্সে আসবেন তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে। সেক্ষেত্রে আজ বৃহস্পতিবার ফের তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা হতে পারে।
উল্লেখ্য গত ১৪ মে পশ্চিমবঙ্গের অশোকনগরসহ প্রায় ১১টি জায়গায় তল্লাশি অভিযান চালিয়ে ইডির একটি টিম পি কে হালদারকে গ্রেপ্তার করে। প্রাথমিক জেরায় ইডির কর্মকর্তারা জানতে পেরেছেন, ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে তিনি ভারতে প্রবেশ করেন। ভারতে এসে পশ্চিমবঙ্গের অশোকনগরেই নাম বদল করে শিবশঙ্কর হালদার পরিচয় দিয়ে থাকতে শুরু করে পি কে এবং এদেশেই রেশন কার্ড, ভোটার কার্ড, প্যান কার্ড এবং আধার কার্ড বানিয়েছিলেন তিনি।

ইডি জেনেছে, বাংলাদেশ, ভারত ও গ্রেনেডা- এই তিনটি দেশের পাসপোর্টের অধিকারী পি কে হালদার। ইডির আইনজীবীও জানান একাধিক দেশের পাসপোর্ট ও সেসব দেশের নাগরিকত্বের নথি পাওয়া গেছে পি কে হালদারের কাছ থেকে। যদিও কোনো একটি মহলের দাবি, তার কাছে কানাডার পাসপোর্টও পাওয়া গেছে। তার বিরুদ্ধে রেড অ্যালার্ট জারি করেছে ইন্টারপোল। প্রশ্ন উঠছে, এই সতর্কতা জারির মধ্যেও কীভাবে পি কে হালদার সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে প্রবেশ করলেন? সাধারণত বাংলাদেশসহ বিদেশ থেকে ভারতে আসা কোনো ব্যক্তিকে ইমিগ্রেশনে পাসপোর্ট দেখানোর পর পাসপোর্ট স্ক্যানিংয়ের পর বায়োমেট্রিক (চোখের মণির ছবি, আঙুলের ছাপ) করা হয়। সেক্ষেত্রে পি কে হালদার তার আসল নাম বদল করে শিবশঙ্কর হলেও সীমান্ত পেরোনোর সময়ই বায়োমেট্রিক করার সময় ওই ব্যক্তির আসল পরিচয় সামনে আসার কথা। তাছাড়া বাংলাদেশে তিনি গ্রেপ্তার হতে পারেন, আগাম এই আশঙ্কার আঁচ করতে পেরেই কোনো একটি প্রভাবশালীর মদতে তিনি ইন্টারপোলের রেড অ্যালার্ট জারির আগেই বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন এবং ভারতে ফিরে অশোকনগরে শিবশঙ্কর নামের আড়ালে বসবাস শুরু করেন। আর সেখানেও পি কে হালদারের মাথার ওপর ছিল প্রভাবশালীদের হাত। কোনো একটি মহল বলছে, ভারত থেকেই ভারতীয় পাসপোর্ট নিয়ে হয়তো তিনি কানাডায় যেতে পারেন। সেক্ষেত্রে শিবশঙ্কর নামেই তিনি কানাডায় গিয়ে থাকতে পারেন।

এদিকে দফায় দফায় জেরায় ইডির কর্মকর্তারা অতিরিক্ত বেশ কিছু নাম পেয়েছেন। সেই সূত্র ধরেই ইডির তদন্তকারী কর্মকর্তারা সেসব জায়গায় গোপনে অভিযান চালাচ্ছেন। সেখান থেকে নথি ও ছবি সংগ্রহ করে পি কে হালদারসহ অন্যদের বয়ানের সঙ্গে মিলিয়ে দেখছেন বলে জানা গেছে। সেক্ষেত্রে ইডির নজরে রয়েছে আরো কয়েকজন ব্যক্তি।
তবে ভারতীয় গোয়েন্দারা মনে করছে, অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের কারণেই গ্রেপ্তার হয়েছেন বাংলাদেশে অর্থ জালিয়াতিতে অভিযুক্ত পি কে হালদার। তদন্তকারীরা বলছেন, তিনি ভেবেছিলেন ভাষা ও পরিবেশ এক হওয়ার কারণে পশ্চিমবঙ্গে থেকে প্রতারণার ফাঁদ চালিয়ে যেতে পারবেন। কিন্তু তাতে বাদ সাধলেন ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা ইডির গোয়েন্দারা। বাংলাদেশ থেকে তার সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার পর এত দ্রুত ধরা পড়ে যাবেন তা স্বপ্নেও ভাবেননি পি কে হালদার।

স্থানীয় সূত্র জানায়, গ্রেপ্তারকৃত পি কে হালদার ও তার সহযোগী সুকুমার মৃধার সঙ্গে উত্তর ২৪ পরগনা জেলার একটি রাজনৈতিক দলের একাধিক নেতা, মন্ত্রী, সাংসদের ঘনিষ্ঠতা ছিল। তাদের সহযোগিতায় অশোকনগরসহ রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় সম্পত্তি গড়ে তোলে তারা। এই রাজনৈতিক সখ্যতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি পশ্চিমবঙ্গে নিজেকে শিবশঙ্কর হালদার নামে পরিচয় দিয়ে ভারতীয় নাগরিকত্ব নেন। জালিয়াতি করে তিনি রেশন কার্ড, ভোটার আইডি কার্ড, প্যান কার্ড ও আধার কার্ড করান। তার সহযোগীরাও একইভাবে জালিয়াতি করে ভারতীয় নাগরিকত্ব নেয়। এসব ভুয়া পরিচয়পত্র কারা তৈরি করে দিয়েছে, তা নিয়েও তদন্ত শুরু করেছে ইডি।

এসআর

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়