মহামানব বুদ্ধের বোধির আলোয়

আগের সংবাদ

সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে বাজার : অবৈধ মজুতদারদের আইনের আওতায় আনুন

পরের সংবাদ

লঙ্কার পতন বাংলাদেশে ‘নয়া’ কিছু উত্থানের সম্ভাবনা কতটুকু

আহমেদ আমিনুল ইসলাম

অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশিত: মে ১৫, ২০২২ , ২:২০ পূর্বাহ্ণ আপডেট: মে ১৫, ২০২২ , ২:২০ পূর্বাহ্ণ

ব্যক্তিগত জীবনে রনিল বিক্রমাসিংহে ৬ষ্ঠ বারের মতো শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। এই শপথ ও দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত শ্রীলঙ্কার সমুদয় ভার তার কাঁধে বর্তাল। অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়া হয়ে পড়া দেশটিকে কীভাবে তিনি স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরাবেন সেটিই এখন তার কাছে সবচেয়ে বড় এক চ্যালেঞ্জ। বিশেষত সাধারণের মধ্যে যখন বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়, আইনের শাসন যেখানে সুদূরপরাহত, শান্তি বজায় রাখতে যেখানে সেনাবাহিনী সক্রিয় রয়েছে সেরূপ পরিস্থিতিতে যে কোনো দেশেই শান্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠা অত্যন্ত কঠিন কাজ। ইতোমধ্যে শ্রীলঙ্কার নতুন প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহে ‘জাতীয় ঐক্যের সরকার’ গঠনের কাজ শুরু করেছেন বলে জানা গেছে। রনিলের দায়িত্ব গ্রহণ এবং জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের উদ্যোগেও সাধারণের ক্ষোভ প্রশমিত হয়নি। সাধারণ মানুষ দেশব্যাপী প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপাকসেসহ তার সব সহযোগীর পদত্যাগের দাবিতে অনড় অবস্থান নিয়েছে। তাদের বিশ্বাস গোটাবায়া রাজাপাকসে এবং তার সহযোগীরাই শ্রীলঙ্কার বর্তমান ভয়াবহ বিপর্যয়ের জন্য দায়ী। তাই তারা রনিলের দায়িত্ব গ্রহণের পরও প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপাকসেসহ তার ঘনিষ্ঠদের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন।
এরূপ অবস্থায় বিক্রমাসিংহের অতীত অভিজ্ঞতা বর্তমান সংকট মোকাবিলায় কতটুকু কার্যকর হবে তাই লঙ্কাবাসীর মতো আমরাও দেখার আশায় আছি। শ্রীলঙ্কা পুনরায় আত্মমর্যাদা পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে স্থিতিশীল হোক এটাই আমাদের কাম্য। পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যে শান্তি ফিরে আসুক আমরা তাও চাই। মাহিন্দা রাজাপাকসের পদত্যাগ এবং পদত্যাগ-পরবর্তী নানা ইস্যুতে বিভিন্ন স্থানে সরকারের মন্ত্রী, এমপিদের সঙ্গে সাধারণের বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক স্থানে সহিংসতার ঘটনাও ঘটেছে, ঘটেছে অগ্নিসংযোগের মতো ঘটানাও। ইতোমধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা এবং তদীয় পুত্র নামাল রাজাপাকসেসহ ১৫ জনের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন দেশটির এক আদালত। সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলা করার অভিযোগে মাহিন্দা রাজাপাকসেসহ ১৫ জনের ওপর এ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। অর্থাৎ মাহিন্দা রাজাপাকসের পদত্যাগ এবং রনিল বিক্রমাসিংহের ক্ষমতা গ্রহণের মধ্য দিয়ে শ্রীলঙ্কায় রাজনৈতিক এক পরিবর্তনও ঘটল- ক্ষমতার পালাবদল ঘটল।
শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক ও ক্ষমতার পট পরিবর্তনে ‘পরিবর্তন-প্রিয়’ আমাদের দেশের এক শ্রেণির মানুষের মনের মধ্যেও এক ধরনের পরিবর্তনের সুপ্ত আকাক্সক্ষা প্রকাশমান হয়ে উঠতে দেখা যাচ্ছে। তারা কথায় কথায় শ্রীলঙ্কার মতোই বাংলাদেশের ‘সম্ভাব্য পরিণতি’ ঘটবে বলেও নানাভাবে জনমনে একটা আতঙ্ক তৈরিরও অবকাশ পাচ্ছেন। উপরন্তু তাদের হাব-ভাব, আকার-ইঙ্গিত ও কথা-বার্তায় এমনই মনে হয় যে, শ্রীলঙ্কা দেউলিয়া হয়েছে কিন্তু তার আগে বাংলাদেশ কেন দেউলিয়া হলো না- সে জন্য পরোক্ষ আফসোসও যেন তাদের কুরে কুরে খাচ্ছে! এই আফসোসই অনেকের মধ্যে স্পষ্ট! শুধু যে আফসোসই স্পষ্ট তাও নয়- তাদের মধ্যে এক ধরনের অপেক্ষাও স্পষ্ট। ভাবখানা এমনই যে, শ্রীলঙ্কার তো পতন হয়েই গেছে, বাংলাদেশের হাতেও সময় আর বেশি দিন নেই! ‘বাংলাদেশ’ বলতে এসব উৎসাহী মানুষ আসলে যে আওয়ামী লীগকেই বুঝিয়ে দেয়ার চেষ্টায় তৎপর তাও স্পষ্ট। সোজাসাপ্টা বলতে গেলে তাদের মতে আওয়ামী লীগের হাতের সময়ও ফুরিয়ে আসছে! আসলে এই শ্রেণির মানুষের মধ্যে এক প্রকার বিকৃত মানসিক উল্লাস করছে। সেই উল্লাসেই তারা এমনও অনুভব করছেন যে, তাদের অপেক্ষার প্রহরও যেন শেষ হয়ে আসছে- ক্ষমতার মসনদে বসতে আর যেন দেরিও নেই! আমরা যদি বছরখানেক পেছনে ফিরে তাকাই তবে দেখতে পাব আফগানিস্তানে তালেবান রাজত্ব কায়েম হলেও এ জাতীয় মানসিক বিকারগ্রস্তরা বাংলাদেশে কল্পিত পরিবর্তনের আশায় সুখের সুড়সুড়ি অনুভব করেছিলেন। বিএনপি রাজনৈতিকভাবে এ দেশে কতটা সাফল্য অর্জন করতে পেরেছে তা নির্দিষ্ট করে বলতে না পারলেও মানুষের মানসিক বৈকল্য সৃষ্টিতে যে মোটামুটি ব্যাপক সাফল্য লাভ করেছে তা মাঝেমধ্যে এরূপ নানা ঘটনায় প্রমাণ পাওয়া যায়! অর্থাৎ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা-পরবর্তী সময়ে দীর্ঘ ২১টি বছরে বিএনপি এবং তারই ‘পলিটিক্যাল ফটোকপি’ জাতীয় পার্টি তাদের স্ব-স্ব শাসন মেয়াদে এ দেশের মানুষের মনো-জাগতিক পরিবর্তন ঘটায়। তাদের স্ব-স্ব দলীয় এই সাফল্য বাংলাদেশকে প্রগতিশীলতার চর্চায়, সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধির বিবেচনায় এবং মানসিকভাবে অনেক পশ্চাৎপদ করে দেয়। বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী শাশ্বত মননের জগৎটিকে তারা একেবারে ছিন্নভিন্ন করে দেয়! সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ‘হারমোনি’ তারা একেবারে বিনষ্ট করে দেয়। বিনষ্ট করে দেয় বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনাবোধ এবং জাতীয়তাবাদী আদর্শকেও। বাঙালিকে চিত্ত ও বৈভবে আমূল পরিবর্তনের মাধ্যমে একেবারে দেউলিয়া করে দেয়। মাহিন্দা রাজাপাকসের সরকার শ্রীলঙ্কাকে আজ যেমন অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়া করেছে তেমনি বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিল্পসংস্কৃতি ও চিন্তনের ক্ষেত্রে দেউলিয়া করেছে বিএনপি-জামায়াত ও জাতীয় পার্টির রাজনৈতিক দর্শন- যা এখনো বাঙালিকে মানসিকভাবে পীড়ন করেই চলেছে! ‘আত্মহারা’ কিংবা দিশাহারা বাঙালি বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আত্ম-অনুসন্ধানসহ আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নিয়োজিত আছে।
করোনা মহামারির কবল থেকে বিশ্বব্যাপী মানুষ যখন মুক্তি পেতে যাচ্ছিল সে রকম পরিস্থিতির মধ্যে ইউক্রেনের সঙ্গে অনেকটা একতরফা যুদ্ধ ঘোষণা করে রাশিয়া। অনাকাক্সিক্ষত এই যুদ্ধ প্রকৃতপক্ষে রাশিয়ার অনৈতিক, অমানবিক এবং অসঙ্গত আচরণেরই বহিঃপ্রকাশ। রাশিয়ার একগুঁয়ে মানসিকতার কারণে এই যুদ্ধ- ন্যাটোর সঙ্গে ইউক্রেনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আসলে অজুহাত মাত্র। যুদ্ধ সর্বত্র সাধারণত রাজনৈতিক মতাদর্শ, ক্ষমতা কিংবা দখলের লড়াইরূপে বিবেচিত হলেও রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে সংঘটিত যুদ্ধ রাজনীতির চেয়ে অর্থনীতিকেই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাকে চরম সংকটের মুখে ফেলে দিয়েছে। বিগত আড়াই বছর বিশ্বের সর্বত্র অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে কোভিড-১৯ যেমন শক্তিশালী নিয়ামক হিসেবে কার্যকর ছিল বর্তমানে সেই স্থানটি দখল করেছে রাশিয়া-ইউক্রেনের অকারণ যুদ্ধ! এই যুদ্ধের ফলেই চাল, ডাল, ফল-মূল, আটা, ময়দা, ভোজ্য ও জ্বালানি তেলসহ ডলারের মূল্যেও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করেছে। ডলারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আমাদের টাকার মানও কমাতে হয়েছে। ভারতও তার রুপির মূল্যমান কমাতে বাধ্য হয়েছে। অনেক দেশকে এখন এ পথেই হাঁটতে হবে। করোনা এবং পরবর্তী সময়ের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ মূলত আন্তর্জাতিক বাজার ব্যবস্থাপনাকে ধ্বংস করে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজার মূল্যের প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে। এ রকমই অস্থিতিশীল এক পরিবেশে ‘শ্রীলঙ্কার পরিস্থিতিকে পুঁজি করে একটি মহল নানা রকমের গুজব ছড়াচ্ছে’ বলে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের অভিযোগ করেছেন। তার এই অভিযোগ একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না।
সম্প্রতি বিএনপি নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ও সরকারকে শ্রীলঙ্কা থেকে শিক্ষা নেয়ার কথা বলে মূলত আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা ছাড়ারও আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘শ্রীলঙ্কা সরকারের অবস্থা থেকেও যদি বর্তমান সরকারের শিক্ষা না হয়, তাহলে বুঝতে হবে তাদের পরিণতিও ভয়াবহ হতে পারে। […] আমরা চাই, তারা ভালোভাবে প্রস্থান করুক। পদত্যাগ করুন, নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে।’ তিনি আরো বলেছেন, ‘যারা এই সরকারের নির্বাচনী ফাঁদে পা দিবে তাদের ঘেরাও করতে হবে, সব সময় নজরে রাখতে হবে। কেউ এই সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাবে না।’ গণতন্ত্রচর্চার কথা বললেও গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের নির্বাচন বয়কটের এমন হুঁশিয়ারি এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নির্বাচনে ইচ্ছুক ব্যক্তি বা দলের প্রতি ঘেরাও করার হুমকি কতটুকু গণতান্ত্রিক চেতনাপুষ্ট তা আমাদের প্রশ্নবিদ্ধই করে না বরং তার এবং তার দলীয় স্বৈরতান্ত্রিক আচার-আচরণের মানসিকতাকেও মূর্ত করে তোলে। প্রকৃতপক্ষে বিএনপি গণতন্ত্রচর্চায় কতটা আগ্রহী এবং প্রত্যয়ী তা গয়েশ্বর চন্দ্রসহ বেশ কিছু নেতাকর্মীর দম্ভোক্তির মাধ্যমে সাধারণ মানুষ উপলব্ধি করতে পারেন। ১২ মে ঢাকা মহানগর বিএনপির উত্তর-দক্ষিণ মহানগরের উদ্যোগে আয়োজিত জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশে গয়েশ্বর চন্দ্র এসব কথা বলেন। উপরন্তু, তিনি এও বলেন যে, ‘আর কোনো প্রতিবাদ নয়, হামলা হলে প্রতিরোধ নয়। হামলার বদলে হামলা, আঘাতের পর আঘাত করতে হবে। পোশাকে কিংবা সিভিলে যারাই আমাদের ওপর হামলা করবে তাদের বিরুদ্ধে পাল্টা হামলা, পাল্টা আঘাত করে প্রতিরোধ করব। কাউকে ছাড় দেয়ার সময় নেই’ (নয়া গিদন্ত, অনলাইন, ১২/০৫/২২ ১৩:৩২)।
শ্রীলঙ্কায় বৃষ্টি দেখে এখানে ছাতা ধরার মানসিকতা থেকে সাধারণকে মুক্ত থাকতে হবে। শ্রীলঙ্কায় অর্থনৈতিক বিপর্যয় হঠাৎ আসেনি। পর্যটনভিত্তিক অর্থনীতির দেশ শ্রীলঙ্কা করোনা অতিমারির জন্য বিগত আড়াই বছরে তিলে তিলে দেউলিয়াত্বের দিকে পতিত হয়েছে। বিদেশি ঋণে গড়ে তোলা পর্যটনভিত্তিক মেগা প্রকল্পগুলোর ঋণ সমন্বয়ে করতে পারেনি। উপরন্তু বিস্তর গবেষণা ব্যতিরেকে রাসায়নিক সার ব্যবহার বন্ধের ফলে কৃষি খাতও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছিল সেখানে। ফলে সেখানে বিপর্যয় বিভিন্ন দিক থেকেই এসেছে। বিদেশি ঋণে বাংলাদেশে এমন কোনো মেগা প্রকল্প নেই যেখানে ঋণ-সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। তাছাড়া রেমিট্যান্সের প্রবাহসহ বাংলাদেশে রিজার্ভ সংকটের আশঙ্কাও নেই। তাই সব কিছুতেই শ্রীলঙ্কার সঙ্গে তালগোল পাকিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করা থেকে সংশ্লিষ্টদের বিরত থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে, লঙ্কার পতন হলেই এ দেশে অগণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচনবিহীন ‘নয়া’ কিছু উত্থানের স্বপ্ন মিথ্যা মরীচিকা মাত্র!

আহমেদ আমিনুল ইসলাম : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়