অঙ্কনের মৃত্যু তদন্ত হওয়া দরকার

আগের সংবাদ

লঙ্কার পতন বাংলাদেশে ‘নয়া’ কিছু উত্থানের সম্ভাবনা কতটুকু

পরের সংবাদ

মহামানব বুদ্ধের বোধির আলোয়

দিলীপ কুমার বড়ুয়া

কলাম লেখক ও সাহিত্যসেবী

প্রকাশিত: মে ১৫, ২০২২ , ২:২০ পূর্বাহ্ণ আপডেট: মে ১৫, ২০২২ , ২:২০ পূর্বাহ্ণ

করোনাকালীন বৈশ্বিক মহামারি ও মহাসংকটের এ ক্রান্তিকাল পৃথিবীর মানব জাতির কাছে সব থেকে বড় দুঃসময়। মানুষ সম্মুখীন হয়েছেন এক অদৃশ্য পরজীবীর মারণবাণে। একটা আণুবীক্ষণিক ভাইরাস মৃত্যুকূপে অগণন মানুষের লাশের ওপর বহ্নি উৎসবে মেতে উঠেছিল এবং মানুষের জীবনযাত্রার গতিকে স্থবির করে দিয়েছিল। কফিনের লাইন, গণকবর, সারি সারি চিতার আগুনের লেলিহান শিখার দহনের এমন দৃশ্য বিশ্ব অবলোকন করেছে। এমনই এক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আমরা শঙ্কায় অতিক্রম করেছি জীবনের প্রতিটা ক্ষণ। প্রতিটি দিনকে মনে হতো ভয়ংকরতম দিন। এমন আতঙ্ক ও সংকট যেন আগে কখনো প্রত্যক্ষ করেনি কেউ। এমনি এক বৈরী সময় পার করে এক কঠিন সময়ের আবর্তনে সংঘাতময়, আগ্রাসন কবলিত ও অসহিষ্ণু বিশ্বে এলো বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের এবারের বুদ্ধ পূর্ণিমা। করোনাক্রান্তিকালে গত দুই বছরের বুদ্ধ পূর্ণিমা উদযাপিত হয়েছে ঘরবন্দি আড়ম্বরহীন।
বুদ্ধ পূর্ণিমা মহামানব গৌতম বুদ্ধের জীবনের ত্রয়ী ঘটনার সমারোহে অবিস্মরণীয় ও মহিমান্বিত। এ পূর্ণিমা তিথিতেই গৌতম বুদ্ধের জন্ম, সম্বোধি ও মহাপরিনির্বাণ ঘটেছিল। এবারের বুদ্ধ পূর্ণিমা তিথিতে মহামানব সিদ্ধার্থ গৌতমের এ ত্রিস্মৃতি বিজড়িত পুণ্যদিনে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বিশ্বের সব জীবের মঙ্গলময় জীবন কামনা করছি এবং বৈশ্বিক মহামারিকে অতিক্রম করে বিশ্ববাসী সুখী ও সমৃদ্ধশালী হোক, দুঃখমুক্ত হোক এবং বাংলাদেশের জয়যাত্রা অব্যাহত থাকুক।
এ পৃথিবী যখন অনাচার-পাপাচারে নিমজ্জিত হয়েছিল, মানুষে মানুষে ভেদাভেদ, জাত-পাতের চরম বৈষম্য, ধর্মের নামে প্রাণযজ্ঞ আর পরশ্রীকাতরতা ও হিংসা-বিদ্বেষে মানুষ যখন হিংস্র হয়ে উঠেছিল ঠিক তখনই জগতের কল্যাণে এবং মানুষকে জীবনের সঠিক পথের দিশা দেখাতে, জীবের দুঃখমোচনে এক বৈশাখী পূর্ণিমায় ২০ অসংখ্য কল্প ধরে দশ পারমী, দশ উপ-পারমী ও দশ পরামার্থ পারমী পূরণ করে সিদ্ধার্থ গৌতম জন্মগ্রহণ করেছিলেন দুঃখমুক্তির বার্তা নিয়ে। রাজ পরিবারে জন্মগ্রহণ করে ও সংসারের ভোগবিলাস ত্যাগ করে রাজপ্রাসাদ ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছিলেন সাধারণ মানুষের মুক্তির উপায় খুঁজতে। সংসার চক্রের আবহমান জন্ম-মৃত্যুর ঘূর্ণায়মান চক্রব্যূহের আদি-অন্তের সন্ধান ও মুক্তির পথ নির্মাণে তিনি বনের গহিনে সুদীর্ঘ ৬ বছর কঠোর সাধনা করেন, অন্বেষণ করেন মানবমুক্তির প্রকৃত পথ। অবশেষে নিরঞ্জনা নদী-তীরবর্তী অশ্বত্থ বৃক্ষতলে ৩৫ বছর বয়সে বৈশাখী পূর্ণিমার জোছনা আলোকিত রাতে উপলব্ধির সর্বোচ্চ পর্যায়ে জগৎ আলো করে মানবমুক্তির পথ আবিষ্কার করেন মহামতি গৌতম। লাভ করলেন বুদ্ধত্ব। অবগত হন জন্ম-মৃত্যুর তত্ত্ব, দুঃখরাশির উদয়-বিলয়। অবিদ্যা বা অজ্ঞান ও তৃষ্ণাকে মূল কারণ হিসেবে বর্ণনা করে তার থেকে পরিত্রাণের জন্য সাধনায় মগ্ন অবস্থায় তিনি উদ্ভাবন করেন চার আর্যসত্য ও আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ। হৃদয়ের গভীর গহন তলদেশ থেকে উঠে এসেছে ঢেউ জাগানিয়া এক অকৃত্রিম আবেশ- একটি বিচ্ছুরিত আলোর উষ্ণতা এবং তার উৎসারিত চেতনা- দুঃখ মুক্তির মহাসত্যের সন্ধান। বিশ্বমানবতার বিজয় কেতন ওড়ানোই ছিল তার অভিলাষ। জীবের কল্যাণে স্বোপার্জিত সম্বোধির স্ফূরিত বাণী ছড়িয়েছেন বিশ্বময়। তিনি ৪৫ বছর ধর্মপ্রচার করেন। বুদ্ধের কল্যাণের অমিয়বাণীর বহমান স্রোতধারায় মানুষ দুঃখ মুক্তির পথের দিশা খুঁজে পায়। তার বাণী মানুষকে প্রলুব্ধ করেছিল পরিশুদ্ধ এবং শান্তিময় জীবন প্রতিষ্ঠায়। তার মৈত্রী, আর অহিংসা মন্ত্রের প্রতীতিতে মানুষের চেতনার সম্প্রসারণ ঘটে। বুদ্ধ মানুষকে মানুষ এবং প্রাণীকে প্রাণী হিসেবে দেখতেন এবং সব প্রাণসত্তার মধ্যেই যে কষ্টবোধ আছে তা তিনি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতেন। তার সাধনা ও সুখ কামনা ছিল সব প্রাণীর জন্য। মানুষ থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র প্রজাতির কীটপতঙ্গ পর্র্যন্ত সবার সুখ কামনা করার মতো উদার শিক্ষা তিনি দিয়েছেন। বুদ্ধ নিজে যা আচরণ করতেন, তা জীবজগৎকে শিক্ষা দেয়ার চেষ্টা করতেন। এ জন্যই প্রায়োগিক জীবনে বুদ্ধের সর্বজনীন ও বিশ্বমৈত্রীর এই শিক্ষাকে প্রতিফলন ঘটানোর বিকল্প নেই। বুদ্ধ ছিলেন জীবের মঙ্গল কামনায় অবিচল। তার চেতনায় ছিল দুঃখ জয়ের মাধ্যমে জীবের মুক্তি কামনা। তিনি চতুরার্য সত্য তত্ত্বে জীবনে দুঃখ, দুঃখের উৎপত্তি, দুঃখ ভোগের কারণ এবং তা থেকে মুক্তির পথ দেখান। দুঃখ মুক্তি ও শান্তির জন্য বুদ্ধ যে মোক্ষ পথরেখা আবিষ্কার করেছিলেন তা আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ বা আটটি আর্যপথ নামে অভিহিত। বুদ্ধের সেই আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ- সম্যক দৃষ্টি, সম্যক সংকল্প, সম্যক বাক, সম্যক কর্ম, সম্যক জীবিকা, সম্যক ব্যায়াম, সম্যক স্মৃতি ও সম্যক সমাধি নীতিগুলোর মধ্যেই রয়েছে জীবনের পরিপূর্ণতার সঠিক দিকনির্দেশনা। বুদ্ধ মানবের মাঝে সঞ্চারিত করেছেন তার অমিয়বাণী- যে বাণী মৈত্রীর, যে বাণী অহিংসার, যে বাণী সর্বজনের কল্যাণের। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর চমৎকারভাবে উপলব্ধি প্রকাশ করেছেন- নাগিনীরা চারিদিকে ফেলিতেছে বিষাক্ত নিঃশ্বাস, শান্তির ললিত বাণী শোনাইবে ব্যর্থ পরিহাস! বর্তমান বিশ্বের সর্বত্রই দেখা যাচ্ছে হানাহানি-মারামারি, অহিংসার বিপরীতে সহিংসতা, সন্ত্রাস, বর্বরতা। দেশে-দেশে, জাতিতে-জাতিতে চরম অসহিষ্ণুতা-সংঘাত বিরাজ করছে। মানুষের সমাজ জীবন, ব্যক্তি জীবন থেকে শান্তি তিরোহিত হচ্ছে। আমাদের জাতীয় জীবনেও অস্থিরতা বিরাজ করছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভূতপূর্ব উন্নতি তথা চতুর্থ শিল্পের এ যুগে সভ্যতার বিস্ময়কর আবিষ্কার আর উদ্ভাবনের ক্রম সম্প্রসারণ ও মানুষের দর্শন-মনন-প্রজ্ঞার অপরিসীম উন্নয়ন ঘটেছে। পাশাপাশি মানুষে মানুষে হিংসা, দুর্নীতি, দুর্বৃত্তায়ন, আগ্রাসন। অভাবনীয় স্খলন-পতন-বিভেদ-বিদ্বেষ-বিপর্যয়-বীভৎস কার্যকলাপ ইত্যাদি তামসিক উন্মাদনায় শুভচেতনা, নৈতিক মূল্যবোধ, মানবিকতা মুখ থুবড়ে পড়েছে। ক্রমশ নিষ্ঠুরতম অমানবিক কর্মযজ্ঞে মানবজাতি বেশি পরিমাণে উৎসাহী হয়ে পড়েছে। রক্তলোলুপ জিঘাংসু বাহিনীর বর্বরোচিত সন্ত্রাস-প্রতিসন্ত্রাসে সভ্যতার শরীরজুড়ে রক্তের আলপনা, মানুষরূপী আগ্রাসী নরপিশাচ খামচে ধরেছে শুভ্র সুন্দর ধরিত্রীর অবয়ব। বৃহৎ রাষ্ট্রগুলো অত্যাধুনিক নতুন নতুন মারণাস্ত্র তৈরি করে সমগ্র বিশ্বকে হুমকির সম্মুখীন করে রেখেছে। এ নিত্যনতুন পারমাণবিক মারণাস্ত্রের আবিষ্কারে মানবসভ্যতা হুমকির সম্মুখীন। রাষ্ট্রগুলোর আগ্রাসী ভূমিকায় আজ বিশ্বব্যাপী যুদ্ধংদেহী ভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। এ মুহূর্তে প্রশ্ন জাগে মনে- এ আমরা কোন সভ্যতায় বসবাস করছি। একবিংশ শতকে আমরা কি এ আধুনিক প্রযুক্তি সমৃদ্ধ সভ্যতার কাছে চরম নৃশংসতা প্রত্যাশা করেছি। এর জবাব কি আছে? সংঘাত-সহিংসতায় নিমজ্জিত গোটা পৃথিবীর নিরাপত্তা বর্তমান সময়ে বিপন্ন। সাম্প্রতিক সময়ে আগ্রাসনে নির্যাতিত ইউক্রেনের জনগণের আহাজারি বিশ্ব দেখেছে। উন্মত্ত হিংস্র থাবায় পৃথিবীজুড়ে আজ রক্তের হোলিখেলা চলছে। মানবিকতা ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে। চরম নিরাপত্তাহীনতায় শঙ্কা নিয়ে মানুষ পৃথিবীতে প্রতিটা দিনক্ষণ পার করছে।
বিশ্বে বুদ্ধের বাণীসমগ্র কোনো বিশেষ সম্প্রদায় বা গোষ্ঠীর জন্য নয়। পৃথিবীর সমগ্র প্রাণিকুলের জন্য এ ধর্ম। বুদ্ধ মানবতার মুক্তি সাধনে অজেয় এবং একজন শ্রেষ্ঠ মানবতাবাদী। বিশ্বের এ ক্রান্তিলগ্নে বুদ্ধের আদর্শ অনুসরণের কোনো বিকল্প নেই। তাই প্রাত্যহিক জীবনে সবাইকে প্রার্থনামুখী হওয়ার পাশাপাশি বৌদ্ধিক আচরণ তথা বাস্তব ও অনুশীলনমুখী হতে হবে। এ বিক্ষুব্ধ সময়ের প্রেক্ষাপটে বুদ্ধের প্রতিটি বাণীই হবে একমাত্র শান্তির। বুদ্ধের অহিংস বাণীই দিতে পারে শুদ্ধ চেতনার পরশ। বুদ্ধের অহিংস নীতিকে অনুধাবন করলে বিশ্বে শান্তি স্থাপন সম্ভব। শান্তি প্রতিষ্ঠায় মহামতি বুদ্ধের দর্শন ও জীবনাদর্শ অনুকরণীয়। অহিংস চেতনার বুদ্ধের এ বাণী, চিরকালীন শুভ্র মানস-ভাবনা হিংসায় উন্মত্ত পৃথিবীর বুকে ছড়িয়ে পড়–ক সর্বজীবের কল্যাণে। গৌতম বুদ্ধ নিজের জীবন গড়ে তুলেছিলেন কঠোর তপস্যায়, কৃচ্ছ্রসাধন এবং মধ্যমপন্থায় এক মহৎ জীবনবীক্ষণের বোধ এবং উপলব্ধিকে সঙ্গে নিয়ে। তার কর্মযজ্ঞ সবাইকে শুদ্ধ চেতনায় জাগ্রত করবে অনাদিকাল। গৌতম বুদ্ধের অহিংসা মন্ত্র আর অষ্টমার্গের মর্মবাণী ধারণ করে মানুষ আরো বেশি মানবিক হয়ে উঠবে, মানুষে মানুষে হানাহানি বন্ধ হয়ে সৌহার্দ প্রতিষ্ঠিত হবে বুদ্ধ পূর্ণিমায় সেই দর্শনটুকু ছড়িয়ে পড়–ক মানুষের মাঝে। মৈত্রীর মেলবন্ধনে হিংসা নয় প্রেম, যুদ্ধ নয় শান্তির মঙ্গলধ্বনি অনুরণিত হবে পৃথিবীময়।

দিলীপ কুমার বড়ুয়া : কলাম লেখক ও সাহিত্যসেবী।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়