হাইকোর্ট ডিভিশনের রায় ও নন্দকুঁজা নদী

আগের সংবাদ

ইউক্রেন নিয়ে কী খেলা চলছে?

পরের সংবাদ

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ : সুলভ মূল্যে নিত্যপণ্য বিক্রয় ইতিবাচক

মো. সামছুল আলম

কৃষিবিদ ও কলাম লেখক

প্রকাশিত: এপ্রিল ১১, ২০২২ , ১২:৩১ পূর্বাহ্ণ আপডেট: এপ্রিল ১১, ২০২২ , ১২:৩১ পূর্বাহ্ণ

এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী, মজুতদার, মুনাফালোভী চক্রের কারসাজিতে রমজান মাসে মাছ, মাংস, ডিম, দুধ থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় নিত্যপণ্যের দাম বাড়ে। এ মাসে প্রাণিজ আমিষের বাজারেও যখন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, ঠিক তখনই সুলভমূল্যে মানুষের প্রাণিজ আমিষের চাহিদা মেটাতে সরকারের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এক মহৎ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এ উপলক্ষে গত ৩ এপ্রিল রাজধানীতে সুলভ মূল্যে দুধ, ডিম, পোলট্রি ও মাংসের ভ্রাম্যমাণ বিক্রয় কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়েছে। পহেলা রমজান থেকে ১০টি স্থানে শুরু হলেও বর্তমানে রাজধানীর ১৩টি বিভিন্ন স্থানে ২৮ রমজান পর্যন্ত এই বিক্রয় কার্যক্রম চালু থাকবে। এ কার্যক্রমের আওতায় প্রতিটি ভ্রাম্যমাণ গাড়িতে পাস্তুরিত তরল দুধ প্রতি লিটার ৬০ টাকা, গরুর মাংস প্রতি কেজি ৫৫০ টাকা, খাসির মাংস প্রতি কেজি ৮০০ টাকা, ড্রেসড ব্রয়লার মুরগি প্রতি কেজি ২০০ টাকা, ডিম প্রতি হালি ৩০ টাকা দরে বিক্রি করা হচ্ছে। এতে জনগণের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। ফলে প্রাণিজ আমিষের ঘাটতি কিছুটা পূরণ হবে।
রাজধানীর সচিবালয়সংলগ্ন আবদুল গণি রোড, খামারবাড়ি গোল চত্বর, মিরপুর ৬০ ফুট রাস্তা, আজিমপুর মাতৃসদন, পুরান ঢাকার নয়াবাজার, আরামবাগ, নতুন বাজার, মিরপুরের কালশী, সেগুনবাগিচা, খিলগাঁও, এলেনবাড়ী, যাত্রাবাড়ী ও জাপান গার্ডেন সিটিসহ মোট ১৩টি স্থানে ভ্রাম্যমাণ গাড়িতে করে এসব পণ্য বিক্রি হচ্ছে। গরুর মাংস, খাসির মাংস, পোলট্রি, দুধ ও ডিমের সরবরাহ বৃদ্ধির পাশাপাশি সাপ্লাই চেইন সচল রেখে মূল্য স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্যে এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। রমজান মাসে জনসাধারণ যেন সহজে প্রাণিজ আমিষ ও পুষ্টির চাহিদা মেটাতে পারে, সে লক্ষ্যে ব্যবসায়ী-উৎপাদনকারী-সাপ্লাই চেইনসংশ্লিষ্ট সবাইকে সঙ্গে নিয়ে মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর এই ভ্রাম্যমাণ বিপণন ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করছে। প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্প ভ্রাম্যমাণ এ বিক্রয় কার্যক্রমে সার্বিক সহযোগিতা দিচ্ছে। সুলভ মূল্যে বিক্রির পাশাপাশি যে পরিবহনগুলোয় এই পণ্য বিতরণ করা হচ্ছে, সেগুলো যাতে স্বাস্থ্যসম্মত ও মানসম্মত হয়, পণ্যে যাতে ভেজাল না থাকে, পণ্য যাতে মেয়াদোত্তীর্ণ না হয়, পণ্য যাতে অস্বাস্থ্যকর ও জীবাণুযুক্ত না হয়, সে জন্য মন্ত্রণালয়, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর এবং এলডিডিপি প্রকল্প নিয়মিত মনিটরিং করছে। বিক্রির প্রথম দিন ১০টি গাড়িতে এক হাজার কেজি গরুর মাংস, ৪২ কেজি খাসির মাংস, ব্রয়লার ২৫০ পিস (প্রতিটি এক কেজি করে), এক হাজারটি ডিম ও ২ হাজার লিটার দুধ বিক্রি করা হয়েছে। এ ধরনের উদ্যোগে ব্যাপক সাড়া পাওয়ায় ১০টি গাড়িতে এক হাজার কেজি মাংসের পরিবর্তে দেড় হাজার কেজি দেয়ার পরিকল্পনা করছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। ব্রয়লার মুরগির চাহিদা ধারণার চেয়ে বেশি হওয়ায় ব্রয়লার মুরগিও ৫০০ কেজি সরবরাহ করা হবে। হাঁসের মাংস ১৫০ কেজির পাশাপাশি এখন থেকে তিন হাজার লিটার দুধও সরবরাহ করা হবে। একই সঙ্গে ২০ হাজার ডিম বিক্রয় করা হবে। তবে নিয়ম অনুযায়ী লাইনে দাঁড়ানো প্রত্যেক ব্যক্তি সর্বোচ্চ এক কেজি গরু বা খাসির মাংস, এক কেজি মুরগির মাংস, ডিম এক ডজন, দুই লিটার দুধ কিনতে পারবেন। গত বছর রমজান মাসে মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এলডিডিপি প্রকল্প এবং ডেইরি ও পোলট্রি এসোসিয়েশনের সহযোগিতায় সুলভ মূল্যে দুধ, ডিম ও মাংসের ভ্রাম্যমাণ বিক্রয় ব্যবস্থায় ৩৪ কোটি ৮৫ লাখ ৮৬ হাজার ৪৭ টাকার পণ্য বিক্রি করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ৪৭ লাখ ৩১ হাজার ৩১০ জন ভোক্তা ও ৮১ হাজার ৩৭৭ জন খামারি সরাসরি উপকৃত হয়েছেন।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ঐকান্তিক ইচ্ছায় এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থার নিরলস প্রচেষ্টার মাধ্যমে আজ বাংলাদেশ মাংস ও ডিম উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ বলে এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে। বাংলাদেশে উৎপাদিত মাংস ও ডিম এখন দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানির পর্যায়ে পৌঁছেছে। পুষ্টি ও আমিষের চাহিদা মেটানো, বেকারত্ব দূর করা, কর্মোদ্যোক্তা তৈরি করা এবং নতুন আঙ্গিকে গ্রামীণ অর্থনীতি সচল রাখার ক্ষেত্রে প্রাণিসম্পদ খাত ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। দেশের মোট জিডিপির ৫ দশমিক ০১ শতাংশ এবং কৃষিজ জিডিপির ৩৭ দশমিক ১৯ শতাংশ মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান। এর মধ্যে মোট কৃষিজ জিডিপিতে প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান শতকরা ১৩ দশমিক ১০ ভাগ। স্থিরমূল্যে ২০২০-২১ অর্থবছরে জিডিপিতে প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান শতকরা ১ দশমিক ৪৪ ভাগ। প্রবৃদ্ধির হার শতকরা ৩ দশমিক ৮০ ভাগ এবং জিডিপির আকার প্রায় ৫০ হাজার ৩০১ দশমিক ৩ কোটি টাকা (বিবিএস-২০২১)। জনসংখ্যার প্রায় শতকরা ২০ শতাংশ প্রত্যক্ষ এবং শতকরা ৫০ ভাগ পরোক্ষভাবে প্রাণিসম্পদ খাতের ওপর নির্ভরশীল।
প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি খাতকে আরো সমৃদ্ধ করতে বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতায় প্রাণিসম্পদ খাতে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রকল্প ‘প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন’ প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ প্রকল্পের কার্যক্রম নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছেন। প্রাণিসম্পদ খাতের উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রকল্পের আওতায় করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত ৫ লাখ ৯৭ হাজার ২৪৯ জন খামারির প্রায় ৭শ কোটি টাকা নগদ প্রণোদনা দেয়া হয়েছে। এছাড়া প্রকল্প এলাকায় ৪ হাজার ২শ প্রাণিসম্পদ সেবা প্রদানকারী (এলএসপি) নির্বাচন করা হয়েছে। ১ হাজার ৫শ খামারিকে মিল্ক ক্রিম সেপারেটর মেশিন দেয়া হয়েছে। এছাড়া ১ লাখ ৪৯ হাজারের অধিক খামারিকে যুক্ত করে ৪ হাজার ৫৯৭টি প্রডিউসার গ্রুপ তৈরি করা হয়েছে। এর আওতায় প্রাণী চিকিৎসা খামারির দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার জন্য ৩৬০টি মোবাইল ভেটেরিনারি ক্লিনিক ক্রয় করা হয়েছে। এর মধ্যে ৬১টি বিতরণ করা হয়েছে। বাকি ২৪১টি জুন ২০২২-এর মধ্যে বিতরণ করা হবে। এতে প্রাণিসম্পদ খাতে উৎপাদন আরো বৃদ্ধি পাবে।
এ প্রকল্পের অধীনে সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় সøটার হাউস তৈরি করা হবে। একই সঙ্গে প্রাণিসম্পদ সম্প্রসারণ নীতিমালা, প্রাণিসম্পদ বিমা নীতি প্রণয়ন, প্রাণীদের নিবন্ধন ও পরিচিতি দেয়ার সিস্টেম ও ডাটাবেজ উন্নয়নের কাজ চলছে। আর এসব উদ্যোগের জন্যই প্রাণিসম্পদ খাতে বিপ্লব এসেছে। এখন কোনো প্রাণী আর আমদানির প্রয়োজন হচ্ছে না। অবৈধভাবে যেন কোনো প্রাণী আমদানি না করা হয় সে বিষয়েও মন্ত্রণালয় ব্যবস্থা নিচ্ছে।
মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন দপ্তর বা সংস্থার নিরলস প্রচেষ্টার কারণে ২০০৮-০৯ অর্থবছরে যেখানে মাংসের উৎপাদন ১০ দশমিক ৮০ লাখ টন ছিল তা বেড়ে ২০২০-২১ অর্থবছরে দাঁড়িয়েছে ৮৫ দশমিক ৪১ লাখ টন, দুধের উৎপাদন ২২ দশমিক ৯০ লাখ টন থেকে বেড়ে তা ১১৯ দশমিক ৮৫ লাখ টন এবং ডিমের উৎপাদন ৪৬৯ দশমিক ৯১ কোটি থেকে বেড়ে ২০৫৭ দশমিক ৬৪ কোটিতে উন্নীত হয়েছে। ২০২১ সালসহ গত পাঁচ বছর ধরে পবিত্র ঈদুল আজহায় দেশি গবাদিপশু দিয়ে শতভাগ কুরবানির চাহিদা পূরণ করা হয়েছে। এমনকি গত বছর কুরবানিযোগ্য ২৮ লাখ ২৩ হাজার ৫২৩টি উদ্ধৃত পশু অবিক্রীত ছিল।
করোনাকালেও দেশের মানুষের প্রাণিজ আমিষের পুষ্টি নিশ্চিতে করতে এবং খামারি ও চাষিদের ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে ভিন্ন এক উদ্যোগ নেয় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। করোনার সময় উৎপাদিত মাছ ও মৎস্যজাত পণ্য এবং প্রাণী ও প্রাণিজাত পণ্য বাজারজাতকরণে স্থানীয় প্রশাসনের সর্বোচ্চ সহযোগিতায় ভ্রাম্যমাণ ও অনলাইন বাজার ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। করোনাকালে ভ্রাম্যমাণ ও অনলাইন বিক্রয় ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রায় ৯ হাজার ৫শ কোটি টাকা মূল্যের মাছ, মাংস, দুধ, ডিম এবং অন্যান্য মৎস্য ও প্রাণিজাত দ্রব্য বিক্রি করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের এ ধরনের মহৎ উদ্যোগের কারণে দেশের জনসাধারণ উপকৃত হওয়ার পাশাপাশি দেশের চাষি, খামারি বাঁচবে, ফলে দেশও বাঁচবে।

মো. সামছুল আলম : কৃষিবিদ ও কলাম লেখক।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়