বায়ুদূষণ রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিন

আগের সংবাদ

মাতৃভাষা নিয়ে হীনম্মন্যতা মর্মান্তিক বলতে হয়

পরের সংবাদ

সামনে রমজান : অসংযমের আগাম দৌড়

মোস্তফা কামাল

সাংবাদিক ও কলাম লেখক; বার্তা সম্পাদক, বাংলাভিশন

প্রকাশিত: মার্চ ২৮, ২০২২ , ১:০৪ পূর্বাহ্ণ আপডেট: মার্চ ২৮, ২০২২ , ১:০৪ পূর্বাহ্ণ

রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের অপেক্ষায় ধর্মপ্রাণ মুসলিমরা। গুনাহ মাফ ও নেক অর্জনের জন্য এ মাসটির অপেক্ষা তাদের। এর বিপরীতে বাড়তি মুনাফাবাজি-চাঁদাবাজির আয়োজনও এন্তার। এ মওকার অপেক্ষা কিছু মানুষের। রমজান তাদের কাছে কামাই-রোজগারের বার্ষিক মৌসুম। ফুটপাত থেকে টার্মিনাল, মহল্লা থেকে কাঁচাবাজার সবই তাদের হট৬স্পট। শিষ্য-সামন্তদের নিয়ে টার্গেট মতো এগোচ্ছে তারা। বিশাল ওয়ার্কপ্ল্যান। ধরিবাজ রাজনৈতিক নেতাকর্মী-দুর্নীতিবাজ পুলিশের কাছ থেকে এনওসি বা পারমিট নিয়ে দিচ্ছে এ রাজ্যের গডফাদাররা।
প্রতি বছর রমজান মাস আসার আগে প্রায় সব নিত্যপণ্যেরই দাম বাড়ে। রমজান শুরু হলে আরেকটু বাড়ে। যে কোনো পূজা-পার্বণ-ঈদ উপলক্ষে বাজারের চাবিকাঠি চলে যায় অশুভ চক্রের হাতে। নিত্যপণ্যের দাম বাড়বে- এটি অলিখিত নিয়মের মতো। পণ্যগুলো শুধু নিছক উপহারের পণ্য, নিত্যপণ্য নয়। প্রতিদিন এসব পণ্য কেনা হয় না। কেবল বিশেষ দিনেই কেনা হয়। তাই ওই পণ্যগুলোর দাম বাড়লেও সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়ে না। এদিক দিয়ে বাংলাদেশ ভিন্ন। কেবল দামি বিলাসী পণ্য নয়, সুযোগ পেলেই সব নিত্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়া হয়। ভোজ্যতেল সয়াবিন, পাম অয়েল, পেঁয়াজ, আটা-ময়দা ও ডালের দাম বাড়িয়েছেন ব্যবসায়ীরা। পর্যাপ্ত মজুত, সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে কিংবা নানা অজুহাতে বাড়ানো হচ্ছে চাল, চিনি, মসুর ডাল, প্যাকেট আটা ও ময়দার দাম। এবারের পরিস্থিতিটা আরো ভিন্ন। নিত্যপণ্যের বাজার চড়েছে এবার ঢের আগে। রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধের ছুতায় বেড়েছে আরেক দফা। এরপর রমজান সামনে রেখে সিন্ডিকেটের ফাঁদে এবার আরো নতুনত্ব। এক মাসের ব্যবধানে রাজধানীর খুচরা বাজারে সব ধরনের ডাল, ভোজ্যতেল, আদা, রসুন, পেঁয়াজ, হলুদ, মরিচ, চিনি, লবণ এমনকি খেজুরের দাম বাড়ানো হয়েছে। গরুর মাংস ও মুরগির দামও বেড়েছে। সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ-টিসিবির তথ্যমতে, এক মাসের ব্যবধানে খুচরা বাজারে ১৬ ধরনের নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। বাস্তবে সংখ্যাটি আরো বেশি। দাম কমেছে বা বাড়েনি এমন পণ্যের হদিস মিলছে না। পরিস্থিতির চাপে বাণিজ্যমন্ত্রী বলে বসেছেন, বিদায় করে দিলে বেঁচে যান তিনি।
ব্যবসায়ীরা প্রতি বছরই নানা কৌশলে আগেই দাম বাড়িয়ে দেন সংঘবদ্ধভাবে। ব্যক্তিবিশেষের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার সুযোগ থাকে না সরকারের। দাম বাড়াতে ব্যবসায়ীদের অজুহাতও প্রচুর। আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে টানা ছয় মাস ধরে নিত্যপণ্যের দাম বেড়েই চলেছে। এখন যোগ হয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধ।
ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে মুনাফা করতেই হবে। কিন্তু মুনাফা অর্জনের নামে তিন থেকে চারগুণ পর্যন্ত অতিরিক্ত মুনাফা অর্জনের মতো অনৈতিক কর্মকাণ্ড সমর্থনযোগ্য নয়। বছরজুড়ে দফায় দফায় চক্রাকারে একেকবার একেকটি পণ্যের দাম বাড়ানো যে কোনো ধর্মীয় শিক্ষার মারাত্মক খেলাপ। ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের জের যে বাজারে পড়েছে তাও সত্য। এর নেতিবাচক অর্থনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত থাকার সুযোগ বাংলাদেশের নেই। তার ওপর মূল্যস্ফীতিও বেশ ঊর্ধ্বমুখী। মূল্যস্ফীতি বাড়া মানেই প্রান্তিক ও সীমিত আয়ের মানুষের ভোগান্তি বৃদ্ধি। এতে খাদ্য উৎপাদন, বণ্টন, সরবরাহ ও মূল্যস্তরে পড়তে পারে নেতিবাচক প্রভাব; যা খাদ্যমূল্যের ওপর অস্বস্তিকর প্রভাব ফেলবে। ধর্মপ্রাণরা অন্তত কিছু ভূমিকা রাখতেই পারেন। উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পর্যায়ে থাকলে করোনার সময় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা যে কমেছে, তা অস্বীকার করে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির অঙ্ক এখন মানায় না। ইউক্রেন সংকট থেকে খাদ্যপণ্য, বিশেষত গম এবং জ্বালানি তেলে যে ধকল পড়েছে তা বুঝতে বিশেষজ্ঞ হওয়া জরুরি নয়। বিশ্ববাজারে গমের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জোগান দেয় রাশিয়া ও ইউক্রেন। চলমান সংঘাতের সঙ্গে রাশিয়ার ওপর আরোপিত পশ্চিমাদের বিধিনিষেধ চলতে থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারে গম ও তেলের সরবরাহ আরো কমবে। বাড়বে দাম। তখন বাংলাদেশকেও বেশি দামে এগুলো কিনতে হবে, যা দেশের ভেতর মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়িয়ে দিতে পারে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন-বিপিসি গত বছরের নভেম্বর মাসে দেশের ভেতর জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে উচ্চ হারে, যা অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতিকে ঊর্ধ্বমুখী করেছে পরের মাসেই।
বাংলাদেশের মোট বিশ্ব বাণিজ্যের এক-পঞ্চমাংশ সম্পন্ন হয় ইইউভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে। ইইউতে বাংলাদেশের রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ হলো বস্ত্র ও তৈরি পোশাক। সুইফট থেকে রাশিয়া বিচ্ছিন্ন করার পদক্ষেপ রাশিয়ার সঙ্গে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য প্রায় অসম্ভব করে তুলবে। যুক্তরাষ্ট্র আরো কঠিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিতে যাচ্ছে। তার মানে হলে, খুব কম দেশের পক্ষেই এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে আন্তর্জাতিক লেনদেন করতে পারবে। তা করতে গেলে সে দেশও নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়তে পারে। এদিকে যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে পণ্যবাহী জাহাজের ভাড়া ও বিমা মাশুল বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ রকম অবস্থায় রমজানের সংযমের শিক্ষা আমাদের প্রতিটি সেক্টরের জন্যই জরুরি। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমাদের কোনো সেক্টরেই সংযমের নিশানা নেই। উপরন্তু বেপরোয়াপনা আরো বেশি। তা সব ক্ষেত্রেই। তা খাদ্য, বস্ত্র, স্বাস্থ্য থেকে শুরু করে ধর্মীয় আচারাদিতেও।
রমজান সামনে রেখে বেপরোয়াপনা ফুটপাত বাণিজ্যেও। ফুটপাতকে ঘিরে চাঁদাবাজদের হুকুম তামিলে প্রস্তুত লাইনম্যানরা। বরাবরের মতো এলাকাভেদে টার্গেট ঠিক করে দেয়া হচ্ছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য বলছে, রাজধানীর ফুটপাতজুড়ে চাঁদাবাজিতে জড়িত ছোট-বড় গ্রুপ শতের কাছাকাছি। প্রতি গ্রুপে শত শত সদস্য। এরই মধ্যে গুলিস্তান, মতিঝিল, ফার্মগেট, মিরপুর, উত্তরা, গাউছিয়া, নিউমার্কেট, নিউমার্কেট থেকে শুরু করে বংশাল-সদরঘাটে নতুন মুখের আনাগোনা দেখছে স্থানীয়রা। বাংলাদেশ হকার্স ফেডারেশনের দেয়া হিসাব মতে, রাজধানীতে নিয়মিত হকার প্রায় তিন লাখ। আর রমজানে যোগ হচ্ছে আরো অন্তত পৌনে এক লাখ মৌসুমি হকার। তাদের এলাকাভেদে দৈনিক চাঁদা গুনতে হবে ২০০ থেকে ৪০০ টাকা করে। কোনো কোনো এলাকায় ৫০০ টাকাও। মৌসুমি হকারদের বসানোর নামে চাঁদার বাইরে ২০/৩০ বা ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত থোক দিতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে শত শত কোটি টাকার কারবার। এই কারবারিরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অপরিচিত নয়।
সার্চ করে বা অভিযান চালিয়ে শনাক্ত করার মতো নয় এরা। পুলিশ তাদের চেনে, জানে। তাদেরও পুলিশের সঙ্গে বেশ বোঝাপড়া। তবে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী ও ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের খাস লোকদের ওপর দায় চাপিয়ে দিয়ে পার পেয়ে যায় পুলিশ। তার ওপর মাঝেমধ্যে ইঁদুর-বিড়াল খেলার মতো কিছু ধরপাকড় বা দৌড়ের নাটকীয়তায় দায়িত্বের সুযোগ আছে পুলিশের। কোথাও কোথাও চাঁদা আদায়ে পুলিশ-সন্ত্রাসী সমানে সমান। শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নামেও মোবাইল ফোনে চাঁদাবাজি চলে আসছে। রাস্তায় সাপ দেখিয়ে সাপুড়েদের চাঁদাবাজি যেমন বেড়েছে, তেমনি হিজড়ারাও চাঁদা তুলছে। ভিক্ষুকদেরও চাঁদা দিতে হচ্ছে কয়েক গুণ বেশি। এই কানামাছিতে না গিয়ে, মহল বিশেষকে পেশাদার চাঁদাবাজ না বানিয়ে ফুটপাতের ব্যবসাকে একটা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। ফুটপাত বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও রয়েছে। সেগুলোতেও বিশেষ শৃঙ্খলার মধ্যে কেনাকাটার সীমিত ব্যবস্থা রয়েছে।
বাংলাদেশে বিশেষ করে রাজধানীতে ফুটপাতকে হকারমুক্ত করার উদ্যোগ বেশ কয়েকবারই নেয়া হয়েছে। সফলতা আসেনি। বাংলাদেশের বাস্তবতায় হুট করে এ কাজটি সম্ভব নয়। তবে শহরগুলোতেও সিটি বা পৌর করপোরেশন ও পুলিশ সম্মিলিতভাবে ফুটপাতকে শৃঙ্খলায় এনে হকারদের ব্যবসাকে বৈধতা দেয়ার বিষয়ে কথা হয়েছে বিভিন্ন সময়। কিন্তু এর ফলোআপ নেই। উল্লেখ করার বিষয় হচ্ছে, ফুটপাতে চাঁদাবাজির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ কেউ কখনো করে না। অভিযোগ নেই বা কেউ করে না বলে তা অগ্রাহ্য করার সুযোগ নেই। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দায় অনেক। স্বপ্রণোদিত হয়েই এ ঘটনায় সরকারের পদক্ষেপ প্রত্যাশিত।

মোস্তফা কামাল : সাংবাদিক ও কলাম লেখক; বার্তা সম্পাদক, বাংলাভিশন।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়