সামনে রমজান : অসংযমের আগাম দৌড়

আগের সংবাদ

মিনিকেট-নাজিরশাইল চালের নামে চালবাজি

পরের সংবাদ

মাতৃভাষা নিয়ে হীনম্মন্যতা মর্মান্তিক বলতে হয়

আহমদ রফিক

লেখক, গবেষক ও ভাষাসংগ্রামী

প্রকাশিত: মার্চ ২৮, ২০২২ , ১:০৫ পূর্বাহ্ণ আপডেট: মার্চ ২৮, ২০২২ , ১:০৫ পূর্বাহ্ণ

একুশে ফেব্রুয়ারি (২০২২) প্রধান দৈনিকগুলোয় প্রকাশিত লেখাগুলোতে নজর বুলাতে গিয়ে একাধিক লেখকের রচনায় কিছু অপ্রিয় সত্যের প্রকাশ দেখে ভালো লাগল এই ভেবে :
‘তবু ভালো, আমাদের কারো কারো সত্য স্বীকারে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।’
তবু মনে সংশয় ও প্রশ্ন : এ লেখা সাময়িক (একুশ তারিখের) আবেগের প্রকাশ নয়তো?
তার চেয়েও বড় সত্য হলো, এই সচেতনদের সংখ্যা খুবই ছোট, আর প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন হলো তারাও একুশের চেতনা বাস্তবায়নে তৎপর হওয়ার ক্ষেত্রে কতটা আগ্রহী, কতটা কার্যকর পরিচয় রাখেন বা রেখেছেন। এ প্রশ্নের জবাব খুব একটা আশাপ্রদ হবে বলে মনে হয় না।
কারণ সম্ভবত একটাই- দীর্ঘকাল বিদেশি শাসনে ঔপনিবেশিক রাজভাষা ইংরেজি মাধ্যমে উচ্চশিক্ষিত যে শ্রেণি তৈরি হয়েছে, যাদের ক্রমান্বয়ে বেড়ে চলেছে, রাজনৈতিক-সামাজিক স্তরে সর্বকর্মের নিয়ন্তা। তাদের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে দেশ ও সমাজ চলছে। তারা প্রচলিত ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে রাষ্ট্রভাষা বাংলা প্রচলনের শ্রমে ও সময় ব্যয়ে অনিচ্ছুক। এখানে তাদের সদিচ্ছার অভাব।
তাহলে কেমন করে একুশের চেতনা বাস্তবায়িত হবে, কেমন করে রাষ্ট্রভাষা জাতীয় ভাষায় পরিণত হবে? স্বভাবতই একুশের পথ ধরে একাত্তরের জাতীয়তাবাদী সংগ্রামে একাত্তরে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশ ঔপনিবেশ-ভাষা-সংস্কৃতি প্রভাবিত স্বাধীন স্বদেশই হয়ে থাকল।
আর মাতৃভাষা বাংলা রাষ্ট্রভাষা বাংলা হিসেবে সংবিধানেই বিধিবদ্ধ হয়ে থাকল। এ উপলক্ষে যেটুকু অর্জন তা সামান্য। বিসর্জন বা অপ্রাপ্তির দিকটাই প্রধান- উচ্চশিক্ষা থেকে উচ্চ আদালত পর্যন্ত ঔপনিবেশিক রাজভাষা ও সংস্কৃতিরই যত জয়জয়কার। একুশের জন্য রইল শুধু ভাষাসংগ্রামীদের ক্ষোভ ও মর্মবেদনা, হতাশা আর নৈরাশ্য।

দুই.
স্বভাবতই ঔপনিবেশিক ভাষা ও শিক্ষার দাপটের মুখে মাতৃভাষা- রাষ্ট্রভাষা বাংলা নিয়ে আমাদের শিক্ষিত, বিশেষত উচ্চশিক্ষিত শ্রেণি যে হীনম্মন্যতায় ভুগবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না, তা সে সত্য যত অপ্রিয়ই হোক।
এ হীনম্মন্যতার যুক্তিহীন প্রকাশ আমরা দেখেছি পাকিস্তান আমলে নানা মাত্রায়। একবারও মনে হয়নি, আমাদের ছাত্রসমাজ বাংলার মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করে চলেছে; ত্যাগ স্বীকার করছে, এমনকি জীবন উৎসর্গ করে চলেছে। বিনিময়ে তারা অনেক রক্তের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশে সুবিধাভোগী শ্রেণির জন্ম দিয়েছে, হয়তো তাদেরও অনেকে ওই শ্রেণির অন্তর্গত।
ব্যস, ইচ্ছাপূরণ সম্পন্ন। এখন কী দরকার বাংলা মাধ্যমের জন্য শ্রম ও সময়; মেধা, মনন ও বিদ্যাজ্ঞান ব্যয় করার। জয় হোক রাজভাষা ইংরেজির। বিদেশে সন্তানদের শিক্ষা এবং উপার্জন সূত্র নিশ্চিত হোক, সেই সঙ্গে স্থায়ী বসবাসের ব্যবস্থা হোক। বাংলা একদিনকার আবেগে সুলতান হয়ে থাকুক।
একুশ সম্পর্কে, ভাষা সম্পর্কে এমন এক স্ববিরোধী মানসিকতার কারণে ঔপনিবেশিক রাজভাষা আমাদের শিক্ষিত ও উচ্চশিক্ষিত শ্রেণির জীবনে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। বাংলা উপেক্ষিত, ক্রমে হীনম্মন্যতার শিকার। আমাদের মধ্যবিত্তসহ উচ্চশ্রেণি থেকে এ হীন মানসিকতা অবসানের কোনো যুক্তিসঙ্গত পথ দেখতে পাচ্ছি না।
যে পথ দেখাবে, যারা পথ দেখাবে সেই শ্রেণিই তো লোভের-লাভের শিকার। একাত্তরের রক্তসমুদ্র মন্থনে যে অমৃত উঠে এসেছে, তার ভোগী তো পূর্বোক্ত শ্রেণিগুলো- বিশেষত উচ্চ পেশাজীবী, বৃহৎ ব্যবসায়ী, শিল্পপতি ও ক্ষমতাসীন শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিবিদরা। তাদের অনুসারীদেরও প্রাপ্তি কম নয়। উদাহরণ দিতে গেলে অনেক অপ্রিয় প্রসঙ্গ এসে যাবে।
সম্প্রতি এক তরুণ সাংবাদিক আমাকে প্রশ্ন করে- আরেকটি ভাষা আন্দোলন কি এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে পারে না, এ হীনম্মন্যতা দূর করতে পারে না, একুশের সেøাগান রাষ্ট্রজীবনে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে না? ওর কথা শুনে আমি বিষণ্ন দুঃখের হাসি ফেরত দিই তাকে।
বলি, যে ছাত্র-তরুণ-যুবারা নতুন করে ভাষা আন্দোলন করবে বলছ, তারা তো উল্লিখিত ওইসব সমৃদ্ধ শ্রেণির সন্তান। তাদের মানসিকতা বদলে গেছে নব্য প্রযুক্তির আধুনিকতার প্রবলটানে। তারা এখন বিদেশমুখী- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, মালয়েশিয়া তাদের দ্বিতীয় স্বদেশ, বিশেষভাবে উন্নত বিজ্ঞান-প্রযুক্তির দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
আরো বলি, তারা কেন আন্তর্জাতিক ভাষা নামে পরিচিত একদা রাজভাষা ইংরেজির বদলে মাতৃভাষা বাংলাকে জাতীয় জীবনে প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন করতে পথে নামবে? বরং পাড়ি জমাতে চেষ্টা করবে স্বপ্নের দেশ আমেরিকায়। ভবিষ্যৎ সোনালি ক্যারিয়ার গড়ে তুলতে।
তারা কোন দুঃখে বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে পিছিয়ে থাকা রবিঠাকুরের রোমান্টিক কবিতা ও গানের ভাষা বাংলাকে উচ্চশিক্ষাসহ জাতীয় জীবনে প্রতিষ্ঠার জন্য পথে নেমে পুলিশের লাঠির ঠেঙানি মাথায় নিতে যাবে?
বরং তাদের জন্য এখন উপভোগ্য বিলাসবহুল বিএমডব্লিউআইয়ের মতো গাড়িতে চড়ে বান্ধবীসহ হাইরাইডে পাড়ি জমানো। সমৃদ্ধ এই শ্রেণিরই জন্ম দিয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশ বিগত কয়েক দশকে ব্যবসা-বাণিজ্যপ্রধান পুঁজিবাদী রাজনীতির চর্চায়।
পেছন দিকে তাকানো কি আধুনিকতার বা প্রগতিশীলতার লক্ষণ? নব্য আধুনিকতার পরিচায়ক? অন্যদিকে সাধারণ মধ্যবিত্ত শ্রেণির সন্তানদের উল্লিখিত আর্থ-সামাজিক পরিবেশে প্রাণপণ চেষ্টা যে কোনো মূল্যে সমাজের উচ্চ ডালে উঠে বসার।
সে ক্ষেত্রে প্রতিবাদী আন্দোলন ও মিছিলের পথ তাদের আর পূর্বসূরিদের মতো আকর্ষণ করে না। কেনই বা করবে? সেই পাকিস্তানি বৈষম্যের পরিবেশ তো এখন আর নেই। স্বাধীন বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের পথ ধরে হাঁটছে। তাদের পিতৃপুরুষের ইচ্ছা পূরণ হয়েছে। আর চাই কী?
এখন যারা ব্যতিক্রমী পথ ধরে হাঁটছে, দুঃখ তাদের কপালে। শিক্ষার্থী ও অন্যদের সড়কে নিয়মিত অবাঞ্ছিত মৃত্যুর প্রতিবাদে তাদের রাজপথ-অবরোধ আন্দোলন পুলিশের লাঠিবাজিতে ছত্রভঙ্গ। অনেক ছাত্রী নির্যাতিত। সড়কে অন্যায় মৃত্যুর প্রতিবাদে ইলিয়াস কাঞ্চনের আন্দোলনও ব্যর্থতায় পরিণত।
আমার অনুজপ্রতিম এক একদা-যোদ্ধা আমাকে জানায় তেল-গ্যাস আন্দোলনের দুঃখজনক পরিণতির কথা, আনু মুহাম্মদের মনোবেদনার কথা। এ রকম একাধিক ঘটনা সম্পর্কে আমিও অবহিত বিশেষ কয়েকটি সংবাদপত্র পাঠের কল্যাণে। সময়টা কি এখন এ দেশে এমনই পাল্টে গেছে যে কোনো যুক্তিসঙ্গত প্রতিবাদী আন্দোলনই দানা বাঁধছে না। এখন সময় কি শুধু উপভোগের শ্রেণিবিশেষের জন্য?

 

আহমদ রফিক : লেখক, গবেষক ও ভাষাসংগ্রামী।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়