আলো নিভিয়ে বিভীষিকার স্মৃতি স্মরণ সারাদেশে

আগের সংবাদ

রাজনীতিবিদদের অভিমত: নীতি ও আদর্শই ইন্দো-বাংলা সম্পর্কের ভিত্তি

পরের সংবাদ

স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর এবং নিত্য প্রাসঙ্গিক বঙ্গবন্ধু

প্রকাশিত: মার্চ ২৫, ২০২২ , ১১:০২ অপরাহ্ণ আপডেট: মার্চ ২৫, ২০২২ , ১১:৪৪ অপরাহ্ণ

দেখতে দেখতে স্বাধীন বাংলাদেশের বয়স পঞ্চাশ পূর্ণ হলো। ইতিহাসের এই বাঁকে দাঁড়িয়ে অবশ্যই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর কথা খুবই গভীরভাবে মনে পড়ছে। কেননা তিনি যে আমাদের ইতিহাসের এক নান্দনিক বরপুত্র। নীল আকাশ ভেদ করে তিনি এসেছিলেন এই বাংলায়, তাকে মুক্ত করতে। আজীবন সংগ্রাম করে তিনি আমাদের জন্য এনে দিয়েছেন অমৃতসম স্বাধীনতা। এনেই ক্ষান্ত হননি, সেই স্বাধীনতাকে রক্ষা করার জন্য, তার ভিত্তিকে মজবুত করার জন্য কী নিরলস পরিশ্রমই না করে গেছেন। প্রকৃত ইতিহাস তো মানুষেরই ইতিহাস। রাজা-বাদশাদের যুদ্ধ-বিগ্রহ এবং রক্তাক্ত ষড়যন্ত্রের বিবরণের কাহিনী বরাবরই হয়ে থাকে বাইরে থেকে দেখা এক খণ্ডিত ও অপ্রাসঙ্গিক ইতিহাস। রবীন্দ্রনাথ তার ‘ভারতবর্ষের ইতিহাস’ নিবন্ধে লিখেছেন, ‘ঝড়ের দিনে যে ঝড়ই সর্বপ্রধান ঘটনা, তাহা তাহার গর্জনসত্ত্বেও স্বীকার করা যায় না- সেদিন সেই ধূলিসমাচ্ছন্ন আকাশের মধ্যে পল্লীর গৃহে গৃহে যে জন্মমৃত্যু- সুখদুঃখের প্রবাহ চালিত থাকে, তাহা ঢাকা পড়িলেও, মানুষের পক্ষে তাহাই প্রধান।’ প্রকৃত ইতিহাস ঝড়ের রাত আহত ঐ মানুষেরই সন্ধান করে। বিদেশি পথিকেরা শুধু ভাঙা ঘরটাই দেখেন। ঘরের ভেতরের মানুষটির ক্ষত বিক্ষত হৃদয়কে দেখতে পান না।

অন্যদিকে বাংলাদেশ নামের এই বৃহৎ ঘরটির ভেতরে থাকা দুঃখী মানুষের প্রতিনিধি হয়ে আমাদের ইতিহাসের বরপুত্র হিসেবে বেড়ে উঠেছিলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি ছিলেন ‘তাহাদের’, ‘আমাদের’। শুরু থেকেই তিনি ছিলেন বঞ্চিতজনের সখা। তাদের হয়ে তিনি আজীবন লড়াই করেছেন শাসকশ্রেণির বিরুদ্ধে। সাধারণ মানুষের ন্যায্য দাবি তিনি তুলে ধরেছেন তাঁর ভাষণে। জনগণের ন্যায্য দাবি শাসকশ্রেণি মানতে না চাইলে তিনি রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে তুলতেন। আর রাজনৈতিক আন্দোলন যখন শাসকশ্রেণি নস্যাৎ করতে চেয়েছে তখন তিনি বেছে নিয়েছেন সশস্ত্র সংগ্রামের পথ। তবুও শেষ পর্যন্ত আলাপ-আলোচনার পথ তিনি খোলা রেখেছেন। তাঁর এই রাজনৈতিক ঔদার্যই তাঁকে করেছে মহান।

বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনে প্রথম উল্লেখযোগ্য মাইলফলকটির নাম ভাষা আন্দোলন। ভাষার মর্যাদা রক্ষার এই আন্দোলনটি তাঁর কাছে শুধুই বাঙালির সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষার বিষয় ছিল না। বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারিতে ছাত্র-জনতার কয়েকজন শহীদ হবার সপ্তাহ খানেক বাদে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে আমরণ অনশনে রত শেখ মুজিব মুক্তি পান। এর পর শুরু হয় নতুন রাজনৈতিক দল পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সাংগঠনিক তৎপরতা। ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে তিনি সারাদেশে রাষ্ট্রভাষা বাংলা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি মানুষের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক অধিকার আদায়ে সমাবেশ করতে থাকেন। এসব সাংগঠনিক তৎপরতার অংশ হিসেবে ১৯৫৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবসের প্রথমবার্ষিকী পালন করার উদ্যোগ নেন। ছাত্রছাত্রী ও তরুণদের সংগঠিত করেন। আরমানিটোলা মাঠে ঐ দিন তিনি যে ভাষণটি দেন তাতে ভাষা আন্দোলনের পেছনের অন্তর্নিহিত বড়ো পরিসরের পরিপ্রেক্ষিত তিনি স্পষ্ট করে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘ভাষা আন্দোলন শুধু ভাষার দাবিতে ছিল না, সেটা ছিল আমাদের জীবন-মরণের লড়াই। আমরা মানুষের মতো বাঁচতে চাই।… আমরা কথা বলার অধিকার চাই, শোষণমুক্ত সমাজ চাই।’

শোষণমুক্ত সমাজ নির্মাণের এই স্বপ্ন তিনি আজীবন বহন করেছেন। ১৯৫২ সালের শেষ দিকে তিনি নয়া চীন সফর করেন। সেদেশে মাত্র তিন বছরে কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে কি ধরনের সংস্কার করা হয়েছে তা তিনি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। উদ্দেশ্য সময় ও সুযোগ এলে সাধারণ মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনে এসব নীতি-সংস্কারে তিনি ব্রতী হবেন। তাঁর লেখা, ‘আমার দেখা নয়া চীন’ সেই বিচারে এক স্বপ্নের দলিল। শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার এই স্বপ্ন তাঁকে আর পিছু ছাড়েনি। দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে, প্রাদেশিক মন্ত্রী হিসেবে, গণপরিষদের সদস্য হিসেবে তিনি নিরন্তর এই দুঃখী মানুষের দুঃখ মোচনের প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন। কর্তৃত্ববাদী পাকিস্তান সরকারের জেলজুলুম ও ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করেই তিনি তাঁর স্বপ্ন পূরণের জন্য রাজনৈতিক আন্দোলন সাজিয়েছেন। অন্যায্য ‘দুই অর্থনীতি’র প্রেক্ষাপটে তিনি ছয় দফা কর্মসূচি দিয়েছেন দুই অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামরিক বৈষম্য দূর করার জন্য। সেজন্যে তাঁকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেবার পরিকল্পনা করেছিল পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী। কিন্তু ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ বাঁধ ভাঙা মানুষের আন্দোলনের জোয়ারে ভেসে গেছে। তিনি বরং জেল থেকে বের হয়ে আসেন গণমানুষের অধিরাজ বঙ্গবন্ধু হিসেবে। এর পরের কাহিনী তো আমাদের সবারই জানা। ছয় দফার আলোকেই তিনি দাঁড় করান সত্তরের নির্বাচনী ইশতেহার। বাংলার মানুষ দুটো বাদে জাতীয় পরিষদের সবকটি আসনই তুলে দেন তাঁর হাতে। ঐ ইশতেহারে তিনি গণমানুষের মুক্তির সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তুলে ধরেন। কৃষি, শিল্প ও শিক্ষাসহ সকল খাতের পরিবর্তনের কর্মসূচির কথা ছিল ঐ ইশতেহারে। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী জাতীয় পরিষদে ছয় দফা ভিত্তিক শাসনতন্ত্র পাস করার সুযোগ দেয়নি। উল্টো চাপিয়ে দিয়েছিল গণহত্যা। জবাবে বঙ্গবন্ধু ডাক দেন মুক্তিযুদ্ধের। আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন স্বাধীনতার। একাত্তরের ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরের। ৭ মার্চ তিনি গেরিলা যুদ্ধের যে রূপরেখা (যেমন : ‘ভাতে মারবো, পানিতে মারবো’, ‘যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো’) দিয়েছিলেন তাকেই মূলমন্ত্র মেনে এদেশের কৃষকসন্তান ও দামাল ছেলে-মেয়েরা নেমে পড়ে মুক্তিযুদ্ধে। তিনি বন্দি হন। কিন্তু যে বজ্রকণ্ঠ তিনি জনতাকে দান করে গিয়েছিলেন তার ওপর ভর করেই ‘জয় বাংলা’ বলে শত্রæর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে মুক্তিযোদ্ধারা। যুদ্ধের শেষ দিকে ভারতীয় মিত্রবাহিনী যোগ দেয় এই যুদ্ধে। বিপুল রক্ত ও ত্যাগের বিনিময়ে দেশ স্বাধীন হয়। কিন্তু একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জিত হলেও তা ছিল অপূর্ণ। কেননা বঙ্গবন্ধু তখনো পাকিস্তানের জেলে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধী এবং বিশ্বের অন্যান্য রাষ্ট্রনায়কের চাপে এবং বাঙালির বিশ্বব্যাপী আন্দোলনের কারণে বাহাত্তরের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখেন। সেদিনই পড়ন্ত বিকালে তিনি রেসকোর্স ময়দানে লক্ষ লক্ষ বিজয়ী মানুষের সামনে বলে ওঠেন যে এই স্বাধীনতা অর্থহীন হয়ে যাবে যদি তাঁর মানুষ পেট ভরে ভাত না খেতে পারে এবং তরুণরা যদি কাজ না পায়। এই স্পিরিটই ছিল বঙ্গবন্ধুর কাছে স্বাধীনতার মর্মবাণী। যে সাড়ে তিনটি বছর তিনি দেশ পরিচালনা করেছেন মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির বিষয়টিই ছিল তাঁর কাছে মুখ্য বিবেচ্য। এ লক্ষ্য পূরণের জন্যই তিনি অধিকারভিত্তিক অসামান্য একটি সংবিধান প্রণয়ন করেন মাত্র ন’মাসে। যুদ্ধে বিধ্বস্ত গোড়াকার বাংলাদেশের মাটিতে দাঁড়িয়েই তিনি স্বপ্ন দেখেন সোনার বাংলার। শুরু করেন পরিকল্পিত উন্নয়ন। উন্নয়নের এই অভিযাত্রা মোটেই মসৃণ ছিল না। কিন্তু শোষণমুক্ত সমাজ গঠনের লক্ষ্য থেকে তিনি সামান্য সরে আসেননি। তাই তো তিনি শাসনব্যবস্থার পদ্ধতিগত পরিবর্তনে উদ্যোগী হন। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি মহান সংসদে তিনি অকপটে স্বীকার করেন, ‘এখনো মানুষ না খেয়ে কষ্ট পাচ্ছে। গায়ে তাদের কাপড় নাই। আমি জীবনভর এদের সঙ্গে থেকে সংগ্রাম করেছি, ওদের পাশাপাশি রয়েছি, কারাগারে নির্যাতন ভোগ করেছি, আমার সহকর্মীরা জীবন দিয়েছে। … ওদের দুঃখ দূর করার জন্য … আমরা শোষিতের গণতন্ত্র চাই।’ এই লক্ষ্য পূরণে এদেশের শিক্ষিতজন যে তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হচ্ছেন সে কথাও তিনি স্পষ্ট করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “আজকে আমরা যারা শিক্ষিত, এমএ পাস করেছি, বিএ পাস করেছি স্পিকার সাহেব, আপনি জানেন এই দুঃখী বাংলার গ্রামের জনসাধারণ, তারাই অর্থ দিয়েছেন আমাদের লেখাপড়া শেখার একটা অংশ। … আমি তাদের ফেরত দিয়েছি, তাদের আমি ‘রিপে’ করেছি কতটুকু। তাদের প্রতি কতটুকু কর্তব্য পালন করেছি- এটা আজকে আমাদের সমালোচনার প্রয়োজন আছে। … আমরা কতটুকু তাদের দিয়েছি। শুধু আমাদের দাও। কে দেবে? বাংলার দুঃখী জনগণকে তোমরা কি ফেরত দিয়েছো? এটা আজ প্রশ্ন।” শুধু প্রশ্ন করেই তিনি থেমে যাননি। উপায়েরও সন্ধান দিয়েছেন। প্রশাসনিক পদ্ধতির আমূল পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছেন। দেশে খাদ্য উৎপাদন দ্রুত বৃদ্ধি, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ এবং প্রাথমিকসহ সকল পর্যায়ে শিক্ষা প্রসারের ওপর তাগিদ দেন। তিনি বলেন কৃষক তার কাজ করেন। শ্রমিকও কাজ করেন। শুধু বাধা সৃষ্টি করে শিক্ষিত জনেরা। তাঁর ভাষায়, ‘আমরা ব্যাঘাত সৃষ্টি করি। আমরাই ষড়যন্ত্র করি। আমরাই ধোঁকা দিই। আমরাই লুট করে খাই। আমাদের জমি দখল করে নিয়ে যায়। এ-সকল কাজ করে কারা? আমরা এই দেশের তথাকথিত শিক্ষিত সমাজ, এই দেশের তথাকথিত লেখাপড়া জানা মানুষ।’ তাই তো তাঁর আহ্বান, ‘আজকে আমাদের আত্মসমালোচনার প্রয়োজন, আজকে আমাদের আত্মসংযমের প্রয়োজন। আজকে আত্মশুদ্ধির প্রয়োজন, নচেৎ দেশকে ভালোবাসা যায় না।’ তিনি হৃদয়ের সবটুকু আবেগ ঢেলে সেদিন আরো বলেছিলেন, ‘দেশকে বাঁচাও, মানুষকে বাঁচাও। মানুষের দুঃখ দূর করো। আর দুর্নীতিবাজ, ঘুষখোর, চোরাকারবারিদের উৎখাত করো।’ আর দেশ বাঁচানো এবং মানুষ বাঁচানোর লক্ষ্যেই তিনি দ্বিতীয় বিপ্লবের ডাক দিয়েছিলেন। সাময়িকভাবে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা চালু করেছিলেন। প্রশাসনের বিকেন্দ্রায়ন করে সাধারণের দোরগোড়ায় সরকারি সেবা পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন। জমির মালিকানা অক্ষুণ্ন রেখেই তিনি গ্রামে গ্রামে অংশগ্রহণমূলক সমবায় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা পরিপূরক বলে তিনি বিশ্বাস করতেন। তাই এমন আমূল পরিবর্তনবাদী সংস্কারে হাত দিয়েছিলেন। তিনি সংসদে দেয়া ঐ দিনের ভাষণেই বলেছিলেন, ‘আমি চেয়েছিলাম স্বাধীনতা। কি স্বাধীনতা? রাজনৈতিক স্বাধীনতা ব্যর্থ হয়ে যায় যদি অর্থনৈতিক স্বাধীনতা না আসে। যদি দুঃখী মানুষ পেট ভরে ভাত খেতে না পারে, কাপড় পরতে না পারে, বেকার সমস্যা দূর না হয়, তাহলে মানুষের মনে শান্তি ফিরে আসতে পারে না।’ আর মানুষকে দেয়া সেই প্রতিশ্রুতি পূরণের জন্য পঁচাত্তরের ২৬ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তিনি জনগণের কাছে শাসনতন্ত্রের মর্মবাণী পৌঁছে দেবার অংশ হিসেবেই বলেছিলেন নয়াশাসনব্যবস্থার কথা। কেননা তিনি বিশ্বাস করতেন, ‘এই ঘুণেধরা ইংরেজ আমলের, পাকিস্তান আমলের যে শাসনব্যবস্থা- তা চলতে পারে না। এতে নতুন করে ঢেলে সাজাতে হবে। তাহলে দেশের মঙ্গল আসতে পারে, না হলে আসতে পারে না।’ সে কারণেই তিনি নতুন করে শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু যে স্বার্থান্বেষী মহলের কারসাজির কথা বারে বারে তিনি বলতেন তাদের মদতেই বিশ্বাসঘাতকের দল পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু তথা আমাদের স্বপ্নকে খুন করে। এর পরে স্বদেশ চলতে থাকে ‘অদ্ভুত এক উটের পিঠে’ অন্ধকার পানে। অনেক কষ্ট, ত্যাগ এবং সংগ্রামের পর স্বদেশ ফিরে পেয়েছে বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথ। আ

তাই অবকাঠামোর ব্যাপক উন্নতি হচ্ছে। মাথাপিছু আয় দ্রুতই বাড়ছে। খাদ্য উৎপাদন গত পঞ্চাশ বছরে প্রায় চারগুণ বেড়েছে। কৃষি এখন অনেকটাই আধুনিক ও বহুমাত্রিক। শিল্প-বাণিজ্যের প্রসারও ঘটেছে ব্যাপক হারে। ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে গেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার অংশ হিসেবে আর্থিক খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে। ক্ষুদে ঋণের সুযোগও বাড়ছে। মোবাইল ব্যাংক ও এজেন্ট ব্যাংক খুবই প্রসরমান। তবে কোভিড-উত্তর বিশ্ব অর্থনীতি যখন পুনরুদ্ধারের পথে ছিল তখন নেমে এলো নয়া সংকট তথা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। এর প্রভাবে বিশ্ব সরবরাহ ব্যবস্থা আরো চাপের মুখে পড়েছে। জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। পরিবহন খরচ বেড়ে গেছে। ফলে আমাদের দেশেও দ্রব্যমূল্য, বিশেষ করে আমদানিকরা খাদ্যমূল্য লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। এসবের প্রভাবে অর্থনৈতিক বৈষম্যও বাড়ছে। আর তাই এক কোটি নিম্ন-আয়ের মানুষের জন্য পারিবারিক কার্ড দিয়ে কম দামে খাদ্য সরবরাহের যে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার তা সময়োপযোগী বলা যায়। আর সামাজিক সংরক্ষণের উদ্যোগগুলো তো চলমানই আছে। তবে একই সঙ্গে বঙ্গবন্ধু যে সব চ্যালেঞ্জের কথা বলতেন (যেমন- দুর্নীতি, কারসাজি, লুটপাট, সরকারি সেবা পেতে দুর্ভোগ ইত্যাদি) সেসব তো এখনো অনেকটাই রয়ে গেছে। জমি ব্যবস্থাপনাসহ প্রশাসনিক সেবা ডিজিটাল করার উদ্যোগ সরকার নিচ্ছে। ডিজিটাল অর্থায়নও হালে দানা বাঁধছে। তবে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক অশান্তি তৈরির যে ষড়যন্ত্রের কথা বঙ্গবন্ধু বলতেন সেসব এখনো বেশ সক্রিয়। বঙ্গবন্ধু যে ধর্মকে রাজনীতিতে ব্যবহার না করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন তা এখন শুধু বাংলাদেশ কেন সারা বিশ্বেই খুবই প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। তাই তো অধ্যাপক অমর্ত্য সেন এলএসইতে এক ওয়েবিনারে বলেছিলেন ধর্মনিরপেক্ষতার নিরিখে বঙ্গবন্ধুকে বিশ্ববন্ধু বলা সমীচীন হবে। আরেক অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক কৌশিক বসুও মনে করেন যে ধর্মকে রাজনীতিতে মেশালে উন্নয়ন ব্যাহত হবেই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ বিষয়ে দৃঢ় অবস্থান নিতে পরেছেন বলেই বাংলাদেশের উন্নয়নের ধারা গতিময় রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

আমাদের স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে দাঁড়িয়ে তাই বঙ্গবন্ধু যেসব ক্ষেত্রে সুদূরপ্রসারী নীতি মনোযোগ দেবার পক্ষে ছিলেন সেসবের দিকে আজো নীতি নির্ধারকদের মনোযোগী হবার প্রয়োজন। আমরা যদি তাঁর উদ্বেগের বিষয়গুলো মোকাবিলা করে সামনের দিকে সুস্থিরচিত্তে হাঁটতে পারি তাহলে বঙ্গবন্ধুর আরাধ্য সমৃদ্ধ ‘সোনার বাংলা’ নিশ্চয় অর্জন করতে পারবো। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে বরাবরই আশাবাদী ছিলেন। তাই ১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চে তো ছিল তাঁর দৃঢ়প্রত্যয়ী উচ্চারণ, ‘বাংলাদেশ দুনিয়ায় এসেছে, বাংলাদেশ থাকবে, কেউ একে ধ্বংস করতে পারবে না।’

*লেখক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর

এসআর

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়