আমাদের বোধ জেগে উঠবে কী?
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০১:৫৫ এএম
আমাদের একুশের বয়স এখন সত্তর হলো। আমাদের লাল-সবুজের বয়সও ৫০ পেরিয়েছে। আমরা এখন অনেকটাই পরিণত। আমাদের দিন বদলেছে। আমাদের উত্তরবঙ্গে এখন আর মঙ্গা দেখা দেয় না। আমাদের কবিরা এখন আর ভাত দে হারামজাদা না হয় মানচিত্র খাব, এই কবিতা লিখে না। আমাদের হাওরে এখন গাড়ি চলে। আমাদের গাড়ি এখন পানির নিচ দিয়েও চলবে, মাথার ওপর দিয়েও চলে। আমাদের এখন কেবল বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, মেঘনা, যমুনায় নয় পদ্মাতেও ব্রিজ হয়েছে।
আমাদের যুবকরা বিশ্বকাপ নিয়ে এসেছে। এরই মধ্যে আমাদের একুশ সারাবিশ্বের হয়ে উঠেছে। এমন বাস্তবায়তায় দাঁড়িয়ে যখন আমরা আমাদের ভাষাশহীদদের স্মরণ করি তখন নিশ্চয়ই এমন দৃশ্য দেখতে চাই না শহীদ মিনারে ফুলের বদলে অস্ত্রের মহড়া, দুই পক্ষের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। যেমনটা এবারো দেখলাম কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ায়, চট্টগ্রামের সরকারি হাজী মহসিন কলেজে কিংবা ল²ীপুরের রায়পুরে। এই কি আমাদের পরিণত হওয়ার নমুনা?
২১ ফেব্রুয়ারি আগে আমরা পালন করতাম মাতৃভাষা দিবস হিসেবে, যা বর্তমানে সারাবিশ্ব পালন করে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে। সেই সঙ্গে এই দিবসটিকে শহীদ দিবসও বলা হয়ে থাকে। আমরা জানি প্রতিটি দিবসেরই আলাদা তাৎপর্য আছে, আলাদা গুরুত্ব আছে, সেই সঙ্গে আলাদা প্রেক্ষাপট তো আছেই। ২১ ফেব্রুয়ারির যে কি তাৎপর্য তা সত্তর বছর পরে এসে জাতিকে নতুন করে জানানোর কিছু নেই। কিন্তু কালের আবর্তে, প্রজন্মের পরিবর্তনে ২১ ফেব্রুয়ারি পালনের কলেবর বড় হয়েছে নিঃসন্দেহে, যা এখন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও পালন করা হয় আনুষ্ঠানিকভাবে। আগেও প্রবাসীরা নিজেদের মতো করে দিবসটি পালন করত, এখন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতির ফলে প্রবাসীদের পাশাপাশি বিদেশিরাও দিবসটি পালন করে, যা আমাদের জন্য খুবই গৌরবের। কিন্তু দিবস পালনকে ঘিরে যে আনুষঙ্গিকতা কিংবা পারিপার্শ্বিকতা লক্ষ্য করা যায় তা দিবসের তাৎপর্যের প্রতি কতটা সম্মানের? আরো যদি পরিষ্কার করে বলি এই দিবসটিকে পালন করতে গিয়ে আমরা যাদেরকে সম্মান জানানোর জন্য শহীদ বেদিতে মাঝরাতে কিংবা ভোর রাতে ফুল দিতে যাই, সেখানে গিয়ে কে আগে ফুল দিবে আর কে পরে। কার নাম মাইকে আগে বলা হলো, কার নাম পরে বলা হলো কিংবা কেন বলা হলো এরকম ছোটখাটো বিষয় নিয়ে বিতর্কে জড়ায়, অনেক সময় যা হাতাহাতিতে রূপ নিতে দেখা যায়, যা ইতোমধ্যেই উল্লেখ করেছি। কেন্দ্রীয়ভাবে পুষ্পস্তবক অর্পণের একটি ধারাবাহিক রীতি (অর্থাৎ কার পরে কে ফুল দিবে) সব সরকারের আমলেই চলে আসছে কিন্তু স্থানীয়ভাবে সারাদেশে এই সিরিয়াল নির্ধারণ করা এত সহজ কাজ নয়। আর তাতেই যত বিপত্তি। ফুল দিতে গিয়ে শহীদ মিনারে ধাক্কাধাক্কি, জুতা পরে শহীদ বেদিতে ওঠা এসব চিত্র কি এই দিবসের প্রতি যথার্থ সম্মান প্রদর্শনের নমুনা! এই চিত্র কমবেশি এখন সর্বত্রই চোখে পড়ে। ২১ ফেব্রুয়ারির পরের দিন পত্রিকার পাতা খুললেই সারাদেশের কোথাও না কোথাও ফুল দেয়াকে কেন্দ্র করে মারামারির সংবাদ পাওয়া যায়।
এই দৃশ্য শুধু দেশে নয়, বরং বিদেশের মাটিতে নির্মিত প্রথম স্থায়ী শহীদ মিনার যেটি বিলেতের ওল্ডহ্যাম শহরে অবস্থিত সেখানেও একই চিত্র লক্ষ্য করেছি। দেশীয় রাজনীতির বিদেশি শাখাগুলো বিদেশ বিভুঁইয়ে রাজনৈতিক অপসংস্কৃতি থেকে বের হতে না পারায় সেখানেও একই অবস্থা বিরাজমান।
আমাদের দেশে দিবস পালনের একটা রেওয়াজ অনেক পুরনো। আমাদের নিজস্ব বা জাতীয় যে দিবসগুলো আছে তা অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে পালন করা হয়ে থাকে। এমনকি আন্তর্জাতিক যেসব দিবস রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন করা হয় তাও গুরুত্বের সঙ্গে দিবসের তাৎপর্য সমুন্নত রেখে পালনের চেষ্টা করা হয়ে থাকে। রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে ব্যক্তি মানুষ পর্যন্ত এসব দিবস পালনে সম্পৃক্ত হয়ে থাকে। পাশাপাশি দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিকসহ বিভিন্ন ধরনের সংগঠনও এসব দিবস পালনে ভূমিকা রেখে থাকে। এমনকি দেশি-বিদেশি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন যেমন স্কাউট, রেডক্রস, রেডক্রিসেন্টের মতো সংগঠনগুলোও দিবস উদযাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে থাকে।
আমাদের জাতীয় জীবনে একুশে ফেব্রুয়ারি, শহীদ দিবস তথা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিবস। খুব স্বাভাবিকভাবেই এই দিবস পালনে সবার সম্পৃক্ততা লক্ষণীয়। যে কোনো অকেশন এলেই একদল মানুষ পোস্টার, ব্যানার, ফেস্টুন বানাতে উন্মাদ হয়ে উঠে। আর সেসব ব্যানার-পোস্টারে দিবসের তাৎপর্য তো দূরে থাক নিজের দুই হালি দাঁত বের করা একটা নিজের চেয়ে বড় ছবি, তার উপরে নেতার ছবি… পোস্টারজুড়ে দশটা ছবি থাকলেও কোথাও জায়গা হয় না সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারদের! এই যে ট্রেডিশন চলছে, এ নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যথা নেই। অবশ্য থাকারও কথা নয়, কারণ কোথাও না কোথাও এদের ছবিও যে আছে! নেট দুনিয়ায় এবার দেখলাম একুশ খুবই রাঙানো! তবে রক্তে নয়, রঙে। রং ছটা একুশ! রঙের যথেচ্ছ ব্যবহার!
এই অবস্থা থেকে বের হতে হবে। এই অপসংস্কৃতি চলতে থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমাদের জবাবদিহিতা করতে হবে। এখনই সময় রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে যে কোনো জাতীয় দিবসের ব্যানার, পোস্টার, ফেস্টুন তৈরির মডেল শুধু সরকারি অফিসের জন্য নয় বরং ব্যক্তি পর্যায় পর্যন্ত কী ধরনের ব্যানার করা যাবে আর কী করা যাবে না। এ রকম একটি নির্দেশনা জারি করা সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে।
ইদানীংকালে একটি বিষয় খুব মারাত্মকভাবে লক্ষ করা যাচ্ছে, তা হলো আমাদের অজ্ঞতার কারণেই হোক কিংবা অতি উৎসাহী হয়েই হোক সর্বত্রই লাল-সবুজ রঙের ব্যবহার।
কোনো বিশেষ দিবস ছাড়াও প্রতিদিনই মসজিদে লাল-সবুজ রঙের আলোকসজ্জা করে কি দেশপ্রেম তুলে ধরা হচ্ছে?
গ্রামে যেটা হয়ে থাকে একটু টাকা-পয়সা হলেই বাড়ির পেছনে একটা পাকা ল্যাট্রিন বানানো হয়। এরকমই জনৈক এক ভদ্রলোক গ্রামের বাড়িতে ল্যাট্রিন বানিয়ে ল্যাট্রিনের রং করছেন লাল-সবুজ!
সেদিন স্বচক্ষে দেখলাম একটি প্রাইভেট কোম্পানির ময়লার ডাস্টবিনকে রং করে সুন্দর বানাতে গিয়ে উপরে নিচে সবুজ, মাঝখানে লাল রং করা হয়েছে! লাল-সবুজ টাইলস দিয়ে বাসার ফ্লোর করার মাধ্যমে পতাকার অবমাননা হবে নাকি দেশপ্রেম ফুটে উঠবে এটা আগে বুঝতে হবে। সম্প্রতি দেশে লাল-সবুজের অযাচিত ব্যবহার অনেক বেড়েছে।
একশ্রেণির দুর্নীতিবাজ, মতলববাজ, তেলবাজ, সুবিধাভোগী, সুবিধাবাদী কিছু স্বার্থপর মানুষ যত্রতত্র ব্যবহার করছে লাল-সবুজের আদলকে। যা দেশপ্রেমকে শানিত করার বদলে প্রশ্নবিদ্ধ করছে বৈকি? দেশপ্রেম, চেতনা এই শব্দগুলোর যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হলে আগে বোধের জায়গাটি সঠিক হতে হবে, বোধ জেগে উঠতে হবে… তবেই না প্রকৃত ভোর হবে। সালাম ফিরে আসবে, বরকত ফিরে আসবে… দূর হবে যত অন্যায় অবিচার আর দুর্নীতির রাহু গ্রাস। এই বাংলা ধনধান্যে হয়ে উঠবে সোনার বাংলা।
গাজী মহিবুর রহমান : কলাম লেখক
gmrahman1980@gmail.com
