সার্চ কমিটিতে প্রস্তাবিত নামের তালিকায় আছেন যারা

আগের সংবাদ

গণতন্ত্র বিকাশের সহায়ক শক্তি স্বাধীন গণমাধ্যম

পরের সংবাদ

চ্যালেঞ্জ নিয়ে ৩০ থেকে ৩১-এ পা

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০২২ , ১০:৪১ অপরাহ্ণ আপডেট: ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০২২ , ১১:০১ অপরাহ্ণ

একবিংশ শতাব্দীতে এসে বিশ্ব গণমাধ্যমকে যে এভাবে একটি নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে, সেটা হয়তো কয়েক দশক আগেও কল্পনা করা সম্ভব হয়নি। টেকনোলজির দ্রুত পরিবর্তন গণমাধ্যমকে এমন একটি অভাবনীয় পরিবর্তনশীল জায়গায় নিয়ে এসেছে, যেটা বিশ্বের খ্যাতনামা গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞদের কল্পনার বাইরে ছিল। মাত্র কয়েক দশকে বদলে গেছে গণমাধ্যমের আমূল চিত্র। বিষয়, উপস্থাপনা এবং বৈচিত্র্যের নতুন বাস্তবতায় গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞরা হতভম্ব। বলতে গেলে প্রায় প্রতিদিনই নতুন নতুন বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে গণমাধ্যমের সামনে। তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের সুযোগ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম মানুষের মনোজগতে এমন একটি জায়গা করে নিয়েছে, সেখানে প্রচলিত গণমাধ্যমকে প্রতিদিন একটি নতুন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে অগ্রসর হতে হচ্ছে। এই অবস্থায় উন্নত দেশগুলোর গণমাধ্যম নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে কিছুটা খাপ খাইয়ে নিলেও সংকটে পড়েছে অনুন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর গণমাধ্যম। এসব দেশে টেকনোলজির বিস্তার ঘটলেও শিক্ষা ও অর্থনীতিসহ নানা কারণে মিডিয়ার এই নতুন বাস্তবতার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার মতো পরিবেশ তৈরি হয়নি। যে কারণে বাড়ছে সংঘাত, নতুন বনাম পুরনো মিডিয়ার। অর্থাৎ নিউ মিডিয়া বনাম ট্র্যাডিশনাল মিডিয়া। এই দ্রুত পরিবর্তনশীল সময়ে প্রথাগত মিডিয়াকে যুক্ত হতে হচ্ছে অনলাইনে, অনলাইন যুক্ত হচ্ছে মাল্টিমিডিয়ার সঙ্গে এবং অন্যদিকে মাল্টিমিডিয়া ও টেলিভিশন মিডিয়াকে যুক্ত হতে হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। এছাড়া সোশ্যাল মিডিয়ায় চলছে এক ধরনের সম্পাদকীয় প্রতিষ্ঠানবিহীন সাংবাদিকতা, তা সামগ্রিক গণমাধ্যমকে ফেলে দিচ্ছে এক নতুন চ্যালেঞ্জে। যদিও অনেক বিশেষজ্ঞই মনে করেন, একটা সময়ে গিয়ে পুরো বিষয়টা একটা আকার নিয়ে নেবে। কিন্তু সেটা কখন বা কতদিন পর- সে সম্পর্কে এখন বলা খুবই কঠিন। যেখানে প্রতিদিনই পরিবর্তন হচ্ছে তথ্যপ্রযুক্তি, সেখানে ভবিষ্যদ্বাণী করা সহজ নয়। যোগাযোগের এই বৈপ্লবিক পরিবর্তন গণমাধ্যমকে এনেছে একটি পরিবর্তনশীল ধারায়, যার সঙ্গে আসলে তাল মিলিয়ে চলা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আধুনিক বিশ্বে এই পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য নানারকম পদক্ষেপ নেয়া হলেও যেসব দেশে মিডিয়া লিটারেসি কম, সেখানে মিডিয়ার জন্য একটি সংকট তৈরি করেছে। রুদ্ধ করেছে গণমাধ্যমের নতুন বিকাশ। গণতন্ত্রের অনুষঙ্গ হিসেবে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও এখন গণমাধ্যম নতুন চেহারা নিয়ে একটি নতুন বাস্তবতায় এসে দাঁড়িয়েছে। সেখানে গণমাধ্যম গণতন্ত্রের সহায়ক শক্তি হিসেবে কী ভূমিকা পালন করবে এবং সেটা কোন চেহারা নিয়ে- সেটা এখন একটি বড় প্রশ্নও বটে।

শ্যামল দত্ত

অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ার এই বিস্তার গণমাধ্যম ছাড়াও সমাজ বাস্তবতায় নতুন নতুন সংকট তৈরি করছে। যেহেতু এই ধরনের গণমাধ্যমের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালা নেই, ফলে সমাজে সমাজে, রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে, ধর্মে ধর্মে এবং বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে তৈরি করছে নতুন নতুন সংকট। এমনকি খোদ মার্কিন নির্বাচনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম মানুষের মনোজগতে প্রভাব ফেলছে- এমন অভিযোগের প্রমাণও আছে। অন্যদিকে অনুন্নত দেশগুলোতে এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এসেছে একটি ভয়াবহ চেহারা নিয়ে। এ কথা সত্য যে, তথ্যপ্রযুক্তিতে যে পরিবর্তন ঘটে গেছে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া যেমন যাবে না, আবার এর সঙ্গে পুরোপুরি খাপ খাইয়ে চলাও বড় কঠিন। যে কারণে একটি দোলাচল বা একটি অস্থিতিশীল অবস্থার মধ্য দিয়েই এই মুহূর্তে পার করতে হচ্ছে গণমাধ্যমকে।

বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের গণমাধ্যমও এই বাস্তবতার মুখোমুখি। শত শত পত্রিকা, হাজার হাজার অনলাইন এবং অসংখ্য টেলিভিশন- কতখানি জনমানুষের প্রত্যাশা পূরণ করছে, সেটি এখন একটি বড় প্রশ্ন। কিন্তু এই পুরো পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো পথ আমাদের জানা আছে মনে হয় না। কারণ প্রতিদিনই তথ্যপ্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে বদলে যাচ্ছে গণমাধ্যমের চেহারাও। ফলে পুরো পরিস্থিতি সামলাতে কবে সুনির্দিষ্ট একটি গাইডলাইন তৈরি করা সম্ভব হবে, সেটিও বলা এখন খুবই মুশকিল।

গণমাধ্যমের এরকম একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে ৩১ বছরে পড়েছে পুরনো একটি গণমাধ্যম ‘দৈনিক ভোরের কাগজ’, যার জন্ম হয়েছিল ৩০ বছর আগে স্বৈরাচারের পতনের পর। পত্রিকাটির জন্ম হয়েছিল দীর্ঘ সংগ্রামের পর একটি কাঙ্খিত গণতন্ত্রের যাত্রার মুহূর্তে- যার প্রত্যাশা ছিল একটি অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ; যেখানে সব মত ও পথের একটি মিলনস্থল হবে সেটি। কিন্তু দুর্ভাগ্য ৩০ বছর পর যে আকাক্সক্ষা এবং উদ্দেশ্য নিয়ে যাত্রা শুরু, তার বাস্তবতা আমূল পাল্টে গেছে। সমাজ উন্নত হয়েছে, অর্থনীতির আকার বেড়েছে, তথ্যপ্রযুক্তি পরিবর্তন করেছে গণমাধ্যমের পরিস্থিতি। নতুন বাস্তবতার এই অবস্থায় যে আদর্শ নিয়ে ৩০ বছর আগে যাত্রা শুরু, ৩০ বছর পরে সেই বাস্তবতা কোন জায়গায় আছে, সেটি একটি বড় প্রশ্ন। এখন এই মুহূর্তে প্রতিযোগিতার বাজারে যেখানে অসংখ্য পুঁজি গণমাধ্যমে চলে এসেছে ভিন্ন কারণে, সেখানে আদর্শ বা লক্ষ্য নিয়ে গণমাধ্যমকে টিকিয়ে রাখা কঠিন। নতুন পুঁজির বিকাশ হয়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এবং সেই অসুস্থ পুঁজি আক্রমণ করেছে গণমাধ্যমকেও। গণমাধ্যমের বিকাশের আকাঙ্খায় নয়, নিজেদের কালো অর্থকে সামলাবার জন্য তারা বিনিয়োগ করেছে গণমাধ্যমে। কালো টাকার এই অসৎ ও অসুস্থ প্রতিযোগিতায় একটি গণমাধ্যম কীভাবে সততার সঙ্গে টিকে থাকবে, সেটি এখন একটি বড় প্রশ্ন। প্রতিদিন নতুন নতুন কাগজ বেরোচ্ছে। কিন্তু কেন বেরোচ্ছে, কারা বের করছে, কী উদ্দেশ্যে বের করছে- এটি নিয়ে একটি গবেষণা হতে পারে, কিন্তু সবাই জানেন এর উদ্দেশ্যগুলো কী। এই ধরনের একটি নীতিহীন প্রতিযোগিতার মাঝে একটি প্রকৃত সাংবাদিকতার পরিবেশ তৈরি করে গণমাধ্যমকে এগিয়ে নেয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদি সামাজিক দায়িত্ববোধ প্রধান কারণ না হয়, যদি শুধু ব্যবসাকে প্রতিরক্ষা দেয়ার জন্য গণমাধ্যম বের করা উদ্দেশ্য হয় থাকে, যদি পুঁজিপতিরা গণমাধ্যমকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার জন্য গণমাধ্যম বের করতে আসেন, সেই দেশে গণমাধ্যমের প্রকৃত বিকাশ হওয়া খুবই কঠিন। এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, বাংলাদেশ এখন এরকমই একটি পরিস্থিতির মুখোমুখি।

গণমাধ্যমের যখন এই পরিস্থিতি, তখন বিরানব্বই সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি যাত্রা শুরু করা একটি উদ্যোগ অর্থ্যাৎ ভোরের কাগজ-এর যাত্রা আজ নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। ভোরের কাগজ প্রকাশিত হয়েছিল গণতন্ত্রকে বিকাশের লক্ষ্য নিয়ে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে শানিত করার লক্ষ্য নিয়ে, অসাম্প্রদায়িক এবং গণতন্ত্রকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য। আজকে ৩০ বছর পর সেই লক্ষ্য কতখানি অর্জিত হয়েছে তা মূল্যায়ন করবেন গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞগণ। কিন্তু এটি সত্যিই বাস্তবতা যে, এই ধরনের আদর্শ ও উদ্দেশ্য নিয়ে গণমাধ্যমের টিকে থাকা অসম্ভব হয় দাঁড়িয়েছে। যেখানে একটি কঠিন অবস্থার মুখোমুখি গণতান্ত্রিক কাঠামো, রাজনৈতিক সমাজ বিভাজিত এবং সেই সমাজে দ্রুত পুঁজিপতিদের উত্থান ঘটছে এবং তাদের হাতে গণমাধ্যম চলে যাওয়ায় প্রকৃত সব গণমাধ্যম এখন প্রায় কোণঠাসা। এরকম একটি অবস্থায় ভোরের কাগজের মতো গণমাধ্যমগুলোকে একদিকে যেমন আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে সংগ্রাম করতে হচ্ছে, অন্যদিকে কালো পুঁজিপতিদের থাবার সঙ্গে প্রতিদিন লড়াইয়েও অবতীর্ণ হতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতি নিয়েই ৩০ বছর থেকে ৩১ বছরে পা দিচ্ছে ভোরের কাগজ।

যে আদর্শ সমুন্নত রাখতে এই প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয়েছিল, সেই আদর্শ অটুট রাখার প্রত্যয় পুনরায় ব্যক্ত করছে ভোরের কাগজ। যে দেশের মাটিতে মিশে আছে লাখো মানুষের রক্ত, সে জাতির পিতার নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, সেদেশের মানুষের স্বপ্নের অংশীদার হয়ে মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার বাস্তবায়নের লড়াইয়ে অবতীর্ণ থাকবে ভোরের কাগজ।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই দিনে সকল পাঠক, বিজ্ঞাপনদাতা ও শুভানুধায়ীকে জানাই অনেক শুভেচ্ছা।

এসএইচ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়