ঢাকার খাল উদ্ধার ও সংরক্ষণ চেষ্টা : মেয়র আতিকুলকে সাধুবাদ

আগের সংবাদ

বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও ইন্দিরার কর্মকৌশল

পরের সংবাদ

পরিবহনে অরাজকতা বেড়েই চলছে

মজিবর রহমান

কলাম লেখক

প্রকাশিত: জানুয়ারি ২৯, ২০২২ , ১২:৩১ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জানুয়ারি ২৯, ২০২২ , ১২:৩১ পূর্বাহ্ণ

যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ বাড়ছে ক্রমাগত। কোথাও নতুন সড়ক তৈরি হচ্ছে, কোথাওবা প্রশস্ত হচ্ছে পুরনো সড়ক। ব্রিজ হচ্ছে একের পর এক, উড়াল সড়ক হচ্ছে, হচ্ছে মেট্রোরেল। অর্থনীতির জন্য এসব সুসংবাদ নিশ্চয়ই। যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থা যত উন্নত হবে তত সহজ হবে জীবনযাত্রা। এলাকাভিত্তিক পণ্য সংকট দূর হবে, তৃণমূলের উৎপাদক শ্রেণিরও উৎপাদিত পণ্যের মূল্য যথোপযুক্ত পাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। তবে নিরাপদ যাতায়াতের জন্য খ্যাত রেল, কিংবা সাশ্রয়ী যাতায়াত ও পরিবহনের জন্য শ্রেয় জলপথের উন্নয়নে নজর দেয়া হচ্ছে অতি সামান্যই। সব উদ্যোগ মূলত সড়ককে ঘিরে। আর এই অগ্রাধিকারের সড়ক মানুষের জন্য হয়ে উঠছে ভীতির কারণ।
পুলিশ বিভাগের তথ্য অনুসরণ করে একটি জাতীয় দৈনিক জানাচ্ছে, গত এক বছরে অর্থাৎ ২০২১ সালে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু বেড়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ। অথচ এ সময়ে করোনা মহামারির বিধিনিষেধের কারণে ৮৫ দিন গণপরিবহন নিয়ন্ত্রিত চলাচল করেছে। আগের বছরের তুলনায় ২০২১ সালে সড়কে মৃত্যু বেড়েছে প্রায় ১ হাজার। ২০১৮ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেছিলেন ২ হাজার ৬৩৫ জন, ২০১৯ সালে ৪ হাজার ১৩৮ জন, ২০২০ সালে ৫ হাজার ৪৩১ জন, আর ২০২১ সালে ৬ হাজার ২৮৪ জন। পরিসংখান অনুযায়ী এই মৃত্যুর হার ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। অবশ্য বেসরকারি হিসাবে মৃত্যুর সংখ্যা আরো বেশি। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের হিসাবে সড়ক দুর্ঘটনাজনিত কারণে প্রতি বছর প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। (সূত্র : প্রথম আলো, ২২. ০১.২০২২)
১৯৯৩ সাল থেকে নিরাপদ সড়কের জন্য আন্দোলন করে আসছেন ইলিয়াস কাঞ্চন। এর মধ্যে ২০১৮ সালে ঢাকায় রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই ছাত্র সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হলে ছাত্রসমাজ আন্দোলন গড়ে তোলে এবং দাবি উঠায় কঠোর নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের। দাবিমতো আইন প্রণীতও হয়, কিন্তু তার বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয় না। দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি প্রতিষ্ঠান বিআরটিএ বা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ যারপরনাই ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে, ফলে আইনটি কার্যত কাগুজে আইনে পরিণত হয়েছে। এতে সড়কে অরাজকতা বেড়েই চলছে, প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা বাড়ছে, শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ছে, জনমনে অসন্তোষ তীব্র হচ্ছে। কর্তৃপক্ষ এর পরিণতি নিয়ে উৎকণ্ঠিত মনে হয় না। সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার উপায় নিয়ে অনেক কথাবার্তা, লেখালেখি হয়েছে। এ নিয়ে নতুন করে কিছু বলার আছে বলে মনে করি না। নিয়মনীতি ও আইনকানুন না মানাই অরাজকতার প্রধান হেতু। গণপরিবহনের মালিকরা যথেষ্ট চালাকচতুর, তারা আইন ও নিয়মের সবকিছুই জানেন, কিন্তু প্রতিপালন করেন না। এর পেছনে আছে স্বার্থ, নিজেদের স্বার্থচিন্তা ছাড়া অন্য কোনোকিছুই তাদের বিবেককে নাড়া দেয় না। সে কারণেই আইনের যথাযথ প্রয়োগের আবশ্যকতার কথা বলা। সরকার যদি এদিকে নজর না দেয় তো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে সময় লাগবে না। দুঃখ হয় যখন দেখি সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা অথবা স্থানীয় সরকারের আওতাধীন কোনো প্রতিষ্ঠান নিয়মকানুন মানছে না। সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ি চালাচ্ছে ড্রাইভারের পরিবর্তে হেলপার, তাতে মানুষ চাপা পড়ে মারা যাচ্ছেন। গাড়ির ফিটনেস আছে-কি-নাই যাচাই করানো হচ্ছে না বছরের পর বছর, চালকের লাইসেন্সের মেয়াদও পরীক্ষা করা হচ্ছে না।
সরকারি সংস্থা বিআরটিএর সক্ষমতা কিংবা সদিচ্ছার প্রবল ঘাটতি আছে। গাড়ির ফিটনেস সার্টিফিকেট ইস্যু, লাইসেন্স বা রুট পারমিট প্রদান ইত্যাদি কোনো কাজই সঠিক যাচাই-বাছাই করে করা হয় না। দালালের দৌরাত্ম্য সেখানে প্রবল। দুর্নীতি আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে প্রতিষ্ঠানটিকে- এ কথা বহুদিন থেকে বহুল শ্রæত। লোকবলেরও ঘাটতি আছে বলে তারা শোনান। জরাজীর্ণ এ প্রতিষ্ঠান দ্বারা আশানুরূপ ফললাভ সম্ভব নয়। সরকারকে এদিকটি খতিয়ে দেখতে অনুরোধ করি। প্রতিষ্ঠানটিকে সক্ষম ও সদিচ্ছাপ্রবণ করতে একে ঢেলে সাজানো দরকার, বিকল্প কর্মপদ্ধতি উদ্ভাবন জরুরি। এদিকে দেশে মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত ইজিবাইকের সংখ্যা বাড়ছে অকল্পনীয় গতিতে। বিআরটিএ প্রদত্ত হিসাবে বিগত ১০ বছরে মোটরসাইকেলের সংখ্যা প্রায় পাঁচ গুণ বেড়েছে। ২০১১ সালে এ সংখ্যা ছিল সাড়ে ৭ লাখ, ২০২১ সালে হয়েছে ৩৫ লাখেরও অধিক। ইজিবাইকের কোনো পরিসংখ্যান চোখে না পড়লেও বিভিন্ন গ্রাম ও শহরে যা দেখছি তাতে এ যানটির সংখ্যাও অস্বাভাবিক হতে পারে। মফস্বলের কোনো কোনো শহরের কথা জানি যেখানে ইজিবাইকের কারণে স্বাভাবিক হাঁটাচলা পর্যন্ত দুরূহ হয়ে পড়েছে। এসব যানের সংখ্যাধিক্যের কারণে দুর্ঘটনাও বাড়ছে। বিশেষত মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা মাত্রা ছাড়াচ্ছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে কেবল রাজধানী ঢাকা নয়, মফস্বল শহরগুলোও বাসযোগ্যতা হারাতে যাচ্ছে দ্রুত। বিশেষজ্ঞরা অনেক দিন থেকেই এসব বিষয়ে সতর্ক করছেন। বিভিন্ন রকম পরামর্শ দিচ্ছেন। এবার সরকারেরও দৃষ্টিপাত প্রয়োজন।
পরিবহন শ্রমিকদের অশিষ্ট ও আশালীন আচরণ নিয়ে অভিযোগ বহুদিনের। ইতর প্রকৃতির কথাবার্তা তাদের মুখে আটকায় না, ভদ্রতাজ্ঞান শূন্যের কোটায়। এসব শ্রমিকের একাংশ আবার বেপরোয়া ও হিংস্র প্রকৃতির। তাতে প্রাণ দিতে হয় অনেক মানুষের। গত ২০ জানুয়ারি এমনই এক নৃশংস ঘটনায় প্রাণ গেল এক যাত্রীর। ঢাকার জয়কালী মন্দিরের কাছে ভাড়া নিয়ে কথা কাটাকাটির জেরে বাসের হেলপার ওই যাত্রীকে ধাক্কা দিয়ে বাস থেকে ফেলে দিলে তার মৃত্যু হয়। একই দিন ঢাকারই মগবাজারে দুই বাসের রেষারেষিতে মাঝখানে আটকা পড়ে প্রাণ গেল এক কিশোরের। ঘটনা দুটি নতুন নয়, প্রায়ই ঘটছে এমনতর ঘটনা। খালি বাসে ধর্ষণের মতো লোমহর্ষক ঘটনাও ঘটছে। প্রতিটি ক্ষেত্রে আসামিরা পুলিশের হাতে ধরা পড়ে, বিচারের মুখোমুখি হয়, কিন্তু দীর্ঘসূত্রতায় আটকা পড়ে দৃশ্যমান হয়না বিচার। এমন ধারার পরিবর্তন দরকার।
আশ্চর্যরকমের সত্য, শ্রমিকদের এই আচার-আচরণ পরিবর্তন নিয়ে বাস মালিকরা মোটেও মাথা ঘামান না, উল্টো তাদের পক্ষে সাফাই গেয়ে যান। অথচ তাদের করার আছে অনেক কিছু। যদি যথেষ্ট যাচাই-বাছাই ও আচার-আচরণ পরীক্ষা করে শ্রমিকদের নিয়োগ দেয়া হতো তাহলে পরিস্থিতি পাল্টে যেতে পারত। তাদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের আওতায় আনা গেলে ফলদায়ক হতো। দেশে দূরপাল্লার বিলাসবহুল যে বাসগুলো আছে তাতে কর্মরত শ্রমিকদের আচরণ নিয়ে অভিযোগ শোনা যায় না। এমনকি বিআরটিসির বাসে চাকরিরত শ্রমিকদের নিয়েও তেমন অভিযোগ নেই। বাস মালিকরা যদি তাদের শ্রমিকদের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আচরণের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেন এবং নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেন তাহলে পরিস্থিতির ব্যাপক পরিবর্তন ঘটবে বলে বিশ্বাস করি। ঢাকা শহরে সমস্যা বেশি। প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক ঢাকায় চলাচলরত বাসগুলোকে নির্দিষ্ট কয়েকটি কোম্পানির অধীনে এনে কর্মচারীদের মাসিক বেতন প্রদানের ভিত্তিতে চালানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। গুলশানে তার এ উদ্যোগ ফলপ্রসূও হয়েছে। উত্তরসূরি দুই মেয়র সেই পদ্ধতি অনুসরণ করতে চাইছেন। ভাটারা-কাঁচপুর রুটে পরীক্ষামূলকভাবে চালু করেছেন ‘ঢাকা নগর পরিবহন’-এর বাস। এই বাসগুলো অন্য বাসের তুলনায় শ্রেয়; ঘাটে ঘাটে থামার বিড়ম্বনা নেই, নেই যাত্রীদের সঙ্গে চালক-সহকারীর বচসা। উদ্যোগটিকে সফল করতে পারলে যাত্রীদের দুর্ভোগ অনেকাংশে কমবে আশা করা যায়।

মজিবর রহমান : কলাম লেখক।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়