অঙ্কুরেই বিনষ্ট হচ্ছে বীজ

আগের সংবাদ

কিমাশ্চর্যম অতঃপরম

পরের সংবাদ

বুদ্ধদেব ও সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় : প্রত্যাখ্যানের নীরব অহংকার

অজয় দাশগুপ্ত

কলাম লেখক

প্রকাশিত: জানুয়ারি ২৮, ২০২২ , ১:২৫ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জানুয়ারি ২৮, ২০২২ , ১:২৫ পূর্বাহ্ণ

গত মঙ্গলবার রাতে বুদ্ধদেব বিবৃতি দিয়ে বলেন, ‘পদ্মভূষণ পুরস্কার নিয়ে আমি কিছুই জানি না। আমাকে এ নিয়ে কেউ কিছু বলেনি। যদি আমাকে পদ্মভূষণ পুরস্কার দিয়ে থাকে, তাহলে আমি তা প্রত্যাখ্যান করছি।’ পুরস্কার প্রত্যাখ্যানের বিষয়ে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় আনন্দবাজার পত্রিকাকে বলেন, ‘এভাবে কেউ পদ্মশ্রী দেয়? আমি বলে দিয়েছি, আমার পদ্মশ্রীর দরকার নেই। শ্রোতারাই আমার সব।’ ২০১১ সালে তৃণমূলের কাছে বড় হারের আগ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। তিনি ওই রাজ্যের শেষ কমিউনিস্ট মুখ্যমন্ত্রী।
পশ্চিমবঙ্গ ভারতের একটি রাজ্য। সাতচল্লিশে দেশভাগের নামে যে দুটি রাজ্য সবচেয়ে বেশি আক্রোশ আর অবিবেচনার শিকার হয়েছিল তার একটি পাঞ্জাব আরেকটি বাংলা। দেশভাগের ৭৫ বছর পর ফিরে তাকালে মনে হয় এজন্য দায়ী বাঙালিদের বিদ্রোহ আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। বাংলায় চট্টগ্রামের সন্তান সূর্য সেন যখন সশস্ত্র বিপ্লবের পরিকল্পনা করেছিলেন এবং আত্মাহুতি দিয়েছিলেন তখন বাকি ভারত স্বাধীনতার স্বপ্নও সেভাবে দেখতে শুরু করেনি। প্রীতিলতা থেকে বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরী সব মিলিয়ে চট্টগ্রাম বা বাংলাই ছিল সূতিকাগার। পরবর্তীকালে সুভাষ বোস কিংবা স্বাধীন হওয়ার আগে যুক্ত বাংলার শেরে বাংলা কাউকেই পছন্দ করত না ইংরেজরা। অন্যদিকে পাঞ্জাবের মানুষজন সাহসী আর লড়াকু। শহীদ ভগৎ সিংহ থেকে জালিওয়ানাওয়ালা বাগের রক্ত ইংরেজকে নিশ্চিতভাবেই ক্রোধী করে রাখার নমুনা। সে যাই হোক বাংলা ভাগের অনিয়মতান্ত্রিক খড়গ ভাগ হয়ে যাওয়া পশ্চিম বাংলা আর আমাদের বাংলাদেশের আসলে কোনো ভৌগোলিক সীমারেখাও নেই। মানুষই তা বানিয়ে নিয়েছে। একটা বড় গাছ বা ছোট খাল কিংবা ধানের জমিনের এ পাশকে বাংলাদেশ ও পাশকে ভারত বা পশ্চিম বাংলা বলার রাজনীতি যাই হোক আমাদের সমাজের মিল ও চোখে পড়ার মতো। ভাষা পোশাক খাবার সিনেমা নাটক গান কবিতা সবকিছুই এক ধরনের। দীর্ঘ ঐতিহ্য আর বর্তমানের আন্তর্জাল সংস্কৃতি দুই বাংলাকে এতটা কাছে রেখেছে যে এখন সীমান্ত যেন একটা নিয়ম বা বাধার বিষয়।
কিন্তু মজার বিষয় এই উভয় বাংলার মানুষের আচার-আচরণ সংস্কৃতি আর রাজনীতিতে ঘটে গেছে ব্যাপক পরিবর্তন। আমাদের সমাজে পুরস্কার পদক বা কিছু পাওয়ার জন্য মানুষ এখন মরিয়া। রাজনীতি বাজারে কতটা আছে বা নেই সেটা বড় বিষয় না। বড় বিষয় রাজনীতি বা দল নিয়ন্ত্রিত পদক পুরস্কার। দুয়েকজন মানুষ মাঝে মাঝে এর ব্যতিক্রম বা তাদের কথা আলাদা। কিন্তু তারা তো ব্যতিক্রমই। মূলধারাটা এখন বদলে গেছে। যা তোষামোদী লবিং আর স্তাবকতায় পরিপূর্ণ। এমন একটা বাস্তবতায় কেউ কোনো পদক বা পুরস্কার হাতছাড়া করবেন এমনটা ভাবাও যায় না। কীভাবে সেটা হবে? যেখানে একটা পদকের দামের চেয়ে বেশি টাকা খরচ করে পুরস্কার নেয়ার কথা বাজারে চালু সেখানে প্রত্যাখ্যান বা না নেয়ার মতো বুকের পাটা আসবে কোথা থেকে? এমন না যে আমাদের দেশে তেমন মানুষ নেই। বদরুদ্দীন উমর ১৯৭২ সালেই বাংলা একাডেমি পুরস্কার বর্জন করেন : এমন আরো কেউ কেউ আছেন। কিন্তু কয়েক দশক ধরে সব সরকারের আমলেই এসব পদক প্রাপ্তি লবিং ও সরকারি আনুকূল্য না থাকলে কারো ভাগ্যে জোটেনি। এমনও দেখা গেছে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পুরস্কার ঘোষণা করার পর সে মানুষটির নাম প্রত্যাহার বা বাদ দেয়া হয়েছে। এবং সেই মানুষটি তারপর মারাও গেছেন। এত বড় একটা সম্মান নিয়ে এমন নাটক আমাদের সমাজেই সম্ভব।
যে দুজন মানুষের কথা দিয়ে লেখাটির শুরু তারা কে বা কেন বিখ্যাত তা আমাদের অজানা নয়। বিশেষ করে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় আপামর বাঙালির ঘরে ঘরে পরিচিত এক গায়িকা। সংগীতের পেছনে ব্যয় করেছেন গোটা জীবন। গান গেয়েছেন একাধিক ভাষায়। অথচ এতকালেও সম্মান পাওয়ার যোগ্য মনে করা হয়নি তাকে। তাই নরেন্দ্র মোদি সরকারের চতুর্থ সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান ‘পদ্মশ্রী’ (চধফসধ ঝযৎর) প্রত্যাখ্যান করলেন প্রবাদপ্রতিম সংগীত শিল্পী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। বয়স ৯০ পেরিয়েছে। তার চেয়ে কম বয়সিরাও সম্মান পেয়ে গিয়েছেন। তাই এখন আর সম্মানের প্রয়োজন নেই বলে কেন্দ্রীয় সরকারকে ফোনেই জানিয়ে দিয়েছেন বলে শিল্পীর পরিবার সূত্রে খবর।
মঙ্গলবার ‘পদ্মশ্রী’ প্রাপকদের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। তাতে গীতশ্রী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের নাম রয়েছে। তালিকা প্রকাশের পর এ দিন শিল্পীর লেক গার্ডেন্সের বাড়িতে ফোন আসে দিল্লির তরফে। ‘পদ্মশ্রী’ সম্মানে তাকে সম্মানিত করা হচ্ছে বলে জানানো হয়। কিন্তু অপর প্রান্তে থাকা ব্যক্তিকে শিল্পী সরাসরি জানিয়ে দেন যে, তিনি ‘পদ্মশ্রী’ প্রত্যাখ্যান করছেন। এই সম্মান নিতে অপারগ তিনি।
শিল্পীর পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, বয়স ৯০ পেরিয়েছে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের। ১২ বছর বয়স থেকে গান গাইছেন। সংগীতের পেছনে জীবনের ৭৫টি বছর উৎসর্গ করে দিয়েছেন। অথচ এত দিনেও তার মতো সংগীতজ্ঞকে সম্মানের যোগ্য বলে মনে হয়নি। বরং তার চেয়ে কম বয়সের শিল্পীদের সম্মান ধরানো হয়েছে। তাতেই সম্মান প্রত্যাখ্যান করেছেন শিল্পী।
এই আভিজাত্য বা সম্মানবোধ মানুষের মেরুদণ্ডের পরিচায়ক। বায়োলজিক্যাল মেরুদণ্ড সবারই থাকে। কিন্তু শিরদাঁড়া বলে যেটা সেটা না থাকলে মানুষ মানুষ হয় না। কী হতো যদি সন্ধ্যা এই পদ্মশ্রী নিতেন? তার বয়স এখন ৯০-এর ওপরে। মৃত্যুর পর পদ্মশ্রী যুক্ত হতো নামের সঙ্গে এই তো? কিন্তু তার কি আদৌ প্রয়োজন আছে? পদ্মশ্রীর চেয়ে গীতশ্রী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় বাঙালির মন মাতানো প্রাণ জাগানো এই গায়িকা। যার জন্য মোদি সরকারের এই পদ্মশ্রী আসলেই তুচ্ছ। বরং বলব অজস্র পদ্মশ্রীর ভিড়ে নাম মনে থাকবে হেমন্তের যিনি আশির দশকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন আর থাকবে এবার বর্জন করা সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের নাম।
বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য রাজনীতিবিদ। তার কাকা বাঙালির প্রিয় বিদ্রোহী বিপ্লবী কবি সুকান্ত। বাম রাজনীতির পুরোধা বুদ্ধদেব বাবুর সততা গল্পের মতো। না আছে তার কোনো বিত্তবৈভব না হাঁকডাক। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের পরিবার সূত্রে জানিয়ে দেয়া হয় মোদি সরকারের দেয়া পদ্মভূষণ সম্মান প্রত্যাখ্যান করছেন তিনি। এ ব্যাপারে তিনি জ্যোতি বসুর দেখানো পথেই হাঁটলেন। এর আগে ২০০৮ সালে জ্যোতি বসুকে ভারত রতœ প্রদানের প্রস্তাব করা হয়েছিল। তখন জ্যোতি বসু জানিয়ে দিয়েছিলেন, তাকে ভারত রতœ দেয়া হলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করবেন।
এবার বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে পদ্মভূষণ সম্মান প্রদান করার কথা জানানো হলেও, তিনি তা প্রত্যাখ্যান করলেন। সারাজীবন বিজেপি নামক বিপদ থেকে বারবার রাজ্যকে সাবধান করে এসেছেন তিনি। তাই তিনি চান না বিজেপি সরকারের দেয়া কোনো সম্মান গ্রহণ করতে। বুদ্ধদেব বাবু নিজেই জল্পনার অবসান ঘটালেন পদ্ম-পুরস্কার ফিরিয়ে দিয়ে।
পাশের বাংলার রাজনৈতিক নেতা শিল্পীরা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেও আমাদের কি ঘুম ভাঙবে? আমাদের ঝিমিয়ে পড়া নির্জীব রাজনীতি মুখ লুকানো সংস্কৃতি প্রতিবাদ ভুলেই গেছে প্রায়। ভুলে গেছে না বলার সংস্কৃতি। মাঝে মাঝে তার দরকার পড়ে বৈকি। পড়ে না?
অজয় দাশগুপ্ত : কলাম লেখক।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়