ঘরের শত্রু বিভীষণ

আগের সংবাদ

সড়কে লাশের মিছিল থামছে না!

পরের সংবাদ

শাঁওলি মিত্র : স্মৃতিতে, কীর্তিতে

আহমেদ আমিনুল ইসলাম

অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশিত: জানুয়ারি ২৩, ২০২২ , ১:৩৫ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জানুয়ারি ২৩, ২০২২ , ১:৩৫ পূর্বাহ্ণ

শাঁওলি মিত্র। কণ্ঠশিল্পী, বাচিক শিল্পী এবং মঞ্চাভিনেত্রী হিসেবে আমাদের কাছে পরিচিত। পরিচিত উপমহাদেশের প্রখ্যাত অভিনেতা শম্ভু মিত্র এবং তৃপ্তি মিত্রের সার্থক উত্তরাধিকারী হিসেবে। পরিচিত পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির সফল চেয়ারপারসন হিসেবেও। কিন্তু সব ছাপিয়ে শাঁওলি মিত্র বাংলা নাটকের প্রবহমান ইতিহাসের ধারায় এক ব্যতিক্রমী পথিকও। এ পথের সৃজনকর্ত্রী তিনি নন এ কথা সত্য। তবে তার চেয়েও গভীরতম সত্য হলো বাঙালির হাজার বছরের চর্চিত নাট্য পরিবেশনার ধারাকে আধুনিক জীবনবোধের সমান্তরালে স্থাপনে প্রয়াসী ছিলেন তিনি। সমগ্র জীবনের সাধনায় সে প্রয়াসে তিনি সফলও হয়েছিলেন। এই মহান শিল্পী বাঙালির সহস্রবর্ষের ঐতিহ্যবাহী ‘কথকতা’ ও ‘কথানাট্য’ রীতির আধুনিক প্রতিষ্ঠা নিয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গসহ বিভিন্ন অঞ্চলে যখন সংগ্রামশীল তখন ‘ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাট্য’, ‘কথানাট্য’ এবং ‘বাংলা বর্ণনাত্মক নাট্যরীতি’র প্রতিষ্ঠাকল্পে সমগ্র বাংলাদেশ মন্থন করছেন সেলিম আল দীন। বাংলা নাটকের ইতিহাসের ধারায় বিচিত্র অবদানের জন্য রবীন্দ্রোত্তরকালে সেলিম আল দীন অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাট্যকার।
১৯৮৯-৯০ সালের কথা। আমরা তখন নাটক বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাটক, কথকতা, কথানাট্য, পাঁচালি, বর্ণনাত্মক নাট্যরীতি প্রভৃতি অভিধার সঙ্গে পরিচয় চলছে মাত্র! কিছু কিছু বুঝি- যতটুকু বুঝি, তার বাইরেই বরং অপরিচয়ের বিস্তৃত অবলেশ! না বোঝার জগৎটাই বৃহৎ। এমন এক সময়ে সেলিম স্যারের আমন্ত্রণে শাঁওলি মিত্র জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগে আসবেন। দিনক্ষণ ঠিকঠাক। যে দিন তিনি ঢাকায় এলেন তাকে আনার জন্য সেলিম স্যারের সঙ্গী হলাম সহপাঠী, রুমমেট বন্ধু পংকজ আর আমি। সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ছিল সেদিন। তাই ক্যাম্পাস থেকে সন্ধ্যার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবাস নিয়ে বিমানবন্দরে রওনা হলাম আমরা। মাইক্রোবাসটি একাধিকবার পথে বিগড়ে গেল। আমাদের পৌঁছাতেও বিলম্ব হলো অনেকখানি। বিমানবন্দরে গিয়ে জানলাম কলকাতার ফ্লাইট অনেক আগেই চলে এসেছে। খোঁজ-খবর নিয়ে জানা গেল সে ফ্লাইটের যাত্রীদেরও কেউ আর ভেতরে নেই! সেলিম স্যারের অস্থিরতা সম্পর্কে যারা কিছুটা হলেও পরিচিত তারা বুঝতেই পারেন তখন তার কী অবস্থা! সে সময় ল্যান্ডফোন ছাড়া যোগাযোগের মাধ্যম ছিল না। এক সময় স্যারের অস্থিরতা কমল। তিনি সম্ভবত নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু ভাই অথবা অন্য কারো কাছে ফোন করে জেনেছেন শাঁওলি মিত্র উত্তরায় বাচ্চু ভাইয়ের এক পরিচিতের বাসায় উঠেছেন। আমরা উত্তরা গেলাম। সেখান থেকে রাত সাড়ে নয়টা-দশটার দিকে আমাদের যাত্রা শুরু হলো জাহাঙ্গীরনগরের অভিমুখে। এ যেন এক অন্তহীন যাত্রা! এ যাত্রার যেন শেষ নেই! কিছু দূর যাওয়ার পরপরই মাইক্রোবাসটির স্টার্ট বন্ধ হয়ে যায়! বয়স্ক ড্রাইভার, তাই স্যারের রাগ হলেও প্রকাশ করেন না। সেলিম স্যার, পংকজ আর আমি ধাক্কা দেই গাড়ি স্টার্ট নেয়, যাত্রা শুরু হয়! এভাবে ঢাকা শহরের ভেতরই কয়েকবার গাড়ি ঠেলতে হলো আমাদের। সেলিম স্যার ধাক্কা দেন আর রসিকতা করে বলেন : ‘ভাগ্যিস, রাত ছিল! নইলে পত্রিকায় সচিত্র নিউজ হয়ে যেতাম রে!’ গাড়ি ধাক্কানোর সময় আমাদের সঙ্গে আর গাড়ি চলন্ত অবস্থায় শাঁওলি মিত্রের সঙ্গে গাড়ি নিয়ে বিচিত্র ধরনের হাস্যরস করছিলেন স্যার। আসলে শাঁওলি মিত্রকে ব্যস্ত রাখার অজুহাত! শেষবারের মতো গাড়ির স্টার্ট বন্ধ হলো আমিন বাজার ও বলিয়ারপুরের মাঝামাঝি জায়গায়। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই প্রভৃতি নানা ঘটনার জন্য এ জায়গাটির বদনাম আগে শুনেছি। আমরা জানতাম স্যার অনেকটাই ভিতু প্রকৃতির! কিন্তু সে রাতে তার মধ্যে ভয়ের লক্ষণ দেখিনি! রাত তখন ১২টা অতিক্রম করেছে! স্যার বললেন আর ধাক্কাধাক্কি, ঠেলাঠেলি নয়, আয় তোদের আকাশের নক্ষত্র চেনাই, কোনটির কী নাম শেখাই। শাঁওলি মিত্রকেও গাড়ি থেকে নামতে বললেন। তিনি স্বাচ্ছন্দ্য ছিলেন না তবু নামলেন। আকাশের নক্ষত্র নিয়ে আলোচনা হলো কিছুক্ষণ। পংকজ ও আমার মধ্যে আকাশের অনন্ত নক্ষত্ররা কোনো আবেদনই সৃষ্টি করতে পারল না! ভীষণ ক্লান্তি আর অপ্রকাশিতব্য রাগও কাজ করছে ভেতরে ভেতরে! স্যার তাও বুঝলেন! বললেন : ‘একবার ইউলিসিসের কথা মনে কর, দেখবি আমাদের এই অভিযাত্রা তার চেয়ে কত সহজ! কত সংগ্রাম করে ইউলিসিসকে দেশে ফিরতে হয়েছিল! কত বছর লেগেছিল, মনে আছে তোদের?’ স্যারের প্রশ্ন এড়িয়ে আমরা তখন নক্ষত্রমুখী হয়ে উঠি! নক্ষত্র-পরিচয় শেষ হলে আবারো ধাক্কা। গাড়ি স্টার্ট নিল। আমরা রাত দেড়টার দিকে ক্যাম্পাসে পৌঁছালাম। পরদিন শাঁওলি মিত্র বিভাগে এলেন। পুরাতন কলা ভবনেই তখন আর্টস ফ্যাকাল্টির সব বিভাগ। সব বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীকে আগেই আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। শাঁওলি মিত্রের আবৃত্তি ও পাঠ শুনে সবাই আপ্লুত। বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ ও জীবনানন্দ দাশের কবিতার এমন পাঠ ও আবৃত্তি আগে শুনিনি! ক্যাসেট কিনে আবৃত্তি শোনার অভ্যাস ছিল আমাদের অনেকেরই। কিন্তু শাঁওলি মিত্রের আবৃত্তি শোনার পর সেসব ভীষণ হাল্কা মনে হতো! পরপর ক’দিনেই শাঁওলি মিত্র ‘শাঁওলি দিদি’ হয়ে উঠলেন। শাঁওলি দি আমাদের উচ্চারণের ক্লাসও নিলেন, পাঠ-অভিনয়ের ক্লাস নিলেন। বইয়ের ভেতরকার চরিত্ররা যেন তার কণ্ঠে জীবন্ত অবয়ব নিয়ে উপস্থিত হতো আমাদের সম্মুখে! মনে পড়ে, শাঁওলি দির আবৃত্তি শোনার পর আর কোনোদিন আবৃত্তির ক্যাসেট কিনিনি। ৭ দিনের মতো সময়েই তার কণ্ঠ শ্রবণেন্দ্রিয়কে এমনভাবে তৈরি করে ফেলেছিল যে আর কোনোরূপ আবৃত্তিই আমাদের কান আর শুনতেই চাইত না! সন্ধি ও সমাসবদ্ধ দীর্ঘ শব্দযুক্ত বাক্যের কী সহজ ও সাবলীল উচ্চারণে বঙ্কিম-উপন্যাসের পাঠ তিনি উপস্থাপন করেছেন আমাদের সামনে! সে পাঠ শুনে আমাদের মনের ভেতর যে চিত্রকল্প সৃজিত হয়ে উঠত তাও যেন একেবারেই জীবন্ত! কী অপূর্ব ঢং, কী অপূর্ব বিস্ময়ের ঘোর সৃজন করে তিনি তার শ্রোতা-দর্শককে ভিন্ন এক জগতে নিয়ে যেতেন কতই না সহজে! এ রকম বিস্ময় লাগা ঘোরের মধ্যে বিভাগে আমাদের প্রায় সপ্তাহখানেক কেটে গেল।
সপ্তাহান্তে চলে গেলেন শাঁওলি দি। কিন্তু তার কণ্ঠ রয়ে গেল আমাদের কানের ভেতর হয়ে একেবারে মর্ম পর্যন্ত! মাঝেমধ্যে সহসাই যেন কোনো না কোনো কবিতার চরণ শাঁওলি দির কণ্ঠ ভেসে আসত। ঘোরের আবেশেই শুনতে পেতাম লাশ কাটা ঘর, বনলতা সেন, রূপসী বাংলা কিংবা অন্ধকার কবিতার নিরন্তর অনুরণন। শুভা পাঠকালে শাঁওলি দির গাওয়া রবীন্দ্রনাথের ‘আমি কান পেতে রই/ ও আমার আপন হৃদয় গহন দ্বারে/ বারে বারে কান পেতে রই/ কোন গোপন বাঁশির কান্না হাসির গোপন বাঁশি শুনিবারে’- গানটি কতদিন যে আমাদের ব্যাকুলতায় কাতর করেছে তার শেষ নেই! ভেসে আসত রবীন্দ্রনাথের অতিথি, চার অধ্যায়, ঘরে বাইরে, সোনার তরী, নিরুদ্দেশ যাত্রার নানা প্রসঙ্গসহ বঙ্কিমের সেই বিখ্যাত চরণ : ‘পথিক, তুমি কি পথ হারাইয়াছ?’- কত কী! কিন্তু শাঁওলি দি, আজ উপলব্ধি করছি আপনারা আমাদেরকে একটি সত্য পথেরই পথিক বানিয়েছেন। আমরা পথ হারাইনি। বাংলা নাটকও ঔপনিবেশিকতার চাকচিক্যময় বিভ্রান্তি এড়িয়ে বলিষ্ঠ আত্মপরিচয়ে সঠিক পথেই আজ বিকাশমান রয়েছে।
শাঁওলি দিকে ঢাকা থেকে ক্যাম্পাসে আনার অভিজ্ঞতা ও অভিযান (!) ক্রমেই সুখ-স্মৃতি হয়ে উঠেছে। তা আজ বিশাল সম্পদেও যেন পরিণত! আমরা অনেকেই সেলিম স্যারের নিত্য-সহচর ছিলাম। শাঁওলি দির মতো ব্যক্তিত্বের সঙ্গও আমাদের জীবনকে উজ্জ্বল করেছে। সপ্তাহখানেক তিনি আমাদের সঙ্গে ছিলেন, আমরা ছিলাম ঘোরের মধ্যে। এই ঘোরের মধ্যে কথানাট্য, পাঁচালি, কথকতা, বর্ণনাত্মক নাট্যরীতিসহ অচিন্ত্য-ধর্মদর্শনের দ্বৈতাদ্বৈতবাদী তত্ত্বের আলোচনা শুনেছি। শুনেছি বাঙালির চিরায়ত দর্শন এবং সুফিবাদ নিয়েও আলোচনা। সে বয়সে তখন এসবের কী বুঝি! তবে নানা আলোচনায় যে কানটি তৈরি হয়েছিল তা নিয়েই বর্তমানে আমাদের পথচলা অব্যাহত আছে। তারই ধারাবাহিকতায় ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন পরিবেশনাসমূহের আঙ্গিক ও পরিবেশনা রীতির কাঠামো ও ধরন আমাদের অনুসন্ধিৎসার প্রেরণার স্থল। তারপর আমরা শাঁওলি মিত্রের একক পরিবেশনা দেখলাম। বাঙালির চিরায়ত কথকতা পরিবেশনা রীতির আশ্রয়ে তিনি আমাদের সামনে উপস্থাপন করলেন মহাভারতের খণ্ড অংশ থেকে ‘নাথবতী অনাথবৎ’ এবং ‘কথা অমৃত সমান’। সবাই মুগ্ধ বিস্ময়ে উপভোগ করলাম তার পরিবেশনা। বুঝলাম সেলিম আল দীন স্যার এ দেশে বসে ইউরোপাগত এবং ঔপনিবেশিক শিল্পরুচি আত্মস্থের বিরুদ্ধে যে সাংগঠনিক প্রয়াসে যুক্ত পশ্চিমবঙ্গে শাঁওলি মিত্রও ঠিক একই কাজ করছেন অনেকটা একাই। বাংলা নাট্যের শাশ্বত শিল্পবোধ ও শিল্পরুচিকে আধুনিক জীবনের অনুকূলে প্রতিষ্ঠার নিভৃতচারী এই মহান শিল্পী জীবনকে বাইরের চাকচিক্য দিয়ে বদলানোর চেয়ে অন্তর্গতভাবে পরিবর্তিত করতে চেয়েছেন। যেমনটি চেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথও। তাই রবীন্দ্রনাথ, শম্ভু মিত্র, সেলিম আল দীন কিংবা শাঁওলি মিত্ররা বাঙালির এতটা আপন। আপনজনদের প্রয়াণে আমরা অসহায় হয়ে পড়ি, নিঃস্ব বোধ করি। কিন্তু তাদের কীর্তিই কণ্টকাকীর্ণ পথেও আমাদের সাহসী করে তোলে। ১৪ জানুয়ারি আমরা নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের চতুর্দশ প্রয়াণ দিবস পালন করলাম। সেলিম আল দীনের মৃত্যু আমাদের মাথার ওপরকার শৈল্পিক আকাশকে দীর্ণ করেছে। আর ১৬ জানুয়ারি শাঁওলি মিত্রের প্রয়াণ সংবাদে আমাদের সেই আকাশটা যেন মুহূর্তেই আরো বিদীর্ণ হয়ে গেল!
শাঁওলি মিত্র, শাঁওলি দি, হে অনন্তলোকের অভিযাত্রী- পরজন্মেও শৈল্পিক ভুবনে বসবাস হোক আপনার, আপনাদের। সমগ্র জীবন যাদের কথা আসরে আসরে ‘কথকতা’য় বয়ান করে গেলেন মহাভারতের সেই সব বঞ্চিত-ব্যথিত চরিত্ররা মানবিক বোধ নিয়ে আপনার নিত্য-সহচর হোক। ভালো থাকুন ওপারে।
আহমেদ আমিনুল ইসলাম : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়