রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর স্বতন্ত্র বেতন কাঠামোর বাস্তবায়ন

আগের সংবাদ

শাঁওলি মিত্র : স্মৃতিতে, কীর্তিতে

পরের সংবাদ

ঘরের শত্রু বিভীষণ

মযহারুল ইসলাম বাবলা

নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত

প্রকাশিত: জানুয়ারি ২৩, ২০২২ , ১:৩৫ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জানুয়ারি ২৩, ২০২২ , ১:৩৫ পূর্বাহ্ণ

প্রাত্যহিক জীবনে আমরা সবাই নিঃশঙ্ক-নিরাপদে থাকতে চাই। নিজেদের ক্ষতিকারক সন্দেহভাজন শত্রুর বিষয়ে কম-বেশি সর্বদাই সজাগ-সচেতন থাকি। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে কে যে আমাদের প্রকৃত শত্রু আর কে যে মিত্র সেটা কিন্তু আমাদের অজ্ঞাতেই থেকে যায়। সন্দেহবশত কাউকে কাউকে শত্রু বিবেচনায় সতর্ক থাকলেও অনেক ক্ষেত্রেই শেষ রক্ষা হয় না। শত্রু নির্ধারণে আমরা প্রায়ই ভুল করে থাকি। প্রবচন আছে ‘ঘরের শত্রু বিভীষণ’। পৌরাণিকে আর্য রাম-ল²ণ ও অনার্য রাবণের সঙ্গে লঙ্কার যুদ্ধে রাবণের পরাজয়ের মূলে তারই নিজ ভ্রাতা বিভীষণের বিশ্বাসঘাতকতাকে কেন্দ্র করে প্রবচনটি ভারতবর্ষব্যাপী প্রচলিত। অর্থাৎ দূরের শত্রু কখনো ক্ষতি করতে পারে না, নিকটস্থ ছদ্মবেশী মিত্রদের সাহায্য-সহযোগিতা ব্যতিরেকে। আমাদের সামাজিক জীবনে এমনকি আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের নানা পর্বের নৃশংস ঘটনার পেছনে ঘরের অর্থাৎ নিকটজনদের বিশ্বাসভঙ্গের কারণেই শত্রুপক্ষের বিজয় লাভ সম্ভব হয়েছে। আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক জীবনেও অনুরূপ ঘটনা প্রায় ঘটে। পৈতৃক অর্থ-সম্পদ নিয়ে বিরোধে ভাই-ভাইয়ে, বোন-বোনে কিংবা ভাই-বোনে ওই সম্পত্তির কারণে পরস্পর চরম শত্রু হয়ে ওঠে। পরিণতিতে হানাহানি, বিবাদ-বচসা, মামলা-মোকদ্দমা হতে আইনি লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়া তো সাধারণ ঘটনা। সম্পত্তির জন্য ভাই হত্যা-বোন হত্যার ঘটনাও যে ঘটে না তা কিন্তু নয়। পিতা-পুত্র, স্বামী-স্ত্রী, ভাইয়ে-ভাইয়ে, বোন-ভাইয়ের সম্পর্ক-সম্প্রীতি ভেঙে পড়ে ওই উত্তরাধিকারী অর্থ-সম্পত্তির কারণেই। অর্থাৎ সম্পত্তি এবং ক্ষমতার প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে সর্বাধিক শত্রুতার ঘটনা ঘটে। এটা পারিবারিক জীবনে, সামাজিক জীবনে, রাজনৈতিক ইতিহাসে, সাহিত্যেও আমরা দেখতে পাই।
ভারতবর্ষের সুদীর্ঘ ইতিহাসের সব পর্বেই ক্ষমতা ও সম্পত্তির কারণে ভাই-ভাইকে, ভাই-বোনকে, পুত্র-পিতাকে, পিতা-পুত্রকে, জামাতা-শ্বশুরকে, সেনাপতি-রাজাকে হত্যা ও রাজ্য দখলের অজস্র ঘটনার দৃষ্টান্ত রয়েছে। ভারতীয় পৌরাণিকেও ক্ষমতার প্রভাব বিস্তারে শত্রু-মিত্রের অসংখ্য যুদ্ধ-বিগ্রহের কথাও উল্লেখ রয়েছে। বাংলা সাহিত্যে, বিশ্বসাহিত্যেও সম্পত্তি, ক্ষমতা, নারীকে নিয়ে দ্ব›দ্ব-বিবাদের প্রচুর শত্রুতার ঘটনা বর্ণিত আছে। সেখানেও শত্রুরা প্রধানত নিকটজনই, দূরের কেউ নন। ভারতবর্ষ সুদীর্ঘকাল বহিরাগত মুসলিমদের শাসনাধীনে ছিল। মুসলিম শাসকদের আগমনে এবং দখল প্রক্রিয়ায় শক্তি প্রয়োগ যেমন ছিল তেমনি ছিল স্থানীয়দের সহায়তা। স্থানীয় সহায়তা ব্যতিরেকে কেবল শক্তি দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি শাসন সম্ভব হতো না। বহিরাগত মুসলিম শাসকরা ভারতবর্ষে স্থায়ী হয়েছিল। তারা সম্পদ পাচার না করে লুণ্ঠিত বা অর্জিত অর্থ-সম্পদ এদেশেই বিনিয়োগ করেছে। নানা উপায়ে ব্যয় করেছে। তারা বহিরাগত ছিলেন বটে তবে ভারতবর্ষকেই নিজ দেশ বিবেচনায় স্থায়ী নাগরিক রূপে চিরটাকাল ভারতবর্ষেই অতিবাহিত করে গেছেন। তাই তাদের বহিরাগত বলা অনুচিত হবে। এসব শাসকের ক্ষেত্রেও ক্ষমতা নিয়ে পিতা-পুত্র, ভাইয়ে-ভাইয়ে, ভাই-বোনে, জামাই-শ্বশুরে পরস্পরের চরম শত্রু হয়ে একে অপরকে বন্দি, হত্যার অগণিত ঘটনা ঘটেছে। নিকটজনদের পরস্পরের শত্রুতে পরিণত হওয়ার মূলেই রয়েছে সম্পত্তি এবং ক্ষমতা। ব্যক্তিগত মালিকানা এবং ক্ষমতার কারণেই মানুষ পরস্পরের শত্রুতে পরিণত হয়ে ওঠে, এটাই বাস্তবতা।
ব্রিটিশরা বাণিজ্যের অজুহাতে ভারতবর্ষে এলেও এদেশের সম্পদে আকৃষ্ট হয়ে তারা দেশ দখলের মতলব এঁটেছিল। বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার রাজন্যদের প্রত্যক্ষ বিশ্বাসভঙ্গের সুযোগে শঠতার যুদ্ধে রাজ্য দখল করে নেয়। এরপর একে একে গোটা ভারতবর্ষ ব্রিটিশদের অধীন হয়ে পড়ে। যুদ্ধ-বিগ্রহের পাশাপাশি স্থানীয়দের অর্থ-বিত্ত, সুযোগের নানা প্রলোভনে দেশমাতৃকার বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতায় উদ্বুদ্ধ করে সারা ভারতবর্ষ বহিরাগত ছদ্মবেশী বণিক ব্রিটিশ ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনাধীন হয়ে পড়ে। তথাকথিত বহিরাগত মুসলিম শাসক এবং বহিরাগত ব্রিটিশ শাসকদের মধ্যকার মৌলিক পার্থক্যটি হচ্ছে, মুসলিম শাসকরা সুদীর্ঘকাল স্থায়ীভাবে বসবাসে ভারতবর্ষীয় নাগরিক হয়ে গিয়েছিল। তাদের অর্থ-সম্পদ এদেশেই থেকে গিয়েছিল। ব্রিটিশরা কিন্তু তা করেনি। তারা এদেশ থেকে অর্থ-সম্পদ একচেটিয়া লুণ্ঠন করে নিজ দেশে পাচার করেছিল, তাদের শাসনামলজুড়ে। আমাদের দেশীয় উৎপাদিত কাঁচা পণ্য নিজেদের দেশে পাঠিয়ে পাকা পণ্যে রূপান্তর করে আমাদের দেশেই সেই পণ্যের একচেটিয়া বাজার গড়ে তুলেছিল। দুই শাসকদের মধ্যকার অর্থ-সম্পদ সংক্রান্ত বিষয়ে মৌলিক পার্থক্য থাকলেও তারা শাসক হিসেবে ভারতবর্ষীয় জনগণের স্বার্থ, আশা-আকাক্সক্ষার বিপরীতে নিজেদের সাম্রাজ্যবাদী শাসন-শোষণ এবং লুণ্ঠন অব্যাহত রেখেছিল। ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার ব্রিটিশ ইন্ডিয়া ঔপনিবেশিক শাসন থেকে একে একে মুক্তিলাভ করলেও জনগণের ভাগ্য অপরিবর্তিতই রয়ে গেছে। কোনো রাষ্ট্রেই জনগণের শাসন কায়েম হতে পারেনি। কেবল ক্ষমতার হাত বদল ঘটেছে। অথচ ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্তির লড়াইতে অগণিত মানুষের ত্যাগ-আত্মত্যাগেও জনগণের রাষ্ট্ররূপে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি খণ্ডিত ভারত-পাকিস্তান। কেননা জনগণের লড়াই-সংগ্রামে ব্রিটিশদের পরাস্ত ও বিতাড়ন করা সম্ভব হয়নি। বেগতিক অবস্থা বুঝতে পেরেই ব্রিটিশরা দেশীয় শাসকশ্রেণির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে দ্রুত কেটে পড়েছিল। সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্র ভেঙে স্বাধীন বাংলাদেশও জনগণের কাক্সিক্ষত রাষ্ট্র হতে পারেনি, জাতীয়তাবাদী শাসকশ্রেণির ক্ষমতা কুক্ষিগত করার কারণে। তাই অনায়াসে বলা যায় সর্বত্রই ঘটেছে কেবলই ক্ষমতার হস্তান্তর। অর্থাৎ সুলতানী আমল, মোগল আমল, ঔপনিবেশিক শাসন অবসানেও তিন খণ্ডে খণ্ডিত তিন স্বাধীন রাষ্ট্র সমষ্টিগত জনগণের মিত্র না হয়ে শত্রুতে পরিণত হয়েছে, অতীতেরই অবিচ্ছেদ্য ধারাবাহিকতায়। রাষ্ট্র জনগণের রাষ্ট্রে পরিণত না হয়ে সাবেকী ব্যবস্থাধীনে অটুট রয়েছে।
আমাদের রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য পাঁচ বছর মেয়াদের রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্বে সরকার গঠিত হওয়ার সাংবিধানিক বিধি-বিধান রয়েছে। জনগণের সমর্থনের ভিত্তিতেই দলীয় রাজনৈতিক সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেয়ে থাকে। আমরা প্রতি পাঁচ বছর অন্তর রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য সরকার নির্বাচিত করে থাকি। কিন্তু আমাদের এযাবৎকালের অভিজ্ঞতাটি হচ্ছে, জনগণ দ্বারা নির্বাচিত একটি সরকারও জনগণের আকাক্সক্ষা পূরণ করেনি। অপরদিকে জনগণের ওপর অনাচারের অসংখ্য দৃষ্টান্ত রেখে জনশত্রুতে পরিণত হয়েছে। তারপরও জনগণ প্রতিটি নির্বাচনে ভোট প্রদান করে, শাসক নির্বাচনে। কোনো শাসক দলের দ্বারা শোষিত হবে সেটা নির্ধারণে। জনপ্রতিনিধিত্বকারী সরকার মাত্রই জনগণের মিত্র নয়, ক্ষমতায় বসেই শত্রুতে পরিণত হতে বিলম্ব করে না। আমাদের নির্বাচনী ব্যবস্থায় প্রতিটি নির্বাচনে প্রার্থীরা অতি সাধারণ মানুষের দ্বারে উপস্থিত হয়ে বিগলিত বিনয়ে ভোট প্রার্থনা করে। তাদের অতিশয় বিনয়ে মানুষ নিকটজন ভেবে ভোট প্রদান করে, ভোটে জেতার পর ওই বিজয়ী জনপ্রতিনিধি নিকটজন তো নয়ই, বরং জনগণের শত্রুতে পরিণত হতে সামান্য সময় ক্ষেপণ করে না। আমাদের রাজনৈতিক-সংস্কৃতির এটাই বাস্তবিক ধারাবাহিকতা। জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার দমনে রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে লেলিয়ে দিতেও কসুর করে না। এই যে আমাদের শাসকশ্রেণি এরা বহিরাগত নয়, নয় বিজাতীয়ও। তারা আমাদের স্বজাতি তো বটেই পাশাপাশি নিকটজনও।
আমাদের পারিবারিক, সামাজিক এবং রাষ্ট্রব্যবস্থা জুড়ে এই যে ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও একক নিরঙ্কুশ ক্ষমতা নিয়ে পরস্পরের দ্ব›দ্ব-বিবাদ, হিংসা-হানাহানি, খুন-হত্যার ইত্যকার ঘটনা ঘটে; তার অবসানের একমাত্র উপায়টি হচ্ছে ব্যক্তিমালিকানার বিপরীতে সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠা, পাশাপাশি জনগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রবর্তন। যেটি বিদ্যমান ব্যবস্থাকে অক্ষুণ্ন রেখে সম্ভব হবে না। তাই সর্বাগ্রে প্রয়োজন ব্যবস্থাটির আমূল পরিবর্তন এবং ধর্মনিরপেক্ষ-জনগণতান্ত্রিক সমতার রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। বিদ্যমান অমানবিক-নিষ্ঠুরতা থেকে পরিত্রাণের বিকল্প পথ কিন্তু আর নেই। এই বাস্তবিক সত্যটি উপলব্ধি ও পরিত্রাণের উপায়টি যথাযথ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই পরিসমাপ্তি ঘটবে ব্যক্তিগত মালিকানার অর্থ-সম্পদ এবং একক স্বৈরাচারী ক্ষমতার দ্ব›দ্ব-বিবাদ, হিংসা-হানাহানি ও হত্যা-খুন।
মযহারুল ইসলাম বাবলা : নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়