নোবেল পুরস্কার : এবার ভিন্ন মূল্যায়ন

আগের সংবাদ

শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করতে ঢাকায় শাবির শিক্ষকরা

পরের সংবাদ

বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও ইন্দিরার অতুলনীয় ভূমিকা

ড. এম এ মোমেন

সাবেক সরকারি চাকুরে, নন-ফিকশন ও কলাম লেখক

প্রকাশিত: জানুয়ারি ২২, ২০২২ , ১২:৩৮ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জানুয়ারি ২২, ২০২২ , ১২:৩৮ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের ঐতিহাসিক ১৯৭১-এর যুদ্ধ বিজয়েরও সুবর্ণজয়ন্তীতে ভারত সরকারের কাছে ইন্দিরা গান্ধী উপেক্ষিত হয়েছেন, তার নামও উচ্চারিত হয়নি। এ নিয়ে ভারতের পত্র-পত্রিকায় নিন্দাজ্ঞাপন করা হয়েছে। বিজেপি সরকার অসন্তুষ্ট হতে পারে এই কূটনৈতিক আশঙ্কায় আমাদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশেও কার্পণ্য ছিল। একাত্তরের প্রত্যক্ষ স্মৃতি ও একাত্তরের দলিলপত্র আমাকে এ ধারণাই দেয় যে সরকারি প্রতিশ্রæতির বাইরেও ইন্দিরা গান্ধী যদি ব্যক্তিগতভাবে উদ্যোগী না হতেন, আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের তারিখটি হয়তো পিছিয়ে যেত, হয়তো ভিন্ন কোনো জটিলতার মোকাবিলা আমাদের করতে হতো।
নেতৃত্বের জ্যেষ্ঠতায় একাত্তরে তার প্রধানমন্ত্রী থাকার কথা ছিল না। ১৯৭১-এ ইন্দিরা গান্ধী যদি ভারতের প্রধানমন্ত্রী না থাকতেন, প্রধানমন্ত্রী থাকতেন সম্ভবত মোরারজি দেশাই কিংবা চরণ সিং কিংবা জগজীবন রাম। রামস্বামী কামরাজ কিংবা গুলজারিলাল নন্দাও প্রধানমন্ত্রী পদ-প্রত্যাশীদের মধ্যে ছিলেন। এই পাঁচজনের যে কেউ প্রধানমন্ত্রী আসনে থাকলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের মতো বিশাল ঘটনাটি আরো পিছিয়ে যেত। তাদের মধ্যে যিনিই প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসুন না কেন, অন্তর্দলীয় দ্ব›দ্ব ও আঞ্চলিক ক্ষমতা ভাগাভাগির লড়াইয়ে তাকে একটি দুর্বল সরকারের নেতৃত্ব দিতে হতো। তাদের কেউই রক্ষণশীল চরিত্র নিয়ে দেশীয় সংকট পাশ কাটিয়ে অথবা মোকাবিলা করে, নিক্সনের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলের সংকট নিয়ে মাথা ঘামাবার মতো অবস্থায় থাকতেন না। যুগপৎ বাংলাদেশ ও ভারতের স্বার্থ রক্ষা করে, বিশ্বজনমত পক্ষে এনে, একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু কৌশলগত যুদ্ধ জিতে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে ইন্দিরা গান্ধী যেমন সর্বোচ্চ-সম্ভব সহযোগিতা করেছেন, তেমনি পাকিস্তানকে দুই খণ্ড করে ভারতের পূর্ব-সীমান্তকে পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ আক্রমণের ঝুঁকি থেকে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত করেছেন।
বাংলাদেশের শরণার্থীর বোঝা কাঁধে নিয়ে, বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারকে ভারতের অভ্যন্তরে স্থান দিয়ে, সর্বোপরি মুক্তিবাহিনী গঠনে সার্বিক সহায়তা দিয়ে ইন্দিরা গান্ধী অকংগ্রেসীয়দের সমালোচনার মুখে যেমন ছিলেন, নিজ দলের রক্ষণশীলরাও তাকে ছাড় দেননি। নিক্সন-কিসিঞ্জারের হুমকি ও রূঢ় আচরণের মুখেও তিনি অনড় ছিলেন।
ইন্দিরা গান্ধী বলেছেন, বাংলাদেশের মানুষকে অনেক ভুগতে হয়েছে। তরুণ ছেলেরা স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের জন্য আত্মবলিদানের সংগ্রামে লিপ্ত। ভারতের জনগণও একই আদর্শের প্রতিরক্ষায় লড়ে যাচ্ছে। আমার কোনো সন্দেহ নেই যে এই শ্রেষ্ঠতম উদ্যোগ এবং আত্মদান ভালো কাজের জন্য, আমাদের আত্মনিবেদনকে তা আরো শক্তিশালী করবে এবং দুই দেশের জনগণের বন্ধুত্ব অক্ষুণ্ন রাখবে। যা হোক, পথ যত দীর্ঘই হোক, আত্মদান যত বেশিই হোক, আমাদের দুই দেশের মানুষের ভবিষ্যতে ডাক পড়বে, আমি নিশ্চিত আমরা বিজয়ীই হবো।
ইন্দিরা গান্ধী বলেছেন, শেখ মুজিবুর রহমানকে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ যে ম্যান্ডেট দিয়েছিল- বিস্ময়কর সেই ম্যান্ডেট থেকে স্বাধীনতার আন্দোলন। গত নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভের জন্য জনগণ আমাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন, কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যান্ডেটের তুলনায় তা কিছুই নয়।
অনেক বৈরী সহকর্মীর মধ্যে থেকেও ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে আবেগময় সম্পৃক্ততা অনুভব করেছেন। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধজয়ের এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ে অংশীদারিত্বের গৌরব ইন্দিরা গান্ধীকে অলংকৃত করেছে।
তার প্রধানমন্ত্রী হওয়াটা অবশ্যই আকস্মিক এবং অভ্যন্তরীণ ক্ষমতাদ্ব›েদ্বর ফল। রামস্বামী কামরাজের নেতৃত্বে কংগ্রেসে সিন্ডিকেট তাদের অনুগত থাকবে বিবেচনা করে ইন্দিরাকে প্রধানমন্ত্রী বানায়। তাদের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। এই সিন্ডিকেটের প্রায় সবাইকেই ইন্দিরা কোনো না কোনো পর্যায়ে তার রাজনীতি থেকে বহিষ্কার করেছেন অথবা তিনি তাদের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসেছেন।
ইন্দিরা গান্ধীর কঠোর সমালোচককে বলতে শোনা গেছে, ইন্দিরার কেবিনেটে তিনিই একমাত্র পুরুষ। একই কথা বলা হয়েছে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারকে নিয়ে।
জহরলাল নেহরুর একমাত্র সন্তান ইন্দিরার জন্ম ১৯ নভেম্বর ১৯১৭, ভারতের এলাহাবাদে। তার বাবা স্বাধীনতার পর থেকে টানা ১৭ বছর ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ইন্দিরা ব্যক্তিগত দেহরক্ষীদের হাতে নিহত, ভারতের দ্বিতীয় সর্বাধিক সময়ের প্রধানমন্ত্রী। শুরু থেকেই ইন্দিরা বাবার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর আবাসিক চিফ অব স্টাফ, কার্যত তিনিই প্রধান হোস্টেস, তিনিই একান্ত সচিব। ইন্দিরা রাজনীতিতে যোগ দেন। পঞ্চাশের দশকের শেষদিকে তিনিই ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ১৯৬৪ সালে নেহরুর মৃত্যুর পর লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর মন্ত্রিসভায় তিনি তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী হন। ১৯৬৬ সালে লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর আকস্মিক মৃত্যুর পর মোরারজি দেশাই দলীয় প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী হওয়ার শক্তিশালী দাবিদার। জ্যেষ্ঠদের মধ্যে কুমারস্বামী কামরাজ ও তরুণদের সমর্থনে মোরারজির বিরুদ্ধে প্রার্থী হন এবং বড় ব্যবধানে বিজয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রী হন।
১৯৭১ সাল ইন্দিরার জন্য ভয়ংকর চ্যালেঞ্জ ও চরম সাফল্যের বছর। তিনি তখনকার পূর্ব পাকিস্তান থেকে ভারতে আসা প্রায় ১০ মিলিয়ন শরণার্থী সামলেছেন, এটাকে পুঁজি করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ সমর্থন করে বাংলাদেশের বন্ধুত্ব ও আস্থা অর্জন করেছেন।
১৯৭১-এর ডিসেম্বরে পাকিস্তানকে নাস্তানাবুদ করে ৯৩ হাজার সৈন্যসহ পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডকে আত্মসমর্পণে প্রধান ভূমিকা রেখেছেন। পূর্বাঞ্চল বিচ্ছিন্ন হয়ে নতুন স্বাধীন দেশ হয়ে যাওয়ায় সৈন্য মোতায়েনের ক্ষেত্রে কেবল পশ্চিম সীমান্তেরই গুরুত্ব রয়ে যায়। ইন্দিরার এ সাফল্য অসামান্য; স্বল্পতম সময়ে সব শরণার্থীকে ফেরত পাঠিয়ে প্রমাণ করেছেন শরণার্থী পুনর্বাসনে নয়, সাফল্য প্রত্যাবাসনে এবং নিজ দেশের ওপর থেকে উটকো বোঝা মানবিকভাবে অপসারণে।
ইন্দিরাবিরোধী নেতা অটল বিহারি বাজপেয়ি তাকে বলেছেন, ভারতের দেবী দুর্গা। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিজয় সর্বভারতীয় ‘ইন্দিরা ওয়েভ’ সৃষ্টি করে। চুয়াত্তর থেকে এ ঢেউয়ের তোড় কমতে থাকে।
১৯৭২-এর ফেব্রুয়ারিতে ইতালির সাংবাদিক ওরিয়ানা ফ্যালাসিকে দেয়া ইন্দিরা গান্ধীর সাক্ষাৎকার থেকে তার নিজের সম্পর্কে বলা কথা উদ্ধৃত করছি : শৈশব থেকেই আমি জটিল, কঠোর ও কষ্টের জীবনযাপন করেছি- এ ধরনের সমস্যাক্রান্ত জীবনের মধ্য দিয়ে যাওয়া সুযোগও বটে। আমার প্রজন্মের অনেকেরই এর মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। মাঝে মাঝে আমি ভাবি একালের তরুণরা জীবনের সেই নাটক থেকে বঞ্চিত, যা আমাদের জীবনের কাঠামোটা তৈরি করে দিয়েছে। আমি এমন একটা বাড়িতে বাস করেছি সেখানে প্রতিনিয়ত সবাইকে গ্রেপ্তার করার জন্য পুলিশ এসে হাজির হতো। আমারটা অবশ্যই সুখী ও শান্ত শৈশব নয়। আমি ছিলাম চিকন, রুগ্ণ এবং নার্ভাস এক বালিকা। পুলিশ অন্যদের ধরে নিয়ে যাবার পর সপ্তাহের পর সপ্তাহ, মাস আমাকে একাই থাকতে হতো (তরুণী ইন্দিরা নিজেও কারাবরণ করেছেন)। নিজে নিজে বেঁচে থাকাটা আমি দ্রুত শিখে নিয়েছি। আট বছর বয়সে আমি নিজে ইউরোপ গিয়েছি। সে সময় থেকেই ভারত থেকে সুইজারল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড থেকে ফ্রান্স, ফ্রান্স থেকে ইংল্যান্ড আসা-যাওয়া করছি এবং বয়স্ক মানুষের মতোই খরচের হিসাব-নিকাশ করছি।
অনেকেই আমাকে জিজ্ঞেস করেন, কে আমাকে বেশি প্রভাবিত করেছেন বাবা না মহাত্মা গান্ধী? তারা আমার পছন্দকে প্রভাবিত করেছেন, সাম্য ও ন্যায় বিচারের আকুতি আমি বাবার কাছ থেকে পেয়েছি, তিনি পেয়েছেন মহাত্মা গান্ধীর কাছ থেকে। এটা বলা ঠিক হবে না যে বাবা আমাকে অন্যদের চেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছেন- আমার ব্যক্তিত্বের বিকাশে আমার বাবা না মা না মহাত্মা গান্ধী না আমার বন্ধুজন বেশি প্রভাব বিস্তার করেছেন তা আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয়। সবারই প্রভাব রয়েছে। আমাকে কারো শিষ্যত্ব গ্রহণ করতে হয়নি। স্বাধীনভাবে আমি নিজের জন্য আবিষ্কার করেছি। যেমন আমার বাবা চাইতেন সাহসী হই, এমনকি শারীরিকভাবেও কিন্তু তিনি কখনো বলেননি- তোমাকে সাহসী হতে হবে। আমি যখন কঠিন কিছু করে ফেলতাম, কিংবা দৌড়ে ছেলেদের হারিয়ে দিতাম তিনি সগর্বে স্মিত হাসি দিতেন।
মহাত্মা গান্ধীর মৃত্যুর পর তাকে ঘিরে অনেক কথা চালু হয়। সন্দেহ নেই তিনি ছিলেন ব্যতিক্রমধর্মী মানুষ। আমি তার সঙ্গে অনেক কাজ করেছি। যখন হিন্দু-মুসলমান সংকট চলছিল, মুসলমানদের পক্ষে তাদের রক্ষা করার দায়িত্ব আমাকে দেন। তবে আমার এবং গান্ধীর মধ্যে কোনো সমঝোতা সৃষ্টি হয়নি, যেমনটা ছিল বাবার সঙ্গে আমার। তিনি সবসময় ধর্মের কথা বলতেন- তিনি মনে করতেন সেটাই ঠিক কিন্তু অনেক বিষয়েই তরুণদের তার সঙ্গে একমত পোষণ করার কথা নয়। আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন আমি কেমন দৃঢ়চেতা নারী।
ওরিয়ানা জিগ্যেস করলেন, আপনি বলেছেন যুদ্ধ এড়াতে আপনি ইউরোপ ও আমেরিকা সফর করেছেন। কী ঘটেছে, আপনি কি সত্যটা বলবেন? নিক্সন এটাকে কীভাবে নিয়েছেন?
ইন্দিরা জানালেন সত্য কথাটা আমি স্বচ্ছভাবে নিক্সনকে বলেছি। আমি প্রধানমন্ত্রী হিথ, প্রেসিডেন্ট পম্পিডো ও চ্যান্সেলর ব্রান্ডটকে যে কথা বলেছি, সে কথাই তাকে বলেছি। কোনো শব্দের হেরফের না করে বলেছি, ১০ মিলিয়ন শরণার্থীর বোঝা নিয়ে আমাদের চলা সম্ভব নয়। এ রকম বিস্ফোরণোন্মুখ পরিস্থিতির উত্তাপ আমরা আর সহ্য করতে পারছি না। আমার কথা এডওয়ার্ড হিথ, জর্জ পম্পিডো, উইলি ব্রান্ডট খুব ভালো বুঝেছেন। কিন্তু মিস্টার নিক্সন বোঝেননি। আসল ঘটনা হচ্ছে, অন্যরা যে রকম বোঝেন, তিনি বোঝেন তার চেয়ে ভিন্নটা। আমি সন্দেহ করেছি তিনি পাকিস্তানপন্থি। অথবা আমি জেনেছি আমেরিকানরা সবসময়ই পাকিস্তানের পক্ষে, তারা যতটা পাকিস্তানের পক্ষে, তার চেয়ে বেশি ভারতের বিরোধী বলে।
তবে আমার মনে হয়েছে, তাদের ধারণা বদলে যাচ্ছে, তাদের পাকিস্তানভাবাপন্নতা কমছে, ভারত বিরোধিতাও। কিন্তু এ ধারণাটিও ভুল। নিক্সনের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ আর যা-ই করুক যুদ্ধ এড়াতে সাহায্য করেনি। এটা কেবল আমার কাজে লেগেছে। অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে, যখন কেউ তোমার বিরুদ্ধে কিছু করে, তার কিছু না কিছু তোমার পক্ষে চলে আসে। আমি দেখেছি জীবনের প্রতিকূল পরিস্থিতি ও বিরোধিতা বরং আমাকে সুবিধা করে দিয়েছে। কেন আমি গত নির্বাচনে জিতেছি জানেন? কারণ জনগণ আমাকে পছন্দ করে আমি তাদের জন্য কাজ করি। কারণ বিরোধীরা আমার সঙ্গে খুব খারাপ আচরণ করেছে। আমি যুদ্ধে কেন জিতেছি জানেন? কারণ আমার সৈন্যদের সমর্থ ছিল, কারণ আমেরিকা ছিল পাকিস্তানের পক্ষে। আমেরিকা সব সময় ভেবেছে তারা পাকিস্তানকে সাহায্য করছে। যদি তা না করত পাকিস্তান শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হতে পারত। যে সামরিক শাসন গণতন্ত্রকে অস্বীকার করে, তাকে সাহায্য করা মানে দেশকে সাহায্য করা নয়। সে দেশের সামরিক শাসনই পাকিস্তানকে পরাজিত করেছে। আমেরিকা সমর্থিত সামরিক শাসন। কখনো বন্ধুরা খুব বিপজ্জনক।
৬ নভেম্বর ১৯৭১ প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স আয়োজিত অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন। ৭ নভেম্বর নিউইয়র্ক টাইমসে জোনাথন ক্যান্ডেলের প্রতিবেদন : গতকাল প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বলেন, যেভাবে পূর্ব পাকিস্তান থেকে শরণার্থী ভারতে আসছে তা তার দেশের জন্য ‘ভয়ংকর এক বোঝা’ এবং তা ভারতের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, এমনকি স্বাধীনতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স স্কুুলে স্বতঃস্ফূর্ত বক্তৃতায় তিনি সতর্ক করে দেন যে ভারত সহ্যের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে গেছে। পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের সর্বব্যাপী আন্দোলন চাপা দেয়ার জন্য যে নির্যাতন প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খানের নির্দেশে তার সেনাবাহিনী চালাচ্ছে তাতে ২৫ মার্চের পর থেকে এ পর্যন্ত ৯০ লাখ শরণার্থী ভারতে প্রবেশ করেছে।
ইন্দিরা গান্ধী বলেন, পূর্ব পাকিস্তানের এই সংকটপূর্ণ অবস্থা আকস্মিক কোনো বিদ্রোহ থেকে সৃষ্টি হয়নি বরং তা সামরিক শাসনের অধীনে অনুষ্ঠিত ‘অবাধ নির্বাচনের’ ফল। সীমান্তে কী ঘটছে তা যুদ্ধের হুমকি নয় বরং পূর্ব পাকিস্তানের অভ্যন্তরে যা ঘটে চলেছে তাই যুদ্ধের হুমকির উৎস।
১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান তার ডায়েরিতে লিখেছেন : ‘এই মাত্র শুনলাম, নিয়াজি পূর্ব পাকিস্তানে আত্মসমর্পণ করেছেন। ভারতীয় বাহিনী ঢাকার দিকে এগিয়ে আসছে। ঢাকাকে কাবু করতে মর্টার ও অন্যান্য অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত মুক্তিবাহিনীও সক্রিয়ভাবে ছুটে আসছে। ভারতীয়রা ঘোষণা করেছে, যেহেতু বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে, আজই বাংলাদেশ সরকার শপথ নেবে।’
‘… ইন্দিরা গান্ধী ঘোষণা করেছেন, যেহেতু তাদের লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে, তারা এককভাবেই আগামীকাল সন্ধ্যা ৭টা ৩০ মিনিট থেকে যুদ্ধবিরতি করতে যাচ্ছেন। আমার ধারণা, এই পরিবর্তিত শান্তিবাদী ঘোষণার মাধ্যমে বিশ্বজনমতকে প্রতারণা করে কিছুটা সময় বের করে পূর্বাঞ্চল থেকে পশ্চিম সীমান্তে সেনা নিয়ে আসাই তাদের লক্ষ্য। যদিও এটারও প্রমাণ আছে যে তারা এখন থেকে সেনাসদস্যদের উঠিয়ে চীন সীমান্তে মোতায়েন করছেন। আসলে চীনের তেমন কিছুই করতে হবে না। চীন হিমালয় সীমান্তে কিছুসংখ্যক সেনাসমারোহ ঘটালেই ভারতকে পূর্ব সীমান্তে পর্যাপ্ত সেনা মোতায়েন করতে হবে। ফলে পশ্চিম পাকিস্তানের ওপর চাপ কমে আসবে।’
‘এটি পাকিস্তানের জন্য একটি কালো দিন, কেবল যে সাড়ে ৬ কোটি মুসলমানের একটি প্রদেশ ভারতীয় প্রভাব-বলয়ে চলে গেল তা নয়, আমাদের অত্যন্ত চমৎকার সেনা ডিভিশন, কিছু বিমান ও নৌশক্তিও হাতছাড়া হয়ে গেল। তাদের কেমন করে ভারতের কাছ থেকে মুক্ত করা হবে, সেটাই বড় চিন্তা। এই জিম্মিদের ছাড়িয়ে আনতে গেলে ভারত বড় একটা বিনিময়মূল্য চেয়ে বসবে।’ আইয়ুব খান লিখেছেন, ‘আমার আফসোস, আমাদের শাসকরা যদি এটা বুঝতে পারতেন এবং ভারতকে দিয়ে এই ব্যবচ্ছেদ করানোর চেয়ে শান্তিপূর্ণভাবেই বাঙালিদের যদি বেরিয়ে যেতে দিতেন, সেটা ভালো হতো।’
আইয়ুব খানও তো এই কাজটা করতে পারতেন। কিন্তু সশস্ত্র আন্দোলন ছাড়া স্বাধীনতা আমার নয়, বাংলাদেশের সশস্ত্র আন্দোলনের সাফল্যের প্রধান সহায়ক শক্তি ছিলেন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী।

ড. এম এ মোমেন : সাবেক সরকারি চাকুরে, নন-ফিকশন ও কলাম লেখক।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়