‘অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু’ কথাটির আড়ালে আমাদের সভ্যতার বিলুপ্তি নিহিত!

আগের সংবাদ

উন্নয়নের অর্থনীতি : ধারণা ও বাস্তবতা

পরের সংবাদ

এখানে কে প্রার্থী, হু কেয়ারস- এমন রাজনীতিক উক্তি ভালো লাগেনি

স্বপ্না রেজা

কথাসাহিত্যিক ও কলাম লেখক

প্রকাশিত: জানুয়ারি ২১, ২০২২ , ১:২২ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জানুয়ারি ২১, ২০২২ , ১:২২ পূর্বাহ্ণ

উক্তিটি সাংসদ শামীম ওসমানের। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রাক্কালে। উক্তিটি মনে দাগ কেটেছিল। তাই নির্বাচনে ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী জয়ী হওয়ার পর কিছু কথা না লিখে থাকতে পারলাম না। সত্যিই তো, কে প্রার্থী নারায়ণগঞ্জ সিটি মেয়র নির্বাচনে সেটা নিয়ে তো একজন শামীম ওসমান সাহেবের কিছু যায় আসে না। যাওয়ার কথা নয়। উক্তির সাধারণ ভাবসম্প্রসারণ করলে দাঁড়ায়, তিনি অনেক বড় একজন নেতা এবং আইভী তেমন কিছুই নয়। স্থায়ী জনগণ তা মনে না করলেও অন্তত তিনি মনে করেন, তিনি অনেক বড় একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তেমনটাই মনে করে আসছেন, যা তার আচরণে সবসময়ই প্রকাশ পায়, পেয়েছে। সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এক সংবাদ সম্মেলনে নিজের মুখেই বলেছিলেন যে, তিনি ঝড়। টিভি ও পত্রিকার সংবাদের মাধ্যমে দেশের আর ১০ জনের মতো আমারও সুযোগ হলো তার কথা শোনা ও পড়ার। ঝড় ভালো বা মন্দ কোন অর্থে তিনি বলেছেন, সেটা পরিষ্কার করেননি। তবে সাধারণ অভিজ্ঞতা বলে, প্রকৃতির ঝড়ের তাণ্ডবলীলা থাকে। ‘শামীম ওসমান’ এই ঝড়ের কেমন লীলা, সেটা তিনিই ভালো জানেন। তবে সেই ব্যাখ্যা তিনি সম্মেলনে দেননি। কিন্তু সাধারণ মানুষের মনে শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছিল। অনেকেই ভেবে নিয়েছিলেন, এটা তার থ্রেট হতে পারে। সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরো বলেছিলেন, এখানে কে প্রার্থী, হু কেয়ারস। কলাগাছ, না আমগাছ- সেটা দেখার বিষয় নয়। এটা বঙ্গবন্ধুর নৌকা, শেখ হাসিনার নৌকা, এর বাইরে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার নৌকার প্রতি তার ভক্তি, শ্রদ্ধা ও প্রীতি অগাধ, সেটা বুঝাতে চেয়েছেন। আবেগপ্রবণ ছিলেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু, শেখ হাসিনার আদর্শ ও জীবনাচরণের প্রতি এবং নিজ দলের একজন জনপ্রিয় নেতার প্রতি তিনি কতটুকু শ্রদ্ধাবোধ দেখাতে পেরেছেন, সেটা নিয়ে কিন্তু বেশ প্রশ্ন থেকে গিয়েছিল। সঙ্গে সংশয়ও। অন্তত তার শারীরিক ভাষা ও বক্তব্যে শব্দ প্রয়োগের ধরনটি শ্রদ্ধাবোধকে দৃশ্যমান করতে পারেননি বলেই অনেকেই মনে করেছেন। সমর্থন করবার আড়ালে তিনি নিজ দলের মেয়র পদপ্রার্থীকেই হেয় করেছেন বলে এক ধরনের ধারণা সৃষ্টি হয়েছিল। বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে সেই বিষয়টিকে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশেষ করে সেলিনা হোসেন আইভীর প্রতি তার অতীত উক্তি, মন্তব্য সেই ধারণাকেই সমর্থন করেছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে ডোন্ট কেয়ার এটিচুড নতুন কিছু নয়। অতীতে এর যথেষ্ট দৃষ্টান্ত আছে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার নাম স্মরণ করে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে দাঁড়িয়ে একজন সাংসদের এমন আচরণ ও বক্তব্য জনগণ প্রত্যাশা করে কিনা সেটা ভাবতে হবে। ভাবা দরকার। নৌকা বঙ্গবন্ধুর, নৌকা শেখ হাসিনার যদি হয় তাহলে সেই নৌকা প্রতীক নিয়েই তো আইভী লড়ছেন, আর তিনিও সেই নৌকার একজন সাংসদ, তাহলে নৌকা সমর্থিত ব্যক্তিকে কীভাবে মূল্যায়ন করতে হবে, সেই বোধটুকু থাকলে সাধারণ মানুষের ভালো লাগত। নাকি তিনি ভেবে নিয়েছেন নির্বাচনে ব্যক্তি লাগে না, শুধু প্রতীক লাগে? একটা কথা মনে রাখা দরকার যে, দলীয় প্রতীক ছাড়াও আইভী বিজয়ী হয়েছিলেন এবং সেটা সম্ভব হয়েছিল একজন ব্যক্তি আইভীর ব্যক্তিত্বের জন্যই। তার জনপ্রিয়তার কারণেই। বঙ্গবন্ধুর নৌকা কিন্তু এদেশের মানুষকে মুক্তি এনে দিয়েছিল, মর্যাদা এনে দিয়েছিল। মানব মর্যাদার প্রতীকই নৌকা সেই সূত্রে। ভুলে গেলে চলবে না যে, জনগণ এখন বেশ সচেতন। বিশেষ করে কারোর মানব মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়, মানহানি হয় এমন আচরণ দেখতে জনগণ এখন আর পছন্দ করেন না। শামীম ওসমান সেলিনা হায়াৎ আইভীকে একজন সাবেক মেয়র হিসেবে সম্মান দেখিয়ে কথা বলতে পারতেন। বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তীতে অন্তত সেইটুকু রাজনৈতিক সংস্কৃতি সাধারণ মানুষ আশা করতেই পারেন। যাই হোক, ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী টানা তিনবারের মতো নারায়ণগঞ্জের মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হলেন। উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট প্রদান সম্পন্ন হয়েছে। অন্যান্য এলাকার নির্বাচন সহিংসতার মতো নৃশংস কোনো ঘটনা এখানে ঘটেনি। একজন নারায়ণগঞ্জবাসী বললেন, আইভীর কোনো সন্ত্রাসী, মাস্তানি দল নেই, লোক নেই। তিনি সাধারণ নারায়ণগঞ্জবাসীর নেতা। ২০১১ সালে নারায়ণগঞ্জ সিটিতে উন্নীত হতেই প্রথম সিটি নির্বাচনে তার জয় তারই উদাহরণ। তখনই আইভীর জনপ্রিয়তা প্রমাণিত হয়েছে। বিপুল ভোটে তিনি জয়ী হয়েছিলেন। সেই সময় শামীম ওসমান আওয়ামী লীগের সমর্থিত প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু জয়ী হতে পারেননি। আইভীর কাছে বিপুল ভোটে পরাজিত হন। আর ২০১১ সালের সিটি নির্বাচনের ফলই শামীম ওসমান ও আইভীর মধ্যকার বিরোধ ও বিভেদের সূচনা বলে স্থানীয় বাসিন্দা ও রাজনৈতিক মহলের বিশেষজ্ঞদের অনেকেই মনে করেন। তারা মনে করেন, আইভীর জনপ্রিয়তা ও বিপুল ভোটে বিজয়কে শামীম ওসমান স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করেননি, করতে পারেননি যা আজো চলমান। আইভীর প্রতি তার প্রতিক্রিয়া ও মনোভাব কখনোই ইতিবাচক বলে প্রতীয়মান হয়নি। অর্থ সেই রকম দাঁড়ায়নি। ফলে তাদের দ্ব›দ্ব প্রকাশ্যে এসেছে বারবার। দীর্ঘদিন ধরে চলমান এই দ্ব›দ্ব ও বিরোধ নেতা বা ব্যক্তির চেয়ে রাজনৈতিক দলটির ইমেজ নষ্ট করছে কিনা তা দেখা দরকার ছিল আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে- এমনটি অনেকেই মনে করে থাকেন। তৃতীয়বারের মতো আইভীর বিজয় মুহূর্তেও শামীম ওসমান বুঝাতে চেষ্টা করলেন, দলীয় সংগঠনের বড় বড় নেতারা নারায়ণগঞ্জ এসে নির্বাচনের জন্য কাজ করে গেছেন। তাই নৌকার জয় হয়েছে। একবারও তিনি তার রাজনৈতিক সহযাত্রী আইভীর নামটি মুখে আনলেন না। দূর থেকে আমাদের পক্ষে বোঝা কঠিন, কী এমন কারণ থাকতে পারে প্রকৃতভাবে এর নেপথ্যে। তবে কাজের সুবাদে অনেকদিন নারায়ণগঞ্জ যেতে হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের সুশীল সমাজের পাশাপাশি পিছিয়ে পড়া দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কাজ করতে হয়েছে। তখন সৌভাগ্য হয়েছিল মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীকে খুব কাছ থেকে দেখার। তার সঙ্গে কাজ করবার। বাংলাদেশের অনেক অঞ্চল, প্রত্যন্ত অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত আছি। সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি জনপ্রতিনিধিদের মনমানসিকতা দেখেছি। দেখেছি তাদের জীবনাচরণ। কিন্তু একজন অতি সাধারণ, বিনয়ী ও প্রচণ্ড সাহসী জনপ্রিয় জনপ্রতিনিধি দেখেছি আইভীকে, যিনি বাস করেন নারায়ণগঞ্জের মতো একটি এলাকায়। তার কাছে পৌঁছাতে জটিল অবস্থা অতিক্রম করতে হয় না। তিনি সার্বক্ষণিক একজন জনপ্রতিনিধি। দেখা গেছে অনেক হুমকি-ধমকি, ঝুঁকির মাঝে স্থানীয় জনগণই তার শক্তি হয়ে উঠেছে ও তাকে সুরক্ষিত করেছে বারবার। তার এই অভাবনীয় জনপ্রিয়তার রহস্য উদঘাটনে যে তথ্য মেলে তা হলো, ব্যক্তি স্বার্থপরতার ঊর্ধ্বে তিনি একজন নির্লোভ রাজনৈতিক ব্যক্তিসত্তা। এছাড়া রয়েছে তার পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য। তিনি রাজনৈতিক দলের সুবিধা নিয়েছেন, ভোগ করেছেন এমন গল্প বাজারে আছে বলে শোনা যায় না। শুনতে পাইনি। তার স্বপ্ন ও সাহসিকতার সঙ্গে সমন্বয় করে নারায়ণগঞ্জের আশানুরূপ উন্নয়ন সম্ভব হয়ে না ওঠার পেছনে কারণ আছে বলে অনেকে মনে করেন। কারণটা হলো, এলাকায় তাকে রাজনৈতিক প্রতিকূল অবস্থার মধ্য দিয়েই কাজ করতে হয়েছে প্রায় প্রতিনিয়ত এবং যে প্রতিকূলতা তারই রাজনৈতিক সংগঠনের অন্য একজন প্রভাবশালী নেতা কর্তৃক সৃষ্ট। তাকে প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মধ্য দিয়ে সময় অতিবাহিত করতে হয় বলে জানা যায়। সাধারণত দেখা যায় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের বিরোধিতা করেন বিরোধী দল। কিংবা বিরোধী দলের বিরোধিতা করেন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল। কিন্তু একটি দলের ভেতর যখন একজন অন্য আর একজনের বিরোধিতা করেন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে, তখন কিন্তু সেটা আর কোনো সাধারণ ঘটনা থাকে না। রীতিমতো ভয়ংকর কিছুতে তা পরিণত হয়। শামীম ওসমান সংবাদ সম্মেলনে আচমকা আইভী নয়, নৌকাকে সমর্থন করবার বিষয়টিকে অনেকেই সন্দেহের চোখে দেখেছিলেন। উদ্দেশ্য খুঁজবার চেষ্টা করেছিলেন। তারা বলছেন, ওসমান সাহেব তো নৌকাকে সমর্থন করেন সেটা বলেছেন কিন্তু আইভীকে সমর্থন করেন কিনা সেটা কিন্তু বলেননি। তার মানেটা কী দাঁড়ায়? সেই প্রশ্নের উত্তরটা এক একজনের কাছে এক এক রকম ছিল। সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়ার বিষয়ে সংশয় ছিল।
পরিশেষে বলব, নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগই যেন আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ না হয়। ব্যক্তির গ্রহণযোগ্যতাই প্রতীকের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ায়। জনগণ এখন বেশ সচেতন। একজন রাজনৈতিক নেতার দায়িত্ব যেমন নিজেকে জনপ্রতিনিধি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা ঠিক তেমনি দায়িত্ব হলো দলের আদর্শের অনুসারী হওয়া। রাজনৈতিক বক্তব্য ও উক্তি হোক শালীনতা ও শ্রদ্ধাপূর্ণ। আর ব্যক্তি ও বস্তুকে আমাদের কেয়ার করতেই হবে। নতুবা আগামীতে আমরা কেয়ারলেস জাতিতে পরিণত হব। অভিনন্দন তৃতীয়বারের মতো সিটি নির্বাচন বিজয়ী মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীকে।
স্বপ্না রেজা : কথাসাহিত্যিক ও কলাম লেখক।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়