শক্তিশালী আর্থিক পুনরুদ্ধারের পথে বাংলাদেশ

আগের সংবাদ

আসুন অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াই

পরের সংবাদ

শহীদজননী জাহানারা ইমামের আন্দোলনের তিন দশক : নির্মূল কমিটি প্রতিষ্ঠার আগে ও পরে

শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী

শহীদ জায়া ও শিক্ষাবিদ

প্রকাশিত: জানুয়ারি ১৯, ২০২২ , ১২:২৬ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জানুয়ারি ১৯, ২০২২ , ১২:২৬ পূর্বাহ্ণ

মুক্তিযুদ্ধে স্বামী হারিয়ে সন্তানদের নিয়ে ১৯৭২ সালে আমি ইস্কাটনে ছিলাম। দোতলা বাড়ির নিচতলায় পান্না কায়সার, ওপরে আমি। বাড়িটি বঙ্গবন্ধু দিয়েছিলেন। যেসব শহীদ পরিবারের ঘরবাড়ি ছিল না তাদের তখনকার সরকার এভাবে পুনর্বাসন করেছিল।
ওই বাসায় একদিন নাফিসা কবির এলেন। তিনি নিজেই আমার সঙ্গে পরিচিত হতে চেয়েছিলেন। নাফিসা কবির শহীদ শহীদুল্লাহ কায়সার ও জহির রায়হানের বোন। আমার সঙ্গে পরিচয়ের সূত্র হলো তার স্বামী ডা. আহমদ কবির আমার স্বামী শহীদ ডা. আলীম চৌধুরীর সহপাঠী এবং বন্ধু ছিলেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজে পড়ার সময় দুজনে যৌথ সম্পাদনায় ‘যাত্রিক’ নামে একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করতেন। এ পত্রিকায় জহির রায়হানসহ তৎকালীন অনেক খ্যাতিমান কবি, সাহিত্যিক লিখেছেন। এসব সূত্রের চেয়েও যে বড় সম্পর্কটি আমাদের মধ্যে তৈরি হয়েছিল তা হলো আমরা শহীদ পরিবারের সদস্য। একজনের ব্যথা অন্যজন অন্তর দিয়ে অনুভব করি।
নাফিসা কবির যুদ্ধাপরাধী ও তাদের বিচার সম্পর্কে আমাকে বুঝিয়ে বললেন। পান্নাকেও নিশ্চয় বলেছিলেন। নাফিসা আপা দুভাইকে হারিয়ে আমার মতোই শোকার্ত ছিলেন। তিনি তাদের কায়েতটুলির বাসায় একটি সভা করেন। শহীদ পরিবারের অনেকে ওখানে ছিলেন। ওখানে কীভাবে আন্দোলনের মাধ্যমে আমরা আমাদের দাবি জানাব এ সংক্রান্ত আলাপ হয়। নাফিসা কবিরের সঙ্গে তার অনুজ তরুণ শাহরিয়ার কবিরও আন্দোলনকে সংগঠিত করতে সক্রিয় ছিলেন। কবীর চৌধুরী, সৈয়দ হাসান ইমাম, মুনতাসীর মামুন এবং আরো অনেকে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্ত্রীরা-তো ছিলামই।
১৭ মার্চ আমরা শহীদ মিনারে সভা করি। অনেকে বক্তৃতা করেন। সভা শেষে ব্যানার, ফেস্টুন নিয়ে বঙ্গভবনে যাই। বঙ্গবন্ধু গেটের কাছে এসে আমাদের কাছ থেকে স্মারকলিপি গ্রহণ করেন। তিনি বলেন, ‘বোন তোমরা ফিরে যাও। আমি অবশ্যই এর বিচার করব।’ এরপর আন্দোলনটি তখনকার মতো স্থগিত ছিল। ওই ’৭২ সালেই বঙ্গবন্ধু বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করেন। আমরা ন্যায়বিচার পাব এই আশায় অপেক্ষমাণ ছিলাম।
১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধু হত্যার পর আমাদের সব আশা-ভরসার পরিসমাপ্তি ঘটেছিল। শুধু তাই নয়, জিয়াউর রহমান, এরশাদ, খালেদা জিয়া ধারাবাহিকভাবে মুক্তিযুদ্ধের সব অর্জন ধূলিসাৎ করেছেন। এ সব কাহিনী মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সবাই জানেন। আমাদের স্বজন হারাবার শোক শতগুণে বেড়েছে তখন সরকারের সব কর্মকাণ্ডে। মনে হতো ৩০ লাখ শহীদের আত্মদান পুরোপুরি ব্যর্থ হয়ে গেল। ১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারি শহীদজননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে ১০১ জন নাগরিক নিয়ে ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’ গঠিত হয় প্রধানত ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং তাদের মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবিতে। আমরা গভীর অন্ধকার সুড়ঙ্গের শেষে এক ক্ষীণ আলোর রেখা দেখতে পেলাম। মনে হলো, না সব হারিয়ে যায়নি। নির্মূল কমিটির পরবর্তী কার্যক্রম এতদিনে সবার অন্তরে স্থায়ী আসন রচনা করতে সক্ষম হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তির কাছে ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’ এখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের প্রধান শক্তি হিসেবে বিবেচিত। তবে স্বাধীনতাবিরোধী পাকিস্তানের প্রেতাত্মা মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক বিএনপি-জামায়াত এবং তাদের সঙ্গে আঁতাত করা দলসমূহ অবশ্যই এ কমিটির ঘোরবিরোধী।
তাতে দমবার পাত্র নন নির্মূল কমিটির নেতা ও সদস্যরা। আমাদের তিনটি স্তম্ভ সভাপতি শাহরিয়ার কবির, সহ-সভাপতি মুনতাসীর মামুন এবং সাধারণ সম্পাদক কাজী মুকুল এবং তারুণ্যে দীপ্ত নতুন নেতৃত্ব ওসব বিরুদ্ধ শক্তিকে বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা করেন না। যেখানে অন্যায় সেখানেই তারা পর্বতসমান দৃঢ়তা নিয়ে রুখে দাঁড়ান। সঙ্গে থাকে অসম সাহসী কর্মীবাহিনী।
নির্মূল কমিটির কাজের পরিধি ব্যাপক। একটি বলিষ্ঠ ও কার্যকর সংগঠন দাঁড় করাতে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছেন নেতারা। দেশজুড়ে ওয়ার্ড ও থানা পর্যায়ে তরুণ কর্মীদের জন্য কর্মশালা করা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় নতুন প্রজন্মকে সচেতন করা, মুক্তিযুদ্ধ মেলা আয়োজন, দেশের প্রায় সব জেলা-উপজেলায় সম্মেলন করা হচ্ছে নিয়মিতভাবে। পাশাপাশি রয়েছে প্রতি বছর শহীদজননী জাহানারা ইমামের বক্তৃতা। শহীদজননী জাহানারা ইমাম স্মৃতিপদক প্রদান, সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময়, সব জাতীয় দিবস উদযাপন।
সামাজিকভাবে রয়েছে নির্মূল কমিটির বিস্তারিত কর্মসূচি। দুস্থ মুক্তিযোদ্ধা, দুস্থ শহীদ পরিবার এবং একাত্তরের নির্যাতিত মা-বোনদের সহায়তা, সাম্প্রদায়িক নির্যাতনের শিকার পরিবারের চিকিৎসা, আইনি ও আর্থিক সহযোগিতা নিয়মিতভাবে করা হয়। মানব ও প্রকৃতি সৃষ্ট দুর্যোগের সময় নির্মূল কমিটি সবার আগে পুনর্বাসন প্রক্রিয়া শুরু করে। তখন দেশের যে কোনো প্রত্যন্ত অঞ্চলে সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি সাহায্য নিয়ে সবার আগে উপস্থিত হন।
রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পর্যায়ে যে কোনো অন্যায়, নির্যাতন, বৈষম্যের বিরুদ্ধে অতিদ্রুত সংবাদ সম্মেলন করা, স্মারকলিপি দেয়া, গণমাধ্যমে প্রতিবাদ প্রকাশ এবং করণীয় নির্ধারণ নির্মূল কমিটির নিয়মিত কাজ। সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায় অথবা কোনো ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠী যখন মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসীদের আক্রমণের শিকার হয় তখন সব ভয়ভীতি, হুমকি-ধমকি উপেক্ষা করে তাদের পাশে দাঁড়ানো এবং প্রতিবাদ করা নির্মূল কমিটির অবশ্য কর্তব্য হিসেবে বিবেচনা করে। সমাজের যে কোনো অনাচারের বিরুদ্ধে সর্বাগ্রে ‘প্রেস বিজ্ঞপ্তি’ দিতে কখনো ভুল হয় না নির্মূল কমিটির।
নির্মূল কমিটির ধারাবাহিক আন্দোলনের কারণেই বাংলাদেশে ’৭১-এর গণহত্যাকারী ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্ভব হয়েছে, যে বিচার বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর বন্ধ করে দিয়েছিলেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়াউর রহমান। ১৯৭২ সালে গৃহীত বাংলাদেশের মূল সংবিধান থেকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও চেতনা মুছে ফেলে ধর্মের নামে জামায়াতে ইসলামীদের হত্যা ও সন্ত্রাসের রাজনীতি, সাম্প্রদায়িক বিভেদ ও বিদ্বেষের কার্যক্রম জেনারেল জিয়াই চালু করেছিলেন, যার বিরুদ্ধে নির্মূল কমিটির সংগ্রাম গত ৩০ বছর অব্যাহত রয়েছে।
আমাদের আরো অনেক সাফল্য আছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় নতুন প্রজন্মকে আলোকিত করার জন্য আমরা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ‘মুক্তিযুদ্ধের শহীদ স্মৃতি পাঠাগার’ স্থাপন করেছি। নির্মূল কমিটি এবং এর নেতারা মুক্তিযুদ্ধকে জনপ্রিয় করার জন্য শত শত বই লিখেছেন, প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন, স্কুল কলেজের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে শত শত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গ্রন্থপাঠ ও রচনা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে। এভাবে একটি প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধকে জেনেছে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত হয়েছে।
কয়েক বছর ধরে নেতাদের দলে নতুন রক্ত সঞ্চালনের জন্য তরুণদের সম্পৃক্ত করছেন। আগ্রহী এবং নিবেদিতপ্রাণ তরুণরাও এগিয়ে আসছেন। এটি আমাদের মধ্যে আশা জাগিয়েছে। নির্মূল কমিটির নেতাদের শতভাগ নির্মোহ, নির্ভেজাল, অকুণ্ঠ মানবতার বাহক। অসাম্প্রদায়িক চেতনা, দেশপ্রেম ও আন্তরিকতা নতুন নেতৃত্ব গঠনের ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা রাখছে। ভবিষ্যতে তাদের নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে নির্মূল কমিটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে এই বিশ্বাস আমার আছে।
এই ব্যতিক্রমধর্মী অনন্য নাগরিক সংগঠনটি এখন দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলেও যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেছে। আন্তর্জাতিক সন্ত্রাস, মৌলবাদ ও মানবতার লঙ্ঘন যেখানেই হচ্ছে সেখানেই সোচ্চার প্রতিবাদও সক্রিয়ভাবে উপযুক্ত অংশগ্রহণ করে চলেছে। পশ্চিমের বিভিন্ন দেশে নির্মূল কমিটির উদ্যোগে আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে জঙ্গি মৌলবাদী সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ধর্মনিরপেক্ষ মানবতা ও বিশ্বশান্তি নিশ্চিতকরণের উদ্দেশ্যে। এটিও আমাদের গৌরবের বিষয়। এত কিছুর পেছনে কারো কোনো ব্যক্তিগত প্রাপ্তির ছিটেফোঁটা গন্ধও নেই। শুধু আছে ধর্মনিরপেক্ষ মানবিকতার প্রতি দায়বদ্ধতা, যা আমরা মোটা দাগে জাহির করতে পারি।
আমরা যারা এ আন্দোলন শুরু করেছিলাম তাদের অনেকে আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছেন। আমাদেরও যাওয়ার সময় ঘনিয়ে এসেছে। ভবিষ্যতের নেতাদের কাছে অনুরোধ রাখছি- তারা যেন নির্মূল কমিটির রাজনৈতিক সততা, পবিত্রতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি দায়বদ্ধতার প্রতি নিবেদিত এবং থাকেন। রাজাকারমুক্ত মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ঋদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার সংগ্রামকে চূড়ান্ত বিজয়ের লক্ষ্যে এগিয়ে নিয়ে যান।
শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী : শহীদ জায়া ও শিক্ষাবিদ।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়