পাঠ্যবইয়ে ভুল রোধে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন

আগের সংবাদ

শহীদজননী জাহানারা ইমামের আন্দোলনের তিন দশক : নির্মূল কমিটি প্রতিষ্ঠার আগে ও পরে

পরের সংবাদ

শক্তিশালী আর্থিক পুনরুদ্ধারের পথে বাংলাদেশ

রেজাউল করিম খোকন

অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার, কলাম লেখক

প্রকাশিত: জানুয়ারি ১৯, ২০২২ , ১২:২৬ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জানুয়ারি ১৯, ২০২২ , ১২:২৬ পূর্বাহ্ণ

করোনা মহামারি থেকে শক্তিশালী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথে বাংলাদেশ। এমনকি করোনার মধ্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে গেলেও আর্থিক খাত শক্তিশালী ভূমিকা রেখেছে। করোনার নতুন ধরন ওমিক্রন নিয়ে শঙ্কার মধ্যেও আমদানি-রপ্তানিসহ নানা সূচকে রয়েছে প্রাণচাঞ্চল্য। ২০২১ সালে রপ্তানির অবস্থা ভালো এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেই ছিল। মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি বিশ্বের হাতেগোনা কয়েকটি দেশের মধ্যে এদেশ ভালো করেছে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর তুলনায়ও অনেক ভালো প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। করোনার মধ্যে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার কাছাকাছি। মাথাপিছু আয় আড়াই হাজার ডলার। জিডিপিতে কৃষির অবদান কমলেও খাদ্য নিরাপত্তায় ব্যাপক অবদান রাখছে এই খাত। দেশের অর্থনীতি কৃষি থেকে শিল্পে স্থানান্তরিত হচ্ছে। সেবা খাত এগিয়ে যাচ্ছে। করোনার লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী প্রবৃদ্ধি না হলেও অন্য অনেক উন্নত দেশের মতো নেগেটিভ প্রবৃদ্ধি হয়নি। তবে বেসরকারি বিনিয়োগ কম হয়েছে। কিন্তু সরকারি বিনিয়োগ ব্যাপক বেড়েছে। বেসরকারি বিনিয়োগ আরো বেশি হওয়া উচিত ছিল। আগামী দিনে শক্তিশালী আর্থিক পুনরুদ্ধারে চালকের আসনে থাকতে হবে বেসরকারি খাতকে। রপ্তানি ও প্রবাসী আয় বেড়ে যাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে। মেগা প্রকল্পের বাস্তবায়ন বাড়ায় আমদানি বেড়েছে। রপ্তানি বাড়াতে শুধু পোশাকশিল্প নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে অন্যান্য শিল্পের দিকে নজর দিতে হবে। রপ্তানিতে শুল্ক বাধা দূর করতে হবে। শুল্ক ক্ষেত্রে সংস্কার দরকার। রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে। দেশের অভ্যন্তরে বিনিয়োগ পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে, যাতে দেশের বিনিয়োগকারীরাই আগে বিনিয়োগ করতে এগিয়ে আসেন। সেটি না হলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের দাওয়াত দিয়ে এনে লাভ হবে না। এছাড়া করোনা মহামারিতে সরকারের ঘোষিত প্রণোদনার অর্থ ছাড়ে গতি বাড়াতে হবে। এই অর্থ শুধু বরাদ্দ নয়, কার্যকর ব্যবহারও দরকার। বাংলাদেশের উন্নয়ন আজ সর্বত্র স্বীকৃত। বিশেষ করে করোনাকালীন আমাদের অর্থনীতির উন্নয়ন সারা বিশ্বের চোখে পড়ার মতো। আইএমএফ-ও তাই বলছে। দারিদ্র্য একসময় আমাদের অনেক ভুগিয়েছে। কিন্তু আমরা এখন সে জায়গায় নেই। বাংলাদেশের উন্নয়নকে অনেকেই ম্যাজিক বলে। প্রবাস আয়, রপ্তানি ও কৃষির ওপর বাংলাদেশের অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে। এই তিন খাতেই সরকারের অবদান রয়েছে। করোনাকালে প্রবাসীদের আয়ের ওপর প্রণোদনা দেয়া হয়েছে, যে কারণে তারা বৈধ পথে দেশে টাকা পাঠিয়েছে এবং তারাই দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রেখেছে। প্রণোদনা প্যাকেজের টাকা কিছু ভুল জায়গায় গেলেও তা যদি দেশেই থাকে, তাহলেও অর্থনীতির জন্য ভালো। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে আমরা অনেক ভালো করছি। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে শক্তিশালী পুনরুদ্ধার হচ্ছে। কিন্তু এখন চ্যালেঞ্জ হলো সুশাসন, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং পরিবেশের ভারসাম্য ঠিক রেখে উন্নয়ন ধরে রাখা। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দক্ষ জনশক্তি তৈরির বিকল্প নেই। এ খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। করোনা পোশাক খাতের জন্য যেমন চ্যালেঞ্জ, তেমনই সুযোগও নিয়ে এসেছে। পোশাক খাতের প্রধান প্রধান কাঁচামালের দাম ব্যাপক হারে বেড়েছে। কিন্তু সে তুলনায় পোশাকের দাম বাড়েনি। সেই সঙ্গে রয়েছে জাহাজীকরণের ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাবও।
চলতি বছর ২০২২-এ বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান সমস্যা হবে কর্মসংস্থান ও জীবিকার সংকট। এছাড়া পরিবেশ বিপর্যয়, সাইবার দুর্বলতা, ডিজিটাল বৈষম্যও অর্থনীতির ঝুঁকির তালিকায় থাকছে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বৈশ্বিক ঝুঁকি প্রতিবেদন ২০২২ শীর্ষক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এসব ঝুঁকির কথা উঠে এসেছে। বিশ্বের প্রায় এক হাজার বিশেষজ্ঞ ও বিভিন্ন খাতের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন তৈরি করেছে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম। প্রতিবেদনে সংস্থাটি শতাধিক দেশের প্রধান ৪টি ঝুঁকি চিহ্নিত করেছে। এতে অর্থনৈতিক ঝুঁকির পাশাপাশি সামাজিক, রাজনৈতিক ও পরিবেশগত ঝুঁকির বিষয়ও উঠে এসেছে। কর্মসংস্থান ও জীবিকার পাশাপাশি বাংলাদেশের জন্য আরেকটি বড় ঝুঁকি হচ্ছে কৌশলগত সম্পদের ভূরাজনৈতিকীকরণ। বাংলাদেশের বিভিন্ন কৌশলগত স্থানে স্থাপনা নির্মাণে এশিয়ার বৃহৎ দুটি দেশের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ চলছে। এই প্রতিযোগিতার সুবিধা হচ্ছে, বাংলাদেশ এখন বড় প্রকল্পে সহজেই বিনিয়োগ পাচ্ছে। কিন্তু এই পরিস্থিতি দীর্ঘদিন চললে উন্নয়নের পরিবেশ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দেশে কর্মসংস্থানবিহীন প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। এ রকম প্রবৃদ্ধি আরো বৈষম্য সৃষ্টি করবে। বৈষম্য থাকলে সমাজ টেকসই হয় না। জনগোষ্ঠীর বিরাট একটি অংশ চাকরির বাজারের বাইরে থাকলে তাদের অবদান থেকে সমাজ বঞ্চিত হয়। শুধু তারাই নয়, অর্থনীতিও বঞ্চিত হয়। কোনো না কোনো সময় গিয়ে সেই প্রবৃদ্ধি আর ধরে রাখা সম্ভব হয় না।
কোভিডের সংক্রমণ গত বছরের শেষের দিকে অনেকটাই কমেছে। অর্থনীতি এখন সচল হতে শুরু করলেও কোভিডের পূর্ববর্তী অবস্থায় পৌঁছায়নি। ব্যাংক খাত এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মূল্যস্ফীতির নিয়ন্ত্রণ। করোনার অভিঘাতের পরে অর্থনীতি এখন সচল হয়েছে। আমদানি-রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়েছে। মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি বেড়েছে। এখন অর্থনীতিতে প্রচুর বিনিয়োগ প্রয়োজন। অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে এটি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। আমাদের দেশে কর্মসংস্থান সেভাবে বাড়েনি। মহামারিতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে কর্মসংস্থানের সুযোগ। সামাজিক নিরাপত্তার জন্য কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করতে হবে। এজন্য ব্যাংকগুলোর প্রতি বেশি নজর দিতে হবে। জামানতমুক্ত এসএমই ঋণ দেয়ার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। মূল্যস্ফীতি অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। করোনার বিপর্যস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধার প্রান্তিক পর্যায়ে গ্রামীণ এলাকায় বেশি হয়েছে। বিশেষ করে কৃষি খাত অবদান রেখেছে। এখন আবার নতুন করে ওমিক্রন শুরু হয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে মহামারি থেকে সামলে ওঠা ব্যক্তিরা। তিনি বলেন, যাতে আবার সমস্যা না হয়, সেদিকে সরকারের খেয়াল রাখতে হবে। বিশেষ করে স্বনির্ভর বা ব্যক্তিপর্যায়ে একক আয়ের নির্ভরশীলদের কীভাবে গুরুত্ব দেয়া যায়, তা দেখতে হবে। দারিদ্র্যপীড়িত এলাকায় বিদ্যালয়ে খাদ্য সহায়তা দেয়া যেতে পারে। বিশেষ করে যারা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে রয়েছে, তাদের দেখা উচিত। সংক্রমণের সর্বোচ্চ সময়ে করোনা পোশাক খাতের মাঝারি ও ছোট আকারের প্রতিষ্ঠানে আঘাত হেনেছে বেশি। তারা এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি অনেকেই। আবার রপ্তানিকৃত পণ্যের মূল্য দেশে আসেনি, যদিও আমদানি দায় স্থগিত করার সুবিধা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ পরিশোধ করতে পারছে না। এতে তাদের বিরুদ্ধে ফোর্সড লোন তৈরি হয়েছে। অথচ করোনার সময়ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে কারখানা চালু রাখা হয়েছে। এজন্য এখন রপ্তানি বেড়েছে। বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণের হার কমে আসা, একই সময়ে ভিয়েতনামে লকডাউনে থাকা, চীন-আমেরিকা দ্ব›দ্ব, মিয়ানমারের সমস্যা প্রভৃতি কারণে আমাদের অর্থনীতি দ্রুত সচল হয়েছে, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি আদেশ বেড়েছে। এটি টেকসই হবে কি-না, সে বিষয়ে ভাবতে হবে। আমরা মধ্যম আয়ের দেশের ফাঁদে পড়ে যাই কি-না, সন্দেহ হচ্ছে। স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) কাতার থেকে উত্তরণের পর ১৫-২০ বছর ধরে এই অবস্থায় পড়ে থাকতে হয় কি-না, এ ব্যাপারে সংশয়, সন্দেহ রয়েছে। ল্যাটিন আমেরিকাসহ পৃথিবীর বহু দেশ মধ্যম আয়ের দেশের ফাঁদে আটকে আছে। বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে ব্যাপকভাবে কাজ করার প্রয়োজন রয়েছে। রপ্তানি বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ঋণাত্মক হয়েছে। এটি দেশের জন্য ভালো, বিশেষ করে বর্তমান সময়ের জন্য। বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে ব্যাংক খাতে তারল্য প্রবাহের প্রয়োজন। এদিকে বিশেষ নজর দেয়া প্রয়োজন সরকারের। বাংলাদেশের সামনে সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে আইটি খাতের ফ্রিল্যান্সার অন্যতম। অনেক সম্ভাবনাময় খাত রয়েছে। সেগুলোকে চিহ্নিত করে নীতি সহায়তা দিতে হবে। সেক্ষেত্রে কিন্তু বেশকিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। বড় বড় কোম্পানি খুব দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছে, কিন্তু ছোট ও মাঝারি আকারের প্রতিষ্ঠান পারেনি। আর্থিক অন্তর্ভুক্তির জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ।
রেজাউল করিম খোকন : অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার, কলাম লেখক।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়