খনিজসম্পদ ও সম্ভাবনা

আগের সংবাদ

বৈশ্বিক উষ্ণায়ন রোধে সামাজিক বনায়ন

পরের সংবাদ

তিরোধান দিবসে মাস্টারদাকে স্মরণ

প্রকাশিত: জানুয়ারি ১৩, ২০২২ , ১২:১১ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জানুয়ারি ১৩, ২০২২ , ১২:১১ পূর্বাহ্ণ

জীবনের শেষ দিনগুলোতে জেলে থাকার সময় একদিন মাস্টারদার গান শোনার ইচ্ছে হয়। রাত তখন প্রায় ১১/১২টা। জেলের অন্য সেলে থাকা বিপ্লবী বিনোদ বিহারীকে চিৎকার করে ডাকলেন বিপ্লবী কল্পনা দত্ত, ‘এই বিনোদ, এই বিনোদ, দরজার কাছে আয়। মাস্টারদা গান শুনতে চেয়েছেন।’
বিনোদ বিহারী গান জানতেন না। তবু মাস্টারদার জন্য রবি ঠাকুরের ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলোরে’ গানটা গেয়ে শোনালেন। ১৯৩৪ সালের ১২ জানুয়ারি অন্যতম বিপ্লবী তারকেশ্বর দস্তিদারসহ মাস্টারদা সূর্যসেনের ফাঁসির রায় কার্যকর করা হয়। তাই মাতৃভূমির মুক্তি ও দেশবাসীর কল্যাণে প্রাণ বিসর্জন দেয়া দুই বিপ্লবীর প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি। প্রায় ১১ মাস জেলে থাকার পর সশস্ত্র রক্ষীদের কড়া পাহারায় তাদের ফাঁসির রায় কার্যকর করা হয়। এর আগে ব্রিটিশ সেনারা হাতুড়ি দিয়ে নির্মমভাবে পিটিয়ে দুজনের দাঁত ও হাড় ভেঙে দিলে দুজনই জ্ঞান হারান এবং অর্ধমৃত অবস্থায় তাদের ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে দেয়া হয়। যা বিশ্বে বিরল ঘটনা হিসেবে ইতিহাস হয়ে আছে। জেলে থাকাকালীন মাস্টারদার সঙ্গে পরিবারের কাউকে দেখা করার অনুমতি দেয়নি ব্রিটিশ সরকার। ফাঁসির পরও তাদের লাশ কাউকে দেখতে দেয়নি। গভীর রাতেই দুটো লাশ ট্রাকে করে ৪ নম্বর স্টিমার ঘাটে নিয়ে বুকে লোহার টুকরা বেঁধে ব্রিটিশ ক্রুজারে তুলে বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরের সঙ্গমস্থলে অর্থাৎ মাঝদরিয়ায় ফেলে দেয়া হয়। যাতে ভবিষ্যতে আর কেউ ওদের নিয়ে স্বপ্ন দেখার সাহস না পান। চট্টগ্রামের নন্দকাননে হরিশদত্তের ন্যাশনাল স্কুলে ভর্তির পর পড়ার সুযোগ হয় মারাঠি লেখক সখারাম গণেশ দেউস্করের ‘দেশের কথা’ ও বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ’। এরপর মুর্শিদাবাদের বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজে ভর্তি হয়ে পান অধ্যক্ষ শশীশেখর বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো শিক্ষক। যিনি পড়াতেন উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ ও গিবন-এর ‘দি ডিক্লাইন এন্ড ফল অব দ্য রোমান অ্যাম্পায়ার’। পাশাপাশি পড়ার সুযোগ হয় আয়ারল্যান্ডের বিপ্লবী আন্দোলনের ইতিহাস, বিপ্লবী জন মিচেলের আত্মত্যাগের কাহিনী, ইস্টার বিদ্রোহের কথা। যুগান্তর দলের নেতা অধ্যাপক সতীশ চন্দ্র চক্রবর্তী সূর্যসেনকে বিপ্লবের মন্ত্রে দীক্ষা দেন। ১৯১৮ সালে এ কলেজ থেকে বিএ পাস করে চট্টগ্রামে ফিরে এসে হরিশ দত্তের জাতীয় স্কুলের পর তিনি উমাতারা উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে অঙ্কের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন এবং গোপন বিপ্লবী দলে যোগদান করেন। এ সময় তিনি ছাত্রদের মুখে মুখে হয়ে উঠেন ‘মাস্টারদা’। কিছুদিন পর সারা ভারতে বিপ্লবী আন্দোলনের অবস্থা দেখতে গিয়ে আসামে কয়েক মাস কাটিয়ে লখনউ হয়ে কলকাতা ওয়েলিংটন স্কয়ারের গোপন আস্তানায় উঠেন। সেখান থেকে ১৯২৬ সালের ৮ অক্টোবর গ্রেপ্তার করে তাকে পাঠিয়ে দেয়া হয় মুম্বাইয়ের রতœগিরি জেলে। জেলে বসে অন্য রাজবন্দিদের শরৎচন্দ্রের ‘পথের দাবি’র খুব গল্প করতেন মাস্টারদা। বলতেন, ‘মহৎ সাহিত্য মনকে সজীব রাখে।’ ১৯২৮ সালে তার স্ত্রী টাইফয়েডে আক্রান্ত হলে এক মাসের জন্য জেল থেকে ছাড়া হয় সূর্যসেনকে। বিপ্লবী ভাবধারায় দীক্ষিত সূর্যসেন বিবাহবিরোধী হলেও বিএ পাস করে আসার পর ১৯১৯ সালে একপ্রকার জোর করে অভিভাবকরা তার সঙ্গে কানুনগোপাড়া গ্রামের নগেন্দ্রনাথ দত্তের কন্যা পুষ্পকুন্তলা দত্তের বিয়ে দেন। তিনি মনে করতেন, বিবাহ জীবন তাকে কর্তব্যভ্রষ্ট ও আদর্শচ্যুত করবে। বিপ্লবীকে সন্ন্যাসীর মতো হতে হবে। কাম, ক্রোধ, লোভ থাকলে চলবে না। তাই তিনি বিয়ের প্রথম রাতেই সদ্যবিবাহিতা স্ত্রীকে নিজের স্বপ্ন, সাধনা, সংকল্পের কথা বলে বিদায় নিয়ে চলে যান। এরপর স্ত্রীর সঙ্গে কয়েকবার দেখা হলেও খবর নেয়ার প্রয়োজনবোধ করেননি।
১৯২৮ সালের ডিসেম্বর, কলকাতার পার্ক সার্কাস ময়দানে জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে মাস্টারদার নেতৃত্বে চট্টগ্রামের বিপ্লবীরা একযোগে সুভাষ চন্দ্র বসুর পক্ষে দাঁড়ান। ৬৪ দিন অনশনের পর বিপ্লবী যতীন দাসের মৃত্যু হলে আইরিশ রিপাবলিকান আর্মির আদলে গড়ে তোলা হয় ‘ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি’ চট্টগ্রাম শাখা। ১৯৩০ সালে চট্টগ্রামে যুব বিদ্রোহের পরিকল্পনা করেন মাস্টারদা। মোট ৭৩ জন বিপ্লবীকে নিয়ে ‘অগজিলিয়ারি ফোর্স’-এর অস্ত্রাগার এবং পুলিশ লাইনের অস্ত্রাগার এ দুটি প্রধান শত্রæ ঘাঁটি দখলের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ১৮ এপ্রিল রাত ১০টা। মাস্টারদার নেতৃত্বে নন্দকানন টেলিফোন ও টেলিগ্রাফ অফিসে আক্রমণ করে সবকিছু আগুনে পুড়িয়ে দেয়, পাহাড়তলীর রেলওয়ে অস্ত্রাগার এবং দামপাড়া পুলিশ রিজার্ভ ব্যারাক দখল করে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে মাস্টারদা সূর্যসেনকে মিলিটারি কায়দায় সংবর্ধনা দেন। মাস্টারদা অস্থায়ী বিপ্লবী সরকার গঠন করার ঘোষণা দেন এবং চট্টগ্রামকে প্রায় ৪ দিন ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত রাখেন। ২২ এপ্রিল জালালাবাদ পাহাড়ে বিপ্লবীদের সঙ্গে ব্রিটিশ সৈন্য দলের তুমুল যুদ্ধ হয়। জালালাবাদ পাহাড়ের এ যুদ্ধ ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। এরপরই মাস্টারদার সঙ্গে যোগ দেন কল্পনা দত্ত ও প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। ততদিনে ব্রিটিশ সরকার সূর্যসেনকে জীবিত বা মৃত ধরে দেয়ার জন্য ১০ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে। ১৯৩২ সালের ১৩ জুন রাত ৯টায় গোপন সূত্রে খবর পেয়ে পটিয়ার ধলঘাট গ্রামের সাবিত্রী চক্রবর্তীর বাড়িতে মাস্টারদাকে ধরতে অভিযান চালালে ব্রিটিশ ক্যাপ্টেন ক্যামেরনকে গুলি করে মাস্টারদা, প্রীতিলতা ও কল্পনা দত্ত পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও নির্মল সেন গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। গৈরলা গ্রামের ক্ষিরোদপ্রভা বিশ্বাসের বাড়িতে ১৯৩৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি রাত ১০টায় বিপ্লবীদের বৈঠক হয়। অর্থের লোভে বিপ্লবী ব্রজেন সেনের ভাই নেত্র সেন সূর্যসেনের উপস্থিতির খবর জানিয়ে দিলে পুলিশ-সেনাবাহিনী ক্ষিরোদপ্রভা বিশ্বাসের বাড়িটি ঘিরে ফেলে। শুরু হয় উভয়পক্ষে গুলিবিনিময়। কল্পনা দত্ত, শান্তি চক্রবর্তী, মণি দত্ত আর সুশীল দাসগুপ্ত পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও রাত ২টার দিকে ব্রজেন সেনসহ মাস্টারদাকে গ্রেপ্তার করে তল্লাশি চালিয়ে ওই বাড়ি থেকে সূর্যসেনের ‘বিজয়া’ নামক অর্ধসমাপ্ত আত্মজীবনীর খাতা উদ্ধার করে। যা বিচারে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করে। ১৪ নভেম্বর, ১৯৩৩ সালে হাইকোর্ট সূর্যসেনের ফাঁসির রায় ঘোষণা করেন।

গোপাল নাথ বাবুল : দোহাজারী, চট্টগ্রাম।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়