যানজট অভিশাপ থেকে মুক্তি মিলবে কবে?

আগের সংবাদ

খনিজসম্পদ ও সম্ভাবনা

পরের সংবাদ

গ্রামীণ প্রবীণ জীবন

ড. রাধেশ্যাম সরকার

চেয়ারম্যান, ডক্টর রাধেশ্যাম-প্রণতি ফাউন্ডেশন

প্রকাশিত: জানুয়ারি ১৩, ২০২২ , ১২:০৯ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জানুয়ারি ১৩, ২০২২ , ১২:০৯ পূর্বাহ্ণ

আমাদের গ্রাম বাংলার প্রবীণরা কেমন আছেন? গ্রামীণ প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জীবনযাপন সম্পর্কে আমাদের সবারই কম-বেশি ধারণা আছে। বাংলাদেশের বেশিরভাগ প্রবীণ গ্রামগঞ্জে বসবাস করেন। গ্রামের ৯৮ শতাংশ প্রবীণ নিজের বাপ-দাদার ভিটে মাটিতে থাকেন। নিজের গড়া সংসারে পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে পারিবারিক বন্ধন অক্ষুণ্ন রেখে থাকতে ভালোবাসেন। তারা আমৃত্যু ছেলে, ছেলে-বউ, নাতি-নাতনি পরিবেষ্টিত থাকতে পছন্দ করেন। মৃত্যুটা শান্তিময় ও স্বাছন্দ্যময় আশা করেন। কিছু বতিক্রম ছাড়া পারিবারিক বন্ধনটা খুবই মজবুত। গ্রামে আগের মতো একান্নবর্তী পরিবারে সংখ্যা কমে যাচ্ছে। অনেক তরুণ-তরুণী শহরে চাকরি করেন এবং তারা বিয়ে-শাদি করে শহরেই সংসার করছেন। বৃদ্ধ মা-বাবা গ্রামেই থাকেন। তাদের সেবা-যতœ ও দেখাশোনা করার মতো কেউ নেই। অনেক সন্তান মা-বাবাকে নিয়মিত মোবাইলে খোঁজখবর রাখেন, মাঝে মধ্যে বাড়িতে আসেন এবং তাদের দেখাশোনার ব্যবস্থাসহ সব বিষয়ই যতœ নেন। আবার কতিপয় সন্তান আছে তারা মা-বাবার সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ রাখেন না, এমনকি মোবাইলেও যোগাযোগ করেন না এবং দুবেলা খাবার ব্যবস্থা বা চিকিৎসার খোঁজখবরও নেন না। নিজের সবটুকু উজাড় করে সন্তানকে মানুষ করেছেন আর এখন সন্তানের এমন নৈতিক ও মানবিক অবক্ষয় দেখে দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন। সন্তানরা মা-বাবার ভরণ-পোষণের সব দায়িত্ব নিতে ধর্মীয়, মানবিক ও নৈতিকভাবে বাধ্য। কিন্তু গ্রামীণ প্রবীণরা অনেক সময় সন্তানদের কাছ থেকে যথোপযুক্ত সাড়া পান না। এই সমস্যা উপলব্ধি করে বাংলাদেশ সরকার ২০১৩ সালে একটি আইন পাস করেছে, যা মা-বাবার ভরণ-পোষণ আইন-২০১৩ নামে অবহিত। এই আইনে বলা হয়েছে সান্তানকে মা-বাবার যাবতীয় ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করতে হবে। আইন লঙ্ঘনকারীর জন্য জেল ও জরিমানার ব্যবস্থা আছে। কিন্তু গ্রামীণ অধিকাংশ প্রবীণ এই আইনের কথা জানে না অথবা জানলেও সন্তানের বিরুদ্ধে মামলা করেন না। কারণ সন্তানের অমঙ্গল কোনো মা-বাবা চান না। অনেক প্রবীণ আছেন নিঃসন্তান এবং সহায়-সম্বলহীন। তারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তাদের কথা সমাজ ও রাষ্ট্রের ভাবা উচিত।
গ্রামীণ প্রবীণদের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি। অনেক প্রবীণ কৃষি শ্রমিক ও দিনমজুর হিসেবেও কাজ করেন। স্বল্পসংখ্যক প্রবীণ ক্ষুদ্র ব্যবসা যেমন- দোকানদারি, ফেরিওয়ালা, মাছ ও তরকারি বিক্রির সঙ্গে জড়িত। কিছুসংখ্যক প্রবীণ শারীরিক অক্ষমতার জন্য কাজ করতে পারেন না। অধিকাংশ প্রবীণ কোনো না কোনো কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকেন। একদম অচল প্রবীণের সংখ্যা খুবই কম। স্বল্পসংখ্যক প্রবীণ দোকানি, তরকারি বিক্রেতা, গবাদিপশু পালন, হাঁস-মুরগি পালন করে অর্থ উপার্জন করেন। কোনো কোনো প্রবীণ মৌলভী, পুরোহিত ও পণ্ডিত এবং ঘটকালী করে পারিবারিক ব্যয় মিটান। দু-একজন প্রবীণ সামাজিক দান ও ভিক্ষাবৃত্তির ওপর নির্ভরশীল। হাতেগোনা কিছুসংখ্যক প্রবীণ অবসর ভাতা এবং মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পেয়ে থাকেন। বয়স্ক ভাতাপ্রাপ্ত প্রবীণদের সংখ্যাও কম নয়। তবে পরিমাণে খুবই সামান্য।
গ্রামীণ প্রবীণদের শারীরিক অবস্থার বেশি ভালো নয়, অধিকাংশ প্রবীণ কয়েকটি রোগ নিয়ে বেঁচে আছেন। বাতব্যথা, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, চোখ-কান-দাঁতের সমস্যা, হৃদরোগ, কোষ্ঠকাঠিন্য, হজমের সমস্যা, পেপটিক আলসার, প্রসাবে সমস্যা, মাথা ধরা, হাঁপানি, চর্ম রোগ ইত্যাদি রোগে ভুগছেন। আবার কিছু রোগ আছে যার উপসর্গ দেখা যায় না। নিয়মিত চেক-আপ না করার জন্য জটিল অবস্থা ধারণ করে। গ্রামের কোনো প্রবীণ নিয়মিত ডাক্তার দেখান না। অধিকাংশ প্রবীণ কখনো ডাক্তার দেখাননি এবং স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাননি। বেশিরভাগ প্রবীণ কোনো রোগের উপসর্গ দেখা দিলে নিকটস্থ ফার্মেসি থেকে ওষুধ ক্রয় করে খান। সরকারের কমিউনিটি ক্লিনিকে প্রবীণদের জন্য তেমন কোনো সেবা না থাকায় তারা পল্লী চিকিৎসক বা ফার্মেসিম্যানদের ওপর নির্ভরশীল। প্রতিটি গ্রামে বেশ কিছু অতিপ্রবীণ আছেন যারা জটিল রোগে ভুগছেন এবং পারিবরিক অর্থনৈতিক অসচ্ছলতার জন্য চিকিৎসা করাতে পারেন না বিধায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন। গ্রামে দেখা যায় যে, অতিপ্রবীণদের থাকার জয়গাটা অস্বাস্থ্যকর, অন্ধকার, নির্জন বা ঘরের পেছনে অথবা গোয়ালঘরের সঙ্গে থাকার ব্যবস্থা করা হয়। মলমূত্র, ময়লা বিছানা ও কাপড়চোপড়ে সয়লাব। এ রকম একটি বদ্ধ কারাগারে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামির মতো মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে হয়।
প্রবীণরা সাধারণত শিশুর মতো হাসি-খুশি থাকতে চান ও তারা বিনোদনপ্রিয়। গ্রামে প্রবীণদের জন্য কোনো বিনোদনের ব্যবস্থা নেই। প্রবীণরা সামাজিক যে কোনো অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের আগ্রহ দেখান। যেমন- ধর্মীয় উৎসব, পহেলা বৈশাখ, বাউল গান, জারি-সারি গান, বিয়ে, কুলখানি, জনসভা, ভোট, নির্বাচনসহ সব কিছুতেই অংশগ্রহণ করতে চান প্রবীণরা। গ্রামে হাডুডু ও ফুটবল খেলা বা নৌকাবাইচ হলে গ্রামের সব প্রবীণ দেখতে যেতে যান। যে কোনো নির্বাচনী আড্ডা বা চায়ের টেবিলে প্রবীণরাই বেশি মজা করেন। টেলিভিশন, রেডিও ও সংবাদপত্রের সবচেয়ে বেশি অংশগ্রহণ করেন প্রবীণরা। তাই প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে প্রবীণ সেবা ও বিনোদনকেন্দ্র থাকা প্রয়োজন। গ্রামীণ অনেক প্রবীণের পান, তামাক, গুল, বিড়ি, জর্দার অভ্যাস আছে। তামাক শরীরের জন্য ক্ষতিকর, এটা সম্পর্কে সবাই অবহিত। তবুও কু-অভ্যাস ত্যাগ করতে পারেননি অধিকাংশ প্রবীণ। প্রায় সব প্রবীণের কামনা, মৃত্যু যেন সচল অবস্থায় আসে। গ্রামীণ বৃদ্ধদের প্রায়ই একাকিত্বের অভিশাপে ভুগতে হয়। প্রায়ই জীবনসঙ্গী একজন আগেই চলে যান এবং ছেলেমেয়েদের দেশে বা বিদেশে কাজ করতে বাধ্য হয়। একাকিত্বের সঙ্গে যুক্ত হয় বিষণ্নতা। বর্তমানে কেউ আর প্রবীণ মানুষটির কথা শুনতে চায় না। প্রবীণ ব্যক্তিটি তার জীবনের সফলতার কথা গর্ব করে বলতে চায় কিন্তু শোনার মানুষ নেই। এরা একবেলা খাবারের চেয়ে মন খুলে মনের ভাব প্রকাশ করতে পারলে বেশি সন্তুষ্ট থাকে। আমি আমার তরুণ প্রজন্মকে আহ্বান করব আসুন আমরা আমাদের পাড়া, মহল্লা, গ্রামে একটি করে প্রবীণ আড্ডাখানার ব্যবস্থা করি। তাদের কাছ থেকে ঘটে যাওয়া বাস্তব জীবনভিত্তিক ইতিহাস জানি। এতে তারাও মনে শান্তি পাবেন আর আমরাও কিছু শিখতে পারব। আর কোনো প্রবীণ ব্যক্তিকে অবহেলা না করি, কারণ আমারও একদিন ওই মানুষগুলোর মতো হব। যান্ত্রিক সভ্যতায় সবাই ব্যস্ত, এর মঝেও একটু সময় তাদের দিন আনন্দ-বিনোদনের জন্য। এই একটু বিনোদনে গল্প-আড্ডা তাকে প্রফুল্ল রাখবে, যা হাজার টাকার ওষুধের চেয়ে উপকারী।

ড. রাধেশ্যাম সরকার : চেয়ারম্যান, ডক্টর রাধেশ্যাম-প্রণতি ফাউন্ডেশন।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়