উই মিস ইউ লিডার

আগের সংবাদ

সতর্ক হোন, স্বাস্থ্যবিধি মানুন

পরের সংবাদ

নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচন : আইভীর ভোট ফিক্সড হয়ে গেছে?

বিভুরঞ্জন সরকার

জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক

প্রকাশিত: জানুয়ারি ১২, ২০২২ , ১:৩৬ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জানুয়ারি ১২, ২০২২ , ১:৩৬ পূর্বাহ্ণ

করোনা সংক্রমণের হার আকস্মিকভাবে বাড়তে থাকায় সরকার আবারো কিছু বিধিনিষেধ আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। করোনা সংক্রমিত নতুন রোগী ও শনাক্তের হার উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। গত রবিবার সকাল ৮টা থেকে সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ২ হাজার ২৩১ জন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে, যা গত চার মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। করোনার নতুন ধরন ওমিক্রনও দেশে শনাক্ত হয়েছে। ওমিক্রন দ্রুত সংক্রমিত হয়। এ অবস্থায় বৃহস্পতিবার থেকে ১১ দফা বিধিনিষেধের কথা জানানো হয়েছে। মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক, কেউ মাস্ক না পরলে শাস্তির মুখে পড়তে হবে। গণপরিবহন চলাচল করবে অর্ধেক যাত্রী নিয়ে, খোলা জায়গায় সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সমাবেশ বন্ধ করতে হবে। দোকান, শপিংমল, বাজার, হোটেল-রেস্তোরাঁসহ জনসমাগম স্থলে সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে।
এই অবস্থায় নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন হবে কিনা সে প্রশ্ন উঠেছে। আগামী ১৬ জানুয়ারি এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এর মধ্যে নির্বাচনী প্রচারণা জমে উঠেছে। নারায়ণগঞ্জের দিকে এখন রাজনীতি সচেতন সবারই নজর। পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন মিলিয়ে মোট ১৮ বছর মেয়রের দায়িত্ব পালন করা সেলিনা হায়াৎ আইভী এবার আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে নৌকা প্রতীকে পুনরায় মেয়রপ্রার্থী হয়েছেন। মেয়র পদে ৭ প্রার্থী থাকলেও প্রতিদ্ব›িদ্বতা দুজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। সেলিনা হায়াৎ আইভীর প্রধান প্রতিদ্ব›দ্বী তৈমূর আলম খন্দকার। তৈমূর আলম খন্দকার বিএনপির একজন প্রবীণ নেতা। বিএনপি দলগতভাবে নির্বাচনে অংশ না নেয়ায় তৈমূর আলম খন্দকার নির্বাচন করছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে, হাতি প্রতীক নিয়ে। তিনি নিজেকে সর্বদলীয় প্রার্থী হিসেবে প্রচার করছেন। দলের সব পদ থেকে তাকে অব্যাহতি দেয়া হলেও স্থানীয় বিএনপি তার সঙ্গেই আছে। নির্বাচনী প্রচারে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা অংশ নিচ্ছেন। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব স্থানীয় নেতাকর্মীদের ভোট থেকে বিরত থাকার কোনো নির্দেশনা দিয়েছেন, এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে বিএনপি দ্বৈতনীতি নিয়ে চলছে। একদিকে ঘোষণা দিয়েছে রেখেছে, তারা দলীয়ভাবে এই সরকার ও বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে কোনো নির্বাচনে অংশ নেবে না। কিন্তু অনেক জায়গায় বিএনপির পরিচিত নেতারা ধানের শীষ প্রতীক ছাড়া স্বতন্ত্রভাবে অন্য প্রতীকে নির্বাচন করছেন এবং জয়লাভও করছেন। যারা জয়লাভ করছেন তাদের দল থেকে বহিষ্কারের কোনো খবর জানা যায়নি। জিতলে দলের কৃতিত্ব, হারলে দলের দায় নেই- বিএনপির এই নীতি দলের মধ্যে এবং দলের বাইরে সমালোচিত হচ্ছে। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়েও বিএনপি একটি দ্বিমুখী নীতি নিয়ে আছে। তৈমূর আলম খন্দকার জিতলে বলা হবে যে, আওয়ামী লীগের পেছনে কোনো জনসমর্থন নেই, তাদের পায়ের নিচে মাটি সরে গেছে- এটা আবারো প্রমাণ হলো। আর তৈমূর আলম খন্দকার পরাজিত হলে বলা হবে, তিনি তো আমাদের কথা শোনেননি। ধানের শীষ প্রতীক না হলে কি আর ভোটে জেতা যায়? দলের সিদ্ধান্ত না মানার খেসারত তাকে দিতে হলো।
তৈমূর আলম খন্দকার অবশ্য দাবি করছেন যে, সুষ্ঠু নির্বাচন হলে তিনিই জিতবেন। তার মানে হারলে তিনিও বলবেন যে, নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি। তার বিজয় ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে। আমাদের দেশে এখন সবাই ভোটে দাঁড়িয়ে জিততে চান, হারতে চান না কেউ। অথচ হার-জিৎ ভোটের স্বাভাবিক ফল। হারার মানসিকতা না থাকায় যে কোনো উপায়ে জয়ের জন্য প্রার্থীদের মরিয়া চেষ্টার কারণেই নির্বাচনের পরিবেশ শান্তিপূর্ণ থাকে না। নারায়ণগঞ্জে এখন পর্যন্ত মারামারি, হানাহানির ঘটনা ঘটেনি। তবে উত্তেজনা নেই তা বলা যাবে না।
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আইভী পরাজিত হলেও ক্ষমতাসীন সরকারের পতন হবে না। কিন্তু সরকারদলীয় প্রার্থী না হলে বিজয়ীর পক্ষে উন্নয়ন কাজকর্ম এগিয়ে নেয়া সহজ হয় না। কারণ আমাদের দেশে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে উন্নয়ন কাজের জন্য সরকারি বরাদ্দের মুখাপেক্ষী থাকতে হয়। নিজস্ব অর্থায়নে সেটা সম্ভব হয় না। সবকিছুই হয় দলীয় রাজনৈতিক সুবিধা বিবেচনা করে। ভিন্ন দলের কেউ স্থানীয় সরকারের বড় পদে নির্বাচিত হয়ে মানুষের চাহিদা অনুযায়ী কাজ করতে পেরেছেন, এমন নজির আছে কি? নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের সময় এটা কি ভোটারদের বিবেচনার বাইরে থাকবে? প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য আমাদের ভোটের ফল জানার অপেক্ষায় থাকতে হবে।
নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচনে তৈমূরের সঙ্গে তার দল নেই। তিনি দলের সিদ্ধান্ত না মেনে প্রার্থী হয়েছেন। কিন্তু সেলিনা হায়াৎ আইভী তো আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচন করছেন। নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগ কি দলেবলে তার সঙ্গে আছে? না, আওয়ামী লীগ সেখানে বিভক্ত। এক পক্ষের নেতা সংসদ সদস্য শামীম ওসমান। তিনি প্রভাবশালী ওসমান পরিবারের সদস্য। নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগ মোটামুটি তার কথায় চলে বলে শোনা যায়। শামীম ওসমান আগাগোড়া আইভীর বিরুদ্ধে। প্রথমবার তাকে হারিয়েই মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন আইভী। তাদের বিরোধ বা দ্ব›েদ্বর কথা দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অজানা নয়। তারপরও এই বিরোধ নিষ্পত্তির কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায় না।
শামীম ওসমান এবং তার লোকজন আইভীর পক্ষে নামবে না- এই আশঙ্কা থেকেই সম্ভবত কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ আইভীর পক্ষে থাকার জন্য, তাকে জিতিয়ে আনার জন্য আগেভাগেই সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ না করলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার হুঁশিয়ারিও দেয়া হয়েছে। শামীম ওসমান ও সমর্থকদের ওপর এসব হুঁশিয়ারি কোনো প্রভাব না ফেললেও শেষ দিকে এসে শামীম ওসমান সম্পর্কে আইভীর কিছু মন্তব্য এবং তারপর শামীম ওসমানের জবাব- সব মিলিয়ে নির্বাচন পরিস্থিতিতে নতুন করে কিছুটা নাটকীয়তা যোগ হয়েছে। আইভী বলেছেন, তৈমূর আলম খন্দকার ওসমান পরিবারের প্রার্থী। শামীম ওসমান সম্পর্কে গডফাদারের যে ইমেজ তাও উল্লেখ করে কিছুটা চাপে পড়েন আইভী। কিন্তু শামীম ওসমানের সমর্থকরা যে আইভীর পক্ষে মাঠে নেই- সেটাও সবাই দেখছেন। দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বও নিশ্চয়ই চোখ বুজে নেই। নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী পরাজিত হলে তার রাজনৈতিক প্রভাবের কথাও তাদের বিবেচনার বাইরে থাকার কথা নয়। সম্ভবত কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের চাপের কারণেই শামীম ওসমান গত ১০ জানুয়ারি নাটকীয়ভাবে সংবাদ সম্মেলন করে নির্বাচনে নৌকার পক্ষে মাঠে থাকার ঘোষণা দিয়েছেন। তার এই ঘোষণা কতটা আন্তরিক, আর কতটা লোক দেখানো সে প্রশ্ন দলের ভেতরে-বাইরে সব জায়গায় আছে। কেউ বলছেন, শামীম ওসমানের প্রকাশ্য ঘোষণার একটি ইতিবাচক প্রভাব ভোটারদের মধ্যে পড়বে। আর আইভী সমর্থকরা মনে করেন, নির্বাচনকে ঘিরে দলীয় নেতাদের অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা বন্ধ হওয়া জরুরি। বাইরে সমর্থন দিয়ে ভেতর ভেতর তৈমূরের দিকে বাতাস দিলে ফল খারাপ হবে। কয়েকদিন আগে আইভীর জন্য চাঁদা চেয়ে শামীম ওসমান সমর্থক বলে পরিচিত সিটি আওয়ামী লীগ নেতা খোকন সাহার একটি ফোনালাপ ফাঁস হওয়াকে স্যাবোটাজ বলেই মনে করা হয়। কারণ আইভী কারো কাছে চাঁদাবাজি করেন, এটা তার চরম শত্রæরাও বলবেন না।
মাঠের রাজনীতিতে বিরোধী দলের অনুপস্থিতির সুযোগে দেশের রাজনীতিতে ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। মাঠ ফাঁকা পেয়ে গোল দেয়ার যে একটা নিয়ম আছে সেটাও আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতারা ভুলে আছেন এবং যে যেভাবে পারেন গোল দেয়ার চেষ্টা করছেন। তাই শুধু নারায়ণগঞ্জে নয়, সারাদেশেই নৌকা ঠেকাতে নৌকার লোকজনই উঠেপড়ে লেগেছে। আওয়ামী লীগের এই গৃহবিবাদ ক্রমশ একটা বড় সমস্যা হয়ে দেখা যাচ্ছে। দলের শৃঙ্খলা দারুণভাবে ভেঙে পড়েছে।
নারায়ণগঞ্জে এর আগেও কোনো নির্বাচনে শামীম ওসমানের সমর্থন না পাওয়ায় আইভীর জয়লাভে কোনো সমস্যা হয়নি। তবে এবার পরিস্থিতি নানা কারণে কিছুটা ভিন্ন।
আওয়ামী লীগ টানা ক্ষমতায় থাকায় মানুষের মধ্যে কিছু বিরূপতা তৈরি হয়েছে স্বাভাবিকভাবেই। আওয়ামী লীগ শাসক দল হিসেবে অন্য দলের তুলনায় খারাপ নয়- এটা মুখে স্বীকার করেও কেউ কেউ পরিবর্তন চায়। আইভী নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন আগেরবারও করেছেন। তাই এ বিষয়ে তার অভিজ্ঞতা আছে। ভোটারদের মধ্যে আইভীর প্রশ্নে এক ধরনের আবেগ কাজ করে বলে শোনা যায়। দীর্ঘদিন দায়িত্বে থাকলে কিছু না কিছু বদনাম না হয়ে যায় না। স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি, অনিয়ম করা জনপ্রতিনিধিদের একটি স্বাভাবিক ব্যাধি হয়ে দাঁড়িয়েছে। দায়িত্ব পেয়েছেন অথচ কোনো অনিয়মের সঙ্গী হননি, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। কিন্তু আইভী ১৮ বছর দায়িত্ব পালন করলেও তার বিরুদ্ধে তেমন কোনো অভিযোগ তুলতে পারেনি তার রাজনৈতিক বিরুদ্ধবাদীরাও।
সেলিনা হায়াৎ আইভী বলেছেন, ‘শামীম ওসমানের সমর্থন দেয়া না দেয়ায় ভোটের ফলে খুব বেশি প্রভাব ফেলবে না। ভোটাররা অলরেডি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন, তারা কাকে ভোট দেবেন। আমার ভোট ফিক্সড হয়ে গেছে, বড় ব্যবধানে জয় হবে ইনশাআল্লাহ।’
করোনার কারণে ভোট নিয়ে কোনো নতুন সিদ্ধান্ত না হলে ১৬ জানুয়ারি সন্ধ্যায়ই জানা যাবে নারায়ণগঞ্জবাসীর সিদ্ধান্ত।
বিভুরঞ্জন সরকার : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়