সতর্ক হোন, স্বাস্থ্যবিধি মানুন

আগের সংবাদ

যে কারণে বিলুপ্ত নারায়ণগঞ্জ মহানগর ছাত্রলীগের কমিটি

পরের সংবাদ

তিন জট থেকে মুক্তির প্রত্যাশা

প্রকাশিত: জানুয়ারি ১২, ২০২২ , ৮:৩৮ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জানুয়ারি ১২, ২০২২ , ৯:২৯ পূর্বাহ্ণ

নাসিক নির্বাচন ঘিরে ভোটারদের মতামত: জলজট, যানজট ও আবর্জনা জট নারায়ণগঞ্জবাসীর গলার কাঁটা

গত এক দশকে রাস্তাঘাট, ড্রেনেজ ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত অনেক উন্নয়ন হয়েছে নারায়ণগঞ্জ শহরে। মূল রাস্তা ধরে অলিগলিতে পিচঢালা পথের মাঝখানে সবুজের সমারোহ উন্নয়নের কথাই জানান দেয়। তারপরও নাগরিকদের দাবি, এখানকার প্রধান সমস্যা জলাবদ্ধতা, যানজট ও আবর্জনা তাদের গলার কাঁটা। এছাড়া মাদক-সন্ত্রাসের মতো সমস্যা থেকে মুক্তির পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জ শহরকে একটি নিরাপদ ও আধুনিক নগরী হিসেবে দেখতে চায় ভোটাররা। এসব সমস্যা থেকে উত্তরণে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের জোরালো ভূমিকা রাখার দাবি নগরবাসীর। গতকাল মঙ্গলবার নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে এই প্রতিবেদক কথা বলেন সাধারণ ভোটার ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে। আলাপচারিতায় উঠে আসে তাদের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত ও প্রত্যাশার কথা। দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ হাব বন্দর নগরী নারায়ণগঞ্জ। শীতলক্ষ্যার এপার ওপার মিলিয়ে নারায়ণগঞ্জ, সিদ্ধিরগঞ্জ ও বন্দর- এই তিন পৌরসভা নিয়ে ২০১১ সালে গঠিত হয় সিটি করপোরেশন। প্রায় ৭৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই সিটিতে রয়েছে ২৭টি ওয়ার্ড। ২০ লাখ জনসংখ্যার এই শহরে ভোটার ৫ লাখের বেশি।

পৌরসভা থেকে সিটি করপোরেশন হওয়ার পর ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী দুই মেয়াদে ১০ বছর মেয়র পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। এর আগে এক মেয়াদে তিনি পৌরসভার চেয়ারম্যান ছিলেন। ২০১১ সালে মেয়র পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে এবং ২০১৬ সালে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন আইভী। আগামী ১৬ জানুয়ারি সিটি করপোরেশনের তৃতীয় মেয়াদে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া নির্বাচনেও তিনি মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। নির্বাচনে তার প্রধান প্রতিদ্ব›দ্বী হিসেবে রয়েছেন বিএনপি থেকে পদচ্যুত স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী এডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকার। ২০১১ সালে বিএনপির সমর্থনে মেয়র প্রার্থী হয়েছিলেন তিনি। তবে ভোটের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে দলের সিদ্ধান্তে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন। এবার প্রার্থী হওয়ায় বিএনপি তাকে চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা, জেলা কমিটির আহ্বায়ক ও জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সদস্য পদ থেকে অব্যাহতি দিয়েছে। আইভী এবং তৈমূর ছাড়া আরো ৫ জন প্রার্থী মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এছাড়া ১৮২ জন কাউন্সিলর প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন এই নির্বাচনে। এ অবস্থায় নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে ভোটের মাঠের সমীকরণ ততই স্পষ্ট হচ্ছে। সবাই নির্বাচনী মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে নানা

প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট প্রার্থনা করছেন। সাধারণ ভোটাররাও প্রার্থীদের পর্যবেক্ষণে রেখেছেন। ভোটাররা নাগরিক সুবিধা সহজতর করাসহ মাদক-সন্ত্রাস ও সামাজিক সমস্যা দূর করার মতো প্রতিশ্রুতিশীল জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত করার কথা বলেন। নাগরিকদের মতে, নারায়ণগঞ্জের তিনটি পৌরসভা একত্র হয়ে সিটি করপোরেশনে উন্নীত হওয়ার পর আইভীর মেয়াদে বিভিন্ন ওয়ার্ডে ব্যাপক কাজ হয়েছে সত্য; কিন্তু নগরীর মূল সমস্যা তথা জলাবদ্ধতা, যানজট ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কোনো উন্নতি ঘটেনি। একটু বৃষ্টি হলেই রাস্তাঘাট পানির নিচে তলিয়ে যায়। এসব সমস্যার সমাধান না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন নগরবাসী। ভোটারদের প্রত্যাশা, নতুন মেয়র এসব জনগুরুত্বপূর্ণ সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি সিটির অনুন্নত অঞ্চলগুলোর দিকেও নজর দেবেন।

নগরীর ১২ নম্বর ওয়ার্ডের খানপুর বউবাজার এলাকায় স্থানীয় চার বাসিন্দার সঙ্গে কথা হয় গতকাল মঙ্গলবার?। জলাবদ্ধতা, মাদক ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে সমস্যার কথা জানান তারা। রাস্তার পাশে ডিম-রুটি বিক্রেতা স্বপন মিয়া বলেন, রাস্তাঘাট, ড্রেনের কাজ হয়েছে। কোথাও পাকা রাস্তা বাকি নেই। তবে একটু বৃষ্টি হলেই রাস্তাঘাট পানির নিচে তলিয়ে যায়। এছাড়া ময়লা নিয়ে সমস্যা রয়েছে জানিয়ে এলাকার বিভিন্ন স্থানে ডাস্টবিন স্থাপনের দাবি তার। এই ওয়ার্ডের তরুণ ভোটার মিঠু চন্দ্র দাস। গতবার এলাকায় না থাকায় ভোট দিতে পারেননি তিনি। এবারই প্রথম ভোট দেবেন। মিঠু বলেন, যেই নির্বাচিত হোক না কেন যুবসমাজের উন্নয়নে কাজ করতে হবে। তাকেই মানুষ ভোট দেবে, যিনি কাজ করেন এবং যিনি জনসম্পৃক্ত ছিলেন।

নগরীর চাষাড়া চৌরাস্তা মোড়ে কথা হয় স্থানীয় অটোচালক সুমন মিয়ার সঙ্গে। যানজটের দুর্ভোগের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, এখানে যানজট নিত্যদিনের সঙ্গী। যানজটের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। কেউ নগরবাসীকে এটা থেকে মুক্তি দিতে পারল না। তার কথার রেশ টেনে অটোতে থাকা যাত্রী ফরহাদ হোসেন বলেন, ভাই আমাদের এখানকার সমস্যাগুলো নিয়ে একটু ভালো করে লেখেন। যারা সামনে নির্বাচিত হবেন তারা যেন সমস্যাগুলো থেকে আমাদের মুক্তি দেন।

নগরীর ২৫, ২৬ ও ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দারা ময়লা ও পানি সমস্যার কথা জানান। ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের লালখারবাগ এলাকার বাসিন্দা পেশায় রাজমিস্ত্রী মো. ফায়জুল্লাহ বলেন, নিয়মিত ময়লা ফেলার নির্দিষ্ট কোনো জায়গা তাদের নেই। অনেকেই বাড়ির সামনের উন্মুক্ত স্থান কিংবা খালের মধ্যে ময়লা ফেলেন। একই এলাকার মানসুরা বেগম ও আলতাফুননেসা বলেন, তাদের এলাকায় রাস্তাঘাটের কাজ হয়েছে অনেক। তবে পার্শ্ববর্তী একটি কারখানা থেকে নির্গত ডাস্টের কারণে অনেকের শ্বাসজনিত সমস্যা হয়। এই সমস্যা সমাধানের দাবি জানান তারা। একই সঙ্গে পানি সরবরাহের বিষয়েও জোর দেয়ার কথা বলেন তারা।

সিটির বর্তমান সমস্যা ও প্রত্যাশার বিষয়ে জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জ জেলা নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল হক দীপু বলেন, নারায়ণগঞ্জের প্রধান সমস্যা হচ্ছে, যানজট, জলাবদ্ধতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, মাদক-সন্ত্রাস ও বায়ু দূষণ। পাশাপাশি হকারমুক্ত ফুটপাত জনমানুষের দাবি। আগামীতে যারাই নির্বাচিত হবেন, তাদের এ সমস্যাগুলো সমাধানের পথ বের করতে হবে এবং সে অনুযায়ী নগর ব্যবস্থাপনার কাজগুলো এগিয়ে নিতে হবে। এছাড়া নারায়ণগঞ্জকে গ্রিন সিটিতে রূপান্তরিত করতে একটি পিপিপি (পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ) প্রজেক্ট সময়ের দাবি। এই প্রজেক্টের মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জ একটি আধুনিক গ্রিন সিটিতে পরিণত হবে বলে মনে করি।

প্রায় একই সমস্যার কথা তুলে ধরে সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজনের নারায়ণগঞ্জ জেলা সাধারণ সম্পাদক ধীমান সাহা জুয়েল বলেন, এসব সমস্যা সমাধানের জন্য আলাদা আলাদা সংস্থা আছে। যিনি মেয়র নির্বাচিত হবেন, সব সংস্থার সমন্বয় করে তিনি সমস্যাগুলো নিরসন করবেন। পাশাপাশি সন্ত্রাসের নগরী হিসেবে নারায়ণগঞ্জের একটি দুর্নাম আছে। আমরা সন্ত্রাসের নগরী চাই না, একটি শান্তিপূর্ণ নিরাপদ শহর চাই। আমারা যেন সুন্দরভাবে নগরীতে বসবাস করতে পারি। এটাই নাগরিক হিসেবে আমাদের প্রত্যাশা।

গত কয়েক বছরে নগরে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে জানিয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা সাস্কৃতিক জোটের সভাপতি ভবানী শংকর রায় বলেন, আরো যেসব উল্লেখযোগ্য সমস্যা রয়েছে সেগুলো আশা করি যারা নির্বাচিত হবেন তারা সমাধানের উদ্যোগ নেবেন। এছাড়া মাদক, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজমুক্ত সবার বসবাসযোগ্য একটি নগরী গড়ে তুলবেন, নাগরিক হিসেবে জনপ্রতিনিধিদের কাছে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

এদিকে জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী আইভী ও তৈমূর দুজনেই। দুইবারের নির্বাচিত মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী নির্বাচিত হলে চলমান কাজগুলো শেষ করার পাশাপাশি নাগরিক সুবিধা আরো বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। এছাড়া নগরীর প্রধান সমস্যাগুলো সমাধানের পাশাপাশি নদী, পুকুর, জলাশয়, মাঠ, পার্ক নির্মাণে জোর দেবেন বলেও জানালেন তিনি। এ বিষয়ে আইভী বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাকে টাকা দিয়েছেন। সে টাকা দিয়ে নারায়ণগঞ্জের কোনায় কোনায় কাজ করেছি। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, জাইকার অনেক প্রজেক্ট চলমান। এসব প্রজেক্ট শেষ করার জন্য আমি আবার মেয়র হতে চাই। ভোটারদের ভোট চাই। যা আমার ভোটাররা জানে। তাই আমি ভোট চাইলে তারা হাসি মুখে প্রকাশ্যেই আমাকে ভোট দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। এটি তাদের আন্তরিকতার বহিঃপ্রকাশ। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি চাঁদাবাজ নই, সন্ত্রাসী নই, আমার কোনো বাহিনী নেই। আমি অন্যায় দূর্নীতি করিনি। অন্যায় দূর্নীতির প্রতিবাদ করে গেছি।

অন্যদিকে তৈমূর আলম খন্দকার স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে বলেন, তিনি নির্বাচিত হলে নগরীর প্রধান সমস্যাগুলো আগে সমাধান করার ওপর জোর দেব। এছাড়া শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানকে প্রাধান্য দিয়ে নারায়ণগঞ্জকে স্বাচ্ছন্দ্যে বসবাসযোগ্য বিজ্ঞানসম্মত পরিবেশবান্ধব একটি নিরাপদ নগরী হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।

এসএইচ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়