আইন প্রণয়ন ও ইসি গঠনের প্রস্তাব জেপির

আগের সংবাদ

রেমিট্যান্সে থাবা : হুন্ডিতে বাহবা

পরের সংবাদ

মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রে কী হচ্ছে?

আবির হাসান সুজন

শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশিত: জানুয়ারি ১১, ২০২২ , ১:১৮ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জানুয়ারি ১১, ২০২২ , ১:১৮ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশে মাদকের ভয়ানক বিস্তার যত শক্ত অবস্থান তৈরি করছে এর বিপরীতে যথাযথ চিকিৎসা কিংবা নিরাময়ের ব্যবস্থা ততটা জোরদার করা হচ্ছে না। সারাদেশে মাদকাসক্তির সমস্যা যতটা ব্যাপক, এর সমাধানের জাতীয় উদ্যোগ সে তুলনায় একেবারেই ক্ষুদ্র এবং মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা খুবই নগণ্য। বাস্তবতা হলো বেশিরভাগ নিরাময় কেন্দ্রকে অনেক সময় একটি ভবনের ভেতরে জেলখানার মতো মনে হয়। সেখানে পর্যাপ্ত চিকিৎসক থাকে না। সেবা দানকারীদের মধ্যে প্রায়ই মাদকাসক্তদের প্রতি অপরাধী হিসেবে আচরণ করার প্রবণতা থেকেই যায়।
সারাদেশে ১৮-৬০ বছরের মানুষের মধ্যে মাদকাসক্তের সংখ্যা ৫৬ লাখের বেশি। অবশ্য এই বিপুলসংখ্যক মাদকাসক্তের চিকিৎসার জন্য দেশের ৪৪ জেলায় অনুমোদনপ্রাপ্ত মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র আছে মোট ৩৫১টি। এর মধ্যে ১০৫টিই ঢাকায়। ২০ জেলায় অনুমোদনপ্রাপ্ত কোনো নিরাময় কেন্দ্রই নেই। কিন্তু মাদকাসক্তের চিকিৎসা নেয়া ব্যক্তিরা মারধর ও শারীরিক-মানসিক নির্যাতন ছাড়া তারা কোনো চিকিৎসা দেখেননি। নির্যাতনের বিষয়টি সামনে আসে কিছুদিন আগে। গাজীপুরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে। আশা করি এতে কর্তৃপক্ষের টনক নড়েচড়ে যাবে। চিকিৎসার পরিবর্তে নির্যাতন, পরিবেশ ভালো না থাকা, চিকিৎসক না থাকা, অতিরিক্ত টাকা হাতিয়ে নেয়ার মতো নানা অভিযোগে মানুষের আস্থা হারাচ্ছে নিরাময় কেন্দ্রগুলো।
শুধু ঢাকার কেন্দ্রগুলোতেই নয়, ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনায় যে তিনটি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র আছে, সেখানকার অবস্থাও ভালো নয়। অবকাঠামো নেই, রোগী নেই, প্রয়োজনীয় চিকিৎসক নেই, ভালো পরিবেশও নেই। সব মিলে দুরবস্থা বাসা বেঁধেছে সেখানে।
হাতেগোনা কয়েকটি ছাড়া বেশির ভাগ কেন্দ্রই পুনর্বাসন কেন্দ্র নয়। এই কেন্দ্রগুলোতে আসা রোগীদের হাতে-পায়ে শিকল দিয়ে বেঁধে তালাবদ্ধ কক্ষে রাখা হয়। এটি আর যায় হোক চিকিৎসা নয়, এটি মানবিক অবমাননা। নিরাময় কেন্দ্রে মাদকাসক্ত ব্যক্তি আসার পর তাকে প্রশিক্ষিত লোক দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কাউকে কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে তাকে বিশেষ কক্ষে রাখতে হবে। ওই কক্ষের মেঝে ও দেয়ালে ফোমজাতীয় পদার্থ থাকবে, যাতে রোগী পড়ে গিয়ে এবং কোনোভাবে মাথায় আঘাত না পান। মাদক গ্রহণ করতে না পারায় রোগীর শরীরে কাঁপুনি, মলমূত্র ত্যাগ করাসহ বিভিন্ন উপসর্গ ও প্রতিক্রিয়া দেখা দিলে ওষুধ দিতে হবে।
মাদকাসক্তি ছাড়াতে রোগীকে কাউন্সেলিংয়ের মধ্যে রাখতে হয়। অথচ এসব কেন্দ্রে রোগীদের মারধর কিংবা মানসিক চাপে রেখে বন্দিদশায় আরো অসুস্থ করে দেয়া হয় যার ক্ষতিকর প্রভাব রোগীর পরিবারে পড়ে। মাদকাসক্ত যে নিজেই মাদকের ক্ষতিগ্রস্ততার শিকার হয় বিষয়টি এমন নয়, মাদকসেবীর সঙ্গে সঙ্গে পরিবার, বন্ধু-বান্ধব, সহকর্মী, তথা সামগ্রিক সমাজব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে। একটি পরিবার যখন অর্থনৈতিক টানাপড়েন সত্ত্বেও চিকিৎসার জন্য নিরাময় কেন্দ্রে পাঠায় তখন হত্যার মতো ঘটনার শিকার হতেও দেখা যায়।
এমন প্রেক্ষাপটে মাদকাসক্তদের সুস্থ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার প্রত্যয়ে মাদকাসক্তি নিরাময় ও মানসিক স্বাস্থ্য পরামর্শ কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। পরিচ্ছন্ন ও মনোরম পরিবেশ, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, বিনোদনসুবিধা, খেলাধুলা ও জিমনেশিয়ামের ব্যবস্থা, প্লাটিনাম ক্যাটাগরির এসি রুম, আত্মহত্যা ঠেকাতে সেন্সর বিশিষ্ট ফ্যান স্থাপন, লিফট ও জেনারেটর ব্যবস্থা, সব ধর্মের জন্য প্রার্থনার ব্যবস্থা, নারীদের জন্য আলাদা চিকিৎসাব্যবস্থাসহ নানা রকম অত্যাধুনিক বৈশিষ্ট্য থাকতে হবে নিরাময় কেন্দ্রে। আমাদের মনে রাখতে হবে, মাদকাসক্তরা কোনো আসামি নয় কিংবা পরিবারের বোঝা, একটু কাউন্সিলের মাধ্যমে তারাও পেতে পারে সুস্থ স্বাভাবিক জীবন। তাই মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রগুলোর উচিত, তাদের সঙ্গে যথাযথ ব্যবহার করা, আধুনিক পরিবেশ নিশ্চিত করা।
আবির হাসান সুজন
শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়